গালি বয় ও প্রতিবাদের ভাষা র‌্যাপ মিউজিক

কিউ কি ফারাক হ্যায়, তুঝে ছেড়নে কি তালাপ হ্যায়,

তু নাকলিওয়ালা মারাদ হ্যায়,

মারদাঙ্গি পে কালাঙ্ক, হেওয়ানিয়াত কি শাকাল,

জিতনি তুঝমে গারমি, উস্সে জাদা গারাম মেরা কালাম

কিউ ইতনা বেশারাম?

ওপরের কথাগুলো ‘মেজর সি’ পরিচয়ে পরিচিত চন্দ্রশেখর কুন্দ্রা’র মিউজিকে, ভারতের জনপ্রিয় র‍্যাপ সিঙ্গার ‘ডিভাইন’-এর নিজের লেখা ও নিজের কণ্ঠে গাওয়া ‘শের আয়া শের’ গানের কিছু লাইন। যেই গানটি ব্যবহৃত হয়েছে ‘গালি বয়’ সিনেমাতে। যারা দেখেছেন নিশ্চয়ই গানটা তাদের দৃষ্টি আকড়ে ধরেছে।

একজন দুর্দান্ত র‍্যাপারের মতো এনার্জেটিক মুভমেন্টের সাথে সিদ্ধান্ত চতুর্বেদীর পারফরমেন্স, আর তাকে দেখে রণবীর সিংয়ের অবাক হয়ে যাওয়া দৃশ্য, গানের মিউজিক, লিরিক্স – কি ছিল না এই গানে!

তবে গানের কথাগুলো, কিংবা বিশেষ করে উপরের এই লেখাগুলো অনেক কিছুই কিন্তু প্রকাশ করছে – কথাগুলো একটু না হয় খেয়াল করে দেখি। বিশ্বের প্রায় অনেক দেশেরই নিত্যদিনের ঘটনা। আচ্ছা নিজের দেশের কথাই না হয় ভাবি।

প্রতিটি নতুন সকালে, চায়ের চুমুকের সাথে পত্রিকার পাতা খুললেই হেডলাইনসহ বিভিন্নভাবে একটি নিউজ চোখে পড়বেই। যেখানে দেখা যায়, মানুষরূপী মুখোশ লাগিয়ে, কিন্তু আসলে ‘মারদাঙ্গি পে কালাঙ্ক’ কত পুরুষ, শেষ করে দিচ্ছে কত নারী, কত মেয়ের জীবন।

সমাজের চারপাশে একটু নজর ঘুরিয়ে দেখলেই পাবেন, স্কুল-কলেজ পড়ুয়া বয়সের ছেলেদের থেকে শুরু করে, ভিন্ন বয়সী এমনকি সমাজের অনেক বিশিষ্ট সম্মানিত ব্যাক্তিদের দ্বারাও হতে হচ্ছে কতশত মেয়ে, কতশত নারীদের লাঞ্চিত হচ্ছে। উত্ত্যক্ত, এসিড নিক্ষেপ, ধর্ষণ, অপমান, ‘কামজোড়’ ভেবে ছোট করে দেখা হচ্ছে নারীদের কিংবা সংখ্যালঘুদের।

এই সবই যেন এখন নিত্যদিনের ঘটনা।

এগুলো আপনাকে, আমাকে পীড়া দেয়, ভাবতে শেখায়, দুশ্চিন্তা করতে শেখায়। কেননা আপনার, আমার মা-বোনও যে নিরাপদ নেই। নিরাপত্তা নেই আমাদের জীবনসঙ্গিনী কিংবা ভালোলাগার প্রিয় মানুষগুলোরও।

ফুলের মতো জীবনগুলোর উপর এক ভয়াবহ থাবা বসিয়ে দেয় সেই ‘নাকলিওয়ালা মারাদ’-রা। এতে ফুলগুলো দুমরে-মুচড়ে যায়, কিংবা একদমই ঝরে যায়।

জোয়া আখতার পরিচালিত গালি বয় সিনেমার এই গানটি শুরু হওয়ার আগে দেখা যায়, বহু শ্রোতাদের মাঝ থেকে দু-একজন ছেলে মিলে, স্টেজে দাড়িয়ে গান গাওয়া মেয়েটিকে, ‘কথার মাধ্যমে’ উত্ত্যক্ত করছে, সে যেন কিছু না একদম ‘শূন্য’। তখন মেয়েটি স্টেজ ছেড়ে চলে যায়। তারপরই ‘এমসি শের’ উপরে লেখা লাইনগুলো দিয়ে সাজানো এক চমৎকার ‘র‍্যাপ’ দিয়ে করেছে প্রতিবাদ। এবং যাদের বোঝার তারা বুঝে গিয়ে হয়েছেন পিছপা। লজ্জিত হয়ে স্থান ত্যাগ করেই প্রমান করেছেন তারা হেরে গিয়েছে।

আমরাও কি পারি না এই সমস্যাগুলোর আগে থেকেই সমাধান করতে? বা প্রতিবাদ করতে? এগুলোকে রুখে দিতে? হ্যা অবশ্যই পারি। তবে সত্যি বলতে আমরা ভীতু নই, আমরা অকুতোভয়। ‘গালি বয়’ ছবিতে নির্মাতা প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে বেছে নিয়েছেন র‌্যাপ মিউজিককে। র‌্যাপ মিউজিকের ঘরানাটাই এমন। তালে তালে কিছু অসংলগ্ন বাক্য বলে যাওয়াই র‌্যাপ নয়, প্রতিটি র‌্যাপে থাকতে হবে একটা বার্তা, সময় পাল্টানোর একটা দিক নির্দেশনা, সাথে টিউন ও বিট।

আমাদের সমাজ, সামাজিক অবস্থা, আমাদের প্রতিদিনের জীবনের উপর ভিত্তি করেই তৈরি হয়ে যাচ্ছে কত চলচ্চিত্র। সেগুলো দেখে অনেক ভালো সময় কেটে যায়, আমরা হাসি, আমরাই কাঁদি, আবার আমরাই অবাক হই। সেভাবে ভালো কিছু থেকেও কিন্তু ‘ভালো’ শেখা যায়। সিনেমাও আমাদের অনেককিছুই শেখায়।

সিনেমা কিংবা সুরে ভরা গানের কথাগুলো ‘জীবন’ না হলেও, আমাদের জীবনে ঘটে যাওয়া কত ভালো-খারাপ ফুটে উঠছে সবসময়। হয়তোবা চোখে আঙুল দিয়েও কিছু বোঝানোর চেষ্টা করে।

মনোযোগ দিয়ে সিনেমা দেখে উপভোগ করি। অভিনয়, গান উপভোগ করুন, ভালো কিছু শেখার থাকলে, বুঝার থাকলে বুঝে নিন। সিনেমা হল গণযোগাযোগের বিশাল একটা মাধ্যম। এখানে বিনোদনের সাথে সাথে কিছু শিক্ষাও আসে। সিনেমায় থেকে চিত্তের বিনোদন তাই যেমন জরুরী, তেমনি চিত্তের বিকাশও দরকার।

 

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।