চিরকালের হার্টথ্রুব ঋষি কাপুর

ঋষি কাপুর তিনি এমন এক সুপ্রসিদ্ধ পরিবার থেকে এসেছেন, যেখানে চার প্রজন্ম ধরে কেবল তারকারাই জন্ম নিচ্ছেন। আরেকটু স্পষ্ট করে বললে, তাঁদের জন্মই হয় অভিনয় করার জন্য।

কাপুর পরিবারের আদি নিবাস মূলত পাকিস্তানের পেশোয়ারে। ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের সময় তাঁরা ভারতে চলে আসেন।

ঋষি কাপুরের দাদা পৃথ্বীরাজ কাপুরের খ্যাতনামা একটা থিয়েটার কোম্পানি চালাতেন। তাঁর দাদাকে বলিউডের ইতিহাসের অন্যতম সেরা এক অভিনেতা ও নির্মাতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাকে বলা হয়, ‘দ্য শো-ম্যান অব ইন্ডিয়ান সিনেমা’।

ঋষি কাপুরের ডাক নাম ‘চিন্টু’। বাড়িতে এই মিষ্টি নামেই সবাই ডাকে। আর দর্শকদের কাছে তিনি আজীবন পরিচিত ছিলেন ‘চীর তরুণ’ হিসেবে।

  • ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে শুরু

‘ছোট খাটে একটা শিশু ঘুমিয়ে থাকবে’ – পৃথ্বীরাজ কাপুরের নাটকে এমন একটা দৃশ্য ছিল। নিজের নাতিকে দিয়ে পৃথ্বী সেটা করিয়েছিলেন। মানে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে অভিনয় জগতে পা রেখেছিলেন ঋষি।

মাত্র চার বছর বয়সে রুপালি পর্দায় আসলেন। বাবার ছবি ‘শ্রী ৪২০’-এর একটা বৃষ্টি ভেজা রোম্যান্টিক গানের ‍দৃশ্যে এসেছিলেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য।

  • ‘তরুণ’ প্রেমের গল্প

‘মেরা নাম জোকার’ কর রাজ কাপুরের বিরাট আর্থিক ক্ষতি হয়েছিল। কারণ, ছবিটা দিয়ে শিশুশিল্পী হিসেবে ‘চিন্টু জি’ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়ে গেলেও, বক্স অফিসে ছবিটা একেবারেই চলেনি।

রাজ কাপুরের তাই দেনা মেটানোর জন্য হলেও একটা হিট ছবি দরকার ছিল। তিনি তারুণ্যের প্রেম নির্ভর ছবি বানালেন ডিম্পল কাপাডিয়া আর ঋষি কাপুরকে নিয়ে। ‘ববি’ বিরাট সাফল্য পেল। তাতে রাজ কাপুরের কেবল দেনাই মিটলো না, বিরাট লাভও হল।

আর সাথে সাথে মাত্র ২০ বছর বয়সেই একজন রোম্যান্টিক স্টারের জন্ম হয়ে গেল, যে রাজত্ব পরবর্তী সময়ে প্রায় তিন যুগ স্থায়ী হয়।

ববি সেকালে একটা বিস্ময় ছিল। ৭০ দশকের অন্যতম হিট ছবি এটা। ওই আমলে খোদ নিউ ইয়র্ক টাইমস এই ছবির ওপর প্রতিবেদন ছাপিয়েছিল। শাহরুখ খান একবার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘ভারতীয় সিনেমা এর আগে ছিল নারী-পুরুষ কেন্দ্রীক, ববি মুক্তি পাওয়ার পর সেটা হয়ে গেল ছেলে-মেয়েদের ব্যাপার।’

  • স্বপ্নের রাজকুমার

অমিতাভ বচ্চনের পর ওই যুগে ঋষিই ছিলেন সবচেয়ে বেশি ‘বিক্রিযোগ্য’ তারকা। নির্মাতারা এই চকোলেট বয় ইমেজটা কাজে লাগিয়ে রাতারাতি ছবি হিট করে ফেলতেন। ‘খেল খেল মেয়’, ‘রাফো চাক্কার’, ‘হাম কিসি সে কাম নেহি’ দিয়ে ঋষির এই ইমেজটা তৈরি হয়েছিল।

 

বাইরেও অনেক মেয়ের সাথে নাকি ওই সময়ের ‘স্বপ্নের রাজকুমার’-এর মেলামেশা ছিল। পত্রপত্রিকাগুলোর কেউ কেউ তার নামের সাথে ‘প্লে-বয়’ তকমাও লাগিয়ে ফেলতো।

