সাংবাদিকদের ছোট করতে গিয়ে আপনি ক্রিকেটারদেরই হেয় করলেন!

সাংবাদিকদের গালি দেন যা ইচ্ছা। আমার আপত্তি নাই। ক্রিকেটারদের ছোট করলে আপত্তি আছে। প্রবল আপত্তি। সিম্পল। আমি এরকমই।

বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি গালি খায় মনে হয় সাংবাদিকরা। সব শ্রেণি, সব পেশা, সব বয়সের মানুষ যখন-তখন যাচ্ছেতাই সব কথা বলে সাংবাদিকদের নিয়ে। একজন সাংবাদিক হিসেবে আমার প্রচণ্ড খারাপ লাগে। তবে রাগ করতে পারি না। ক্ষিপ্ত হতে পারি না। প্রতিবাদ করতে তো পারিই না। কারণ জানি, আমাদের পেশায় এমন অনেক লোক আছে, তারা এমন সব কাজ করে যে গালিগুলো খেতে হয়। জেনারেল পাবলিক পারসেপশনের যা অবস্থা, ওই লোকদের জন্য বাকি সবারও গালি খাওয়া জায়েজ।

তো, ভাবমূর্তি যেখানে তলানিতে, সেখানে কেউ যদি মনে করে যে সাংবাদিকরা লাঞ্চ বা ডিনারের আশায়, কিংবা ‘ইনসাইড নিউজের’ জন্য ক্রিকেটাদের তেল মারে, সেটা খুব অস্বাভাবিক নয়। আরও কত অপমানই তো কত জনে করে। কিন্তু, সাংবাদিকদের ছোট করতে গিয়ে যদি কেউ ক্রিকেটারদেরও ছোট করে, তাহলে আমার সেখানে প্রবল আপক্তি আছে।

ঘুষ বা উপঢৌকন যারা নেয়, তারা যেমন দোষী, যারা স্বেচ্ছায় বা উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য ঘুষ দেয়, তারাও সমান দোষী। কোনো ক্রিকেটার যদি নিজের স্বার্থে কাউকে লাঞ্চ-ডিনার করায় বা কেউ যদি সাংবাদিকদের মাধ্যমে পাবলিক সিমপ্যাথি জাগিয়ে খেলতে চায়, ওই সাংবাদিকের পাশাপাশি ক্রিকেটারও তো দোষী, নাকি? তীর তো দুই পক্ষের দিকেই ছোঁড়া হলো!

সাংবাদিকদের ছোট করতে গিয়ে কাকে ছোট করা হলো? হাজব্যান্ডের সতীর্থদের, টিমমেটদের।

আমার একান্তই ব্যক্তিগত আপত্তি এখানে। প্রচণ্ড খারাপ লেগেছে যে ক্রিকেটারদেরও ছোট করা হয়েছে। আমার ‘ব্যক্তিগত’ খারাপ লাগার কথা বলছি, কারণ গত ৯-১০ বছর ধরে আমি অনলাইনে-অফলাইনে এই ব্যাপারটি নিয়ে প্রচণ্ড লড়াই করে আসছি, ক্রিকেটারদের যেন কোনোভাবেই ছোট করা না হয়। সবসময়ই, যে কোনো ইস্যু, ক্রিকেটারদের দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবা ও ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছি। ক্রিকেটীয় সমালোচনার বাইরে কোনো গালি, ব্যক্তিগত আক্রমণ ক্রিকেটারদের করা হলেই ঝাঁপিয়ে পড়েছি। ক্রিকেটারদের হয়ে রীতিমত যুদ্ধ করেছি কথায় ও লেখায়। সেটি তামিম-সাকিব-মাশরাফির জন্য যেমন করেছি, সৌম্য-লিটন-তাসকিন বা সম্ভব সবার জন্যই করেছি। কিন্তু আজ যখন দেখছি, ক্রিকেটার ফ্রেটারনিটিরই একজন ক্রিকেটারদের এভাবে পাবলিক পোস্টে ছোট করেছে, আমি কষ্ট পেয়েছি।

