আত্মবিশ্বাস দিলেই আত্মবিকাশ সম্ভব

বাংলাদেশ ক্রিকেট দলে ঢোকার ও জায়গা ধরে রাখার ক্রাইটেরিয়া আজও বোধগম্য হলো না!

লিটনকে কেনইবা বাদ দিলেন, আবার কোন ঘরোয়া পারফরমেন্সের বদৌলতেইবা ফেরালেন? এখন এই ইনিংসের পরে কীভাবেইবা বাদ দেবেন? মানে, বাংলাদেশে তো টেস্টে ফিফটি করে আউট হয়ে গেলে ক্রাইম ধরা হয় না, পুরস্কার হিসেবে দলে জায়গাটা রয়ে যায়। তাও ভালো।

এসব প্রশ্নের গভীরে দেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যত লুকিয়ে আছে।

অধিনায়ক সাকিব আল হাসানও ঘন ঘন একাদশ/স্কোয়াড পরিবর্তনের বিপক্ষে। তাঁর সঙ্গে শতভাগ সহমত।

সাকিবের স্টেটমেন্টের পরিষ্কার ব্রডশিট লিখলেন লিটন। এই একটা ইনিংস দিয়ে আপনি অতীতে সব ক্রিকেটারের সঙ্গে ঘটা বাদ পড়া বা দলে আসার কার্যকরণ হয়তো মেলাতে পারবেন।

প্রথমে ডাকলেন। দেখলেন দুই-চার ইনিংস বা ম্যাচ। এরপর খারাপ খেলার জন্য স্কোয়াড থেকেই বের করে দিলেন। বাদ পড়ার পর, ফার্স্টক্লাস ক্রিকেটেও আহামরি কিছু না করার পরও, আবারও দলে ডাকতে বাধ্য হলেন!

এ কারণেই এ বছর মাত্র ৬ টেস্ট খেলা বাংলাদেশ দলে ৮ জনের অভিষেক হয়েছে! ভাবা যায়!

এর পেছনে কী যুক্তি? যুক্তিহীন বায়বীয় শব্দই হয়তো যুক্তি হবে নির্বাচকদের, যা বহুবর্ষজীবী হিসেবে আজও বেঁচে আছে বটে, কিন্তু দলটাকে বাড়তেও দিচ্ছে না, শক্তও হতে দিচ্ছে না।

এই টেস্টের পুরো প্রথম দিন জুড়ে ধারাভাষ্যকাররা বাংলাদেশের উদ্বোধনী জুটি নিয়ে চর্চা করে গেলেন। কে হবেন তামিম-সঙ্গী? ইমরুল কায়েস? সৌম্য সরকার? লিটন দাস? সাদমান ইসলাম অনিক? নাজমুল হোসেন শান্ত?

এতো দিনেও সে উত্তর অজানা! সত্যই অজানা! ক্রিকেটারদের অনিয়মিত ব্যর্থতা তো এই অজ্ঞতার বড় কারণ বটেই। কিন্তু নির্বাচক তথা বিসিবির দায়ও কম নয়। এতো দ্রুত কাউকে ব্রাত্য করে দিলে তিনি ঋজু হবেন কী করে!

উইকেটকিপিং নিয়েও একই দশা গিয়েছে কিছুদিন আগেও। মুশফিক না লিটন? মুশফিক আবার কিপিং গ্লাভস ফিরে পেলেন সত্য, কিন্তু ঘটনা হলো, তামিম ইকবালের ইনজুরি না হলে, লিটনকে লোয়ার মিডলঅর্ডারেই খেলতে হতো জিম্বাবুয়ে সিরিজে। তখন হয়তো মুশফিক চারে খেলতেন, মিঠুন এখন যেখানে খেলছেন। তার মানে, আজও কিছু থিতু নয়!

আপনি ভাবতে পারেন, মিঠুনকে মুশফিক মানের ব্যাটসম্যান বানিয়ে বা ভেবে তাঁকে চার নম্বরে খেলানো হচ্ছে! টেস্ট ব্যাটিংয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পজিশন এই নম্বর চার। দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ/সেরা ব্যাটসম্যান এই পজিশনে খেলেন, এটাই ইতিহাসের কথা। সদ্য অভিষিক্ত মোহাম্মদ মিঠুনকে সেই জ্বলন্ত চুল্লীর মধ্যে ফেলে দেওয়ার অর্থ হলো, ‘সুযোগ দিয়েছি, করে খাও’! এতো সহজ করে খাওয়া! টেস্ট ক্রিকেট কি এতোই সহজ?

