গ্যাংস অব ওয়াসিপুর: ক্ষমতাই যখন বংশ পরম্পরা

‘গ্যাংস অব ওয়াসিপুর’ বলিউডের সর্বকালের সেরা চলচ্চিত্রের মধ্যে একটি আমার দৃষ্টিকোণ থেকে। বিশ্বের অন্যতম সেরা গ্যাংস্টার জনরার ছবি হিসেবে যাকে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। সাম্রাজ্যবাদ, রাজনীতি এবং মাফিয়া জগতকে খুব কাছ থেকে দেখানো হয়েছে। মুভিটি পরিচালনা করেছেন বলিউডের ধরাবাধা নিয়মের বাইরে গিয়ে যিনি সিনেমা নির্মাণ করে বারবার হয়েছেন সমালোচিত সেই অনুরাগ কাশ্যপ।

‘গ্যাংস অব ওয়াসিপুর’-এর আগে ক্যাশপের সেরা সৃষ্টি আমার দৃষ্টিকোণ থেকে ‘নো স্মোকিং’, এমন ধরনের ফিকশনাল সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার সচারচার দেখা যায় না। কিন্তু গ্যাংস অফ ওয়াসিপুর নির্মানের মধ্য দিয়ে চিরাচরিত বলিউডীয় ধারার সবটাই ভেঙ্গে ফেলেন তিনি। গ্যাংস অফ ওয়াসিপুর দেখার সময় সব সিনেমাপ্রেমীদের মনে হবে তিনি যেন বাস্তবতা দেখছেন খুব কাছ থেকে। লুঙ্গি, গামছা, বহুবিবাহ, যৌনতা, কামনা – সমাজের সকল উপাদানের এক অসাধারণ মিশ্রণ হল গ্যাংস অফ ওয়াসিপুর।

দুই ভাগে নির্মিত ২০১২ সালের ‘গ্যাংস অব ওয়াসিপুর’ আমার দেখা সব থেকে বড় এক্সপেরিমেন্টাল প্রোজেক্ট বলিউডের। নতুন স্ক্রিপ্ট রাইটার, নতুন অভিনেতা সব মিলিয়ে যেন পুরোপুরি নব সংসার ক্যাশপের। দুই পর্বের এই বিশাল সিনেমাতে নেই কোন বড় মানের অভিনেতা, পরিচিত মুখ বলতে দূর্গা চরিত্রের রিমা সেন, তাও সাউথের মুভি থেকে যার পরিচিতি। তবে গ্যাংস অফ ওয়াসিপুর শুধু নতুন ইতিহাস জন্ম দেয়নি, দিয়েছে বলিউডকে কিছু ক্ষণজন্মা প্রতিভা। নওয়াজউদ্দীন সিদ্দিকী, জিসান কুরাইশি, রাজকুমার রাওয়ের মত কিছু কাল্ট অভিনেতার সাথে সাথে মনোজ বাজপেয়িকেও নতুন করে চিনেছে দর্শকরা।

‘গ্যাংস অব ওয়াসিপুর’ কোন চায়ের দোকানে বসে লেখা কাহিনী নয় বা নয় কোন মানুষের মন গড়া কাহিনী। গ্যাংস অফ ওয়াসিপুর ইন্ডিয়ার এক অঞ্চলের অরাজকতার কাহিনী, সত্য ঘটনার উপর নির্মিত কাহিনী। কাহিনীর পটভূমি জানার জন্য আমাদের যেতে হবে ব্রিটিশ শাসন আমলে, যখন বাংলা, ভারত ও পাকিস্তান একত্রে ছিল। আর সেই শাসনের মালিক ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে যাকে বলা হয় ‘ইআইসি’।

নামেই বোঝা যাচ্ছে ওয়াসিপুর অঞ্চলের কাহিনী নিয়ে গড়ে উঠেছে মূলত সিনেমাটি। ওয়াসিপুর মূলত বাংলার একটি অংশ ছিল, পড়ে এটি বিহারের অংশ হয়ে যায়। ২০০০ সালের পরে এটি নতুনভাবে ঝাড়খন্ড প্রদেশে অন্তর্ভুক্ত হয়। কিন্তু এতো বিখ্যাত কেন সে কথা যদি সবার মনে জেগে থাকে, তহলে বলব জায়গাটি মুলত কয়লা খনির জন্য বিখ্যাত। বাংলাদেশ যেমন গ্যাসের উপর ভেসে আছে বলা হয়, ওয়াসিপুরের মাটির নিচে তেমন শুধু কয়লা আর কয়লা।

আর ব্রিটিশ শাসনামলে কয়লা চালিত রেলগাড়ি এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র থাকার দরুন ব্যপক চাহিদা পড়ে এই কয়লার উপর। তাই এখানে শুরু হয় ব্যপক হারে কয়লা উত্তোলন। এমনি চাহিদা এই কয়লার যে সরকারি ভাবে ছাড়াও অবৈধভাবে উত্তলোন করা হত কয়লা। সেজন্য নতুন নতুন খনির প্রয়োজন পড়ত। তখন সেখানকার প্রভাবশালীরা দূর্বল খেটে খাওয়া মানুষের বসতবাড়ি উচ্ছেদকরে সেখানে খনন কাজ পরিচালনা করে কয়লা উত্তোলন করত।

