অ্যালো, মা!

গোল করলেই আমার মা কল করেন। বল পোষ্টের জাল ছুঁয়েছে কি ছোঁয়নি, মোবাইলে মায়ের কল চলে আসে।

মা ব্রাজিলে আছেন না খোদ স্টেডিয়ামে বসে খেলা দেখছেন, তাতে কিছুই যায় আসেনা। আমি মাঠে খেলছি, তাতেও কিছু যায় আসেনা। কল করবেনই। প্রতিবার। ম্যানচেষ্টার সিটির হয়ে গোল করছি, মায়ের কল…আমি তো জানি মা কল করেছেন। মাঠে থাকি বা যেখানেই থাকি। তাই গোল করলে সোজা কর্নার ফ্ল্যাগের কাছে গিয়ে হাত কানের কাছে নিয়ে গিয়ে বলি, ‘অ্যালো, মা!’

সিটিতে আসার পর লোকজনের কাছে খুব মজা লাগলো আমার গোল উদযাপন। সবার জিজ্ঞাসা, ব্যাপারটা কি?

সহজ উত্তর, মা সবসময় কল করেনতো, তাই ফোন ধরি গোল করার পর।

বড় উত্তরও আছে। সেই উত্তরের শুরু হচ্ছে আমার ছেলেবেলায়। বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থাকা এক বালক। ব্রাজিলে এই একটা জিনিষের অভাব নেই। স্বপ্ন। আমাদের দেশে প্রতিটা শিশু বাঁচে বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে। সবার চেয়ে আমি কিছুটা সৌভাগ্যবান বলতে পারেন, আমার কয়েকজন সুপারহিরো চেনাজানা ছিলো।

আমি বড় হয়েছি সাও পাওলোর উত্তরে পেরি জার্ডামে। ওখানে বেঁচে থাকা, জীবন চালানো কঠিন সংগ্রামের বিষয়। আমার সৌভাগ্য, মা প্রচন্ড পরিশ্রম করতেন। টেবিলে খাবারের অভাব হয়নি কখনো। সাথের অনেকেরই জীবন এরকম ছিলোনা। আরো কঠিন ছিলো তাদের জীবন। কখনো কখনো আমার সাথের ছেলেপিলের দিনে খাবার জুটতো একবার, তাও মাঠে গেলে। এমন অনেক বাচ্চা ছিলো মাঠে যেতো শুধু খেতে। একটা হ্যাম স্যান্ডউইচ আর একটা সোডার জন্যে মাঠের চারপাশে এরা থাকতো সারা দিন। একই খাবার প্রতিদিন। সাদা পাউরুটির ওপর মোর্তাদেল্লা আর এক ক্যান সোডা।

কখনো কখনো শুধু এক বোতল সোডা।

সারাদিনে…বুঝতে পারছেন বিষয়টা?

আমার সকল স্বপ্ন, এখন যা নিয়ে আছি, যা আছে আমার…সবকিছুর শুরুটা ক্লাব পেকুইনিনোস থেকে। পেকুইনিনোস মানে হচ্ছে ‘ছোট্ট’। এই ক্লাবটা আসলে একটা ফুটবল ক্লাবের চাইতে বড় কিছু। ব্রাজিলের আর দশটা ক্লাবের মতো ভাববেন না, আবার সেই বীচ ক্লাবের কথাও মাথায় আনার দরকার নেই। কোন বীচ বা পাম গাছ…এরকম কিছু না। আমাদের মাঠ মিলিটারি জেলখানার ঠিক বাইরে, খোলা জায়গা। ধূলায় ভরা, ঘাসহীন ন্যাড়া একটা শক্ত জমি। চারপাশে লম্বা লম্বা বিশাল সব পাইন গাছ। আমরা ছাড়া ঐ মাঠে শুধু জেলের পুলিশরা খেলতেন।

আমার বয়স যখন নয়, বন্ধু ফ্যাবিনহো কে সাথে নিয়ে প্রথম ওই মাঠে উপস্থিত হলাম। ওখানকার দলে খেলা যাবে কিনা দেখতে গিয়েছিলাম। বড় একটা বনের মাঝখান দিয়ে দুই বন্ধু হাঁটছি, বগলের চে বুট।

