গুঞ্জন সাক্সেনা: ফ্লাইঙ হাই ইনটু দ্য বয়েজ ক্লাব

গুঞ্জন সাক্সেনা সিনেমাটা দেখলাম। আগে নিজের গল্প শোনাই, তারপরে মুভি রিভিউ দেয়া যাবে।

আমার বাপের গুষ্ঠিতে অনেকেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সেবা করেছেন। থাকতামও চট্টগ্রাম, ভাটিয়ারীতে প্রায়ই আসা যাওয়া হতো। যখন ট্রেনে করে কোথাও যেতাম, ট্রেনের জানালা দিয়ে ভাটিয়ারির পাহাড়ের গায়ে লেখা ‘উন্নত মম শির’ লেখাটি বরাবর গায়ে কাটা দিত। এখনও লেখার সময়ে চোখের সামনে ভাসছে সেই দৃশ্য, ‘অ্যাড্রেনালিন রাশ’ অনুভব করছি।

জীবনে যদি প্রথম কোন স্বপ্ন দেখে থাকি, তবে সেটা ছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে অফিসার হবার। বিটিভিতে সেই সময়ে আর্মিদের একটি অনুষ্ঠান দেখাতো, নাম ভুলে গেছি, হয়তো ছিল ‘অনির্বান’। তবে ম্যাকগাইভার যে আগ্রহের সাথে দেখতাম, সেই অনুষ্ঠানটাও একই আগ্রহের সাথেই দেখতাম। আর্মি অফিসার চাচারা বাড়িতে বেড়াতে এলে তাঁদের চলাফেরা, কথাবার্তা লক্ষ্য করতাম। সেনাবাহিনীর ইউনিফর্মের দিকে সেই লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতাম যে দৃষ্টিতে কোন উঠতি খেলোয়াড় জাতীয় দলের জার্সির দিকে তাকিয়ে থাকে।

বাস্তব ও পর্দার গুঞ্জন সাক্সেনা

আমি তেলাপোকা ভয় পেতাম। আব্বু বলতো, ‘তেলাপোকা ভয় পেলে আর্মিতে যাবে কিভাবে?’ সেই ভয় কাটাতে আমি স্যান্ডেল দিয়ে উড়ন্ত তেলাপোকা তাড়া করেছি।

আমি যা করতে চাইতাম না, আব্বু শুধু বলতেন, ‘এটা না করলে আর্মি হবে কিভাবে?’ – ব্যস, সেটার পেছনে জীবন দিয়ে দিতাম।

টিভিতে দেখতাম আর্মিরা দড়ি বেয়ে দেয়ালে চড়েন, উঁচু জায়গা থেকে লাফ দেন। টারজানের মতন এপার থেকে ওপার চলে যান। এখানে ওখানে ঝুলে ঝুলে পার হন। কিংবা বুকে ভর দিয়ে চলেন। সেই শৈশব থেকেই হাতের কাছে যা ছিল, সেটা দিয়েই প্র্যাকটিস করতাম। ক্রিকেট খেলার সময়ে বল তিন তলার সানশেডে আটকে গেছে? অসুবিধা নেই। আমি গ্রিল ধরে ধরে বেয়ে উঠে বল নামিয়ে আনতাম। আমার বয়সী অন্য যেকোন ছেলের কথাতো বাদই দিলাম, বড়রাও তা দেখে আঁতকে উঠতেন। আমি নিশ্চিত ছিলাম, আইএসএসবি ট্রেনিংয়ে আমাকে কেউ ঠ্যাকাতে পারবে না।

কিন্তু, সেনাবাহিনীর প্রাথমিক মেডিকেল টেস্টেই বাদ পড়ে গেলাম। আমার হাঁটুর মাঝে ওদের প্রয়োজনের তুলনায় একটু বেশিই ফাঁক। আল্লাহর সিদ্ধান্ত, এর উপর কারোর হাত নেই। তিনি চান না আমি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ক্যান্টমেন্টে জীবন কাটাই, তিনি আমাকে আমেরিকা পাঠালেন। মেনে নিলাম, ঐ ইউনিফর্ম আমার গায়ে কখনই চড়বে না।

