একটি হিংস্র দৃষ্টি ও লাল কার্ডের সূচনা

কার্ড ছাড়া ফুটবল ম্যাচের কথা কেউ ভাবতেই পারেনা। প্রতিটা ম্যাচের পরই কোন খেলোয়াড়টা হলুদ বা লাল কার্ড দেখলো সেটা আলোচনার একটা বিষয় হয়ে দাঁড়ায়, বিশেষ কোন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় যদি কার্ডটা দেখে থাকেন। অথচ পঞ্চাশ বছর আগেও ফুটবলে হলুদ কার্ড, লাল কার্ড বলে কিছু ছিলনা। যদিও ফুটবলে মাঠ থেকে বহিষ্কার আরোপের প্রথা আরো অনেক আগে থেকেই চালু হয়েছে, তবে তখনো সেটা আজকের ফুটবলের মতো ছিলনা।

যেকোন ফরমাল খেলাধুলার জন্যই নির্দিষ্ট নিয়মকানুন, প্রয়োজন অনুসারে শাস্তি, নিষেধাজ্ঞা আরোপের সুযোগ থাকা আবশ্যক। কিন্তু মধ্যযুগে যে ‘মব ফুটবল’ প্রচলিত ছিল সেটাতে নিয়ম বলে কিছু ছিলনা।

দুই পাড়ায় খেলা হতো, খেলোয়াড় সংখ্যা নির্দিষ্ট ছিলনা। দুই পাড়ার শেষ প্রান্তের মাঝামাঝি অংশে খেলা হতো – সবার উদ্দেশ্য ছিল একটাই, ‘ফুলানো শূকরের মূত্রথলি’ কে প্রতিপক্ষের অংশে নিয়ে যাওয়া। শুধু মৃত্যু বা হত্যা ব্যাতিত যেকোন উপায়েই এই কাজ করে যেত। নিয়ম বলতে এটুকুই।

উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত ফুটবল খেলা হতো এই নিয়মেই। ১৮৬৩ সালে অনেক প্রচেষ্টার পর একটি নির্দিষ্ট নিয়মে ফুটবল খেলার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এফএ)। মূলত এই সময়কেই আধুনিক ফুটবলের সূচনাকাল বলা হয়।

অ্যান্টনিও র‌্যাটিন

আধুনিক ফুটবল ১৮৬৩ শুরু হলেও, অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে মাঠে কার্ডের প্রচলন সময়ের হিসেবে একেবারেই। বাস্তবতা হচ্ছে এফএ প্রতিষ্ঠার পর ১০৭ বছর লেগে যায় এই নিয়ম চালু হতে। ১৯৭০ বিশ্বকাপ দিয়ে আন্তর্জাতিক ম্যাচে প্রথম কার্ড ব্যাবহারের নিয়ম চালু করে ফিফা। যদিও ইংলিশ ফুটবল এই নিয়মকে গ্রহণ করতে আরো ছয় বছর সময় নেয়।

কার্ড সিস্টেম চালু হওয়ার আগে রেফারি খেলা নিয়ন্ত্রন করতো সম্পূর্ণ তার কথা এবং ব্যাবহারের মাধ্যমে। কোন খেলোয়াড় নিয়ম ভঙ্গ করলে (যেমন নিয়ম বহির্ভূত ফাউল) তকে সতর্ক করা হতো – এটা ‘বুকিং’ নামে প্রচলিত ছিল, এখনো আছে। দ্বিতীয়বার কোন প্লেয়ার ‘বুকড’ হলে তাকে মাঠ ছাড়ার নির্দেশ দেয়া হতো। এই নিয়ম আরোপে ঘরোয়া ফুটবলে খুব একটা সমস্যা না হলেও আন্তর্জাতিক ম্যাচগুলোতে এভাবে খেলা পরিচালনা করতে গিয়ে ভাষাগত কারণে রেফারিদের সমস্যা পড়তে হতো, কারণ অন্যভাষার খেলোয়াড়রা রেফারির কথা বুঝতে পারতোনা, তাই অনিশ্চয়তা থেকে বিতর্ক তৈরি হতো।

