কিটনের সহজাত উদ্ভাবনী চিন্তা ও গো ওয়েস্ট

‘গো ওয়েস্ট’, বাস্টার কিটনের ভিন্ন, অপেক্ষাকৃত লো-কী কমেডি এবং আঁধারে পড়ে যাওয়া সিনেমাগুলোর একটি। ওয়েস্টার্ন আবহের এবং এই জঁনরার রুটিনমাফিক কাউবয় ঘরানার একটি চরিত্র তৈরি করেছেন কিটন। এবং নিজেই চরিত্রটিতে অভিনয় করেছেন। গো ওয়েস্ট সিনেমার গল্প এক নামহীন যুবক এবং এক প্রাণীর (গরু) আবেগপূর্ণ সম্পর্ককে বুনিয়াদ করে গড়ে উঠে।

উত্তরে কোন কাজ না পেয়ে কপালটাকে আরেকবার ঘঁষে দেখবে বলে ট্রেনে চড়ে দক্ষিণে এসে নেমেছে নামহীন, বন্ধুহীন এক যুবক (ট্রেন থেকে নামার পরের; বিস্তৃত পাহাড়ে ছেয়ে থাকা দক্ষিণের ল্যান্ডস্কেপ দৃশ্যটি, উত্তরের জনাকীর্ণ ছোট্ট শহরের প্রারম্ভিক দৃশ্যের সাথে উত্তর আর দক্ষিণের পার্থক্য অকপটে তুলে ধরে)। ট্রেন থেকে নেমে নিজের বেঁচেকুটে থাকা সম্বলের প্রায়টা বিক্রি করে ভেস্ট, নেকটাই, বুট, গানবেল্ট পড়ে পুরোদস্তুর কাউবয় সাজে ভাগ্য পরীক্ষায় নেমে পড়েছে নামহীন এই যুবক। শুধুমাত্র কাউবয় হ্যাটটা মাথায় নেই, তার বদলে নিজের পর্ক-পাই হ্যাটটা শোভা পাচ্ছে যুবকের মাথায়।

এক মালিকের পশুর খামারে কাউবয়ের কাজও জুটিয়ে ফেলেছে। যদিও কাজটার কিছুই সে বুঝে না। দক্ষ কাউবয় হতে গিয়ে ভুলভাল কাজ করে একেবারে লেজেগোবরে অবস্থা তার। তবে দক্ষ কাউবয় হওয়ার সকল প্রচেষ্টা বিফলে গেলেও, বন্ধু জুটিয়ে ফেলার চেষ্টায় সে সফল হয়। একটি গরুর সাথে বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠে তার। বাদামি চোখের ওই অবলা জীবটিই সিনেমার প্রধান সহ-চরিত্র। অনেকটা ‘লিডিং-লেড’ হিসেবেও ধরা যায়। (খামারের বাকি গরুগুলো থেকে এই গরুটিকে আলাদা করতে যে শার্প কনট্রাস্ট ব্যবহার করা হয়েছে, তা পুরো সিনেমার ভিজ্যুয়ালেই ব্যবহৃত হয়েছে।)

যুবক প্রথমদিকে ব্যাপারটিকে আমলে নেয় না তেমন, ওদিকে গরুও তার পিছু ছাড়ে না। কিন্তু খামারের মালিক, খামারের সবকটি গরু শহরে বিক্রি করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে নামহীন এই যুবক বাদামি চোখের ওই অবলা প্রাণীটিকে বাঁচানোর তাগিদ অনুভব করে। পিছু ছুটে চলে সে। এবং এই পিছু নেওয়ার ফলশ্রুতিতেই সিনেমার তৃতীয় অংকে দুর্ধর্ষ এবং হাস্যরসাত্মক এক পরিস্থিতির তৈরি হয়।

গো ওয়েস্ট গুফি গল্পের সিনেমা। তবে পছন্দসই হওয়ার ক্ষমতাও এতে বিদ্যমান। আকৃতিগত দিক থেকে গো ওয়েস্টের মিল স্থাপন করা যায় কিটনের-ই আরেক সিনেমা ‘সেভেন চান্সেস’-এর সাথে। ওয়েস্টার্ন সিনেমার বাঁধাধরা উপাদানগুলোকে খুবই নম্রতার সহিত ব্যবহার করেছেন কিটন, যার কারণে বহু-ব্যবহারের সেই জীর্ণ ভাবটা এতে আর থাকেনি। তাঁর চরিত্রটির আনাড়িপনাকে উল্লেখ্য করে তৈরি অপ্রখর বা সাধারণ মানের কৌতুকগুলোও তখন যথেষ্ট কৌতুকবোধের সৃষ্টি করে। সিনেমার প্রথম দুই অংক খানিকটা ধীরগতিসম্পন্ন। পেসিং স্টাইল যে খুবই রসপূর্ণ, তেমনটি নয়। তবে সিনেমার মোড় ঘুরিয়ে দেয় তৃতীয় অংক।

