নায়করা কেন আর নায়কোচিত নন!

নায়কোচিত সেই এন্ট্রান্সটা আর হয়না কেন জানিনা। যেমন ছিলেন নায়ক রাজ রাজ্জাক, জসিম কিংবা জাফর ইকবাল। অথবা উত্তম কুমার, রাজেশ খান্না, মিঠুন চক্রবর্তী। তাঁরা ছিলেন সত্যিকারের ফিল্মস্টার। শাহরুখ, সালমান, আমির খান, জিৎ- এদেরকে দেখলেই সাধারণ জগতের বাইরে আলাদা একজন মনে হয়।

কিন্তু আমাদের দেশীয় চলচিত্রেও এখনকার অভিনেতাদের কাছে স্পেশাল লুক আছে, কস্টিউমস আছে, ফরেইন লোকেশন আছে। কিন্তু সেই হার্টথ্রুব ব্যাপারটা নেই কেন? যেভাবে রিঅ্যাকশন দেন, তাতে হিরোকে আর হিরো মনে হয়না।

কিন্তু শাহরুখ, সালমানেরা কী করে গত বিশ বছর ধরে দর্শকদের মধ্যে একই রকমের চাহিদা ধরে রাখতে পারছেন?

অভিনয়, দলগত উপস্থাপনায়, নির্মাণশৈলীতে আজও কোথায় যেন বড় একটা বিশাল ঘাটতি রয়ে গেছে আমাদের ঢালিউডি চলচিত্রে। আজকাল চরিত্রগুলো নিয়ে গবেষণা বোধহয় হয়ইনা। সংশ্লিষ্টরা বাজেটের দোহাই দিলেও আমার কাছে মনে হয়, বাজেট তেমন প্রতিবন্ধকতা নয় যদি চলচিত্রের প্রত্যেকটা উপাদানের মিশ্রণ সঠিকভাবে হয়।

যদি ভাল গ্রুমিং সেশন হয়। যদি উচ্চ শিক্ষিত (চলচিত্র পরিচালক, সহকারী পরিচালক, সংলাপ রচয়িতা, গীতিকার ও সুরকার, ফাইট ডিরেক্টর, সেট ডিজাইনার, লাইট ডিরেকশনস, কাস্টিং এজেন্সি এবং দক্ষ ক্রু) পরিচালকদের বেশিবেশি সমাগম হয়। উদাহরণ হিসেবে এমন অনেক কম বাজেটের ছবির কথা বলা যাবে, যেগুলো ভীষণরকম ব্যবসা সফল ছিলো।

উত্তম কুমারের ক্যারিয়ারের প্রায় ২৪/২৫ বছরের মাথায় যখন সত্যজিৎ রায় তাঁকে ‘নায়ক’ ছবিতে কাস্ট করলেন, সেই চিরচেনা রোমান্টিক হিরোর বদলে অন্য এক উত্তম কুমার খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এলেন। এবং ‘নায়ক’ সুপার হিট। বিখ্যাত পরিচালক শক্তি সামন্তের ‘অমানুষ’ ছবিতেও তাই দেখা যায়।

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নায়িকা ববিতাকে নিয়ে যখন ‘অশনি সংকেত’ নির্মাণ করলেন, সেখানে অন্য এক ববিতাকে আমরা খুঁজে পাই। আবার বাসু চ্যাটার্জির ‘হঠাৎ বৃষ্টি’ সিনেমায় ফেরদৌসের যে টেলেন্ট আমরা দেখেছি, সেই মান পরবর্তীতে তার ক্যারিয়ারের অন্য ছবিগুলিতে ক্রমশ ক্ষুন্ন হয়েছে। আমাদের জাহিদ হাসান, রিয়াজ, মাহফুজ আহমেদ- এরা যে হুমায়ন আহমেদের নির্দেশনায় তাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ পারফরম্যান্স দিয়েছেন, তা সবারই জানা আছে।

খান আতাউর রহমান, জহির রায়হান, হুমায়ুন আহমেদ- তাঁরা জানতেন, কী করে অভিনেতা তৈরি করতে হয়, অভিনেতার ভিতর থেকে অভিনয় বের করে নিতে হয়। এই মানুষগুলো আজ কোথায় পাবো? আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে। এখনো অনেককিছু শেখার বাকি।

দুঃখ হয় ভেবে, ‘দীপু নাম্বার টু’ এর পরে আজ পর্যন্ত ভালো মানের শিশুতোষ ছবি এদেশে হয়নি। ভালো একটা আইকনিক এনিমেটেড মুভি তৈরি হয়নি। অথচ এই পাশের দেশেই ‘তারে জামিন পার’ অথবা হলিউডের ‘হোম অ্যালোন’, ‘বেবিজ ডে আউট’ দেখে ভূয়সী প্রশংসা করছি।

একজন বাঙ্গালি নির্মাতাই বহু বছর আগে গুপি গাইন বাঘা বাইন, সোনার কেল্লা বানিয়েছিলেন ভেবে অবাক লাগে। রোমান্টিক ছবির বাইরে গবেষণাধর্মী কাজ হয়েছে। সেগুলো সফল এবং কম বাজেটের ছবি। আমরা টাইটানিক বা এভেটার চাচ্ছিনা, রেম্বো বা টার্মিনেটরের মতো সুপার ডুপার হিট সিরিজও চাচ্ছিনা।

চিল্ড্রেন্স অব হেভেন, শ্রাবণ মেঘের দিন, দুই দুয়ারির মতো সহজবোধ্য, মাটির গন্ধলাগা হৃদয়স্পর্শী কিছু গল্প দাবী করছি। যে কারণে মানুষ হয়তো আবারও সিনেমাহলমুখী হতে পারে। আমাদের সিনেমা শিল্প আবারও সুদিন ফিরে পেতে পারে।

প্রযুক্তিকে আমরা কোনভাবেই অস্বীকার করতে পারবোনা। মানুষ প্রতিনিয়ত সময়কে ধারণ করে চলেছে। আশির দশকে ভিসিআরে দেখা হিন্দি বা হলিউডের ছবিগুলি সিনেমাপ্রেমীদের চলতি সময়ের সাথে ভালো/মন্দ কম্পেয়ার করতে শিখিয়েছে।

স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলো মানুষের রুচির পরিবর্তন ঘটিয়েছে। তবুও বছরে একটা-দুটো হলেও, যখন হুমায়ন আহমেদের সিনেমা হলে লেগেছে, মানুষ সিনেমা দেখতে ছুটে গিয়েছে। প্রত্যেকটি শো হাউজফুল। শত চ্যানেলের ভীড়েও, তাঁর নাটিক দেখতে মানুষ ঠিকই বিটিভিতে ফিরে গেছে।

একজন সিনেমাপ্রেমী, অনুরাগী হিসেবে আমি আমার দেশীয় চলচিত্রের স্বার্বিক উন্নতিতে সংশ্লিষ্টদের আরও বেশি যত্নবান হওয়ার জন্য অনুরোধ করছি।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।