কার্তিক আরিয়ান: একটি অনুপ্রেরণাদায়ক গল্প

কার্তিক আরিয়ান নাকি বলিউডের এই প্রজন্মের খুব ‘ভাগ্যবান’ এক অভিনেতা। কারণ, একদম ক্যারিয়ারের শুরু থেকে তিনি তরুণ প্রজন্মের নয়নের মনি। শুরু থেকে বলতে একদম অভিষেক থেকেই।

প্রথম সিনেমা ছিল ২০১১ সালের ‘প্যায়ার কা পাঞ্চনামা’। ভিন্নধর্মী এই কমেডি সিনেমাটি তিন বন্ধুর গল্প নিয়ে হলেও আলাদা করে নিজের জাত চিনিয়েছিলেন কার্তিক। এই সিনেমার দ্বিতীয় কিস্তি ‘প্যায়ার কা পাঞ্চনামা ২’-তেও তিনি করেছিলেন বাজিমাৎ।

তবে, সমস্যা ছিল একটাই প্রশংসিত সব চরিত্র করলেও কোনোভাবেই বলিউডের ‘প্রথম শ্রেণির নাগরিক’ হতে পারছিলেন না কার্তিক। সেই অপেক্ষার অবসান হল ২০১৮ সালে এসে।

‘সনু কি টিটু কি সুইটি’ বক্স অফিসে খুব বিস্ময়কর রকমের ঝড় তোলে। পৌঁছে যায় ১০০ কোটির ক্লাবে। ব্যাস, এরপর থেকেই কার্তিকের নাম এখন সবার মুখে মুখে। এর মধ্যে যে ক্যারিয়ারের সাতটা বছর কেটে গেছে সেটা যেন কেউ খেয়ালই করলো না। ‘ভাগ্যবান অভিনেতা’ খেতাবের আড়ালে তাঁর লড়াইটা যেন দেখেও না দেখার একটা ভাব ভারতীয় মিডিয়ার মধ্যেও দেখা যায়।

সেই স্ট্রাগলটা কেউ দেখুক আর নাই বা দেখুক, কার্তিককে এখন আর অবজ্ঞা করার চেষ্টাও করছে না কেউ। এখন রাস্তায় তিনি হাঁটলেই ভিড় জমে যায়। বিস্তর সাক্ষাৎকার দিয়ে বেড়ান এখানে-ওখানে। নানা রকম অনুষ্ঠান হাজির থাকেন। এই তো সেদিনই মানিশ মালহোত্রার পোশাক গায়ে দিয়ে স্বয়ং কারিনা কাপুরের সাথে র‌্যাম্পে হাঁটলেন।

পর্দায় কার্তিকের উপস্থিতিতে বাড়তি মাত্রা যোগ করে তাঁর কমিক টাইমিং। ফলে, সিনেমার প্রতিটি ফ্রেমেই সহজেই তাঁকে আলাদা করা যায়। ‘কোনো কিছুই অসম্ভব নয়’ – কার্তিককে দেখে অন্তত তরুণ প্রজন্মের এই কথাটা বুঝে ফেলা উচিৎ।

প্রশ্ন হতে পারে, কার্তিক কি এমন অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন? চলুন এবার সেই গল্পটা বলা যাক।

কার্তিকের আসল নাম কার্তিক তিওয়ারি। জন্ম ১৯৮৮ সালের ২২ নভেম্বর, মধ্য প্রদেশের গৌলারিওরে। বাবা-মা দু’জনেই পেশায় চিকিৎসক। বোঝাই যাচ্ছে, পুরোপুরি নন-ফিল্মি ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে উঠে এসেছেন তিনি। কার্তিক ডি ওয়াই পাতিল কলেজের বায়োটেকনোলজি বিভাগের ছাত্র ছিলেন। অভিনয়ে আগ্রহটা ছিল কৈশোর বয়স থেকেই। তাই ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কঠিন পড়াশোনার ফাঁকফোকরেই অভিনয়ের সুযোগ খুঁজতেন।