কিটনের সহজাত উদ্ভাবনী চিন্তা, কুইর্কি স্টাইল, ফিজিক্যাল কমেডি আর ব্যঙ্গাত্মক গ্যাগের সমন্বয়ে সিনেমার শ্রেষ্ঠ দিক হয়ে উঠেছে এই শেষ অংক।

শহরের রাস্তায় হাজারো গরু ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছুটছে, গরুর এই বিশাল বহর দেখে পাগলের মত দিক-বেদিকে দৌড়ুচ্ছে মানুষ আর তার মাঝে কিটন কিছুই হয়নি মত হেলেদুলে এগুচ্ছে- এ গোটা দৃশ্যটি খুবই সহজাত হাস্যরসে পূর্ণ হয়ে উঠে এবং একটা ‘ম্যাডক্যাপ’ কোয়ালিটি এনে দিতে সক্ষম হয় গোটা দৃশ্যের মাঝে। অথচ কিটন এই সম্পূর্ণ দৃশ্যটিতে মাত্র একটি রসাত্মক উপাদানই ব্যবহার করেছেন।

ভিন্ন ভিন্ন দিকে গরুগুলোর ছুটে যাওয়ার ঘটনাকে বিস্তৃত করে এবং ক্যামেরা বারবার তাতেই স্থির রেখে চমৎকার কৌতুকাবহ তৈরি করেছেন কিটন। তবে এই ভিজ্যুয়াল গ্যাগ শ্রেষ্ঠত্বে মোড় নেয় তখন, যখন কিটন দৃশ্যটাকে আরেকটু জটিল আর হাস্যরসাত্মক করতে, গরুর বহরকে একটি কাপড়ের দোকানে ঢুকে পড়তে দেন। গরুর বহরকে দোকানের ভিতর ঢুকতে দেখে ভয়ার্ত ক্রেতাদের দৌড়ঝাঁপ, রোলার স্কেটে এক ক্রেতার দৌড়ে বেড়ানো, কারো উড়ে পড়া, ভারসাম্যহীন অবস্থায় থাকা লিফট; এই সকল উপাদানকে কিটন তাঁর টাইমিং এবং মোশনের নিখুঁত ধারণায় সমন্বিত করে স্ল্যাপস্টিক কমেডির আবহ তৈরি করে খুবই সন্তোষজনক এক পরিণতির উপহার দেন।

আর এটি পুরোপুরিই দৃশ্য ও সম্পাদনার গতিময়তার সাথে সম্পর্কিত। গরুর বহর পুলিশদের তাড়া করার দৃশ্যটি তো অনেকটা সুরিয়াল আবহ তৈরি করে। চমৎকার সব গ্যাগের পাশাপাশি প্রায়-সিরিয়াস একটি সাবপ্লটও কিটন রেখেছেন সিনেমায়। খুব গুরুত্বপূর্ণ করে না তুললেও, গরুর বহর শহরে পাঠানোর সিদ্ধান্তে খামার মালিকদের ভেতরে খানিকটা দ্বন্দ্বপূর্ণ অবস্থার অবতারণা করেছেন কিটন। এবং যে-দৃশ্যটি না রাখলেই নয়, কিটনের প্রিয়, দীর্ঘ একটি ট্রেইন দৃশ্যর দেখা মেলে এই সিনেমায়-ও।

শেষত, লালরঙা ডেভিল কস্টিউম গায়ে চড়িয়ে মনে রাখার মত ক্লাইম্যাক্স উপহার দিয়েছেন বাস্টার কিটন। সাদাকালো সিনেমায় রঙ বোঝার কথা না যদিও, কিন্তু গরুর পালকে অন্যদিকে আকৃষ্ট করতে যে ডেভিল কস্টিউম গায়ে চড়িয়েছেন তা কোন রঙের সেটুকু আন্দাজ করতে খুব একটা বেশি বেগ পেতে হয় না।

সিনেমার প্রথম দুই অংককে লো-কী রেখে হাস্যরসাত্মক এবং ঐশ্বর্যপূর্ণ এক ক্লাইম্যাক্সের তৈরি করেছেন তিনি ধীরেসুস্থে। এবং একদম শেষ দৃশ্যটিতে সিনেমার সংকীর্ণ রোমান্টিক সাবপ্লটটিকে ছোট একটি গ্যাগ দিয়ে খানিকটা ব্যঙ্গ করেন কিটন, যা-সিনেমার অদ্ভুত প্রকৃতিটাকে আরেকবার জোরালো করে তোলে।

‘গো ওয়েস্ট’ অভিনেতা বাস্টার কিটনের শ্রেষ্ঠ সিনেমাগুলোর একটি না হলেও, তাঁর অন্যসব সিনেমার মতই দারুণ উপভোগ্য সাইলেন্ট-কমেডি। এবং তা অন্যান্য সিনেমার চেয়ে ‘লো-কী’ হয়েও। তবে সমাপ্তি দৃশ্যে অপ্রাসঙ্গিক টোনের সেই রোমান্টিক আবহ আরো একবার কিটনের ‘আনসেন্টিমেন্টাল সেন্সিবলিটি’রই প্রকাশ ঘটায়।

 

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।