এই টেস্টে যেহেতু মুশফিক শুধু ব্যাটসম্যান হিসেবে খেলছেন, তাঁর সুযোগ ছিল চারে খেলার। কিন্তু, অধিনায়ক সাকিবই জানিয়েছেন, ছয়ে খেলেই এতো এতো রান করা একজন ব্যাটসম্যানকে জায়গা পরিবর্তন করে খেলতে বললে মনোসংযোগ নষ্ট হয়। অতএব, বোঝা যাচ্ছে, মুশফিক ছয়েই থাকবেন, সুস্থ হলে ভবিষ্যতে উইকেটকিপিংও করবেন বরাবরের মতো।

বাংলাদেশের পরবর্তী টেস্ট সিরিজে তামিম হয়তো ফিরবেনই। ধরে নেওয়া যেতে পারে, ইমরুল-সৌম্য নন, তামিমের আরেক নতুন সঙ্গী হবেন সাদমান। এই ইনিংসের কল্যাণে লিটন সুযোগ পেলে, তিনিও বাঁহাতি-ডানহাতি কম্বিনেশনের কারণে বিবেচনায় আসতে পারেন।

তবে, লিটনকে নিয়েই বোধকরি সবচেয়ে গভীর দূরদর্শী ভাবনা ও পরিকল্পনা করতে পারে টিম ম্যানেজমেন্ট। যদি তাঁকে কিপিং করানো না-ই হয়, তাঁর জন্যই ‘মিউজিক্যাল চেয়ার’ হওয়া চার নম্বর জায়গাটা বরাদ্দ করা যেতে পারে।

কেউ মানুন বা না মানুন, লিটন রান করুন বা না করুন, টেকনিক্যালি তাঁর সমবয়সীদের মধ্যে লিটনই সবচেয়ে প্রতিভাবান, ন্যাচারালি শার্প ও কম্পোজড ব্যাটসম্যান। ধারাবাহিক হতে পারলে লিটনই একদিন দেশসেরা ব্যাটসম্যান হবেন, এতে সন্দেহ কী! ন্যাচারাল ওপেনার ঠিক আছে, কিন্তু চার নম্বরে খেলানোর ব্যাপারে তাঁকে ‘আত্মবিশ্বাস’ দিলে, ‘আত্মবিকাশ’ অবশ্যই সম্ভব।

ক্যারিয়ারের শুরু থেকে না হলেও, শচীন ওয়ানডেতে ওপেন করছেন শেষ ম্যাচ পর্যন্ত। শুরুতে ছয়ে খেললেও, টেস্টে প্রায় পুরো ক্যারিয়ার খেলেছেন চারে। শেভাগ ন্যাচারাল ওপেনার ছিলেন না কোনদিনই, কিন্তু সৌরভ গাঙ্গুলী শেভাগকে ওখানে পাঠানোর পর বাকিটা ইতিহাস!

ওয়ানডে-টেস্টে দুই ফরম্যাটেই ওপেন করেন, এমন ব্যাটসম্যানদের মধ্যে গত বিশ বছরে তাঁর চেয়ে বিস্ফোরক ওপেনার খুব কমই এসেছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে। ব্যাপারটা অনেকটাই পোয়েটিক হারমোনির মতো, মানে কবিতারই মতো। কবিতা হতে হলে, ‘রাইট ওয়ার্ড ইন রাইট পজিশন’ হতে হয়। এখানেও, একই কথা ভিন্নভাবে – ‘চুজ ইউর রাইট ম্যান ফর রাইট পজিশন’।

টিম ম্যানেজম্যান্ট ছোট কিন্তু, নিখুঁত দূরদর্শী পরিকল্পনা করতে পারলে অধিনায়ককে হয়তো ঘন ঘন মুখ বদল নিয়ে হাহাকার করতে হবে না!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।