ধূমপানের জন্মকথা

সন্ধ্যার সময় রাস্তার পাশের টং দোকানে বসে ছিলাম, দোকানদার কে বললাম  মামা চা দেন এক কাপ। চা দিলো, আমি মনের আনন্দে চা পান করিতে লাগলাম। ইতোমধ্যে ৩/৪ জন এসে দোকানিকে বলতে লাগল মামা একটি বিড়ি দাও তো, একজন বললো, ‘মামা একটা সিগরেট দ্যান!’

আর একজন বললো, ‘মামা একটা সিগার দেন তো! পাশ থেকে আর একজন বলে, ‘মামা একটা সিগারেট দেন।’ যে যাই বলুক না কেন মামা হয় সোনালি পাতা বা বেনসন সিগারেট ই বাইর করে দিচ্ছে। ভাবলাম একজিনিসের কত নাম সিগার, বিড়ি, সিগরেট, সিগারেট। আমি ভাবলাম মামা মনে হয় সব ভাষা জানে, হিন্দি, কোরিয়ান, সিলেটি, চাটগাইয়া সব। নাহলে যাই বলুক এক জিনিস দিচ্ছে কি করে।

হঠাৎ ভাবলাম আচ্ছা সিগারেট আসল কিভাবে? কোন সে মানব যে প্রথম এই জিনিস বানালো। কে বলছিল কাগজে মুড়িয়ে, তামাক পাতা পুরিয়ে বাইরে আগুন লাগিয়ে, পেছন দিয়ে টান দিতে। এসেই লেগে গেলাম, বিফল হয়নি। পেয়েছি সিগারেটের জন্মকথা।

সিগারেটের ইতিহাস সুপ্রাচীন। যুগ যুগ ধরে মানুষ শৈল্পিক উপায়ে ধুমপানের নিমিত্তে সিগারেট পান করে আসছে। সভ্যতার ইতিহাস যত পুরনো, মানুষের সাথে সিগারেটের সখ্যতা ততটাই পুরনো ।মানবসভ্যতার নিদর্শন হিসেবে ধরা হয় পাথর ঠুকে ঠুকে আগুন ধরানোর সময়কে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, সেই আগুন জ্বালানো হয়েছিল ৩১ মে তারিখে প্রায় সাড়ে তিন মিলিয়ন বছর পূর্বে।

অন্য এক গবেষণায় বলা হয়, পৃথিবীর হনলুলু এলাকার এক গ্রামের সর্দার টাইকিউপ এর আদেশে তাঁর বিশিষ্ট গুণমুগ্ধা লিলিউপিক প্রথমসিগারেট বানান। প্রভাব – সিগারেটের প্রভাবসমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। ধোঁয়া যেমন চারপাশ গ্রাস করে নেয়, সিগারেটও সমাজ গ্রাস করে নিয়েছে নিজ যোগ্যতায়। পৃথিবীর প্রায় সব মনীষী এবং মহামানবেরা সিগারেটের প্রেমমুগ্ধ ছিলেন।

মানবজাতির অন্যতম বড় প্রতিভা স্যার মার্ক টোয়েন যথার্থই বলেছেন, ‘স্বর্গে যদি ধূমপানের ব্যবস্থা না থাকে তবে আমি সেখানেও যাবো না।’

প্রায় ৮০০০ বছর আগে পৃথিবীতে তামাকের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। আর ৬০০০ বছর আগে থেকে মধ্য আমেরিকায় তামাকের চাষ শুরু হয়। তামাক প্রথমদিকে মূলত ঔষধ হিসাবে ব্যবহার করা হতো। খ্রীষ্টপূর্ব ১০০০ শতাব্দীর দিকে মায়ান সভ্যতার মানুষেরা ধূমপান এবং তামাক পাতা চিবানো শুরু করে।

প্রাচীন গুহাচিত্র থেকে জানা যায় মায়ান পুরোহিতরা ধূমপান করতো এবং এটা তাদের কাছে বিশেষ অর্থ বহন করতো। তাদের বিশ্বাস ছিলো ধূমপানের মাধ্যমে আত্মাদের সাথে যোগাযোগ করা যায়। পরবর্তীতে মায়ানরা পুরা আমেরিকায় ছড়িয়ে যায় এবং সেই সাথে তামাক গাছকেও ছড়িয়ে দেয় আমেরিকা জুড়ে।

