ঘউল: দ্রোহের অনল থেকে বিস্ফোরিত এক দানবের গল্প

১.

ভবিষ্যতের ভারত৷ দেশজুড়ে একচ্চত্র সামরিক শাসন৷ রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রত্যেকটি সেক্টরে সামরিক জান্তার অবাধ নিয়ন্ত্রন৷ রাষ্ট্রই নির্ধারণ করে দিচ্ছে একজন নাগরিকের দিনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কীভাবে চলতে হবে, কী পড়তে হবে, কী দেখতে হবে৷ রাষ্ট্রযন্ত্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে সামরিক শাসনের বিষবাষ্প ছড়িয়ে৷ মুক্তচিন্তার চর্চা দেশে নিষিদ্ধ,সেটা রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল৷

মুক্তবুদ্ধি ও বাকস্বাধীনতার আতুরঘর বিশ্ববিদ্যালগুলোকে দেশ থেকে উঠিয়ে দেয়া হয়েছে৷ প্রাথমিক আর মাধ্যমিকের পড়াশোনা কড়া নজরদারিতে জান্তার দেয়া সিলেবাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ৷ সিলেবাস বহির্ভূত স্টাডি প্রকাশ্য দেশদ্রোহিতা৷ রাষ্ট্র যা নির্ধারণ করে দেয় সেটাই মহান, চিরকল্যাণকর৷ জান্তার বিরুদ্ধে কন্ঠস্বর তুললে সে কন্ঠকে রোধ করতে রয়েছে কনডেম সেল নামক ভয়াবহ নির্যাতন কক্ষ৷ সন্দেহের ভিত্তিতে নাগরিকদের নিজের পরিবারের সামনেই উঠিয়ে নেয়া হচ্ছে, দিনের পর দিন জিজ্ঞাসাবাদের নামে করা হচ্ছে অবর্ণনীয় নির্যাতন৷

নিরাপরাধ জেনেও অনেককে হত্যা করা হচ্ছে শুধুমাত্র অন্যদের ভয়ে তটস্থ করে রাখার উদ্দ্যেশ্যে৷ রাষ্ট্রের শাসনতন্ত্রের খেলাপ বই-পুস্তক পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে৷ নাগরিক অধিকার নিষ্পেষণের যাঁতাকলে পিষ্ট৷ ফলে বিচ্ছিন্নভাবে ছড়িয়ে পড়ছে সন্ত্রাসবাদ, বোমা হামলার মাধ্যমে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করা হচ্ছে৷ ঠিক এরকম একটি গুমোট, থমথমে পরিবেশের মধ্য দিয়েই সিরিজের প্রথম এপিসোডের শুরু৷

২.

নিদি রহিম৷ সামরিক অ্যাকাডেমির স্পেশাল ইন্টারোগেশন শাখায় অধ্যয়নরত একজন টপ স্কোরার মুসলিম নারী ট্রেইনি৷ সামরিক অ্যাকাডেমিতে অধ্যয়নের ফলে ‘সামরিক শাসনই দেশের জন্য সর্বোত্তম’ বলে মনে করে৷ রাষ্ট্র নির্ধারিত আইনের বহির্ভূত যেকোন কর্মকাণ্ডই তাঁর দৃষ্টিতে পাপ৷ সামরিক শাসনই তার ধ্যান-জ্ঞান৷

তার বাবা শাহনেওয়াজ রহিম একজন অধিকার সচেতন উর্ধ্বশির শিক্ষক৷ জান্তার অলক্ষ্যে তিনি তার ছাত্রদের মৌলিক অধিকারের পক্ষে সচেতন করতে সিলেবাস বহির্ভূত বই, লেকচার শিট পড়ান৷ নিজের মনোভাবে তিনি অনেকটা একরোখা, অটল, অনড়৷ ফলে নিদির চোখে তার বাবা হয়ে যায় একজন রাষ্ট্রদ্রোহী৷ নিজের বাবাকে সংশোধনের জন্য জান্তার হাতে ধরিয়ে দেয়৷ এর কয়েকদিন পরেই তার বাবাকে আর খোঁজে পাওয়া যায় না৷

৩.

আলী সাইয়েদ৷ ভয়াবহ কয়েকটি বোমা হামলার প্রধান সন্দেহভাজন, মিলিশিয়ার দৃষ্টিতে আতঙ্কবাজ, জঙ্গি৷  অনেক অভিযান চালিয়েও করেও তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি৷ কিন্তু একদিন হঠাৎ করে স্বেচ্ছায় এসে ধরা দেয় সে৷ তাকে নিয়ে যাওয়া হয় কনডেম সেল মেঘদূতে জিজ্ঞাসাবাদের উদ্দেশ্যে৷ নিদি রহিমকে একাডেমীতে প্রশিক্ষণের ছয়মাস পূর্বেই পাঠানো হয় মেঘধূতে শুধুমাত্র আলী সাইয়েদকে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য৷

