বাংলাদেশের সরকারি চাকরি ও কোটা ব্যবস্থা: বিস্ময়কর ১২ তথ্য

১.

বিসিএসে ৫৬ % কোটা আর ৪৪ % মেধাভিত্তিক নিয়োগ হয়। কোটা পদ্ধতি রাখা হয় পিছিয়ে পড়াদের বাড়তি সুবিধা দেওয়ার জন্য, প্রতিযোগিতায় যারা পারবে না। পিছিয়ে থাকবে। এই সত্যটা আপনি যদি মানেন, এটাও আপনাকে এখন স্বীকার করতে হবে, আপনি এমন একটা আমলা ব্যবস্থা তৈরি করতে চাইছেন যেখানে অর্ধেকের বেশি লোকবল থাকবে এমন, মেধার লড়াইয়ে যারা পিছিয়ে থাকবেন!

২.

সর্বশেষ বিসিএসে ২১০০ শূন্য আসন ছিল। কোটা বাদ দিলে মেধার মাধ্যমে পদ নির্ধারণ হয়েছে ৯২৪টি!

প্রতি বিসিএসে ৩ লাখ ৯০ হাজার পরীক্ষার্থী অংশ নেন। প্রিলি পরীক্ষার জন্য ৭০০ টাকা করে দিতে হয়। এর সঙ্গে পরীক্ষা কেন্দ্রে যাওয়া-আসা, থাকা-খাওয়া মিলে কখনো কখনো পরীক্ষার্থীদের গড়ে আরও ১ হাজার টাকা খরচ হয় (যেহেতু বিসিএস শুধু বিভাগীয় শহরে দেওয়া যায়)। একটি প্রিলি পরীক্ষার পেছনে মোট খরচ হয় ৬৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা। সেটিও বস্তুত ৯২৪টি আসনের জন্য! বিশেষ বিসিএস অবশ্য আলাদা। তবু সংখ্যাটা সামান্যই।

৪.

প্রিলি পরীক্ষা নিতে শিক্ষার্থী প্রতি পিএসসির কত হয়? প্রশ্নপত্র ছাপানো, পৌঁছানো, পরীক্ষার হলে গার্ড দেওয়া শিক্ষকের ভাতা মিলিয়ে শিক্ষার্থী প্রতি ৫০ টাকা করে খরচ হলেও আমি অবাক হব। ৭০০ টাকা করে তারা কেন নেন এর যুক্তিযুক্ত ব্যাখ্যা কী?

৫.

সবচেয়ে বড় কোটা মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগের প্রতি সম্মান জানিয়ে (৩০ শতাংশ)। পরে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান; আরও পরে এখন তাদের নাতি-নাতনি বা পোষ্যদেরও এই কোটা সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। সন্তান পর্যন্ত ঠিক ছিল, বংশ পরম্পরায় কোটা সুবিধা অব্যাহত রাখার যুক্তি কী?

৬.

এর যে কোনো যুক্তি নেই তা বোঝা যায় যখন কোটা থেকে যতজনকে নেওয়ার কথা, ততগুলো শূন্যপদও পূরণ হয় না যোগ্যতার অভাবে। যেহেতু কোটা সুবিধাপ্রাপ্তদেরও ন্যূনতম নম্বর পেতে হয়।

৭.

এরপরও কোটা পদ্ধতি সংস্কার কেন করা হবে না? ৭০ শতাংশ মেধা ও ৩০ শতাংশ কোটা পদ্ধতি চালুর দাবি আমার কাছে খুবই যৌক্তিক মনে হয়েছে।

৮.

কোটার সুবিধা ভোগকারীরা অনেক সময় প্রিলিতে ৫৯ শতাংশ নম্বর পেয়ে সুযোগ পেয়েছেন লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার। যেখানে ৭৫ শতাংশ নম্বর পেয়েও সাধারণ শিক্ষার্থী তা পাননি।

৯.

