বিদায়, রুপালি গিটারে ঝড় তোলা প্রিয় ছায়ামূর্তি

এটা একটা অদ্ভুত ব্যাপার দুঃখ, হতাশা, কষ্ট, রাগ আমাকে যতটা প্রভাবিত করে, আনন্দ কখনই নয়। শূন্যের নিচে ২ ডিগ্রি তাপমাত্রায় মেয়েকে স্কুলে দিয়ে এসে ভাবছিলাম আমার সাম্প্রতিক আনন্দলাভের ঘটনা কোনটি। আমি মনে করতে পারলান না। ধারণা করে নিলাম এটি আমার দূর্বল স্মরণশক্তির কারণে হতে পারে। চা বানিয়ে, পরোটা ভেজে, নাস্তা করার সময় চেষ্টার গতি আরও বাড়ালাম। মনে পড়ল গতবছর স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠানে অহনা স্টিলপ্যান বাজিয়েছিল।

এত সুন্দর ছিল গানের সুর, এবং ও এত সুন্দর করে তা বাজাচ্ছিল, যে আমি মোহিত হয়েছিলাম। এত পিচ্চি একটা মেয়ে আমার, এত বড় একটা বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছে দেখে হঠাতই নিজের অজান্তে চোখে পানি চলে এসেছিল, সম্ভবত একবছর আগের ওই ঘটনাই আমার সাম্প্রতিক সবচেয়ে আনন্দের ঘটনা। আরও একটু পিছনে ঘেঁটেঘুটে আরও কয়েকটা আনন্দের ঘটনা খুঁজে পেলাম, যেগুলো আসলে দূঃখের সাথে জড়িয়ে। আমার আম্মার বেস্ট ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়া এবং সেটা সারভাইভ করা যথাক্রমে আমার জীবনের অন্যতম ভয়াবহ দূঃখের এবং আনন্দের ঘটনা। আরও দুটো আনন্দের মধ্যে আছে দুই দুইবার আব্বার ‘Transient Ischemia’য় আক্রান্ত হবার পরপরই তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে পারা এবং কোন বড় ধরণের ক্ষতি না হওয়ার ঘটনা।

এছাড়া ছোট ছোট আনন্দের মধ্যে আছে, নানা সময়ে নানা মানুষের ছোট বড় উপকার করতে পারা এবং সেটা স্পেসিফিকালি অন্যদের না জানানো। নানা সময় নানা মানুষ নানা দুঃখে কষ্টে আমার সাথে যোগাযোগ করেন। কেন করেন জানি না, আমার বাইরের খোলস দেখে আমাকে নক করতে চাওয়ার কথা না, কিন্তু তবুও করেন। সেই সময়গুলোতে আমি নিজেই হয়ত নানা ঝামেলায় থাকি, কিন্তু তবু আমার সীমিত সাধ্য দিয়ে তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করি। অনেকে অনেক মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে কথা বলতে চান।

আমাদের সংস্কৃতিতে মানসিক সমস্যাকে পাগলামি বলে উড়িয়ে দেয়া হয়, তাই অনেক সময় একদমই অচেনা মানুষ, যাদের কথা বলার আর কেউ নেই, তারাও কোন এক অদ্ভুত কারণে আমার সাথে কথা বলতে চান। আমি আমার বন্ধুবান্ধব আত্মীয় স্বজনদের সাথে তেমন খাজুরে আলাপ করি না, কিন্তু দীর্ঘসময় ধরে, মাসের পর মাস এইসব মানুষদের কথা শুনি, তাদের উৎসাহ দেবার চেষ্টা করি যাতে এই সমস্যাগুলো কোন ভয়াবহ পর্যায়ে চলে না যায়। যখন তারা ভালো থাকেন, ভালো লাগে।