গুঞ্জন সাক্সেনার গল্পটা এইভাবেই শুরু। ভারতে জন্ম নেয়া এক মেয়ে ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখে আকাশে ওড়ার। প্রাইভেটে পাইলট ট্রেনিং নেয়ার সামর্থ্য পরিবারের নেই, তাই এয়ারফোর্সে যোগ দেয়া। সেখানেও সে টেকে না। ফিজিক্যাল ডিজ্যাবিলিটির কারণে রিজেক্টেড হয়। স্বপ্ন ভাঙে। কিন্তু তারপরেও কিভাবে সুযোগ পায়, সেটা আর বললাম না। দেখে নিবেন।

একটি সমস্যা দেখা দিল। তাঁর স্বপ্ন প্লেন চালানো, দেশ সেবা না। প্লেন চালানোর শখ মেটানোর জন্য এয়ারফোর্সের গুরুত্বপূর্ণ পদে যোগ দেয়াটা কী ঠিক হবে? ওটাতো দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ বীর সন্তানদের অধিকার। তাঁর যোগদান কি দেশের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা নয়?

এই প্রশ্নটাই সে তাঁর বাবাকে করে। বাবা যে জবাবটা দেন, সেটা আপনারা সিনেমায় দেখবেন। এখানে বললে মজা নষ্ট হয়ে যাবে। এক অসাধারন পিতা-কন্যার সম্পর্কের সিনেমা এটি। ‘সাঞ্জু’ যেমন দেখা উচিৎ এক পিতা ও তাঁর পুত্রের মাঝে কেমন সম্পর্ক হওয়া উচিৎ সেটা বোঝার জন্য, তেমনই ‘গুঞ্জন সাক্সেনা – দ্য কারগিল গার্ল’ দেখা উচিৎ পিতা কন্যার সম্পর্কের জন্য। এমন পিতা যদি দেশের ঘরে ঘরে জন্ম হয়, তাহলে দেশের ভাগ্য বদলে যাবে।

সিনেমাটি প্রতিটা মেয়ের দেখা উচিৎ, কিভাবে নিজের স্বপ্ন ছুঁতে হয় এই অনুপ্রেরণার জন্য। প্রতিটা ছেলেরও দেখা উচিৎ, মেয়েদের প্রতি নেগেটিভ দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাবার জন্য। এই মেয়ে কেবল নিজের বোন, স্ত্রী মা-ই নয়, সহকর্মীও বটে। বাংলাদেশে এখনও কোন মেয়ে যখন নিজের পরিশ্রম মেধা ও বুদ্ধি দিয়ে বসকে খুশি করে, তখন নিজের সহকর্মীরা, যাতে কিছু নারীও থাকেন, গুঞ্জন তোলেন যে বসের সাথে শুয়ে শুয়ে মেয়েটা এই প্রমোশন, এই প্রশংসা, এই সফলতা অর্জন করেছে।

এই সিনেমা প্রতিটা অভিভাবকের দেখা উচিৎ। কিভাবে নিজের সন্তানদের পাখা মেলার সুযোগ দিতে হয়, কিভাবে তাঁদের ওড়ার সাহস দিতে হয়, স্বপ্ন ছোঁয়ার চেষ্টা করতে হয়, তা শিখতে হলে সিনেমাটি একটি আদর্শলিপি।

পঙ্কজ ত্রিপাঠি এবং জাহ্নবি কাপুর এখানে ভাল অভিনয় করেছে। পঙ্কজকে নিয়ে বলার কিছু নেই। মনোজ বাজপেয়ীর শিষ্য বলে কথা, দ্রোণাচার্যকে গুরু মেনে যেমন একলব্য ধনুর্বান চালানো শিখেছিল, পঙ্কজও তেমনই মনোজ বাজপেয়ীকে দ্রোণাচার্য্যের স্থান দিয়েছে। তাঁকে একলব্যের সাথেই তুলনা করা চলে।

