‘ভাইরাল’ বোমা

ভাইরাল শব্দটা শুনলেই একটা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত মনে হতো ভাইরাস সংক্রমণজনিত কোনো সমস্যা। সোস্যাল মিডিয়ার বিস্ফোরণসূত্রে ভাইরাল শব্দের অর্থ বদলে গেছে, এটি হয়েছে মার্কেটিংয়ের অন্যতম মরণাস্ত্র।

ভাইরাল কে গুগল কীভাবে দেখে জানার জন্য গুগলে ঢু মেরে পেলাম- ‘According to Urban Dictionary, something that “goes viral” is an image, video, or link that spreads rapidly through a population by being frequently shared with a number of individuals.’

সর্বশেষ কয়েকবছরে ভাইরালিটি পরিণত হয়েছে সামষ্টিক এবং গোষ্ঠীভূত চিন্তা, আকাঙ্ক্ষা, বিনোদন কিংবা দাবি আদায়ের সূচক এ। ভাইরালকে বলা যায় কালেক্টিভ ফোর্স, যা কাঁপিয়ে দিতে পারে, এমনকি ভেঙ্গেও দিতে পারে সামাজিক সুরক্ষার দেয়াল। পারমাণবিক বোমার মতো ভাইরালিটিকেও নির্দ্বিধায় সামাজিক বোমা বলা উচিত এখন।

ভাইরাল বোমার গভীরে ঢোকার পূর্বে কিছু প্রাথমিক বোঝাপড়া সেরে নেয়া যাক।

বাংলাদেশের অনলাইন কমিউনিটিতে কনটেন্টের ভাইরালিটি ৪টি সুনিশ্চিত প্যাটার্ন অনুসরণ করে।

  • প্যাটার্ন ১: বিতর্কিত প্রসঙ্গ। রাজনৈতিক বক্তব্য, যৌন স্ক্যান্ডাল, প্রশাসনিক দুর্নীতি, সেলিব্রিটি বিতর্ক প্রভৃতি।
  • প্যাটার্ন ২: সামাজিক প্রসঙ্গ। মানবিক আবেদন, ইমোশনাল কনটেন্ট, খুন-ধর্ষণ, অপরাধসহ বিভিন্ন অবক্ষয়।
  • প্যাটার্ন ৩: বিনোদন। সিনেমা ক্লিপিংস, সংলাপ, স্থিরচিত্র, গান, নাচ, বক্তৃতা, এমেচার পারফরমার প্রভৃতি।
  • প্যাটার্ন ৪: লেইমনেস। স্থূলরুচির বিভিন্ন কর্মকাণ্ড এবং ট্রলিং কনটেন্ট

ভাইরাল হয় কীভাবে?

কেউ একজন নিজের প্রোফাইলে অথবা কোনো গ্রুপে কনটেন্টটি পোস্ট করে, তার ফ্রেন্ডলিস্টের মানুষজন অথবা সেই গ্রুপের মানুষেরা সেটা শেয়ার করে, সেটা দেখে তার লিস্টের মানুষেরা। এভাবেই একটি সুবিশাল এবং সুবিস্তৃত হিউম্যান নেটওয়ার্ক চেইনের মাধ্যমে একটি কনটেন্ট ভাইরাল হয়।

একটি কনটেন্ট তৈরির পরই অনুমান করা যায় এটি ভাইরালযোগ্য নাকি অযোগ্য।

যখনই কোনো কনটেন্ট ভাইরাল হয় তার প্রেক্ষিতে পরিবর্তন ঘটে দ্রুতগতিতে। তাতে কেউ রাস্তা থেকে পৌঁছে যায় সুরম্য প্রাসাদে, আবার কেউ সুরম্য অট্টালিকা থেকে উৎখাত হয়ে চলে আসে বিচারের আওতায়।

ভাইরাল না হলে কোনোকিছুই কর্তৃপক্ষের নজরে আসবে না – এই বোধ তৈরির ক্ষতিকর দিক হলো এটা অর্গানাইজড সিস্টেমের অন্তঃসারশূন্যতা এবং অকার্যকারীতা নির্দেশ করে, একিটি বিকল্প ভারচুয়াল প্রশাসনিক ব্যবস্থা তৈরি করে যার বাস্তবিক কোনো ভিত্তি নেই।

ভাইরালিটি বোধকে একটু সরল গাণিতিক নিয়মে বুঝতে চাওয়া যাক।

একটি কনটেন্ট ভাইরাল হতে গড়ে ২দিন সময় লাগে, ৩য় বা৪র্থ তম দিনে সেটি পিকে উঠে, তারপর অন্য কোনো নতুন কনটেন্টের ভিড়ে সেটি হারিয়ে যায়। একটি ভাইরাল কনটেন্টের গড় আয়ু ৫-৬ দিন হলে মাসে ৫-৬টি মাত্র কনটেন্ট পাওয়া যায়। ভাইরালিটির তীব্রতা অনুসারে কিছু কনটেন্টের আয়ুসীমা ১০-১২ দিন পর্যন্তও বজায় থাকতে পারে। অসমতার সূত্রানুসারে আমরা সমস্যাটিকে 2<x<5 আকারে লিখতে পারি, যেখানে x=ভাইরাল কনটেন্ট।