এটা সবসময়ই সত্য যে, একটি বিতর্কিত ঘটনা নতুন কোন নিয়মের পথ তৈরি করে দেয়। ১৯৬৬ সাল বলতে ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ জয়ের বছর বুঝালেও এই বিশ্বকাপের গল্প আরো বড়, কারণ এর হাত ধরে ফুটবলের এই উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন সাধিত হয়।

বিশ্বকাপ জয়ের পথে সেবার কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার সাথে দেখা হয় ইংল্যান্ডের; ওই ম্যাচের দুইটা ঘটনাই মূলত ফুটবলের এই বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পথকে সুগম করে দেয়।

দুই বিতর্কিত ঘটনার মধ্যে অধিক চাঞ্চল্য তৈরি কিরেছিল আর্জেন্টিনা অধিনায়ক অ্যান্টনিও র‌্যাটিনের মাঠ থেকে বহিষ্কার হওয়া। আক্রমনাত্মক মনোভাবের জন্য তিনি পরিচিত ছিলেন আগে থেকেই, যদিও বোকা জুনিয়র ফ্যানরা এটাকে লড়াকু মনোভাব হিসেবে বিবেচনা করতো কিন্তু সেটাই তার জন্য সমস্যা হয়ে দাড়ালো বিশ্বকাপে।

অবশ্য কোন ফাউল বা মারামারির জন্য র‌্যাটিন মাঠ থেকে বহিষ্কৃত হননি, তবে যে কারণে হয়েছেন সেটাই তৈরি করেছিল বিতর্ক। মাঠে থাকা অবস্থায় বোঝা যায়নি ঠিক কি কারণে তাকে বহিষ্কার করা হয়, পরে ম্যাচ রিপোর্টে উল্লেখ করা হয় যে আর্জেন্টাইন অধিনায়ক রেফারির উদ্দেশ্যে নিয়ম লঙ্ঘন করে এমন ভাষা প্রয়োগ করেছে। কিন্তু জার্মান রেফারির স্পেনিশ বোঝার কথা না। তাহলে এটা কিভাবে সম্ভব? আসলে তাকে বহিষ্কারের প্রধাণ কারণ ছিল রেফারির প্রতি হিংস্র দৃষ্টিতে তাকানো। হাস্যকর হলেও এটাই সত্যি।

ঘটনা এখানেই শেষ না। রেফারি যে তাকে বের হয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে সেটা র‌্যাটিন বোঝেননি। তাই তিনি মাঠ ছাড়তে রাজি ছিলেন না। এরপর টুর্নামেন্টের রেফারি প্রধাণ ক্যান এস্টন মাঠে এসে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন।

বোঝার পরও বিব্রত র‌্যাটিন কোনভাবেই মাঠ ছাড়তে রাজি হলেননা। শেষ পর্যন্ত তাকে মাঠ থেকে বের করার জন্য পুলিশ আনতে বাধ্য হয় কতৃপক্ষ। এরপরও ক্ষান্ত হননি র‌্যাটিন। মাঠ থেকে বের হবার পর রাণীর জন্য বিছানো বিশেষ লাল কার্পেট এর উপর বসে পড়েন।

ম্যাচের আরো একটি বিতর্কিত ঘটনা ছিল যেটা নিয়ে এখনো কোন গ্রহনযোগ্য মিমাংসা হয়নি। সেই ম্যাচে ইংল্যান্ডের হয়ে দুই চার্লটন ভাই খেলেছিলেন। ম্যাচের একটা সময়ে জ্যাক গোলমুখে ধাক্কাধাক্কির সাথে জড়িয়ে পড়েন। রেফারি সেখানে আসলে তার ভাই ববি এসে রেফারির সাথে বলতে যায়, কিন্তু সেখানে রেফারির তাদের সতর্ক করার কোন লক্ষণ দেখা যায়নি। কিন্তু ম্যাচ রিপোর্টে দেখানো হয়সে তারা দুজনেই বুকড হয়েছেন এবং পরদিনই ইংলিশ ম্যানেজার এটার কারণ জানতে চিঠি দেয় ফিফাকে। তবে তিনি উত্তরটা পান সেটা পরিষ্কার ছিলনা।

