ট্র্যাজেডিক গুরু দত্ত: বলিউডে অনন্তকাল টিকে থাকা একটি নাম

বসন্ত কুমার শিব শংকর পাডুকোন! এই নামটা শুনে বা কোথাও দেখে চলচ্চিত্রপ্রেমীরা কাউকে চিনবেন না বললেই চলে। সেই হিসেবে বলা যায় শুধুমাত্র বার্থ সার্টিফিকেটেই বসন্ত কুমার শিব শংকর পাডুকোন নামটা থেকে গেলো, কিন্তু সেলুলয়েডের পর্দার নাম ‘গুরু দত্ত’ স্বর্ণাক্ষরে চিরস্থায়ী হিসেবে রয়ে গেলো সিনেমা জগতে।

ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতে চিত্রনাট্যকার, প্রযোজক, পরিচালক, অভিনেতা হিসেবে গুরু দত্ত নামে উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে জ্বলজ্বল করছেন অকাল প্রয়াত বসন্ত কুমার পাডুকোন। গুরু দত্ত ভারতের প্রথম পরিচালক যিনি সিনেমাস্কোপে শ্যুট করেছিলেন সেই ষাটের দশকের শুরুতে। সফল প্রযোজক, পরিচালকের পাশাপাশি অভিনয়ের জগতেও গুরু দত্ত এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। ২০১০ সালে সিএনএনের ‘সর্বকালের সেরা ২৫ এশীয় অভিনেতা’র তালিকায় তার নাম অন্তর্ভুক্তি হওয়াটা তাকে অমর করে রাখবে সিনেমাপ্রেমীদের মাঝে।

পারিবারিক সুত্রে জানা যায় বয়স যখন মাত্র দেড় বছর তখন একদিন খেলতে খেলতে চলে গিয়েছিলেন কুয়োর ধারে৷ সেই সময় তাঁর দাদী এসে না বাঁচালে সেটাই হত তাঁর জীবনের শেষ মুহূর্ত৷ সেই অল্প বয়সে বসন্ত কুমার মৃত্যুর ফাঁড়া কাটিয়ে উঠতে পারলেও ১৯৬৪ সালের ১০ অক্টোবর মাত্র ৩৯ বছরে মৃত্যুর ফাঁড়া কাটাতে পারেননি খ্যাতিমান গুরু দত্ত৷ বলা হয়ে থাকে গুরু দত্তের ব্যক্তিগত জীবন ফিল্মি দুনিয়ার কোনো মাশালা সিনেমার গল্পের থেকে কম ছিলো না। গুরু দত্তের ফিল্মি ক্যারিয়ার, প্রেম,বিয়ে এবং মৃত্যু নিয়ে একটা সময় তোলপাড় হয়েছিল বলিউড৷

১৯২৫ সালের ৯ জুলাই দক্ষিণ ভারতের একটি অভিজাত ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার বাবা-মা দুজনেই শিল্প-সাহিত্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। ফলে সাংস্কৃতিক আবহে বেড়ে ওঠেন তিনি। তার ছোট বোন ললিতা লাজমী প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী। বেঙ্গালোরে জন্ম হলেও কলকাতার ভবানীপুরে শৈশব কাটে তার। সেখানেই শৈশব এবং কৈশোর কাটানোর ফলে  বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি আলাদা একটা টান অনুভব করতেন তিনি। বাঙালিদের মতোই বাংলা বলতে পারতেন। বাংলা এবং বাঙালির প্রতি টান থেকেই আসল নাম সরিয়ে বাংলা নাম গ্রহণ করে হয়ে বসন্ত কুমার থেকে তিনি হয়ে গেলেন গুরু দত্ত।

পারিবারিক অসচ্ছলতার কারণে মেট্রিক পাশের পর আর কলেজে যাবার সৌভাগ্য হয়নি তার। ওইসময় বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী উদয় শংকর একটি শোয়ের জন্য কলকাতায় এলে ঘটনাচক্রে তার দলে নৃত্যশিল্পী হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়ে যান তিনি। এখান থেকেই মূলত সিনেমার প্রতি ভালোবাসা শুরু হয়। এমনকি চলচ্চিত্র জগতে তিনি নৃত্য পরিচালক হিসেবেই যাত্রা শুরু করেন পুনের ‘প্রভাত ফিল্ম স্টুডিও’র মাধ্যমে।