ইংরেজরা ভারত ত্যাগ করার পর ওয়াসিপুর ধানবাদের ‘হিস্যা’ হয়ে যায়। আর এখানের প্রাভাবশালীরা তখন যোগ দেয় রাজনীতিতে, আর নিজেদের প্রভাব বজায় রাখার জন্য সাথে রাখত নির্ভিক একজন পালোয়ান। এখান থেকেই মূলত শুরু হয় গ্যাংস অফ ওয়াসিপুরেরে কাহিনী।

একটা ছোট্ট ছেলে সর্দার খান প্রতিজ্ঞা করে যতদিন না সে তার বাবা শহীদ খানের খুনের বদলা নিতে পারছে ততদিন মাথায় চুল রাখবে না। মস্তক মুন্ডন হয় তার। সদ্য স্বাধীন হওয়া ভারতে একটু আধটু লেখাপড়াও শেখে সে। কাকার সংসারে লুকিয়ে মানুষ হয়। কিন্তু সর্দারের রক্তে তো বইছে তার বাবার মতোই এলাকা দখল, আধিপত্য বিস্তার আর মুরুব্বিয়ানার রক্ত।

একদিকে আছে কয়লা খনির মালিক রামধীর সিংহ। বাবার খুনি, এলাকার জনদরদী নেতা। অন্যদিকে সর্দারের দুই বিবি, পাঁচ সন্তান আর নিজের কৌমের সাথে যুঝে চলার নিরন্তর সংগ্রাম। সর্দার এই ছবির ট্রাজিক বীর কিনা আমরা জানি না। কারণ ছবির প্রথম অংশ শেষ হয় সর্দারকে খুনের চেষ্টার মধ্যে দিয়ে। হিংসা, মারামারি, খুন-জখম, রাহাজানি, বিশ্বাসঘাতকতা আর গভীর প্রেম যদি হয় এই আখ্যানের মোড়ক।

তাহলে অন্যদিকে আছে এক পরিবারের গল্প বলতে বসে তার মহাক্যাবিক আখ্যানের বিস্তারের সাথে সাথে দেশ, সময় ইতিহাসকে ছুঁয়ে যাওয়ার এক আপ্রান প্রচেষ্টা। সর্দার খানের বংশধরদের যদি ক্রমান্বয়ে পর্দায় নিয়ে আসা হয় তাহলে তাদের দেখা মিলবে ঠিক এভাবে –

দানেশ খান -> ফয়জল খান -> পারপেন্ডিকুলার -> ডেফিনেট ।

প্রথম পর্বে মূলত দেখানো হয়েছে ওয়াসিপুরে সর্দার খানের প্রভাব বিস্তার এবং রামাধীর সিং এর সাথে বিরোধ। মনোজ বাজপেয়ি’র জাদরেলি অভিনয় আর খুনে দৃষ্টি মনে রাখার মত ভীতি সঞ্চয়ে বাধ্য করবেই। সাথে রয়েছে নৃশংসভাবে মানুষকে গরুর মত জবাই করার দৃশ্য। যা ওয়াসিপুরের ভয়াবহতার নিদর্শণ। প্রথম পর্বের শেষদিকে মনোজ বাজপেয়ি-এর গুলিবিদ্ধ হবার পর গাড়ি থেকে বের হয়ে আসার দৃশ্য দেখার পর, কোন মানুষের পক্ষে তাঁর অভিনয় নিয়ে প্রশ্ন রাখার অবকাশ থাকবে না।

কথায় বলে রক্ত কথা বলে। কথাটির মর্ম একেবারে হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যায় দ্বিতীয় পর্বে যখন গাঁজার নেশা ও সিনেমাতে মশগুল এক কালো যুবক হয়ে ওঠে ওয়াসিপুরের হর্তাকর্তা। সেখানেই মূলত দেখা মিলে নওয়াজউদ্দীন সিদ্দিকীর। এক হ্যংলা পাতলা, রোগা লিকলিকে কালো বর্ণে এই অভিনেতা কি তখন জানত কি করতে চলছে সে। এক ফয়জল খানের চরিত্র তাকে রাতারাতি বানিয়ে দিলো সুপারস্টার।

গ্যাংস অব ওয়াসিপুরের সব থেকে শক্তিশালী চরিত্র আমার মতে, কারণ গাঁজার নেশায় বুদ হয়ে থাকলেও কি করে বারবার একই অস্ত্র বিক্রি হয় তা সে খুব সহজেই বুঝতে পারে। গ্যাংস অব ওয়াসিপুর’-এ সর্দার খানের কনিষ্ঠ পুত্র ফয়জল খানের চরিত্রে দুর্দান্ত অভিনয় করে লায়ন্স গোল্ডের পুরস্কার পেয়েছিলেন নওয়াজ। সে কথার সাথে বললেন, ‘ফয়জল খানের চরিত্রে অভিনয়, ‘গ্যাংস অব ওয়াসিপুর’—এগুলো একেবারে অনন্য।’

