পহেলা বৈশাখ: ইতিহাসের পাতা থেকে

বারো মাসে তেরো পার্বনের জন্য বাঙালির সুনাম বহুদিনের!

বছরঘুরে উৎসবের সমারহ যেন লেগেই থাকে বাঙালির ঘরে ঘরে। আর বাঙালিদের অন্যতম প্রাণের উৎসব হিসেবে আবহমান কাল হতে উদযাপিত হয়ে আসছে পহেলা বৈশাখ। পহেলা অর্থ ‘প্রথম’ এবং বৈশাখ হল ‘বাংলা বর্ষ’ তথা বঙ্গাব্দের প্রথম মাস। বাংলাদেশ ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গ এবং ত্রিপুরার বাঙালিরা এই উৎসব পালন করে থাকে মহা সমারোহে। বসন্তের নবীন পাতায় চড়ে গুটি গুটি পায়ে পহেলা বৈশাখ আসে বাঙালির ঘরে ঘরে।

ছায়ানটের মঞ্চে ঐতিহ্যমণ্ডিত রবীন্দ্রসংগীত ‘এসো হে বৈশাখে’ এ গলা মেলানো সেই লাল পেড়ে সাদা শাড়ি পরা মেয়েটি হয়ত জানে না এই মঞ্চ আর এই উৎসবের তাৎপর্য কতটুকু। চৈত্র শেষের শেষ বিকেলে নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে অস্তমিত সূর্য দেখে মন খারাপ করা ছেলেটা হয়ত জানে না কত অন্ধকার যুগ আর কত আলোর ঠিকানার সাক্ষী এই পহেলা বৈশাখ। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক ক্লাবে, পহেলা বৈশাখ নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটানো ছেলেটি হয়ত জানে না কত ইতিহাসকে বুকে জড়িয়ে রেখেছে এই উৎসব।আর এমন অনেক না জানা বিষয় নিয়ে বছর ঘুরে আবারো বাঙালির দরজায় এসে উপস্থিত পহেলা বৈশাখ। আর এই আনন্দ-উৎসবকে সামনে রেখে আমাদের এই আয়োজন।

  • পহেলা বৈশাখের আদ্যপান্ত

মুঘল আমলে বাংলার অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তথা জমির কৃষি পণ্যের খাজনা প্রভৃতি নির্ভর করত ‘হিজরী সনের উপর’। কিন্তু হিজরী সন চাঁদের উপর নির্ভরশীল বলে কৃষি ফলন এবং সংগ্রহের সাথে এই হিজরী সন ছিল যথেষ্ট সাংঘর্ষিক। তৎকালীন মুঘল সম্রাট আকবর এই অবস্থা বুঝতে পেরে বিখ্যাত জ্যেতির্বিজ্ঞানী এবং চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজিকে প্রাচীণ বর্ষপঞ্জিতে সংস্কার করার নির্দেশ দেন। সেই মোতাবেক ফতেহউল্লাহ সিরাজি হিজরী সন এবং হিন্দু সৌরবর্ষের সমন্বয় সাধন করে নতুন বাংলাবর্ষ বিনির্মাণ করেন। জানা যায়, ১৫৮৪ সালের ১০ অথবা ১১ মার্চ বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে এই পদ্ধতির চালু হয় ১৫৫৬ সালের ৫ নভেম্বর থেকে, যেদিন আকবর সিংহাসন আরোহন করেছিলেন।

ঋতুনির্ভর ছিল বাংলার তৎকালীন কৃষিকাজ। যার কারণে চৈত্র মাসের শেষের দিনগুলোতে জমিদার তালুকদার এবং ভূ-স্বামীরা কৃষকদের থেকে খাজনা গ্রহণ করত। আর বৈশাখের প্রথম দিনটিতে জমিদার, মহাজন ব্যবসায়ীরা তাদের এলাকা এবং ব্যবসা সংশ্লিষ্ট লোকদের মিষ্টি মুখ করিয়ে নতুন বর্ষের শুরু করত। এইদিন ব্যবসায়ীরা আগের বছরের সব পুরাতন হিসাব নিকাশ শেষ করে নতুন হিসাবের খাতা খুলত। আনুষ্ঠানিক ভাবে এই আয়োজনকে বলা হত ‘হালখাতা’। কালের আবহে আজো এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছে পুরান ঢাকা সহ দেশের বহু বাঙালি ব্যবসায়ী।

