একটি গোপাল ভাড় মার্কা ‘আই অ্যাম জিপিএ ভাইভ’ প্রজন্ম

১.

ইউনিভার্সিটিতে পড়া অবস্থায় হুট করে আমার ঘনিষ্ঠ দুই বন্ধু পরিকল্পনা করলো যে স্পোকেন ইংলিশে ভর্তি হবে। ইউনিভার্সিটির কাছেই ফার্মগেইটে এফএম মেথডের তখন বিশাল বড় বিজ্ঞাপন। দুই জনই ভাবলো সেখানেই ভর্তি হবে। আমাকেও পীড়াপীড়ি করতে লাগলো। এসব স্পোকেন ইংলিশ কোর্স করার প্রয়োজনীয়তা আমি কখনোই অনুভব করিনি।

ছোটবেলা থেকে ইংরেজীতে দক্ষতা বলার মতো না হলেও কাজ চালিয়ে নেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু ইংরেজীতে কথা বলার জন্য যে জিনিসটা সবচেয়ে প্রয়োজনীয় ছিল সেটা হচ্ছে চর্চা। সেই চর্চার জন্যেই দুই বন্ধু ভর্তি হতে চাচ্ছিল কোর্সটাতে। সেই আমলে সাড়ে তিন হাজার টাকা খরচ করে তিন মাসের কোর্স করার নূন্যতম ইচ্ছে না থাকলেও শুধু মাত্র বন্ধুদের জোরাজুরির কারণে গেলাম ফ্রি তে তাদের ওপেনিং ক্লাসটা দেখার জন্য।

ওপেনিং ক্লাস করেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম যে কোর্সটা করা যায়। না, সিদ্ধান্তটা তাদের পড়ানোর স্টাইলের কারণে নেই নি। আমাদের কোর্সটা যে আপু করাবেন তাকে দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। তিন মাস সেই আপুকে দেখার জন্যেই কোর্সটাতে ভর্তি হলাম। সাথে কোর্সটাও করা হবে, সার্টিফিকেটটাও ফ্রি। এ যেন ‘রথ দেখতে গিয়ে কলা বেচা’ নয় বরং ‘কলা বেচতে গিয়ে রথ দেখা’।

ক্লাস করতে গিয়ে দেখলাম যে স্টান্ডার্ডে তারা সবকিছু করছে সেটা আমাদের (অন্তত আমার) লেভেলের নয়, ক্লাস সেভেন এইটের লেভেলের। একেবারে গ্রামার থেকে শুরু করেছে। অবশ্য ক্লাসের অনেককে দেখলাম এটাও বুঝতে পারছে না। আমি সচরাচর ক্লাস কম করি, শুধুমাত্র টপিকগুলো যোগাড় করে নিজে নিজে বাসায় পড়ে নেই। কিন্তু এখানকার প্রতিটি ক্লাসই করতাম। কারণটা নিশ্চয়ই সবাই বুঝতে পেরেছেন।

কোন এক বিচিত্র কারণে ম্যাডামও আমাকে পছন্দ করতো। হয়তো ক্লাসে আমার করা নির্মল রসিকতা গুলো উনিও উপভোগ করতেন। তাছাড়া ক্লাসে আমিই সবচেয়ে বেশি রেসপন্স করতাম। কিছু জিজ্ঞেস করলেই ফটাফট ইংরেজিতে উত্তর দিয়ে দিতাম।

সমস্যা হয়ে গেলো পরীক্ষার দিন। পরীক্ষা ছিল শুধু ভাইবা। ইংরেজীতে কিছু কথা বলা আর ভোকাবুলারি টেস্ট। অতিরিক্ত কনফিডেন্সের কারণে কিছু পড়ারও প্রয়োজন মনে করিনি। কিন্তু আপু আমাকে যখন জিজ্ঞেস করলো ‘দর কষাকষি’ করার ইংরেজি কি তখন আমি ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম। কিছুতেই মনে করতে পারছিলাম না। আমার অবস্থা দেখে আপুও অবাক । এত সহজ বিষয়টা পারছি না! উনি আমাকে সাহায্য করতে চাইলেন। বললেন দোকানে দিয়ে আমরা দামাদামি করি সেটাকে কি বলে মনে করো।

আমার ভাগ্যটাই সম্ভবত খারাপ ছিল। এত সাহায্য করতে চাওয়ার পরেও কিছুতেই মনে পড়লো না। আপু হতাশ হয়ে বললেন, ‘বারগেইন’ কথাটা কখনো শোনোনি? আমরা দোকানে গিয়ে বারগেইনিং করি না!

লজ্জায় আমার মাথা নিচু হয়ে যাচ্ছিল। এত সহজ বিষয়টা পারলাম না। আপু কি পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেয় কিনা। আপু আর কোন প্রশ্ন করলেন না। সম্ভবত হতাশ হয়েই। রেজাল্ট দেওয়ার পর অবাক হয়ে দেখলাম আপু আমাকে এ+ দিয়ে দিয়েছেন। হয়তো অতীত ক্লাস পারফর্মেন্সের কারণেই।

২.