সিনেমার সব থেকে মজার দুটি চরিত্র পারপেন্ডিকুলার এবং ডেফিনেট। ধারণা করা হচ্ছে গ্যাংস অব ওয়াসিপুর ১.৫ নামে মুভি তে হয়তো ডেফিনেটের উত্থান বা তার প্ল্যান নিয়ে আলোচনা করা হবে। বাস্তবের গ্যাংস অব ওয়াসিপুর কিন্তু এখনো বিদ্যমান। ছবিতে শাহিদ খান, সর্দার খানের চরিত্র দেখছন বাস্তবে এমন চরিত্র বিদ্যমান ছিল। শফিক খান নামের সেই ব্যাক্তির চরিত্রে অভিনয় করেন মনোজ বাজপেয়ি। যদিও শফিক খানের বর্তমান বংশধররা এসব কথা অস্বীকার করেন।

এমনকি এই ছবি মুক্তি পাওয়ার পর ওয়াসিপুরের বাসিন্দারা জানিয়েছেন তীব্র প্রতিবাদ। কারণ তাদের অনুমান এই ছবি তাদের অঞ্চলের নাম খারাপ করছে। বদনাম করা হয়েছে এই ছবিতে। তথ্য সম্প্রচার মন্ত্রীকে তাঁরা চিঠি পাঠিয়েছেন। রাঁচি হাইকোর্টে রিট পিটিশন দাখিল হয়েছে।

২০১০ সালের ডিসেম্বরের এক রাতে বেনারসে স্টান্ট সিকোয়েন্স শ্যুটিংয়ের সময় মারা যায় ছবির সহকারী পরিচালক সোহিল শাহ। তাঁর মৃত্যুটা নিছকই অ্যাক্সিডেন্ট না খুন তা নিয়েও একটা চাপা গুঞ্জন আছে। ছবিটি সোহিলের নামে উৎসর্গীকৃত। মুক্তির পর থেকে মাত্র চার দিনে এই ছবি ব্যবসা করেছে প্রায় বারো কোটি টাকার। যা প্রযোজকের মুখে হাসি ফুটিয়েছিল।

সিনেমার প্রথম অংশ থেকে দ্বিতীয় অংশ বেশি জোরালো এবং গোছানো, যদিও এন্ডিং অপরিষ্কার। কিন্তু মাত্র আট পৃষ্ঠার একটা রাফ স্ক্রিপ্ট নিয়ে যে জিশান কাদরি এসেছিল দেখা করতে তার জন্মস্থান ওয়াসিপুর নিয়ে ছবি করার জন্য, তিনি কি তখন ও জানতেন এই ছবি হয়ে যাবে এতো বিখ্যাত! জানলে হয়তো আজ ‘গ্যাংস অব ওয়াসিপুর’ হত না। কারণ বিখ্যাত সব ছবির সৃষ্টি এভাবে হয়ে যায় অজান্তে।

ভারতীয় উপমহাদেশে গ্যাংস্টারদের দৌরাত্ম্য আজকের নয়। তবে আরেকটু ছোট পরিসরে যদি বলি, বলিউডের সাথে গ্যাংস্টার জগতের সম্পর্ক সবচেয়ে আলোচিত এবং লোভনীয়ও। সঞ্জয় দত্ত, রাম গোপাল ভার্মা, অর্জুন রামপাল, প্রীতি জিনতা, অনিল কাপুর প্রমুখের সাথে শোনা গেছে অন্ধকার জগতের যোগসাজশের গুজব; সত্যতাও মিলেছে অনেকবার। যেই জগতের সাথে সিনেমা জগতের এত প্রেম, তার নিবেদনে কোন ছবি হবেনা, ভাবাই সার। ‘গডফাদার’, ‘নার্কোস’ ঘরানা যাদের প্রিয় তারা তো বটেই বলিউডি মশলাদার ছবির দর্শকরাও এখন ফিরছেন এইসব অন্ধকার জগত নিয়ে নির্মিত ছবিগুলোর দিকে।

সর্বোপরি ‘গ্যাংস অব ওয়াসিপুর’ একটি সভ্যতার গল্প। চাইলে এটাকে অসভ্যতাও বলা যায। এই সভ্যতা/অসভ্যতা বড় হতে হয়েছে কয়লাখনির পাশে। যে সভ্যতা নিজের দেশের নামে, স্বাধীনতার নামে লুট করেছে ট্রেন, জনপদ। যে সভ্যতা দেখেছে নিজের মাকে বিক্রি হতে রাতের পর রাত। যে সভ্যতা নিজের হাতে খুন করেছে বিশ্বাসকে, শৈশবকে, তার ভালোবাসাকে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।