গেট আউট: সাদা-কালোর অন্তহীন বিদ্বেষের গভীর লড়াই

‘বেস্ট অরিজিন্যাল স্ক্রিনপ্লে’ ক্যাটাগরিতে এবার অস্কার পাওয়া প্রথম ‘কালো’ চিত্র্যনাট্যকার জর্ডান পিল।

এটা তার পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র ছিলো। নিজে একজন কৃষ্ণাঙ্গ (এখানে ব্ল্যাক বলা মাজেজাপূর্ণ), চিত্রনাট্যটি তৈরিও হয়েছে একজন কৃষ্ণাঙ্গ বা ব্ল্যাক যুবকের প্রেমিকার বাসায় বেরাতে গিয়ে অকল্পনীয় ভয়ানক বিপদের সম্মুখীন হওয়া ও সেখান থেকে বাঁচার বা বের হওয়ার রক্তাক্ত চেষ্টা নিয়ে।

পরিচালক: জর্ডান পিল
জনরা:  মিস্ট্রি, থ্রিলার
আইএমডিবি: ৭.৭

বাবা ছাড়া মায়ের কাছে বড় হয়েছেন পরিচালক জর্ডান পীল। অবধারিত ভাবে একজন কৃষ্ণাঙ্গ হওয়ার কারণে সমাজের হোয়াইটদের থেকে সে যে নেতিবাচক ব্যবহার পেয়েছেন তা বলাবাহুল্য। ছবির সবচেয়ে মর্মস্পর্শী ও আক্রমণাত্মক সংলাপের মধ্যে একটি সংলাপ ছিলো ‘Just because you’re invited, doesn’t mean you’re welcome.’ এই প্রাসঙ্গিক গভীর তাৎপর্যপূর্ণ সংলাপটির মাধ্যমে কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি আমেরিকান হোয়াইটদের অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ দৃষ্টিভঙ্গীর বাস্তব প্রমাণ দিয়েছেন জর্ডান।

আর এই ভাবনার নবসৃষ্টি হয় যখন মার্কিন গৃহযুদ্ধের পর মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গদের নাগরিক অধিকার দেওয়া হয়। যদিও দাস প্রথার সময় থেকেই এই বর্ণবিদ্বেষ। যার অবসান কোন কালেই হবে না।

আর এখানেই উঠে এসেছে পরিচালক জর্ডানের আত্মকথন। একজন নবাগত পরিচালক সবসময় প্রথম ছবিতে নিজের অতীত, নিজের মন অথবা স্বপ্ন তুলে ধরেন। জর্ডানও ছবির প্রধান চরিত্র ক্রিসের (ড্যানিয়েল কালুউইয়া) মাধ্যমে জানালেন তার বা তাদের এই সমাজে অবস্থানের চিত্র।

মূল কথায় আসি। অন্যান্য সাধারণ থ্রিলার ছবির মতই মনে হয়েছিলো গেট আউট ছবিটি। কিন্তু শুরু থেকেই যখন শিল্পীদের সংলাপে বারবার উঠে আসছিলো ‘ব্ল্যাক’ ‘হোয়াইট’ শব্দ গুলো। তখনই মনে হয়েছিলো অস্কার জয়ী এই চিত্রনাট্যের মধ্যে কেমন এক বর্ণবিবাদের গুঞ্জন। পরিচালক জর্ডানের চাপা বেদনা, নিষ্পেষিত হওয়ার যন্ত্রণা গুলো সারিবদ্ধ হচ্ছিলো প্রতিটি দৃশ্যে, প্রতিটি সংলাপে।

ছবির শেষের দিক থেকে শুরু করি, যেখানে আসলে চলচ্চিত্রটির সবচেয়ে নিগূঢ় রহস্যের আত্মপ্রকাশ ঘটে। ক্রিস যখন সব জানতে পেরে প্রেমিকা রোজের বাড়ি থেকে পালানোর চেষ্টায় মত্ত তখন ক্রিসকে বাধা দেয় তার ভাই। রোজের ভাই ক্রিসকে মারতে থাকে আর বলতে থাকে মিসিসিপি ১, মিসিসিপি ২, মিসিসিপি ৩। উফফ, কি ভয়ানক শব্দ, কি দুর্বিষহ স্মৃতি ভাসতে শুরু করে চোখে। প্রমাণ হয়ে গেলো আধুনিক মুক্ত বিশ্বের চামরার নিচে চির অক্ষত, সজীব ‘কু ক্লাক্স ক্লান’ (kkk)।