সেই বুকিং নিয়ে ১৯৯৭ সালে স্যার ববি চার্লটন একটু সন্দেহ প্রকাশ করেন। ব্যাপার হচ্ছে – ইংলিশ কিংবদন্তি ক্যারিয়ারে বুকড হয়েছিলেন আরো একবার। কিন্তু ওই বুকিংটা ভুল ছিল বলে রেফারি পরে স্বীকার করে। অর্থাৎ সেটা বাদে শুধু ১৯৬৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের বুকিংটাই ক্যারিয়ারের একমাত্র বুকিং। ফিফা তার অনুরোধে আবারো সেই বুকিং রেকর্ড ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করে। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড আর্জেন্টিনা ম্যাচকে সামিনে রেখে ফিফা স্যার চার্লটনকে জানায় যে সেই ম্যাচে দুই ভাইকেই রেফারি সতর্ক করেছিলেন।

সেই বিশ্বকাপের রেফারিদের প্রধান কেন অ্যাস্টন র‍্যাটিনকে পুলিশ দিয়ে বের করার আগের দৃষ্টিকটু ঘটনাগুলো দেখেন সামনে থেকে। এ ধরণের ঘটনা আবার ঘটুক সেটা তিনি চাননি। ক্যান এস্টোন রেফারি হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিলেন। ১৯৬৩ সালের এফএ কাপ ফাইনালের দায়িত্ব পালন করে তিনি অবসরে যান। এর আগে ১৯৬২ চিলি বিশ্বকাপে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান পরিচালনার জন্য সম্মানসূচক দায়িত্ব দেয়া হয়। তিনি এতো বেশি সন্তুষ্ট করেছিলেন যে পরবর্তি চিলি বনাম ইতালি ম্যাচের দায়িত্বও তাকে দেয়া হয়। কিন্তু এই ম্যাচটার তিনি কখনোই নিজেকে সম্মানিত বোধ করবেন না।

কেন অ্যাস্টন

সেই ম্যাচটি ‘স্যান্তিয়াগোর রণক্ষেত্র’ হিসেবে পরিচিত। ম্যাচ শেষে অ্যাস্টন এটাকে মিলিটারি স্কেলে আম্পায়ারিং বলে আখ্যায়িত করেন। ম্যাচের আগে চিলির পত্রিকাগুলোতে গুজব রটে যে ইতালিয়ানরা চিলিয়ান মেয়েদের নিয়ে বাজে কথা প্রচার করছে। এমন খবরের পর স্বাভাবিকভাবেই ক্ষোভে ফুঁসে চিলি। স্বাভাবিক ভাবেই এর প্রভাব পড়ে মাঠের খেলায়, সে সুবাদে ম্যাচটি হয়ে দাঁড়ায় মর্যাদার লড়াইয়ে।

সেই ম্যাচে অসংখ্যবার ফুটবলারদের মধ্যে মারামারি বন্ধ করার কাজ করতে হয় এস্টনকে। দুই ইতালিয়ান প্লেয়ারকে মাঠ থেকে বহিষ্কার করার সময়ও একজন খেলোয়াড়কে পুলিশের সাহায্য নিয়ে বের করতে হয়। পুরো ম্যাচে রেফারিকে আর্মড পুলিশ সাথে নিয়ে ম্যাচ পরিচালনা করতে হয় যেন ম্যাচটি কোনভাবে শেষ করা যায়। সেই ম্যাচেও ভাশাগত কারণে খেলোয়াড়দের সঠিক নির্দেশনা পেতে সমস্যা হয় এবং ওইরকম উত্তপ্ত ম্যাচে মেজাজ ধরে রাখতে পারেননা অনেক খেলোয়াড়।