ইউরোপিয়ানদের মধ্যে বিখ্যাত নাবিক এবং আবিষ্কারক ক্রিস্টোফার কলম্বাসই প্রথম তামাক গাছ দেখেন। ১৪৪২ সালে কলম্বাস যখন সান সালভাদরে গিয়ে পৌঁছান তখন সেখানকার আদিবাসীরা মনে করেছিলো কলম্বাস ঈশ্বর প্রেরিত স্বর্গীয় জীব! তারা কলম্বাসকে উপহার স্বরূপ কাঠের তৈরি যুদ্ধাস্ত্র, বন্য ফলমূল এবং শুকনো তামাক পাতা দিয়েছিলো।

অন্যান্য উপহার গুলো নিলেও কলম্বাস ধূমপান না করে তামাক পাতা গুলো ফেলে দিয়েছিলো। ঠিক ঐ বছরই আরেকজন ইউরোপিয়ান রডরিগো ডি জেরেয (Rodrigo de Jerez) কিউবায় গিয়ে পৌঁছান এবং ইউরোপিয়ান হিসাবে তিনিই প্রথম ধূমপান করেছিলেন। রডরিগো ডি যেরেয ছিলেন স্পেনের নাগরিক। পরবর্তীতে স্পেনে ফিরে গিয়ে তিনি জনসম্মুখে ধূমপান করে মানুষজনকে চমকে দিতেন।

এক জন মানুষের নাক এবং মুখ দিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছে এটা দেখে সাধারন মানুষ ভড়কে যেত। একটা সময় অনেকেই ভাবতে শুরু করে যে রডরিগো ডি যেরেযের উপর শয়তান ভর করেছে। তাই রডরিগোকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়! কারাগারে রডরিগোর সাথে থেকে অনেকেই ধূমপান শুরু করেন।

মোনার্দেস নামের একজন স্প্যানিশ ডাক্তার বিশ্বাস করতেন যে ধূমপান ৩৬ ধরনের অসুখ নিরাময় করে। যেমন – দাঁতের ব্যাথা, নখের প্রদাহ, সর্দি জ্বর এমনকি ক্যান্সার! তবে এটা শুধুই ছিলো তার একান্ত বিশ্বাস। স্যার ওয়াল্টার রিলি ইংল্যান্ডের রানী প্রথম এলিজাবেথকে ধূমপান করার একটা পাইপ উপহার স্বরুপ দেন। ধূমপান করার পর রানী অসুস্থ্য হয়ে গিয়েছিলো। মনে করা হয়েছিল তাঁকে বিষ দেওয়া হয়েছে! স্যার রিলি আমেরিকায় ভার্জিনিয়ার গভর্নর রালফ লেনের মাধ্যমে পাইপের সাথে পরিচিত হন। ব্রিটিশ কলোনী ভার্জিনিয়া পুরা ইংল্যান্ডের জন্য তামাকের একটা উৎকৃষ্ট উৎস ছিলো।

১৮৫৬ সালে ক্রিমিয়ান যুদ্ধ ফেরত সৈন্যরা তুর্কি থেকে সিগারেট নিয়ে আসে। সৈনিকদের মাঝে সিগারেট অনে জনপ্রিয় হয়ে পড়ে। অলসতা এবং বিষাদ দূর করার জন্য তখন সৈন্যদেরকে নিয়মিত সিগারেট সরবরাহ করা হতো।

১৮৬৫ সালে আমেরিকার নর্থ ক্যারোলিনার ওয়াশিংটন ডিউক নামের এক ব্যাক্তি প্রথম সিগারেট রোল করে বিক্রি করা শুরু করে। আর সেখান থেকেই আজকের সিগারেটের বর্তমান রূপ। সাহসী মহাপুরুষ জো মার্ক্স উচ্চারণ করেন সেই কিংবদন্তী শব্দাবলি, ‘আমাকে যদি সিগারেট ও নারীর মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নিতে বল আমি সব সময় সিগারেটকেই বেছে নিব।’

১৮২৮ সালে নিকোটিনের পিওর ফর্ম আবিষ্কার করেন বিজ্ঞানীরা। কিছুদিনের মধ্যেই সবাই বুঝতে পারে এটা মারাত্মক বিষ।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।