ইংরেজিতে লেখা পোস্ট শুধু দেশে নয়, দেশের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। সাংবাদিকদের সম্পর্কে যেমন তারা বাজে ধারণা পেয়েছে, ক্রিকেটারদের সম্পর্কেও খুব ভালো ধারণা পায়নি। যেহেতু, ক্রিকেট সমাজেরই একজন এসব লিখেছে। দলের জন্য খুব ভালো বিজ্ঞাপন এটি নয়।

তামিম-মাশরাফিদের নিশ্চয়ই এতটা দু:সময় আসেনি বা সৌম্য-তাসকিন বা যে কেউ এতটা ছোট মানসিকতার নিশ্চয়ই নন, যে সাংবাদিকদের হাতে রেখে জনপ্রিয়তা পেতে হবে!

ক্রিকেটার-সাংবাদিকতা, এসব তো পেশা। এর বাইরেও তো ‘মানুষ’ বলে একটা পরিচয় থাকে লোকের। মানুষে মানুষে সুসম্পর্ক রাখা, কথা বলা, বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার করা, এসবও বড় গুণ। বড় যোগ্যতা। এই স্বাভাবিক মানবিক গুণাবলিকেও যদি কেউ জটিল করে ভাবে, তাতে তার মানসিক দৈন্যই প্রকট হয়ে ফুটে ওঠে।

সব মানুষ এক ধরণের নয়, এটি আমি যথেষ্টই ভালো বুঝি। উদাহরণ যদি দেই, লিটনের জন্য অনলাইনে কম যুদ্ধ করিনি। সে সম্ভবত আমার নামও জানে না, চেহারা চেনে কেবল। হাই-হ্যালোর বাইরে কথাও হয়নি জীবনে। তাতে সমস্যার কিছুই আমি দেখি না। তিনি নিজের মতো থাকেতে পছন্দ করেন। অন্য অনেকেই আবার দূর থেকে দেখলেই ডাকবেন, কথা বলবেন, হাসি-মজা করবেন। এটা তাদের ধরণ। তার মানে লিটন খারাপ? মোটেও না, সে তার মতো। কিন্তু যারা কথা বলছে, মজা করছে, তারা কি উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য করছে? এভাবে ভাবলে তা খুবই দু:খজনক।

একক জনের ধরণ এককরকম, এটা বুঝি বলেই ২০১০-১১ সালের দিকে যখন সাধারণ ক্রিকেট অনুসারী থেকে শুরু করে মিডিয়া, বলাবলি শুরু করেছিল ‘সাকিব বেয়াদব’, তখন লিখেছি ও বলেছি যে সাকিব ক্রিকেট মাঠের সুপারম্যান, তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আমাদের না ভাবলেও চলবে। তামিমের পাশে যখন অহঙ্কারী তকমা লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল, বারবার বলেছি যে ব্যাটিংয়ে তাঁর শরীরী ভাষা আগ্রাসী, এটিই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

সাকিব আমাদের সর্বকালের সেরা ক্রিকেটার হয়ে গেছেন আরও ৫-৬ বছর আগেই। আন্তর্জাতিক আঙিনায় তিনি বাংলাদেশ ক্রিকেটের উজ্জ্বলতম বিজ্ঞাপন। অসংখ্য রেকর্ড, দুর্দান্ত সব কীর্তি তাঁর। টক শোতে তাঁকে নিয়ে কিছু বললে, তাকে নিয়ে দু কলম লিখলে, কতটাই বা অবমূল্যায়ন করা যাবে তাকে? কতটা!