সেই ম্যাচ শেষ করার পর রেফারি ককেন অ্যাস্টন সর্বমহলে প্রশংসিত হোন এবং পুরষ্কার হিসেবে ১৯৬৬ বিশ্বকাপে রেফারিদের হেড হিসেবে দায়িত্ব পান। কিন্তু সেবারো একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবার পর তিনি নিয়মের আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন।

একদিন কেনসিংটনের একটি রাস্তার পাশে বসে তিনি লক্ষ্য করেন কিভাবে রাস্তার সিগন্যাল বাতি গাড়িগুলোকে কোন বাক্য বিনিময় ছাড়া নির্দেশনা দিচ্ছে। সাধারণ ধারণা কিন্তু সেটাই ফুটবলের যুগান্তকারী পরিবর্তন নিয়ে আসে । রাস্তায় সিগন্যাল বাতি ছাড়া যেমন ট্রাফিক পুলিশ বারবার সংকেত দিতে হতো, কার্ড প্রবর্তনের আগে রেফারিদের অবস্থাও ছিল তেমন। নতুন নিয়মে হলুদ কার্ড দেখিয়ে সতর্ক করা এবং লাল কার্ড দেখিয়ে মাঠ থেকে বহিষ্কারাদেশ দেয়া হয়। যদিও নতুন নিয়ম নিয়ে খোদ ফিফারই সংশয় ছিল, কিন্তু ১৯৭০ বিশ্বকাপে প্রথম কার্ডের প্রচলন হবার পর সেটা দারুন সফলতা ও জনপ্রিয়তা পায়।

ইংলিশ ফুটবল কার্ড প্রথাকে পুরোপুরি গ্রহণ করেনি। তারা বুকিং এর সংকেত হিসেবে হলুদ কার্ড দেখালেও লাল কার্ডের অধিক ব্যাবহারের কথা মাথায় রেখে তারা শুধু হলুদ কার্ডই গ্রহণ করে। কিন্তু খেলোয়াড়কে মাঠ ছাড়ার নির্দেশের ব্যাপারে আগের সমস্যা থেকেই যায়। ১৯৮৭ সালে ইংলিশ ফুটবল কার্ডের ফিফা স্বীকৃত নিয়ম গ্রহন করে অর্থাৎ মাত্র ত্রিশ বছর আগে কার্ডের প্রচলনটা সর্বজন গৃহীত একটি নিয়মে রুপান্তর হয়।

ফুটবল মাঠে খেলোয়াড়দের উত্তেজনাকে নিয়ন্ত্রন করতে হলুদ কার্ড কিংবা লাল কার্ড এখন খুবই কার্যকরী উপায়। যদিও কার্ড নিয়ে এখনো বিতর্ক তৈরি হয়, সেটা থেকে উত্তরণের জন্য ফিফা ভিডিও এসিস্ট্যান্ট রেফারির নিয়মও চালু করতে যাচ্ছে ২০১৮ বিশ্বকাপে। এরপর থেকে আর কোন সংশয় থাকবেনা কার্ড ব্যাবহারের যৌক্তিকতা নিয়ে।

সেই পুরনো মোব ফুটবলের রুপান্তর হতে হতে আজকের অবস্থানে এসেছে ফুটবল। ১৯৬৬ বিশ্বকাপের অ্যান্টিনিও র‌্যাটিনের সেই হিংস্র চাহনি ছাড়া হয়তো আজকের এই কার্ডের নিয়ম চালু হতোনা। কেন অ্যাস্টন হয়তো সেদিন রাস্তার ধারে বসে চিন্তাও করেননি তার সেই সাধারণ ধারণাই বদলে দেবে ফুটবলকে। তার সুশৃঙখল ফুটবলের স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত সত্যি হয়েছে তারই হাত ধরে। আর অবশ্যই সেটার সাথে জড়িত আছে পাগলাটে র‌্যাটিনের অভাবনীয় ঘটনার যেটা পরবর্তিতে আর্জেন্টিনা ইংল্যান্ডের নতুন এক বিশ্বকাপ প্রতিদ্বন্দীতা তৈরি করে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।