খুব অস্থির আনন্দ হয়, তা না, কিন্তু একধরনের স্বস্তি হয়। কালের পরিক্রমায় যখন মানুষের ছোট-বড় বিপদগুলো কেটে যায়, খারাপ সময় কেটে যায়, তখন যোগাযোগ ক্ষীণ হতে থাকে। অনেকে অতীতে সহায়তার কথা ভুলেও যান, এটাই স্বাভাবিক। তবে কেউ কেউ সাহায্য নেবার হীনমন্যতা থেকে উলটো ব্লেইম-গেইমও খেলেন, আমি কষ্ট পেলেও তাদের খারাপ সময় কেটে গেছে দেখে ভালো অনুভব করি। পরবর্তীতে তাদের অনেকেই আবার খারাপ সময়ে যোগাযোগ করেন, আমি আবারও তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি। এই যে অন্য মানুষের জীবনে খানিকটা আনন্দের অবলম্বন হবার সামান্য চেষ্টা, তাই হচ্ছে আমার আনন্দ লাভের ব্যপ্তি।

কিন্তু আনন্দ বাদ দিয়ে কষ্টের কথা, রাগের কথা, ক্ষোভের কথা, হতাশার কথা লিখতে গেলে মহাভারত তার দৈর্ঘ্য নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হয়ে যাবে! আমরা যে দুঃখবিলাসী জাতি, আমি সেটা পুরোপুরি উড়িয়ে দিতে পারি না। আমরা আনন্দকে আঁকড়ে ধরে থাকতি পারি না বেশীক্ষণ, দুঃখকে আঁকড়ে ধরে থাকি সারাজীবন। আমার ক্ষেত্রে এটি ভীষণ প্রযোজ্য। বিদেশীদের দেখি কেউ মারা গেলে সবচেয়ে ভালো কাপড় পরে, সুটেড-বুটেড হয়ে দাফন শেষে মদ পান করতে করতে মৃত ব্যক্তির জীবন উদযাপন করতে। মদ খেতে খেতে সব্বাই সেই ব্যক্তির জীবনের সফলতা, মজার মজার ঘটনাগুলো শেয়ার করে, হাসিঠাট্টা করে, তার প্রতি আনন্দের সাথে শ্রদ্ধা জানিয়ে জীবনে এগিয়ে যায়। কই, আমরা তো তেমনটা পারি না। আমি তো পারিই না।

সেই যে হুমায়ূন আহমেদ মারা গেলেন, আমি সেই শোক এখনও কাটিয়ে উঠতে পারিনি। ভয়াবহ একটা চাপা কষ্ট বুকে নিয়ে আছি গত ৬-৭ বছর। একবারও মনে হয়নি যাক যা হবার তা তো হয়েছেই। আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুটাও তেমন। গত সপ্তাহটা আমার জন্য একটা বড় আনন্দের বিষয় হতে পারত। আমি পিএইচডির কোয়ালিফাইং এক্সাম পাশ করেছি। মানে এখন আমার স্ট্যাটাস ‘পিএইচডি স্টূডেন্ট’ থেকে ‘পিএইচডি ক্যান্ডিডেট’। যারা আমার কাছের মানুষ, তারা জানেন কী ভয়াবহ প্যারার মধ্যে দিয়ে এই প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে গত ৬ মাসে। নর্থ আমেরিকার পিএইচডি’র মূল প্যারা এবং উচ্চ গ্রহণযোগ্যতার একটা বড় কারণ এই কোয়ালিফাইং এক্সাম।

