আবু সালেম: নৃশংস-রোমহর্ষক এক ঘৃণ্য গ্যাঙস্টার

সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবার। মা-বাবার পাঁচ সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয় ছিলেন তিনি। বাবা ছিলেন এডভোকেট! মাত্র ১০০ টাকা পকেটে নিয়ে সে মুম্বাই শহরে এসেছিলো উত্তর প্রদেশের আজমগড় থেকে।

এক হাইস্কুল ড্রপআউট ছেলে। কালক্রমে তাঁর স্মাগলিং বিজনেস ও চাঁদাবাজিকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। ছিলেন একাধারে একজন বখাটে গুণ্ডা, কিন্তু রমণীমোহন এক ক্যাসানোভা, অতিশয় ধূর্ত। নাকটা একটু বড়; কিন্তু লম্বা, সুদর্শন ও ভদ্র-নম্র কথায় মেয়ে পটানোর ওস্তাদ।

নিজের বাড়িতে বসে বুভুক্ষু চোখে বলিউড সুন্দরীদের আবেদনময়ী ফটো দেখতো আর নিঃশ্বাস ফেলতেন। পরবর্তীতে তিনি বলিউডের লাস্যময়ী সুন্দরীদের সাথে অন্তরঙ্গ সম্পর্কে জড়িয়েছেন। এর কোনোটা প্রকাশ্যে এসেছে, কোনোটা আসেনি।

হ্যাঁ, তার নাম আবু সালেম! পুরো নাম আবু সালেম আবদুল কাইয়ুম আনসারি।

বলিউডের খ্যাতনামা সঙ্গীত নির্মাতা প্রতিষ্ঠা টি সিরিজের প্রতিষ্ঠাতা গুলশান কুমারকে খুন করেছিলেন তিনি। কিভাবে জানেন? শুধু খুনই করেননি, যে লোককে দিয়ে খুন করিয়েছিলেন তাঁকে সাফ বলে দিয়েছিলেন যে মেরে ফেলার সময গুলশানের আর্তনাদ যেন ফোন করিয়ে শোনানো হয়। জ্বি, ঠিক এতটাই নৃশংস আর বিকৃত রুচির মানুষ তিনি।

দিনটা ছিল ১২ আগস্ট ১৯৯৭! মুম্বাই নগরীর আন্ধেরীর জিতেশ্বর মহাদেব মন্দিরে সকালের প্রার্থনা সারছিলেন গুলশান কুমার। আবু সালেমের ঘাতক দল অপেক্ষা করছিলো কখন গুলশান কুমারের প্রার্থনা শেষ হয়।

আবু সালেমের হিটম্যান রাজা নামের এক ভাড়াটে খুনী আবু সালেমকে ফোন করেন। সালেম তাকে নির্দেশ দিলেন ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করতে, কারণ গুলশান কুমারের আর্তনাদ শুনতে চান তিনি। মন্দির থেকে বের হওয়ার সাথে সাথেই রাজা গুলি করেন গুলশান কুমারকে। গুলশান কুমার পাবলিক টয়লেটে লুকিয়ে থাকার বৃথা চেষ্টায় দৌড় দেন।

পড়ে যান পা পিছলে। আবার গুলি করে রাজা। দুবাই থেকে ফোনের অপর প্রান্তে সব শুনছেন আবু সালেম। শত শত লোকের সামনে এই নৃশংস ঘটনা ঘটছে। কেউ এগিয়ে আসছে না। পানি পানি বলে চিৎকার করছেন পুরো ভারতনন্দিত এই সুরকার।
মোট ছয় রাউন্ড গুলি করে গুলশান কুমারের মৃত্যু নিশ্চিত করে স্থান ত্যাগ করে ঘাতক দল।

গুলশান কুমারের হত্যাকাণ্ড পুরো ভারতকে কাঁপিয়ে দেয়। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দর কুমার গুজরাল এই হত্যাকাণ্ড তদন্তের নির্দেশ দেন। পুরো বলিউড আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে। আর ২০০২ সালে পর্তুগালে গ্রেপ্তার হওয়ার সময় তার সম্পদের পরিমাণ ছিলো প্রায় ৫,০০০ কোটি রুপি। মাত্র ১০০ রুপি নিয়ে মুম্বাই এসে সম্পদের পাহাড় গড়েছিলেন তিনি।