এই অসমতার মধ্যে একটি গভীর সামাজিক সংকট রয়েছে। দেশি-আন্তর্জাতিক মিলিয়ে প্রতিদিন লাখো প্রসঙ্গের মুখোমুখি হয় মানুষ, প্রতিটিই কনটেন্ট আকারে উপস্থাপিত হয়, অথচ সারা মাস মিলিয়ে বড়োজোর মাত্র পাঁচটি কনটেন্ট ভাইরাল হবে। অনেকেই তুমুল চেষ্টা করছে ভাইরাল হতে,কিন্তু গাণিতিক সূত্রবলেই তার সম্ভাবনা কমে যাচ্ছে।

ভাইরাল হতে না পারা নিকট ভবিষ্যতেই উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষকে প্রচণ্ড হতাশা আর বিষন্নতার মধ্যে ঢুকিয়ে দিবে। ভাইরালের সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে এর প্রতি মানুষের নিরাসক্তিও বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হবে, মানুষ তখন সহমর্মিতা আর সংবেদনশীলতাকে বাড়তি ভার গণ্য করবে, এবং নিজেকে আরো বেশি বিচ্ছিন্ন করে নিবে।

ভাইরালিটির মূল সমস্যাটা এর প্রতি অতিনির্ভরতায়, এবং এখান থেকে কোনো এক পক্ষ লাভবান হওয়ায়। ভাইরাল না হলে যেহেতু গুরুত্ব পাওয়া যাবে না,এবং ভাইরালিটির সুবাদে ভিক্টিম কিছুটা হলেও যেহেতু নজরে আসে, অন্যান্য ভিক্টিমরা প্রথমে আফসোস করবে, একটা পর্যায়ে গিয়ে ক্ষুব্ধ হবে। ভিক্টিম বনাম ভিক্টিমের মধ্যে একটি মনস্তাত্ত্বিক সংঘাত তৈরি হবে, যা এক অনাকাঙ্ক্ষিত সামাজিক বিপর্যয় ঘটাতে পারে।

ভাইরালিটি ইন্টারনেট-যুগের পূর্বেও প্রচলিত ছিল।তখন ভাইরালের ব্যবহারিক নাম ছিল ‘আলোড়ন’ কিংবা ‘তোলপাড়’; ৯০ দশকের আলোচিত শারমিন রিমা হত্যাকাণ্ড, কিংবা হুমায়ূন আহমেদের ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকের চরিত্র বাকের ভাইয়ের ফাঁসি-বিরোধী মিছিল আজকের সামাজিক কনটেক্সট এ ভাইরালই বলা উচিত।

তবু সেই সময়ের ভাইরাল ছিল একপাক্ষিক। পত্রিকা বা টিভিসূত্রে মানুষ যা দেখতো সেটা নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখাতো নিজেদের গণ্ডিতে, তা মূল জায়গায় আসতে পারতো না। এখন অনলাইনের কারণে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানানোর সুযোগ থাকায় কাতার আর কুমিল্লায় থাকা দুজন মানুষ যেমন মুহূর্তের মধ্যে কানেক্টেড হয়ে পড়ছে, তেমনি কনটেন্টের প্রস্তুতকারকও জেনে যাচ্ছে কী ঘটছে। অতি সহজলভ্যতা মানুষকে অর্থপূর্ণতার চাইতে অর্থহীনতার বোধে আক্রান্ত করছে বেশি।

ভাইরাল কেন করে মানুষ?

চারটি প্যাটার্ন পর্যলোচনা করলে দুটি মূল কারণ পাওয়া যাবে। প্রথমত, মানসিক সম্পৃক্ততা অনুভব করে একাত্মতা প্রকাশ করতে চাওয়া, কিংবা প্রতিবাদ জানানো। দ্বিতীয়ত, অনুভূতি শেয়ার কিংবা উপহাস করা।

দুটো কারণের উৎসমূল খোঁজার পূর্বে জানা দরকার মানুষজনের অনলাইন লাইফ হিস্টরি সম্বন্ধে। অধিকাংশ মানুষের অনলাইন লাইফ কয়েকটি কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ- ছবি আপলোড করা, মিনি স্ট্যাটাস লেখা, অন্যদের ছবিতে বা স্ট্যাটাসে লাইক-কমেন্ট দেয়া,চ্যাটিং আর কিছুক্ষণ পরপর নোটফিকেশন দেখা। এছাড়া বিভিন্ন ওয়েবসাইটে আর্টিকেল বা ভিডিও দেখা, অন্যরা কে কী করছে তা নজরদারি করা— অর্থাৎ তাদের সময়ের বৃহত্তম অংশই ব্যয়িত হয় স্ক্রলিংয়ে আর উদ্দেশ্যহীন রোমিংয়ে। উদ্দেশ্যহীনতার দরুণ তাদের মধ্যে এক ধরনের কৃত্রিম সেন্স অব বিলঙ্গিংস তৈরি হয়, যার দরুণ তারা ভাইরালিটির ট্র‍্যাপে ধরা পড়ে।