  • স্ত্রী ভাগ্য

ঋষির মনের নায়িকা ছিলেন নীতু সিং, সে আমলের ডাকসাইটে নায়িকা। ‘খেল খেল মেয়’-এর সেটেই তারা দু’জন দু’জনার কাছাকাছি চলে আসেন। লম্বা সময় প্রেম করেন, ১৯৮০ সালে জমকালো এক বিয়ে করেন।

এই দু’জনের ভাল বোঝাপড়া ছিল গোটা ক্যারিয়ারজুড়েই। নীতুই হয়তো বেশি ত্যাগ স্বীকার করেছেন। পরিবারের খাতিরে আগে ভাগেই রুপালি দুনিয়াকে বিদায় বলেছেন। তবে, পরিবারে টানাপোড়েন হয়েছে সামান্যই। হলেও সেটা সামলে নিতে পেরেছেন।

বলা উচিৎ, নীতু না থাকলে হয়তো ঋষির এতদূর এগোনোটা শক্ত হত। সব সময় ছায়া হয়ে শক্তিটা নীতুই দিয়েছেন। এই দম্পতি রণবীর ও ঋদ্ধিমা’র বাবা-মা। রণবীরের ক্যারিয়ারেও মায়ের অবদানের কোনো শেষ নেই।

  • প্রেমের সওদাগর

ঋষি তার রোম্যান্টিক হিরোর ইমেজ ভাঙতে চেষ্টা করেছেন। ‘কার্জ’ এক্ষেত্রে সবচেয়ে ভাল চেষ্টা ছিল। আবার ‘এক চাদার ম্যাইলি সি’র কথাও বলা যায়, যেখানে তাকে নিজের বিধবা ভাবী হেমা মালীনিকে বিয়ে করতে হয়।

তবে, বারবারই তিনি ফিরেছেন রোম্যান্টিক ঘরানায়। ডিম্পল কাপাডিয়া’র প্রত্যাবর্তনের ছবি ‘সাগর’-এ তিনি ছিলেন। বক্স অফিস হাত ভরে না দিলেও ছবিটি ‘কাল্ট’ তকমা পেয়ে এসেছে।

  • পর্দার আড়ালে…

নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত নায়ক হিসেবেই কাজ করে গেছেন ঋষি। যদিও, ওই সময় বেশ মুটিয়ে গেছেন। চরিত্রগুলোতে তাঁকে অনেক ক্ষেত্রেই আর মানাতো না। নায়ক হিসেবে তাঁর শেষ ছবি ২০০০ সালে মুক্তি পাওয়া ‘কারোবার’।

এর মাঝেই ১৯৯৯ সালে তিনি পর্দার আড়াল থেকে মানে পরিচালনার কাজ করেছিলেন। তবে তাঁর নির্মানে অক্ষয় খান্না আর ঐশ্বরিয়া রায় অভিনীত ‘আ আব লওট চালে’ নামের ছবিটা একদমই চলেনি থিয়েটারে।

  • সেকেন্ড ইনিংস

টেস্ট ক্রিকেটের প্রথম ইনিংসের চেয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে বেশি রান পাওয়াটা টেকনিক্যালি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সেই হিসেবে নিজের ক্যারিয়ারটাকে টেস্ট ক্রিকেটের মত খেলেছেন।

আস্তে আস্তে তিনি চরিত্রাভিনেতা বনে গেছেন। ‘হাম তুম’, ‘ফানা’ কিংবা ‘দিল্লী সিক্স’-এর মত ছবি করে তিনি ফিরেছেন। ‘দো দুনি চার’-এ ২৫ বছর পর পর্দায় জুটি বেঁধেছেন স্ত্রী নীতু সিংয়ের সাথে। আর সেটা করে ফিল্মফেয়ারে সমালোচকদের দৃষ্টিতে সেরা পুরস্কার জিতেছেন।

এরপর আর থেমে থাকেননি। ‘অগ্নিপথ’, ‘স্টুডেন্ট অব দ্য ইয়ার’, ‘আওরঙ্গজেব’, ‘কাপুর অ্যান্ড সন্স’, ‘১০২ নট আউট’, কিংবা ‘মুলক’ – যখন যেটা করেছেন, স্রেফ কাঁপিয়ে দিয়েছেন।

শেষের এই তৃপ্তিকে সঙ্গী করেই শেষযাত্রায় গেছেন ঋষি!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।