বলিউডের সর্বকালের সর্বসেরা অভিনেত্রীদের একজন শ্রীদেবী কন্যার খোলস খুলতে শুরু করেছে। এই ধারা ধরে রাখতে পারলে শুয়োপোকা থেকে প্রজাপতি হতে সে খুব বেশিদিন নিবে না। অবশ্য তাঁর অন্যান্য কোন সিনেমা আমি দেখিনি। তাই বাকিগুলো নিয়ে কোন মন্তব্য করা বুদ্ধিমানের কাজ হবেনা। একটি সিনেমাই দেখেছি, এবং বলবো নতুন হিসেবে ভালই করেছে। ওভার দ্য টপ যাওয়ার চেষ্টা করেনি, পোকার ফেসও ছিল না।

ছোট রোলে মানব বীজও খুবই ভাল অভিনয় করেছেন।

সাথে ভিনিত সিং বরাবরের মতই দুর্দান্ত অভিনয় করেছে। তাঁর মুখ থেকে বের হওয়া একটি সংলাপ ছিল অসাধারণ। সেটি হচ্ছে, সেনাবাহিনীতে নারী পুরুষকে সমান অধিকার দিতে যাওয়া মানে হচ্ছে আর্মিকে দুর্বল করে ফেলা। কারণ, শারীরিকভাবেই এক নারী, এক পুরুষের চেয়ে দুর্বল। এবং ‘দুশমন’ যখন গুলি চালাবে, তখন মেয়ে সেনা বলে কোনই ছাড় দিবে না।

রণক্ষেত্রেও দেখা গেল একই ঝামেলা। গুঞ্জন সাক্সেনার নিরাপত্তা নিয়ে সরকারি পর্যায়ে সবাই চিন্তিত। আর্মি যুদ্ধে ফোকাস করবে নাকি রণনীতিতে? রেকি বা রেসকিউ মিশনে পাঠালে সামান্য বিপদে তাই তাঁকে এবর্ট করে দ্রুত বেসে ফেরত আসতে বলা হয়।

এই পর্যন্ত যথেষ্ট যৌক্তিক মনে হচ্ছে না ওদের প্রশ্ন, উদ্বেগ ও নীতি?

এর জবাবটাই এই সিনেমায় দেয়া হয়েছে। সব যুদ্ধ পেশিশক্তি দিয়ে জেতার প্রয়োজন হয়না। বুদ্ধির, মেধার, দক্ষতার, বিচক্ষণতার প্রয়োগ হয়। এবং এখানেই নারী পুরুষে ভেদাভেদ করার কোন প্রয়োজন নেই। সে বিমান চালাতে বিমানবাহিনীতে যোগ দিয়েছে, পুরুষের সাথে পাঞ্জা লড়তে নয়।

নারীবাদী, নারীবিদ্বেষী, সাম্যবাদী সবার জন্যই একটি চমৎকার সংলাপ আছে পংকজ ত্রিপাঠীর কণ্ঠে, ‘প্লেন ছেলে ওড়াক অথবা মেয়ে, দুইজনকেই পাইলট বলে। যখন প্লেনের কোন সমস্যা নাই তাকে কে ওড়াচ্ছে, তাহলে তোমার কী আপত্তি?’

মাস্টার পিস্ সিনেমা? অবশ্যই না। মাঝারি মানের ভাল সিনেমা, যেখানে কোন অহেতুক প্রেমকাহিনী নাই, আইটেম গান নাই, অশ্লীল নৃত্য নাই, যা পরিবারের সবাই এক সাথে দেখতে পারবেন এবং দেখা উচিৎ এমন একটি সিনেমা হচ্ছে ‘গুঞ্জন সাক্সেনা’।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।