ভাইরালিটি কি নেগেটিভ? – বর্তমান আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে এর উত্তর ‘হ্যাঁ’ বলা অনুচিত, যেহেতু বেশ কয়েকটি ঘটনার রেজাল্ট নির্ধারিত হয়েছে ভাইরালিটি ফ্যাক্টর দ্বারা। পেইন কিলার খেলে ব্যথা সেরে যায়, তবু পেইন কিলার সেবনের ক্ষেত্রে বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয় যে কারণে ভাইরালিটির ক্ষেত্রেও একই শর্ত প্রযোজ্য।

তবে ভাইরালিটির ক্ষেত্রেও মেকানিজম কাজ করে অনুমান আমার, ভাইরালিটিকে স্বতঃস্ফূর্ত মনে হয় না। যে ঘটনার রেজাল্ট আসা উচিত সেটাকে ভাইরাল বেশি বানানো হয়, যেখানে রেজাল্ট আসবে না যেটা পর্যাপ্ত ভাইরাল হলেও ফায়দা নেই। মানুষ তখন ধরে নেয় ভাইরাল হওয়ার কারণেই রেজাল্ট এসেছে, সুতরাং আরো বেশি ভাইরালিটির উপরে নির্ভর করি। অথবা ভাইরাল হয়েও যেহেতু লাভ হয়নি, তার মানে দুর্নীতি আর অত্যাচারিদের হাতেই সবকিছু বন্দী। এটা তাকে আরো বিক্ষুব্ধ করে তোলে।

বেসামরিক মানুষ নিজেদের যতোই বিজ্ঞ আর বিচক্ষণ মনে করুক, আদতে যে আমরা মেকানিজমের উদ্দেশ্য পূরণে নিজেদের অজ্ঞাতসারেই ব্যবহৃত হই তা স্বীকারে কুণ্ঠা বোধ কাজ করে সম্ভবত।

কালেক্টিভ ফোর্সের বিপজ্জনক দিক হলো, অচিরেই মানুষ ব্যক্তিস্বার্থ খুঁজতে আরম্ভ করে লক্ষ্যচ্যুত হয়। কালেক্টিভ ফোর্স কখনো কালেক্টিভ ক্যারেক্টারিসটিক্স এবং কালেক্টিভ আইডিওলজি ধারণ করতে পারে না, এবং সমগ্র ব্যাপারটাই যেহেতু ভারচুয়াল, কে কোন স্বার্থ থেকে অংশ নিচ্ছে তা সনাক্ত করাও সম্ভব হয় না। যে কারণে ভাইরালিটিগুলো ভারচুয়াল কমিউনিটি ফুটবলের বাইরে কিছু হয়ে উঠতে পারে না; যে যার মতো বলের দখল নিতে দৌড়াচ্ছে, দর্শক হাত তালি দিচ্ছে, কিন্তু গোলপোস্টটা কোথায় জানা নেই, দৃষ্টিসীমাতেও দেখা যাচ্ছে না। এই খেলা অনন্তকাল ধরে চললেও কি দর্শক ফলাফল দেখতে পাবে?

মানুষ কি তবে ভাইরালিটিতে অংশ নিবে না। সুশাসন এবং অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা থাকলে ভাইরালিটি নিয়ে মানুষের না ভাবলেও চলতো, কিন্তু দুটোই যেহেতু ভঙ্গুর মানুষ নিজের জন্য এক কল্পরাজ্য তৈরি করে নেয় যেখানে সে একই সাথে রাজা এবং প্রজার চরিত্রে অভিনয় করে। দুই চরিত্রের মধ্যে অবস্থানগত যে সংঘাত তার প্রতাপে সে সেন্স অব নাথিংনেস এ আক্রান্ত হয়। সেটাই তাকে গ্ল্যাডিয়েটরে রূপান্তরিত করে। অমুকে পা হারিয়েছে তাকে ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দাও, অমুকে ছেলে বা মেয়ে হারিয়েছে, তার ক্ষতিপূরণ ২ কোটি – এগুলো ভাইরালিটির ফলাফল। কিন্তু এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কী হতে পারে তা তুহিন নামের শিশুটির হত্যাকাণ্ড একটি ইঙ্গিত দিয়েছে। প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে নিজের শিশুপুত্রকে হত্যা করেছে বাবা। নিকট ভবিষ্যতে বিরাট অংকের ক্ষতিপূরণ পাবার আশায় যদি ছেলে মাকে বা মা ছেলেকে পঙ্গু করে দেয় বা হত্যা করে নাটক সাজায় তাতেও অবাক হওয়ার কারণ দেখি না। ভাইরালিটি আমাদের সেই পরিণতির জন্য প্রস্তুত করছে।

ভাইরালিটির সমালোচনা করছি?- একদমই না, এখন চলছে যস্মিন দেশে যদাচার সংস্কৃতি; বিরোধীতা-সমালোনায় কিছুই ম্যাটার করে না আসলে।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।