কলেজ ড্রপআউট হ্যাকার: পাঁচ হাজার থেকে পাঁচ কোটি রুপির গল্প

হ্যাকার, কলেজ ড্রপআউট কিংবা একজন টেক উদ্যোক্তা – এই সবগুলো শব্দকে এক সাথে সাধারণত নিয়ে আসা যায় না। তবে, শশাঙ্ক চোওরের সফলতার গল্পটা এমননি। ভারতের ইন্দোরের এক মধ্যবিত্ত ব্রাহ্মণ পরিবারে বাবা-মার প্রশ্রয়ের মধ্যেই বড় হয়েছেন তিনি। বয়স যখন মাত্র ১৩ তখন তিনি কম্পিউটারে প্রেমে পরেন।

পারলে সারারাত জেগে গেমস খেলতেন। স্কুলের পরীক্ষা মিস দেওয়া রীতিতে পরিণত করেন। কোডিংই তখন তাঁর ধ্যান-জ্ঞান। হ্যাকিংও শুরু করেন। চ্যাটরুমে যতজন বন্ধুর সাথে দেখা হয়েছে, সবার প্রোফাইলই তিনি হ্যাক করেছেন।

ওই সময়ে সব কোডাররাই হ্যাকার হতে চাইতো। হ্যাকারদের মধ্যে শশাঙ্কের র‌্যাংকিং এগোতে থাকে। শিগগিরই তিনি ইমেইল অ্যাকান্ট হ্যাক করার বিনিময়ে ৫০ ডলার করে নিতে শুরু করেন।

ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের প্রথম বর্ষে থাকার সময়ও এই হ্যাকিংয়ের অভ্যাস ছিল। শশাঙ্ক স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘আমি ভারতীয় সরকারের ৪০ টি ওয়েবসাইট ও ১০০ টি কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট মাত্র ১৮ মিনিটের মধ্যে হ্যাক করেছিলাম। সবারই সাইবার সিকিউরিটির হাল যে যাচ্ছেতাই, সেটা জানিয়ে রিপোর্টও করেছিলাম কেউ আমলে নেয়নি।’

texture, textures

শশাঙ্ক এরপর বছর দুয়েকের ইন্দোর পুলিশের সাইবার সিকিউরিটি কনসালটেন্ট হিসেবে কাজ করেন। শশাঙ্ক জানান, ইন্টারনেট রিলে চ্যাটের (আইআরসি) মাধ্যমে এফবিআই, সিআইএ’র মত বড় প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়োগ দেয় হ্যাকারদের, উদ্দেশ্য সাইবার সিকিউরিটি নিশ্চিত করা। ফলে অনেকটা আইনের রাস্তাতেই হ্যাকিং শুরু করেন শশাঙ্ক।

তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় কাজটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। তবে, আমি হ্যাকিং জানতাম, আর সেটাই করতে চাইতাম।’ তবে, পড়াশোনাটা তাঁর জন্য এতটা সহজ ছিল না। ছিল বিরক্তিকর। তাই দ্বিতীয় বর্ষে গিয়েই ঝরে যান।

  • কলেজ ড্রপআউট থেকে ওয়েব সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞ

স্টিভ জবস রিড কলেজের ড্রপআউট হয়েও অ্যাপেলের মত প্রতিষ্ঠান বানিয়েছেন। বিল গেটস ছিলেন হার্ভার্ড ড্রপআউট, তিনি হলেন মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা, মার্ক জুকারবার্গ পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে বানিয়েছেন ফেসবুক। তবে, উপমহাদেশে মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়াকে ঠিক ভাল চোখে দেখা হয় না। বরং, এই সময়ে অভিভাবকদের গালমন্দ আর প্রতিবেশিদের রক্তচক্ষু হজম করতে হয়।

এরপর কি? বড় একটা প্রতিষ্ঠানের ওয়েব সিকিউরিটি কনসালটেন্ট হয়ে গেলে কেমন হয়? শশাঙ্ক এর জন্য একটা কৌশল অবলম্বন করলেন। তিনি বলেন, ‘আমি ইন্দোরের সেরা একটা প্রতিষ্ঠান খুঁজে বের করলাম। তাঁদের ভোক্তাদের ই-মেইল হ্যাক করে প্রতিষ্ঠানটির নিরাপত্তাগত দুর্বলতার জানান দিলাম। তখন ওদের আমি একটা বিজনেস আইডিয়া দিলাম, এর সাথে কি ধরণের রিসোর্স লাগবে সেটা জানালাম। ব্যস, ওরা আমাকে নিয়োগ দিয়ে দিল।’