আর এই স্টুডিওতে কাজ করার সময়ই তার বন্ধুত্ব হয় ভারতীয় চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেতা দেব আনন্দের সাথে। বন্ধুত্ব এতোটাই গভীর হয় যে, দেব আনন্দ তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, আমার প্রযোজিত সিনেমার পরিচালক হিসেবে কাজ করবে তুমি। পরবর্তীতে সেই প্রতিশ্রুতি রেখে ছিলেন দেব আনন্দ। তার প্রযোজিত ‘বাজি’ সিনেমায় পরিচালক হিসেবে যাত্রা শুরু করেন গুরু দত্ত। অন্যদিকে নিজের পরিচালিত  সিনেমায় নায়ক হবেন দেব আনন্দ এই ওয়াদাও রেখেছিলেন গুরু দত্ত তবে বন্ধুকে নায়ক হিসেবে চুক্তিবদ্ধ করেও নিজের প্রযোজিত ‘সিআইডি’ সিনেমাটি নানা কারনে পরিচালনা করতে পারেননি গুরু দত্ত। পরবর্তীতে এই সিনেমা পরিচালনা করেন রাজ খোসলা।

তবে চিত্রনাট্য, পরিচালনা এবং প্রযোজনার মাধ্যমে গুরু দত্ত ভারতীয় চলচ্চিত্রে আলাদা একটা জায়গা করে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন সেই পঞ্চাশের দশকেই। গুরু দত্ত ছিলেন একাধারে পরিচালক, প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার ও অভিনেতা। এই চার ভূমিকাতেই তিনি ছিলেন সফল। শুধু তাই নয় গুরু দত্ত এগিয়ে ছিলেন তার সময়ের চেয়ে। তার পরিচালিত ‘পিয়াসা’, ‘কাগজ কে ফুল’ সিনেমা দুটিকে বলা হয় বলিউডের শতবর্ষের ইতিহাসে অন্যতম সেরা সৃষ্টি।

টাইম ম্যাগাজিনের ‘সর্বকালের ১০০ সেরা চলচ্চিত্র’ তালিকায় পিয়াসা অন্তর্ভুক্ত। ২০০২ সালে সাইট অ্যান্ড সাউন্ড-এর সমালোচক ও পরিচালকদের ভোটেও এটি সেরা ১০০ চলচ্চিত্রের তালিকায় স্থান পায়, যেখানে দত্তকে সর্বকালের সেরা পরিচালক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তার পরিচালিত ছবির মধ্যে রয়েছে ‘বাজি’, ‘বাজ’, ‘পিয়াসা’, ‘আর পার’ ,  ‘জাল’, ‘কাগজ কে ফুল’, ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস ফিফটিফাইভ’, ‘সয়লাব’।

প্রযোজক ছিলেন ‘আর পার’, ‘সিআইডি’, ‘পিয়াসা’, ‘গৌরি’, ‘কাগজ কে ফুল’, ‘চৌধভিন কা চান্দ’, ‘সাহেব বিবি অউর গোলাম’,‘বাহারে ফির ভি আয়েগি’ সিনেমার। অভিনেতা হিসেবেও তিনি ছিলেন জনপ্রিয়। ‘পিয়াসা’, ‘সাহেব বিবি অর গোলাম’, ‘কাগজ কে ফুল’, ‘চৌদভী কি চান্দ’ সহ বিভিন্ন সিনেমাতে অনবদ্য অভিনয় উপহার দিয়েছেন তিনি। তার প্রতিটি সিনেমার গান আলাদা ছাপ রেখে গিয়েছে। এতোকাল পরেও এসব গান এখনো সমান জনপ্রিয়।

সিনেমায় কাজের বদৌলতে পরিচয় হয় সেই সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় গায়িকা গীতা রায়ের সাথে। পরিচয় থেকে প্রেম এবং প্রেম থেকে বিয়ে। ১৯৫৩ সালে বিয়ে করেন গুরু দত্ত এবং গীতা রায়। বিয়ের পরে গীতা রায় থেকে গীতা দত্ত হিসেবে আবির্ভূত এই জনপ্রিয় প্লেব্যাক গায়িকা। প্রেম করে বিয়ে এবং তাদের কোলজুড়ে তিন সন্তানের আগমন হলেও  বিবাহিত জীবন সুখের হয়নি গুরু-গীতার। প্রযোজক, পরিচালক এবং অভিনেতা হিসেবে অসাধারন একজন ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত হলেও ব্যক্তিগত জীবনে গুরু দত্ত ছিলেন ভীষন খামখেয়ালি, আবেগপ্রবণ স্বভাবের। এছাড়া ধূমপান ও মদ্যপানে আসক্ত ছিলেন তিনি। খ্যাতি, নাম, প্রতিপত্তির সাথে সাথে এসব যেনো বেড়েই যাচ্ছিলো দিন দিন।