‘বিশুদ্ধ মার্কিনবাদ’ তৈরির স্বপ্নে যারা কৃষ্ণাঙ্গ নির্মূলে নেমে পড়েছিলো। তাদের ধারনা ছিলো কেবল গডের সৃষ্টি ‘হোয়াইট’রা। তাদের সম অধিকারে কেউ না। তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শ্বেতাঙ্গ মার্কিনদের আধিপত্য বজায় রাখা।

সহজেই অনুমান করা যায় পরিচালক জর্ডান ভুলেননি কিছুই। উত্তরাধিকার সূত্রে সেও পেয়েছে পূর্বপুরুষের ঘা। আর তা কখনো শুকাতে দেয়নি তার চারপাশের সাফেদ সাহেবরা।

ফিরে আসি, প্রেমিকা রোজের বাসায় বেড়াতে এসে ক্রিস জানতে পারে, রোজের বাবা নিউরো সার্জেন্ট আর মা হিপনো থ্যারাপিস্ট। রোজ তার প্রেমের ফাঁদে কৃষ্ণাঙ্গদের ফেলে তাদের বাড়িতে নিয়ে আসে। আর তার মা মিসি সম্মোহন করে বন্দী করে ফেলে তাদের। আর বাবা মেডিক্যাল অপারেশনের মাধ্যমে কৃষ্ণাঙ্গদের ব্রেনে প্রতিস্থাপন করেন সেই সকল শ্বেতাঙ্গ বৃদ্ধদের ব্রেন, যারা আরও কিছুকাল এই পৃথিবীতে মিথ্যা বাঁচা বাঁচতে চায়।

তাদের আত্মা বেঁচে থাকে সেই কৃষ্ণাঙ্গর দেহে। আর কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তির আত্মাটি সম্মোহনের মাধ্যমে চলে যায় ‘সানকিন প্লেস’ নামক এমন এক কোমা স্টেজে, যেখান থেকে সব শোনা যায় কিন্তু কিছু বলা যায় না।

আর কাল্পনিক এই স্থান সানকিন প্লেসটি নিয়েও পরিচালক জর্ডান এক গভীর প্রহসন করেছেন। তারা কৃষ্ণাঙ্গরাও এমন এক সমাজে বাস করেন, যেখানে সব দেখা যায় কিন্তু সহসাই বলা যায়। আবার বললেও সমাজ ব্যবস্থা তা নিশ্চুপ করে দেয়। এক কথায় এই নশ্বর পৃথিবীতে সানকিন প্লেস বাস্তব।

আবার ফিরে আসি, আর যে কেউ চাইলেই একটি কৃষ্ণাঙ্গ শরীর পেতে পারে না। তার জন্য রোজের বাবা ডিন তার বাড়িতে নিলামের ডাক দেন। সবচেয়ে বেশি দর দিলেই পাওয়া যাবে কৃষ্ণাঙ্গ শরীর। এ জেনো দাস প্রথার এক উন্নত ও আধুনিক প্রচলন।
কৃষ্ণাঙ্গদের উপহাস করে একটি সংলাপ বেশ দায় তৈরি করে ছবিটিতে। যখন ক্রিস তার অন্ধ ক্রেতা জিমের কাছে জানতে চায় এই কাজের জন্য কৃষ্ণাঙ্গই কেন। তখন জিম বলে ‘Black is in fashion’।

এইতো, এই ছবির মাধ্যমেই নিউজ হয়েছে চিত্র্যনাট্যকার হিসেবে প্রথম ‘কালো’ পেলেন অস্কার, প্রথম ‘কালো’ প্রেসিডেন্ট, সবচেয়ে দামি ‘কালো’ র্যা ম্প মডেল। সব জায়গাতেই এমন বর্ণের বিভাজন। জেনো সাদা জন্য সব সাধারণ আর কালোর জন্য সব অবিশ্বাস্য।

এরপর ক্রিস নিজেকে মুক্ত করতে পারে, নাকি অবধারিত ভাবে বিক্রি হয়ে চিরন্তন বসবাস করতে শুরু করবে সানকিন প্লেসে, তা জানতে হলে দেখতে হবে উত্তেজনাপূর্ণ, ভীতিকর এবং মজার গেট আউট ছবিটি!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।