সেখানে বছর দেড়েকের মত কাজ করলেন শশাঙ্ক। এই সময়ে তিনটা প্রমোশন পেলেন। তবে, আরেকটা প্রতিষ্ঠানের বড় অফার পেয়ে চলে গেলেন, তখন তিনি প্রোজেক্ট ম্যানেজার। নতুন এই প্রতিষ্ঠানটির হয়ে ৪৫ দিন কাজ করেই চাকরি ছেড়ে দিলেন। কারণ, এই সময়ে একদমই পারিশ্রমিক দিচ্ছিল না তাঁরা। শশাঙ্ক বলেন, ‘যখন ছাড়লাম তখন আমার সম্বল হল পকেটে থাকা পাঁচ হাজার রুপি।’

  • শুরু হল নতুন লড়াই

২০০৯ সালের ২৩ ফেব্রয়ারি বিকেল পাঁচটায় শশাঙ্ক চাকরি ছাড়েন। কোনো কলেজ ডিগ্রি না থাকার পরও তিনি অনলাইনে আউটসোর্সিংয়ের কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন। কিছুদিন বাদে এক বন্ধু যোগ হন তাঁর সাথে। ২০০৯ সালে তাঁরা একটা ছোট দল নিয়ে ‘ইন্ডিয়া ইনফোটেক’-এর যাত্রা শুরু করেন।

শিগগিরই তারা বুঝতে পরেন, সার্ভিস বেসড না হয়ে প্রোডাক্ট বেসড কিছু করতে হবে তাঁদের। শশাঙ্ক বলেন, ‘বড় কিছু করতে চাইলে প্রোডাক্টে যেতে হবে। তবে, এত অল্প পূঁজি দিয়ে প্রোডাক্ট ব্যবসায় যাওয়া সম্ভব নয়। তখনই একটা বুদ্ধি বের করলাম – সেল প্রোডাক্ট অ্যাজ আ সার্ভিস।’

সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন (এসইও)-এর সার্ভিস ‍শুরু করলেন। প্রথমে তাঁদের ক্লায়েন্ট ছিল মাত্র পাঁচটি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে তিনটি প্রতিষ্ঠান এখনো তাঁদের সাথে আছে।

নিজেদের আলাদা অফিস নিলেন। তবে, বাসা থেকে অফিস প্রায় সাত কিলোমিটার দূর। শশাঙ্ক তাই অফিসেই থাকা শুরু করলেন, যাতে করে কাজে বেশি সময় দিতে পারেন।

  • সাফল্যের শিখরে

সেই সময় থেকে এখন অবধি ১০ হাজারের ওপর এসইও প্রোজেক্ট সফল ভাবে সম্পন্ন করেছেন শশাঙ্ক ও তাঁর প্রতিষ্ঠান। পাঁচ হাজার রূপি নিয়ে যাত্রা শুরু করা শশাঙ্ক এখন বছরে পাঁচ কোটি রুপি আয় করেন। ভারত জুড়ে ইন্ডিয়া ইনফোটেকের এখন চার হাজারেরও বেশি ক্লায়েন্ট আছে। শশাঙ্ক বলেন, ‘ক্লায়েন্টদের কাছে আমরা এখন এসইও’র সুপারহিরো।’

শশাঙ্কের অফিস

একটা সময় এই প্রতিষ্ঠানের জন্য দৈনিক ১৮ ঘণ্টা কাজ করতেন শশাঙ্ক। আজ তিনি এতটাও মরিয়া নন, তবে কাজ ঠিকই করছেন। তিনি বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানের হয়ে আমার কাজ এখন পরিকল্পনা করা ও সেটা বাস্তবায়ন করা একটা টিমের সাহায্যে। হ্যা, আজও আমাকে ৮-১০ ঘণ্টা দৈনিক কাজ করতে হয়।’

শশাঙ্কের জীবন এখন অনেকটাই পাল্টে গেছে। বদলে গেছে চারপাশও। বিশেষ করে যখন তিনি বাড়ি থেকে কোনো সুপারবাইক কিংবা ঝাঁ-চকচকে গাড়িতে করে বের হন, তখন প্রতিবেশিদের চেহারাটা দেখার মত হয়!

– ইওরস্টোরি অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।