উপরের ঘটনাটা বলার একটা উদ্দেশ্য আছে। জীবনে মাঝে মাঝে বিব্রতকর পরিস্থিতির পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। অনেক সময় সেটা অজ্ঞতার কারণে, আবার অনেক সময় সঠিক সময়ে জানা থাকার পরও সঠিক উত্তরটা মনে না পড়ার কারণে।

সমস্যা হচ্ছে আমাদের দেশের বর্তমান প্রজন্মের বেশির ভাগের ভেতরই অজ্ঞতার বিষয়টা প্রবল। ‘আমি জিপিএ ফাইভ পেয়েছি’ এর ইংরেজী বলে ‘আই অ্যাম জিপিএ ভাইভ’. আমার কাছে ইন্টারভিউ দিতে আসা একজন ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার বলে এসএসসি’র অর্থ হচ্ছে সিনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট।

দুই দিন ধরে একটা ট্রল পোস্ট সারাদিন নিউজফিডে ঘোরাঘুরি করছে, এইচটুও’র মানে বলেছে একটা রেষ্টুরেন্টের নাম। আমার এক চাচাতো ভাই গ্রামে বাস করে। তার মতো অনেকেই এইচটুও’র মানে বলতে পারবে না। সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যে মানুষটা আমাদের দেশকে রিপ্রেজেন্ট করবে সে যদি এই সামান্য বিষয়টা না জানে তাহলে সমস্যাটা অনেক বড়ই।

এর চেয়েও বড় যে সমস্যা সেটা হচ্ছে এসব প্রতিযোগীতার কোন সুনির্দিষ্ট নীতিমালা পর্যন্ত নেই। কারা প্রতিযোগীতায় অংশ নিতে পারবে কিংবা অংশগ্রহণ কারীদের নূন্যতম কোন ধরণের যোগ্যতা প্রয়োজন সেই বিষয়গুলো মোটামুটি অস্বচ্ছ।

আমাদের বেশির ভাগই বিষয়টা ফানি হিসেবে ভেবে মানুষটাকে নিয়ে রসিকতা করছে। কয়েকটা উঁচু শ্রেণীর দেশীয় কোম্পানি তাদের এই বিষয়টা নিয়ে বিজ্ঞাপনও বানিয়েছে। বিষয়টা কতটা ভয়ানক সেটা হয়তো আমরা আচও করতে পারছি না। আরেকজনকে দেখলাম ‘উইশ’ করা বিষয়টা কি সেটাই বুঝতে পারছে না।

আমাদের পুরো জাতিই কি এমন মেধা শূন্য নাকি সঠিক জায়গাতে আমরা সঠিক মানুষকে নির্বাচন করতে পারছি না। বিষয় যেটাই হোক আমাদের জন্য সেটা বিপদজনকই। এর চেয়েও বিপদজনক হচ্ছে মূল বিষয়টাকে গুরুত্ব না দিয়ে আমরা রসিকতা করেই যাচ্ছি।

দেশের উন্নতির জন্য আমাদের রসিক জাতির চেয়ে সুশিক্ষিত জাতি বেশি প্রয়োজন।

৩.

আমি যেদিন ‘বারগেইন’ শব্দটার অর্থ বলতে পারিনি সেদিন থেকে কমপক্ষে এক সপ্তাহ লজ্জায় নিজের দিকে তাকাতে পারিনি, বিষয়টা জানা থাকার পরেও শুধুমাত্র অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী থাকার কারণে হয়তো সমস্যাটা হয়েছিল। অথচ যে মেয়েটি এইচটুও’র মানে বলতে পারলো না তাকে দেখি পরের দিন ধানমন্ডির সেই রেস্টুরেন্টে গিয়ে ছবি তুলে পোস্ট করছে। নূন্যতম লজ্জা বোধটা যে থাকা উচিত সেই বোধটাই তার ভেতর নাই।

অথচ আমাদের দেশে ভালো অনেক কিছুও ঘটে যেটা ভাইরাল করা যায়। কিছুদিন আগে জাওয়াদ নামের একজন আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে স্বর্ণপদক পেলো। সেটা নিয়ে এমন হইচই চোখে পড়েনি। আমরা কি আমাদের ভালো বিষয়গুলো সামনে আনতে পারি না? হয়তো নেগেটিভ বিষয় গুলোতেই আমাদের আগ্রহ।

অনলাইন বর্তমানে একটা শক্তিশালী জায়গা। এই শক্তিশালী জায়গাটাকে শক্তভাবে কাজে লাগাতে পারলে আমাদের জন্যই ভাল। দুনিয়ার অনেক দেশেই ট্রল হয়, তবে একই সাথে তাদের ভাল কাজগুলোকেও হাইলাইট করা হয়। আর আমরা এমনই গোপাল ভাড় মার্কা জাতি যে শুধু ট্রলের বিষয় গুলোকে নিয়েই হাইলাইট করি।

এভাবে চলতে থাকলে আমাদের দেশ থেকে একটা সময় শুধু গোপাল ভাড় মার্কা মানুষই বের হবে, কোন স্টিভ জবস কিংবা জুকারবার্গ বের হবে না। এমন যারা আমাদের দেশে রয়েছে তাদেরকে সবার সামনে উপস্থিত করাটাও আমাদেরই দায়িত্ব।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।