তাঁর রেকর্ড, তাঁর অসাধারণ সব পারফরম্যান্স মুছে ফেলা যাবে? এসবই তো সাকিবের হয়ে কথা বলবে। কেউ যদি সত্যিই মনে করেন যে টক শো করে বা লিখে সাকিবের মাহাত্ম্য কমানো যায়, তাহলে দু:খজনক হলেও সত্যি, তিনি ক্রিকেটার সাকিবের বিশালত্ব, সাকিবের ওজন জানেন না বা বোঝেন না, তা তিনি যতোই সাকিবের কাছের কেউ হন। ক্রিকেটার সাকিবের বিশালত্বের কাছ এসব টুকটাক কমপ্লেক্স পাত্তাই পাওয়ার কথা নয়।

বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ট্রলের শিকার হওয়া ক্রিকেটার সম্ভবত তামিম। ম্যাগি নুডুুলস বা চাচার জোর থেকে শুরু করে কত কিছু করা হয়েছে তাকে নিয়ে! যাচ্ছেতাই অপমান করা হয়েছে। ২০১৫ সালে তামিমের স্ত্রীকে মাঝরাতে ফোন করে, ম্যাসেজ গালাগাল করা হয়েছে, ট্রলের ছবি পাঠানো হয়েছে ইনবক্সে। তামিমের স্ত্রী, ক্রিকেটের ‘সি’-ও বোঝেন না, একা কেঁদেছেন, তামিমকে জানতেও দেননি। অনেক পরে, তামিমের সুসময়ে সেসব তামিম জানতে পেয়েছেন।

অসংখ্য ইস্যুতে গত ১০ বছর ধরে লড়াই করছি ক্রিকেটারদের হয়ে। কত সহকর্মীর সঙ্গেও কত কথার লড়াই হয়েছে। আজকে তারা বলছেন, ‘দেখলেন তো, আপনার ক্রিকেট পরিবার নিজেরাই নিজেদের কোন চোখে দেখে!’ আমি জবাব পাইনি, অসহায় লেগেছে।

‘Few’ বা ‘some’ journalists বা ‘sections of media’ লিখলেও তবু নিজেকে বোঝাতে পারতাম যে সবাইকে বলেনি। কিন্তু গণহারেই বলা হয়েছে। এত বছর ধরে সবচেয়ে বেশি লড়াই করেছি সম্ভবত সাকিব ও তামিমের জন্যই। সেটির দারুণ প্রতিদান!

আমরা সংবাদকর্মীদের অনেকেই, অনেক সময় সময়ই অনেক কিছু চেপে যাই। দেশের ক্রিকেটের স্বার্থে, ওই ক্রিকেটারের স্বার্থে। আমি সেটাকে এমনকি সাংবাদিকতার নীতির সঙ্গে আপোসও মনে করি না, কারণ দেশের জন্যই সাংবাদিকতা। এই তো এবারই, গত কয়েকদিনে হয়েছে, তার সিকিভাগও মিডিয়ায় আসেনি। ৫০ ভাগ লেখা হলেও বিস্ফোরণ হয়ে যেত। কিন্তু সামনে বিশ্বকাপ, দলের ভেতর অস্থিরতা সৃষ্টি যাতে না হয়, তাই এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। অথচ ক্রিকেট সমাজেরই একজন ইস্যু তৈরি করলেন।

সাংবাদিকরা খারাপ, বাজে। কিন্তু ক্রিকেট ফ্রেটারনিটির একজন ক্রিকেটারদের হেয় করলে, ইস্যু তৈরিই হয়। ক্রিকেটারদের ব্যক্তিগত অপমান করা বা আক্রমণ করা আমাকে আহত করে। আমি প্রবল ভাবেই আহত হয়েছি। এবং ক্রিকেটাররাও অনেকে শকড, নিশ্চিত করে বলছি। তাঁদের অনেকে এটা ভালোভাবে নেননি, কাল তাদের নিজেদের মধ্যে কথা হয়েছে বিস্তর। শেষ পর্যন্ত সামনে বিশ্বকাপ বলেই পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি সোশ্যাল সাইটে।

তারা যেমন শুভ বোধের পরিচয় দিয়েছে, তেমনি সবারই শুভ বোধের উদয় হোক। সামনের আড়াই মাসে দলের ভালো-খারাপ যে কোনো কিছু হতে পারে। আনন্দ হোক বা দু:খ, পরিবার হয়ে যেন সবাই মন থেকে একসঙ্গে সামলাতে পারে।

– ফেসবুক ওয়াল থেকে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।