প্রতি বছর ৮০ হাজার চাকরিপ্রার্থী সরকারি চাকরিতে নিয়োগ পান। অথচ চাকরির বাজারে প্রতি বছর প্রবেশ করছে ৪ লাখ। এরা অনেকে সস্তা শ্রমে এমনও চাকরি করতে বাধ্য হন, যা একজন রিকশাচালকের চেয়ে কম। আমি রিকশাচালকের পেশাকে অসম্মান করছি না। এই বাস্তবতা বোঝাচ্ছি, একজন অনার্স বা মাস্টার্স পাস করা মধ্যবিত্ত সন্তানকে আমরাই রিকশাচালক হিসেবে মেনে নেব না। যেন সে মাস্টার্স পাস করেছে এটাই তার অপরাধ!

১০.

ন্যূনতম বেতনের পর্যাপ্ত বেসরকারি চাকরিই বা কোথায়? একটি সমাজে সবাই মেধাবী হবেন না। কেউ আমার মতো সাধারণ মেধাবী বা কম মেধার হবেন। আল্লাহতায়ালা এদের এভাবেই বানিয়েছেন। এদেরও কর্মসংস্থানের দায়িত্ব রাষ্ট্রের, সমাজের। অথচ আমরা তাদের জন্য সেই ক্ষেত্রটা তৈরি করে দিতে না পারা ব্যর্থতা উল্টো তাদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে পার পেতে চাই। একজন বেকার যুবকের দিকে সমাজ যে চোখে তাকায়, তার মধ্যে লুকিয়ে থাকে বিদ্রুপ, ব্যাঙ্গ। লজ্জায় মুখ লুকানোর কথা ছিল সমাজের, রাষ্ট্রের।

১১.

কোটা পদ্ধতির কারণে আমাদের তরুণদের মধ্যে যে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ জমা হচ্ছে, তা চোখ বুজে অস্বীকার করা বোকামি। কোনো রাজনৈতিক দলই মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ থেকে নয়, কোটা পদ্ধতিকে ব্যবহার করেছে আমলাতন্ত্রকে রাজনীতিকরণ করার জন্য (আকবর আলী খান নিজে একাধিকবার বলেছেন)। মুক্তিযোদ্ধা ও অমুক্তিযোদ্ধার মধ্যকার মর্যাদার প্রশ্নের লড়াই আমাদের সেনাবাহিনীকে এমন জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল, ’৭৫ থেকে ’৮১ পর্যন্ত দেশ একের পর এক রক্তপাত দেখেছে। দেশের অস্তিত্ব পড়ে গিয়েছিল সংকটের মুখে। দেশের আরেক স্পর্শকাতর রাষ্ট্রযন্ত্র সরকারি কর্মবাহিনী এবং আমাদের তরুণদের কেন আমরা একই বিভেদের মধ্যে দিয়ে বড় করছি? এর ফলাফল কী হবে আমরা কি ভাবছি?

১২.

মহান মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখতেই কোটা পদ্ধতির সংস্কার দরকার। বিশেষ করে মুক্তিযোদ্ধার তালিকা যখন প্রশ্নবিদ্ধ। এ নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যেই কী পরিমাণ হতাশা আছে তা এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য (মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে নিরপেক্ষ ইতিহাসগুলোর একটি) পড়তে গিয়ে জানতে পারছি। অনেকে দেশ স্বাধীনের পর ও শেষ মুহূর্তে মুক্তিযুদ্ধের খাতায় নাম লিখিয়েছিলেন। তাদের দাপটই ছিল বেশি। মুক্তিযোদ্ধারা হতাশা থেকে এদের নাম দিয়েছিল ফ্রাইডে ফাইটার বা ১৬ ডিভিশন (১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে অনেকে মুক্তিযোদ্ধা হয়ে গিয়েছিল বলে)। খোদ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবের ভুয়া সনদ ধরা পড়েছিল।

ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা শুনতেই তো খারাপ লাগে। মুক্তিযোদ্ধা নামের আগে এই শব্দ চালুর, কিংবা মুক্তিযুদ্ধের কোটা সুবিধার কারণে ৪০ হাজার নিয়োগ দিতে গিয়ে বেকার ২০ লাখ উচ্চশিক্ষিত তরুণের মধ্যে এ নিয়ে হতাশা তৈরি করার কোনো যুক্তি আমি পাই না। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের এক জাতিরাষ্ট্রে গড়ে তোলার জন্য হয়েছিল। সেই মুক্তিযুদ্ধ যেন বিভেদের কারণ হয়ে না দাঁড়ায়।

– ফেসবুক থেকে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।