বিদায়, কৈশোরের ভালবাসা

নীল বেদনা নিয়ে চলে গেলে তুমি রাতের তারার মতো। ঘরছাড়া এক সুখী ছেলের ফেরারী মনের খোঁজ আর নেবে না কোনোদিন। সেই ছেলেটি এখনো মধ্যরাতের ঘুম ভাঙা শহরে চাঁদমামার সঙ্গে স্বপ্ন ভাগাভাগি করে। ঢাকার সন্ধ্যায় ছটফট করে ১৯ কিংবা কুড়ির মতো। সকালে হকারের পেপারে খোঁজে রাত জাগা পাখির গল্প। ঘুমন্ত শহরে মাধবীর কষ্ট বুকে নিয়ে অবাক হয়ে দেখে অপরিচিত’কে!

কী এমন হতো, রূপালি গিটার নিয়ে আরো কিছু দিন নষ্টালজিয়ায় ডুবিয়ে গেলে! তুমিই না বলেছিলে, জয়ন্ত ভালোই থাকে। তোমারই তো উপলব্ধি, আসলে কেউ সুখী নয়। তাহলে কোন দুঃখে দরজার ওপাশে চলে গেলে চিরতরে!

তবুও সেই তুমি চিরকাল রয়ে যাবে বাংলাদেশের স্মৃতির ক্যানভাসে; নীরবে। গতকাল রাতে কিংবা আগামীর তারা ভরা রাতে। কষ্ট পেতে ভালোবাসায় কিংবা হাসি শেষের নীরবতায়। আহা জীবনের বেহিসেবী সুখে কিংবা ইটপাথরের সত্যগুলো গোপন রেখে পালাতে চাই চিৎকারে।

নিঃসঙ্গ রোদেলা দুপুরে দূর থেকে তোমায় ভাবব ঠিকই। কিন্তু বেলা শেষে ফিরে এসে ক্ষণিকের জন্য তোমাকে আর পাব না। ভাঙা মন নিয়ে জন্মহীন নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে তখন তোমার প্রশ্নটাই ফিরিয়ে দেব তোমাকে– কী যে যন্ত্রণা আমার, এভাবে কি বেঁচে থাকা যায়?

আইয়ুব বাচ্চু চলে গেলেন। আমার শৈশবের আকাশটা আরো একলা করে। আমার কৈশোরের রংধনুর আরো একটি রং খসিয়ে।

আহা, কী রঙিন ছিল সে দিনগুলি! ব্যান্ড সঙ্গীত নিয়ে কী তুমুল উত্তেজনা! নতুন অ্যালবাম কেনার জন্য ৩৫ টাকা জমানোর সে কী রোমাঞ্চ! এলআরবির বাচ্চু, ফিলিংসের জেমস, ফিডব্যাকের মাকসুদ, মাইলসের শাফিনের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে বন্ধুমহলে তুমুল তর্কাতর্কি। আমরা তো আর সঙ্গীতের সমঝদার নই, কেবলই শ্রোতা। তাহলে সেরাদের সেরা নির্ণয়ের মানদণ্ড কী? কেন, মিক্সড অ্যালবামে যাঁর গান প্রথমে থাকে! আর আইয়ুব বাচ্চুর গান তো বেশির ভাগ অ্যালবামেই থাকত শুরুতে। তাতে আমার কী অপার আনন্দ! কী অপার্থিব সুখ!

আর কনসার্ট দেখা। আহ্, কী মধুর সেই ক্ষণ! হোস্টেলবন্দী দিনে স্কুল পালিয়ে কনসার্ট দেখার আনন্দের তুলনা নেই। আর টিকেট কেটে কখনো কনসার্ট দেখেছি বলেও তো মনে পড়ে না। টাকা পাব কই? তবু ধানমন্ডি ওমেন্স কমপ্লেক্স, রাওয়া ক্লাব, আর্মি স্টেডিয়াম অথবা মিরপুর ইনডোর– কনসার্টের খবর পেলেই ছুটে গেছি। ওখান কোনো না কোনো পরিচতিজনকে তো পাবোই! অথবা ভিড়ের স্রোতের তোড়ে ঠিকই ভেতরে ঢুকে যাব! কিংবা পুলিশ-স্বেচ্ছাসেবকদের লাঠির বাড়ি খেয়ে হলেও দেয়াল টপকে ঢোকার একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে!

কনসার্টে গিয়ে জেমসের বিশালত্ব প্রথমবারের মতো বুঝেছি সত্য। কিন্তু বন্ধুদের কাছে কখনো তা স্বীকার করিনি। এলআরবি তথা আইয়ুব বাচ্চু যদি তাতে সামান্যতমও খাটো হয়ে যায়!

আমাদের প্রজন্মের সেই বাচ্চু পরবর্তীতে আর তেমনটা থাকেননি। সিনেমার গানে, বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেলে তাঁর কণ্ঠ শুনলে মেজাজটা খারাপ হতো খুব। এত বাজারি! এত গা ভাসিয়ে চলা! শৈশব-কৈশোরের নায়কের ওই রূপান্তরটি মানতে পারিনি কখনো। এখনো পারি না। মাসুদ পারভেজ ভাইয়ের সঙ্গে এ নিয়ে বাচ্চুকে পঁচিয়ে খুনসুটি করেছি কতো! কিন্তু আমার ওই তীব্র শ্লেষের শেকড় যে তীব্র ভালোবাসা – সেটি কী আর আমি জানি না!

গত ১৫ বছরের বাচ্চু আমার কাছে তাই ধর্তব্যের না। বরং তার আগের ১৫ বছরের সেই বিনোদনের ফেরিওয়ালাকেই আমি মনে রাখব অনন্তকাল। তাঁর ওই গিটারের ঝংকারই তুমুল ঝড়ের গর্জনের মতো আমার কানে বাজবে আজীবন।

আজ তাঁর চলে যাবার দিনে সত্যি বড় এলোমেলো হয়ে গেছি। স্মৃতিরা সব আমার সাড়ে চার বছরের মেয়ের মতো ঝাঁপ দিয়ে আছড়ে পড়ছে কোলের উপর। ওর মতোই আমার মস্তিষ্কের নিউরন এক খেলাই খেলছে বারবার। বারবার। বারবার। ক্যাসেটের পেঁচিয়ে যাওয়া ফিতার মতো একই গান বাজছে বারবার। বারবার। বারবার।

বিদায় আমার শৈশবের প্রেম। বিদায় আমার কৈশোরের ভালোবাসা।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।