দাউদ ইব্রাহিমের ডি-কোম্পানির অংশ ছিলেন। একটা সময় আলাদা হয়ে নিজেই গ্যাঙ খোলেন। ১৯৯৩ সালে সিরিয়ার বোমা হামলায় কেঁপে উঠেছিল মুস্বাই। সেই ঘটনায় দাউদদের সাথে জড়িত ছিলেন আবু সালেমও।

আবু সালেম ও তাঁর প্রেমিকা বলিউড অভিনেত্রী মনিকা বেদি

খুন, চাঁদাবাজি, সম্পত্তির জবরদখল কিংবা বেআইনী অস্ত্র সরবরাহের জন্য মুম্বাই পুলিশের কাছে তিনি দাউদ ইব্রাহিমের পরই মোস্ট ওয়ান্টেড ব্যক্তি। যদিও, এই মুহুর্তে মুম্বাইয়ের আর্থার রোড জেলের অন্ধকার কুঠুরিতে দিন কাটছে তার। হয়তো এখন কেবল মৃত্যুই তাঁকে মুক্তি দিতে পারে এই জীবন থেকে।

কেন আবু সালেমেরও ফাঁসির সাজা না দিয়ে যাবজ্জীবন সাজা দেওয়া হয়েছে তার পিছনে কারণ হল, ২০০৫ সালে পর্তুগাল থেকে আবু সালেমকে গ্রেফতার করে বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী এদেশে আনা হয়েছিল। সেই চুক্তি অনুযায়ী লিসবন আদালতের শর্ত ছিল যে আবু সালেমকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যাবে না। সেই নিয়মের জেরেই আবু সালেমকে ফাঁসির সাজা শোনানো গেল না।

১৯৯১ সালে ১৭ বছর বয়সী কলেজ শিক্ষার্থী সামিরা জুমানিকে বিয়ে করেছিলেন। যদিও, তাঁর দীর্ঘদিনের প্রেমিকা ছিলেন বলিউড অভিনেত্রী মনিকা বেদি। আবু সালেমের সাথে তাঁর প্রেমে কোনো লুকোচুরি ছিলো না। সালেম চাইতেন মনিকা যেন বলিউডের শীর্ষ নায়িকার আসন দখল করে।

এ জন্য তিনি সুভাষ ঘাই, রাজিভ রায়ের মতো বাঘা বাঘা পরিচালকদেরও হুমকি দিতে দ্বিধাবোধ করেননি। এরপর, দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পর ২০০২ সালে পর্তুগালের লিসবন শহরে পাসপোর্ট জালিয়াতির অভিযোগে দুজনই গ্রেপ্তার হন। দুই বছর কারাভোগের পর তাদেরকে ভারতে ফেরত পাঠানো হয়। পরবর্তীতে এই যুগলের বিচ্ছেদ হয়ে যায়।

আবু সালেমের বর্তমান

দেশে এসে মনিকাকে আড়াই বছর জেলে কাটাতে হয়। জেল থেকে ছাড়া পান ২০১০ সালে। তিনি বিনোদন জগতে ফিরে এসেছেন। তবে, আবু সালেমের আর ফেরা হয়নি। তাঁর সুদর্শন চেহারাতেও বয়সের ছাপ পড়েছে। মাথার চুল পড়ে গেছে।

একেই বলে ভাগ্য কিংবা কর্ম। যার কথায় একটা সময় আন্ডারওয়ার্ল্ড চলতো, যার নাম শুনলেই বলিউডের সালমান , শাহরুখ, সঞ্জয় দত্ত, সুভাষ ঘাই রা কাঁপাকাঁপি শুরু করে দিত, বিনা বাক্য ব্যয়ে চাঁদা দিয়ে দিত, আজ তাঁর দিন কাটছে জেলের অন্ধকার কুঠুরিতে।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।