অন্য বেশীরভাগ দেশে যেখানে পিএইচডির শুরুই হয় গবেষণা কর্ম দিয়ে, এখানে আগে ২-৩ বছর লাগিয়ে বিভাগভেদে ৪-৮টা কোর্স আলাদাভাবে পাশ করতে হয়। যারা ক্যানাডিয়ান সরকারের মেধাবৃত্তি পাওয়া, তাদের আবার এই সবগুলো কোর্সে গড়ে ‘A’ রাখতে হয়, নাহলে স্কলারশীপ বাতিল। এই সবগুলো কোর্স আলাদাভাবে পাশ করার পর আবার সমন্বিত একটা পরীক্ষা দিতে হয় যেখানে কোর্সগুলো সব বুঝে গবেষণায় কাজে লাগানোর যোগ্যতা অর্জিত হয়েছে কিনা সেটা প্রমাণ করতে হয়। এই নানা প্যারা শেষ করে ক্যান্ডিডেসি পাবার পর স্বাভাবিকভাবেই আমাকে কাছের জনেরা বলছিলেন এখন কয়েকদিন রিলাক্স করো, এঞ্জয় করো ইত্যাদি। আমি তাদের আন্তরিকতা বুঝি, কিন্তু সত্য কথা আমার মধ্যে তেমন কোন আনন্দের অনুভূতি হয়নি। আমি বরাবরই দুঃখবিলাসী মানুষ, আমি দুঃখকে আগলে ধরে কাটিয়ে দিতে পারি বহুদিন, কিন্তু আনন্দকে আগলে রাখতে পারি না।

আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যু আমাকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে। প্লিজ মনে রাখবেন, আমার এই ব্যক্তিগত এচিভমেন্টের কথাটা উল্লেখ করেছি লেখার প্রাসঙ্গিকতা প্রমাণ করতে, এছাড়া আমার পিএইচডি’র ক্যান্ডিডেসি নিয়ে আমি আলাপ করতে মোটেও ইচ্ছুক নই। আমি শুধু আইয়ুব বাচ্চুকে নিয়েই কথা বলতে চাই। আমার ভেতর যে কী ভীষণ শূন্যতা আজ, আমি বলে বোঝাতে পারব না। আমার মধ্যে প্রেম ভালোবাসার অনুভূতিও খুব সীমিত। মানুষ অসংখ্যবার প্রেমে-টেমে পড়ে, এই ব্যাপারটা আমার মধ্যে তেমন নাই। কিন্তু বাচ্চু ভাইর ‘সেই তুমি কেন এত অচেনা হলে’ কত হাজারবার শুনেছি, কত হাজার বার একজন কাল্পনিক প্রেমিকার মুখ আঁকবার চেষ্টা করেছি ওই গান শুনে, তা হিসেব করতে পারব না।

বাচ্চু সঙ্গীতাঙ্গনে কী করেছেন তা সব্বাই জানেন। আমি জানি বাচ্চু ভাই আমার জীবনকে কীভাবে প্রভাবিত করেছেন। তিনি তো তাও একটা গান রেখে গেছেন,

এই রুপালি গিটার ফেলে

একদিন চলে যাব দুরে, বহুদূরে

সেদিন অশ্রু তুমি রেখো

গোপন করে।

বড় মানুষদের স্মরণ করার কিছু না কিছু উপায় থাকে। কিন্তু আমাদের বিদায়ের পর কোন চিহ্ন থাকে না। ফেইসবুক কর্তৃপক্ষকে বলে দিয়েছি আমার মৃত্যুর সাথে সাথেই যাতে আমার ফেইসবুক একাউন্টটি চিরতরে মুছে ফেলা হয়। যাপিতজীবনে আনন্দের সাথে খুব একটা সখ্য গড়ে তুলতে পারিনি, তাই দূঃখবিলাসী জীবনের সমাপ্তিতে কারও সাথে কষ্টের ভাগাভাগিও করতে চাই না।

ভয়াবহ কষ্ট বুকে নিয়ে কাটবে আগামী দিনগুলো। মানুষের মৃত্যু যত সত্যই হোক, তার চাইতেও বড় সত্য তার প্রস্থানে কষ্ট পাওয়া অজস্র মানুষের কাটানো নিযুত মুহুর্তগুলো।

ভালোবাসা আইয়ুব বাচ্চু। বিদায়, রুপালি গিটারে ঝড় তোলা প্রিয় ছায়ামূর্তি!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।