অনেক বছর ধরে লুকিয়ে থাকার পর কেন আলী সাইয়েদ এসে স্বেচ্চায় ধরা দেয়? নিদির বাবা হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যায় কেন? আলী সাইয়েদকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কেন নিদি রহিমকে নিয়ে আসা হয়? এই সকল প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে দেখতে হবে ঘউল সিরিজের তিনটি এপিসোড৷

নেটফ্লিক্সের অরিজিনাল সিরিজ ঘউলের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হরর৷ তবে এখানে হরর এসেছে প্রয়োজনের তাগিদে, অনেকটা বাধ্য হয়ে৷ তাই হরর হয়েও ঘউল ধরা দেয় হররের মোড়কে বেষ্টিত বন্দি নির্যাতন ও তার পরিণতির এক ভয়াবহ আখ্যান রূপে৷

সিরিজের প্লটটি পরিচালকের স্বপ্নে পাওয়া৷ পরিচালক পেট্রিক গ্রাহাম ‘এক আগন্তক বন্দির ভয়ে কারাগারের গার্ডসহ সবাই তটস্থ’-এ রকম একটি স্বপ্ন দেখেন৷ ঘুম থেকে উঠার পরই স্বপ্নটাকে স্ক্রিপ্ট আকারে সাঁজিয়ে ফেলেন৷ প্রথমে সিনেমা বানানোর পরিকল্পনা থাকলেও নেটফ্লিক্স যুক্ত হবার পর সেটা তিন এপিসোডের মিনি সিরিজ হয়ে যায়৷ এতে করে গল্পটাকে পরবর্তী সিজনে নিয়ে কলেবরে বৃদ্ধি করার একটা সুযোগও তৈরী হয়৷

অল্পকিছু দৃশ্য বাদে পুরো অংশের চিত্রগ্রহণ করা হয় আলো-অন্ধকার পরিবেশের মধ্যে৷ সিরিজ জুড়েই একটা থমথমেভাব৷ গতিশীল স্ক্রিনপ্লের কারণে চোখ ফেরানোর সুযোগ কম পাওয়া যাবে৷ প্লটের বর্ণনায় সিনেমাটোগ্রাফী বেশ চমৎকার৷ একটা অস্থিতিশীল অশরীরী পরিবেশ তৈরীতে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ভালো ভূমিকা রেখেছে৷

প্রায় ৯০ ভাগ দৃশ্যই ধারণ করা হয় মেঘধূত নামক টর্চার সেলে৷ ইরাকের আবু গারিব কারাগারের আদলে তৈরী করা এ সেলে বন্দি নির্যাতনের ভয়াবহ সব পদ্ধতি দেখানো হয়৷ আবু গারিব কারাগারসহ কাশ্মীরের ‘ক্যাম্প এক্স- রে’ এ বন্দী নির্যাতনের সকল টেকনিক অনুসরণ করার চেষ্টা করা হয়৷

নিদি রহিম চরিত্রে রাধিকা আপ্তের অভিনয় অনবদ্য৷ সব চেয়ে শক্তিশালী অভিনয় এসেছে আবু সাইয়েদ চরিত্রে মহেশ বলরাজের কাছ থেকে৷ একজন দৃড়চেতা বন্দির যে অ্যারোগেটিক নেচার সেটা খুব ভালোভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন৷ লেফটেন্যান্ট লাক্সমি দাস চরিত্রটা একজন অ্যান্টি-মুসলিমের৷

মুসলমান মানেই জঙ্গি, দেশের প্রতি অপার আনুগত্য থাকার পরেও মুসলমান মানেই আতঙ্কবাজ, দেশদ্রোহী সে মনোভাব এ চরিত্রের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে৷ কর্ণেল ডাকুনা চরিত্রে মানব বেশ অভিনয় করেছেন৷ প্রধান চরিত্রগুলো অভিনয়ের যথেষ্ট সুযোগ পেয়েছে, প্রতিটি চরিত্রই সফলভাবে ফুটে উঠেছে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের বলিষ্ট অভিনয় গুণে৷

সিরিজটি দেখার আগে ঘউল সম্পর্কে জেনে নেয়া দরকার৷ ইসলামী মিথোলজী অনুসারে ঘুল হলো একটা প্রাচীন অশরীরী দানব, জ্বিন বা আত্মা৷ কবরের লাশখেকো এ অশরীরীর আরেক নাম গোর৷ একটা বিশেষ চিহ্ন একেঁ কেউ যদি নিজের শরীরের রক্ত ঘুলের প্রতি উৎসর্গ করে তবে তাকে সাহায্য করতে ছুটে আসে ঘউল৷ সর্বশেষ যার শরীরের মাংস খায় তার শরীরের রূপ ধারণ করে বেঁচে থাকে এবং অভিষ্ট উদ্দেশ্য হাসিল না হওয়া পর্যন্ত ক্ষান্ত হয়না৷

ইসলাম, জঙ্গিবাদ, মুসলমান সম্পর্কে অন্যধর্মের লোকজনের মনোভাব, অধিকার হরণের বিরুদ্ধে জেগে ওঠা প্রতিবাদ সব মিলিয়ে ঘউল হররের চেয়েও বেশি কিছু৷

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।