ওই সময় থেকেই মডেলিং শুরু করেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে টানা তিন বছর অভিনয়ের অডিশন দিয়ে গেছেন, কখনোই কোনো রোল পাননি। বুঝে ফেললেন এভাবে হবে না। অনেকটা লুকিয়ে লুকিয়েই ক্রিয়োটিং ক্যারেকটার ইন্সটিটিউট থেকে অভিনয়ের একটা কোর্স করে ফেললেন।

বাবা-মাকে বললেন, তাঁকে দিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং হবে না। তিনি অভিনয় করতে চান। কার্তিক জানতেন, মধ্যবিত্ত পরিবারে অভিনেতা হতে চাওয়ার স্বপ্নকে কেউ পাত্তা দেবে না। তাই, তখনই তিনি বাবা-মাকে নিজের ইচ্ছার কথা জানালেন যখন তিনি ‘প্যায়ার কা পাঞ্চনামা’ সিনেমার জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়ে গেছেন।

সিনেমাটিতে সুযোগ পেতেও কার্তিককে কম কাঠখড় পোড়াতে হয়নি। তখন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। ফেসবুকের মারফতে কাস্টিং কল পেয়েছিলেন। দীর্ঘ ছয় মাস ধরে চলে অডিশন। সিনেমার শুটিং চলাকালে তাঁর কাছে অর্থ ছিল না বললেই চলে। লোখান্ডওয়ালাতে একটা অ্যাপার্টমেন্টে ১২ জন এক সাথে থাকতেন। সেখানে সবাই চাইতেন অভিনেতা হতে। সবার জন্য নিজের হাতে রান্না করে নিজের খরচের অর্থটা যোগার করতেন কার্তিক। বাবা-মাকে অডিশনের কথাটা বলারই সাহস পাননি তখন, বলেছিলেন ইন্টার্নশিপ করতে এসেছেন।

‘প্যায়ার কা পাঞ্চনামা’ সিনেমা যেমনেই ব্যবসা করুক না কেন, এখানে কার্তিকের অভিনীত মনোলোগটি রীতিমত ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসের পাতায় চলে গেছে। চার মিনিটের লম্বা এই অংশটি হিন্দি সিনেমার ইতিহাসেই সবচেয়ে বড় মনোলগগুলোর একটি। যদিও, দ্বিতীয় কিস্তিতেই আগের মনোলগের রেকর্ডটা ভেঙেছিলেন তিনি।

এই মনোলোগের পেছনেও একটা গল্প আছে। অডিশনে এই মনোলোগের দৃশ্যটাই তাকে করতে দেওয়া হয়েছিল। টানা ১২ ঘণ্টা সেই ডায়লোগ নিয়ে কাজ করেন কার্তিক। এরপর যখন অডিশনে দেন, তখন পরিচালক লাভ রঞ্জন বুঝে ফেলেন, এই কাজটা এর চেয়ে ভাল করে আর কেউ করতে পারবে না!

কার্তিক অভিনয়ের পাশাপাশি দারুণ ফুটবল ও টেবিল টেনিস খেলেন। নিরামিষভোজী হলেও খেতে ভীষণ ভালবাসেন। তাঁর ক্যারিয়ারে বড় অনুপ্রেরণা হিসেবে মানেন অক্ষয় কুমারকে। যদিও, তাঁর নিজের জীবনটাও কম অনুপ্রেরণাদায়ক নয়।

প্রথম জীবনে ফেসবুক থেকে প্রায়ই কাস্টিং অডিশনের জন্য ডাক পেতেন কার্তিক। কোনো কেন্দ্রীয় চরিত্র, কোনোটা জুনিয়র আর্টিস্টের চরিত্র। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াশোনার সুবাদে ক্লাস-ল্যাব নিয়ে এতটাই ব্যস্ত থাকতেন যে, এর মাঝে খুব কম সময়ই অডিশন দিতে যেতে পারতেন। ভাগ্য ভাল যে, ‘প্যায়ার কা পাঞ্চনামা’ সিনেমার অডিশনটা তিনি মিস করেননি। না হয়, এতটা প্রতিভাবান একজন অভিনেতাকে হেলায় হারাতে হতো!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।