পহেলা বৈশাখ উদযাপনের ধারাবাহিকতা ব্রিটিশ শাসনামলেও বহমান ছিল। ১৯১৭ সালের প্রথম মহাযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে সেবছর পহেলা বৈশাখে ‘হোম কীর্তন ও পুজার’ আয়োজন করা হয়। ১৯৩৮ সালের দিকেও এই ধরনের কর্মকান্ডের উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে ১৯৬৭ সালের আগে পহেলা বৈশাখ খুব একটা ঘটা করে পালনের রীতি প্রচলিত ছিলনা বলেই জানা যায়।

  • বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখ উদযাপন

১৯৬৫ সালের পূর্বে বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের খুব একটা উল্লেখযোগ্য উদাহরণ পাওয়া যায়নি। তৎকালীন পাকিস্তান সরকার পহেলা বৈশাখ উদযাপনে বিভিন্ন ধরনের কড়াকড়ি আরোপ করার ফলে পহেলা বৈশাখ উদযাপন অনেকটাই ঘরোয়া অনুষ্ঠানে রূপ নেয়। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে নতুন জামাকাপড় পরিধানের মাধ্যমে শুরু হত দিনটি। আত্নীয়-স্বজনের আগমণ, গ্রামে-মহল্লায় বৈশাখী মেলা এবং পান্তা-ইলিশ থেকে শুরু করে নানা পিঠা-পায়েসের আয়োজন এই উৎসবে যোগ করত নতুন মাত্রা।

৬০-এর দশকে পাকিস্তানি শাসক গোষ্টীর অন্যায় আচরণ থেকে মুক্তির উদ্দেশ্যে ১৯৬৭ সালে ঢাকার রমনা বটমূলে ছায়ানটের আয়োজনে শুরু হয় পহেলা বৈশাখের বিশেষ প্রভাতী অনুষ্টান। সেই থেকে আজো বাংলাদেশের অন্যতম বড় এবং উল্লেখযোগ্য পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান হিসেবে এই অনুষ্ঠান মর্যাদা পেয়েছে।

বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখের অন্যতম অনুষঙ্গ ধরা হয় ঢাকা বিশ্বিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের উদ্যোগে বের হওয়া পহেলা বৈশাখের ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’। ১৯৮০ সালের এই শোভাযাত্রার অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। রঙ-বেরঙের মুখোশ, ঢাকের বাদ্য সেইসাথে ঐতিহ্যবাহী বাঙালি সাজে আপামর বাঙালি জাতির অংশগ্রহণ এই শোভাযাত্রাকে করে তোলে বর্ণিল।

পহেলা বৈশাখ উদযাপনে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম পিছিয়ে নেয় কোনদিকেই। ১৯৭৮ সালে চট্টগ্রামের ‘ডিসিহিলে’ আয়োজন করা হয়েছিল বৈশাখী উৎসব। চট্টগ্রামের সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের পরিচালনায় এই উৎসব আজো চট্টগ্রামের অন্যতম বৈশাখী উৎসব হিসেবে গণ্য হয়।

বহু বছর আগে থেকেই পহেলা বৈশাখের অনুষঙ্গ গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী এবং প্রাচীন খেলাধুলা সমূহ।নৌকাবাইচ, গোল্লাছুট, ঘৌড়দৌড়ের মত ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলো আজো গ্রাম বাংলায় কম বেশি চোখে পড়ে।চটগ্রাম শহরের বিখ্যাত লালদীঘির মাঠে শত বছরের ঐতিহ্যকে ধরে রেখে বৈশাখ মাসের ১২ তারিখে হয়ে আসছে জব্বারের বলিখেলা।

জানামতে, বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ এবং বাঙালি যুবক সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাব এবং ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে নিজেদের শক্তিশালী প্রভাব তুলে ধরার উদ্দেশ্যে। চট্টগ্রামের বিখ্যাত ব্যবসায়ী আব্দুল জব্বার ১৯০৭ সালে তাঁর নিজের নামে এই কুস্তি তথা বলীখেলা চালু করেন। শতাব্দী প্রাচীন এই খেলা আজো চট্টগ্রামের অন্যতম প্রধান ঐতিহ্য।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।