এসবের মাঝেই ১৯৫৬ সালে গুরু দত্তর সঙ্গে পরিচয় হয় ওয়াহিদা রহমানের। ভারতীয় চলচ্চিত্রে দীলিপ কুমার-মধুবালা, দেব আনন্দ-সুরাইয়া র মতোই এক ট্র‍্যাজিক প্রেম কাহিনি গুরুদত্ত-ওয়াহিদার। সেই যুগে মুসলিম মেয়ে হয়েও ভারতনাট্যম জানা ওয়াহিদা রহমান তখন একটি তেলেগু সিনেমার একটি গানে অভিনয় এবং পারফরম্যান্স করে আলোচিত এবং প্রশংসিত। ওয়াহিদা রহমানকে এক নজর দেখেই নিজের প্রযোজিত ‘সিআইডি’ সিনেমায় দেব আনন্দের সাথে একটি নেগেটিভ রোলে কাস্ট করেন গুরু দত্ত। সিনেমায় অসাধারন সৌন্দর্য্য, অভিনয় এবং নাচ দিয়ে ওয়াহিদা নজর কাড়েন হিন্দি সিনেমার দর্শকদের।

পরের সিনেমায় নিজের বিপরীতে নায়িকা হিসেবে নেন ওয়াহিদা রহমানকে। জুটি হিসেবে তাদের প্রথম সিনেমা ‘পিয়াসা’ বক্স অফিসে ব্যবসাসফল এবং সমালোচকদের কাছে ব্যাপক প্রশংসা লাভ করে। আজকের সময়ে এসে অলটাইম ক্ল্যাসিক সিনেমার মর্যাদা দেয়া হয়। এরপরে মুক্তি পায় গুরু দত্তের অভিনয় জীবনের আরেকটি মাইলফলক খ্যাত ‘সাহেব বিবি অওর গোলাম’। এই সিনেমা ভারতীয় চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম সেরা একটি সিনেমা হিসেবে গন্য করা হয়।

মীনা কুমারী এই সিনেমা দিয়েই ‘ট্র‍্যাজেডি কুইন’ খেতাব লাভ করেন। সিনেমার প্রতিটা গান, অভিনয়, সংলাপ সবই প্রশংসিত হয়। ‘পিয়া অ্যাউসো জিয়া মে’, ‘না যায়ো সাইয়া ছুড়াকে বাইয়া’ বা ‘ভাবরা বড়া নাদান হ্যায়’ সবকটি গান আজো জনপ্রিয়। প্রথমে ভূতনাথ চরিত্রে শশী কাপুরকে ভাবা হলেও পরবর্তীতে গুরু দত্ত নিজেই অভিনয় করেন।

ওয়াহিদা রহমানের সাথে গুরু দত্তের পর্দায় রসায়ন যেমন অনবদ্য ছিল, তেমনি ব্যক্তি জীবনেও তারা ছিলেন পরস্পরের কাছাকাছি এসেছিলেন বলে গুঞ্জন শোনা যায়। অসাধারন সুন্দরী এবং ধীরস্থির স্বভাবের ওয়াহিদার প্রেমে পড়ে আবেগপ্রবণ গুরু দত্ত। তবে ওয়াহিদার তরফ থেকে কখনোই সেরকম কিছু ছিলোনা বলে জানা যায়। কিন্তু এই একতরফা প্রেম বা আসত্তি গুরু দত্তর দাম্পত্যজীবনকে তছনছ করে তোলে।

এমনিতেই মদ্যপান নিয়ে ঝামেলা ছিলো, এখন ওয়াহিদার সাথে প্রেম সব মিলিয়ে গীতা দত্ত তাকে ছেড়ে সন্তানদের নিয়ে আলাদা থাকতে শুরু করেন। যদিও সবকিছুর পরেও তাদের বিচ্ছেদ হয়নি কিন্তু তারা পৃথকভাবে বাস করার কারন গুরু দত্তের মানসিক টানাপড়েন আরও বাড়িয়ে দেয়। জানা যায় তিনি যেমন ওয়াহিদাকে ভালোবাসতেন তেমনি ভালোবাসতেন নিজের স্ত্রীকেও। দুজনের কাউকেই ত্যাগ করতে চাননি তিনি।

ব্যক্তিগত জীবনের এই টানাপোড়েনের নেতিবাচক ছাপ পড়ে গুরু দত্তের ক্যারিয়ারে। চলচ্চিত্র জগতের কাহিনী নিয়ে নির্মিত ‘কাগজ  কে ফুল’ ব্যবসায়ীক ভাবে অসফল হয়। এই সিনেমাতেও অভিনয় করেছিলেন ওয়াহিদা-গুরু জুটি। যদিও কাহিনি, পরিচালনা, অভিনয়, গান সব দিক থেকে সিনেমাটি ছিল  সেই সময়ে দাড়িয়ে এক অসামান্য সৃষ্টি। গুরু দত্ত সেই ষাট দশকেই সিনেমাস্কোপে শ্যুট করেছিলেন ‘কাগজ কে ফুল’ সিনেমার। মেহবুব স্টুডিওর একটি দেয়াল ভেঙে স্টুডিওর ভেতরের লাইট এবং বাইরের ন্যাচারাল লাইটের সংমিশ্রণে চিত্রায়িত করেছিলেন ক্ল্যাসিক ‘ওয়াক্ত নে কিয়া ক্যায়া হাসিন সিতাম’ গানটি।

গীতা দত্তের মায়াভরা কন্ঠে কোন নাচ বা লিপসিং ছাড়াই ওয়াহিদা রহমান আর তার চোখের এক্সপ্রেশন এবং নির্মানের মুন্সিয়ানা গানটিকে কালজয়ী মর্যাদা এনে দিয়েছে। কিন্তু ব্যক্তিজীবনের মতোই সিনেমার গল্পে বিবাহিত পরিচালকের সঙ্গে নায়িকার প্রেমের কাহিনি সে সময়ের দর্শক গ্রহণ করতে পারেনি। ভারতের আরেক খ্যাতিমান পরিচালক, প্রযোজক এবং অভিনেতা রাজ কাপুর সেই সময়েই বলেছিলেন যে, ‘কাগজ কে ফুল’ সময়ের আগেই বানানো হয়েছে। এবং তার কথার সত্যতা পাওয়া যায় যখন পরবর্তীতে অবশ্য ক্ল্যাসিকের মর্যাদা লাভ করে এই সিনেমাটি।

‘কাগজ কে ফুল’ সিনেমার ব্যর্থতা আবেগপ্রবণ গুরু দত্তকে আরো বেসামাল করে দিয়েছিলো। তবে এরপরে ‘চৌধভি কা চান্দ’ সিনেমাতে ওয়াহিদার বিপরীতে আবারো অভিনয় করেন তিনি। মুসলিম পরিবারের গল্প নিয়ে এই সিনেমায় তাদের জুটি এবং দক্ষ অভিনয় আলোচনা, প্রশংসা এবং ব্যবসায়িক সফলতা সবই পায়। তবে গুরু দত্তের সাথে ওয়াহিদার ততোদিনে দুরত্ব তৈরী হয়ে যায়। গুরু দত্তের কাছ থেকে কিছুটা দূরে সরে যান তিনি।

অবশ্য ক্যারিয়ারে ব্যস্ততা ও সাফল্যই এই দূরত্বের একমাত্র কারণ ছিলো না। ওয়াহিদা তার ঘনিষ্ট বান্ধবী নায়িকা নন্দার কাছে আক্ষেপ করেছিলেন যে, তিনি সরে গিয়েছিলেন এই কারণে যেন গুরু দত্তর বিবাহিত জীবনে শান্তি ফিরে আসে। কিন্তু পরবর্তীতে বোঝা যায় সেটি ছিল তার ভুল ধারনা। তিনি বুঝতে পারেননি অভিমানী গুরুদত্ত আত্মহননের পথ বেছে নিতে পারেন। একাকীত্বের হতাশা সম্ভবত গুরু দত্তের জীবনকে অসহনীয় করে তুলেছিল।

১৯৬৪ সালের ১০ অক্টোবর মদের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে খেয়েছিলেন গুরু দত্ত। মাত্রাতিরিক্ত ঘুমের ওষুধ ও অতিরিক্ত মদের বিষক্রিয়ায় মাত্র ৩৯ বছর বয়সেই এই দক্ষ অভিনেতা, পরিচালকের মৃত্যু ঘটায়। অবশ্য এর আগেও দুবার আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। মৃত্যুর আগে তিনি ফোন করেছিলেন জনপ্রিয় গায়িকা আশা ভোঁসলের বাড়িতে, ফোনে জানতে চেয়েছিলেন তার স্ত্রী গীতা সেখানে আছেন কি না। আশা ভোঁসলেই শেষ ব্যক্তি যিনি গুরু দত্তের সঙ্গে কথা বলেন। গুরু দত্তের ছেলে অবশ্য এই মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে মেনে নেননি। তার মতে এটি ছিল দুর্ঘটনা।

গুরু দত্তের ছোট ভাই দেবী দত্ত বিশ্বাস করেন গুরু দত্ত আত্মহত্যা করেননি৷ একটা সময় অভিনেতা মানসিক অবসাদে ভুগতেন৷ সেই কারণেই ঘুমের ওষুধ খেতেন তিনি৷ দেবী দত্তের দাবি, তাঁর ভাই নিজের প্রাণ নেননি৷ অতিরিক্ত ঘুমের ওধুষ খাওয়ার কারণেই মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়েছিলেন অভিনেতা৷ দেবী তাঁর দাদার সঙ্গে দীর্ঘ এগারো বছর কাজ করেছেন৷ তাই এতটা বিশ্বাস নিয়ে তিনি এ কথা বলতে পেরেছেন৷ দেবী দত্ত আরো জানিয়েছিলেন যে- মৃত্যুর ঠিক আগের দিনও স্বাভাবিক এবং সুস্থ অবস্থায় ছিলেন গুরু দত্ত।

‘বাহারে ফির ভি আয়েঙ্গি’  সিনেমার সেটে দেবীর সঙ্গেই ছিলেন তিনি৷ শ্যুট শুরু হতে আর কয়েক মুহূর্ত বাকি৷ হঠাৎ একজন মুখ্য অভিনেতা শ্যুট ক্যানসেল করায় বেশ রেগে গিয়েছিলেন গুরু দত্ত৷ পরের দিন শ্যুট ক্যানসেল হওয়ার কারণে দেবী এবং গুরু দত্ত কেনাকাটা করতে বেরিয়ে গিয়েছিলেন৷ কোলাবার এক মার্কেট থেকে নিজের দুই ছেলে অরুণ এবং তরুণের জন্য জামাকাপড় কিনে ফিরে আসেন তারা৷ কেনাকাটার পর একসঙ্গেই গুরু দত্তের অ্যাপার্টমেন্টে সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা নাগাদ ফিরে আসেন তাঁরা৷ তখন পেডার রোডের সেই ফ্ল্যাটে একাই থাকতেন তিনি৷ পুরোপুরি স্বাভাবিক ছিলেন তিনি। তাই পরদিন মৃত্যুর খবর বিশ্বাস করতে পারেননি দেবী দত্ত।

মৃত্যুর আগে গুরু দত্ত নতুন সিনেমা নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিলেন।  ‘পিকনিক’ এবং ‘লাভ অ্যান্ড গড’ সিনেমার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন তিনি। ‘লাভ অ্যান্ড গড’ সিনেমার পরিচালক ছিলেন মুঘম-ই-আজম খ্যাত কে. আসিফ। সিনেমাটি প্রায় দুই দশক পর মুক্তি পায়। গুরু দত্তের পরিবর্তে সেটিতে অভিনয় করেন ভারতের আরেক জনপ্রিয় অভিনেতা সঞ্জীব কুমার। গুরু দত্তের মৃত্যুর পরে গীতা দত্ত নিজেও যন্ত্রনা ভুলে থাকতে মদের নেশায় আসক্ত হয়ে যান।

গান গাওয়া ছেড়ে দেন তিনি। ১৯৭২ সালে শারীরিক অবনতির কারণে এই অসম্ভব গুনী এবং জনপ্রিয় গায়িকা মৃত্যবরন করেন। অন্যদিকে গুরু দত্তের অকাল প্রয়ানে শোক ভোলার জন্য কাজের মধ্যেই ডুবে যান ওয়াহিদা। প্রতিদিন দুই শিফটে কাজ করতে থাকেন তিনি। সেই সময়ের হিসাবে বিয়ের বয়স পার করে এসে নিজেকে সামলে নিয়ে ১৯৭৪ সালে গুরু দত্তের মৃত্যুর ১০ বছর পরে বিয়ে করেন তিনি।

অনেকে বলেন ‘কাগজ কে ফুল’ সিনেমার গল্পই সত্যি হয়ে উঠেছিল পরিচালক-প্রযোজক-অভিনেতা গুরু দত্তের জীবনে। একে একে নিজের জীবনের সব প্রিয়জনকে হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে বেচে থাকার চেয়ে হয়তো আবেগপ্রবণ মানুষটি বেছে নিয়েছিলেন সেই রাস্তা যার থেকে আর ফেরা যায় না। তবে যাবার আগে তার প্রতিটা কাজের মাধ্যমে তিনি যে অমর হয়ে রইবেন অন্ততকাল সেটি মনে হয় বোঝা হয়ে গিয়েছিলো গুরু দত্ত’র।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।