দেখা হলো হোসে ফ্রান্সিসকো মামেদের সাথে। এই মানুষটিই আমাদের জীবন বদলে দিয়েছিলেন। ভদ্রলোক ছিলেন সবচে ছোট্টদের যে দল ছিলো তার কোচ। দেখা হতেই বললেন, ‘খেলা যাবেনা মানে? আলবৎ যাবে। কালকেই খেলবি।’

কোন কাগজে সাইন টাইনের ব্যাপার নেই। কিসসু না। কারণ হচ্ছে ক্লাবটাতে ভবিষ্যতে খেলোয়াড় বিক্রির কোন বিষয় ছিলোনা। বাচ্চাদের শুধু খারাপ পথে যাওয়া থেকে আটকানো হচ্ছে ক্লাবের উদ্দেশ্য। আলোর পথ দেখানো হচ্ছে উদ্দেশ্য। মুখে একবেলা খাবার দেয়া হচ্ছে উদ্দেশ্য। বড় কোন ক্লাব না পেকুইনিনোস, নামটা হয়তো শোনেননি। অখ্যাত ক্লাব হতে পারে ঠিকই কিন্তু এই ক্লাবে পৃথিবীর সবচে বড় মিরাকল গুলো হয়।

কখনো কখনো বাচ্চাদের দেখা যেতো ঘন্টার পর ঘন্টা বাসে চড়ে ক্লাবে আসছে শুধু খাবারের জন্যে। সাথে আরেকটা জিনিষ-ক্যানাস্তা ব্যাসিকা। ক্যানাস্তা ব্যাসিকা হচ্ছে একটা বাক্স, ওতে কিছু খাবার থাকতো। ক্যানাস্তা ব্যাসিকা তে করে কোচেরা খাবার বাচ্চাদের বাড়িতে নেয়ার জন্যে দিয়ে দিতেন। চাল, ডাল আর রুটি। যারা নিচ্ছে তাদের অনেকেই হয়তো দিনের পর দিন এই খাবারগুলো চোখেই দেখেনি, খাওয়া তো অনেক দূরের কথা।

কোচ মামেদের একটা বুড়ো সাদা ভক্সওয়াগন ছিলো। সত্তর দশকের গাড়ি টাড়ি হবে। ওতে করে কোচ সমস্ত বাচ্চাদের আনা নেওয়া করতেন। আমরা সবকটা সাইজে এতই ছোট ছোট ছিলাম যে নদশটা বাচ্চা, তাদের বুট, বল সেই ক্যানাস্তা ব্যাসিকা সব গাড়িতেই এঁটে যেতো। একদম সব। শুধু ওতে চড়া মানুষগুলোর স্বপ্নেরা ছাড়া।

ঐ ক্লাব বাচ্চাদের জন্য যা করেছে, করছে…অবিশ্বাস্য লাগে মাঝে মাঝে।

ব্রাজিলে এই কোচ মেমেদের মতো লোকেদের আমরা একটা সুন্দর নামে ডাকি – হিরোইস সেন ক্যাপস।

‘হিরোজ উইদাউট ক্যাপস।’

অনেক বাচ্চাদের কাছে আসলেই মানুষটা তাই। মামেদে বা মামেদের মতো অন্য যারা কোচ ছিলেন, আমাদের জীবনে ফেরার সুযোগ দিয়েছিলেন মানুষগুলো।

আমার জন্যে ফুটবলই ছিলো সবকিছু। ফুটবলের প্রতি ভালোবাসাটা ছিলো সবকিছু। পেকুইনিনোসে সপ্তাহে মাত্র দুদিন ছিলো ট্রেনিং। কখনো যদি যেতে না পারতাম, থাকতাম পেরির রাস্তায়। এমনও সময় গেছে খেলতে খেলতে পেরিয়ে গেছে মাঝরাত। খেলা শেষে সবাই মিলে কঠিন আড্ডা…আড্ডায় মেয়েদের কথা এসেছে, একে ওকে খোঁচানো এসেছে আর এসেছে প্রাণখোলা হাসি। আড্ডা চলতো সেই সকাল পর্যন্ত।

বাড়িতে তো আসলে খুব বেশি কিছু করার ছিলোনা। আমি জন্মাবার পরই বাবা আমার মাকে ছেড়ে চলে যায়। প্রতিটা দিন মাকে উদয়াস্ত পরিশ্রম করতে হতো। শহরে হাউজ ক্লিনারের কাজ করতেন মা। সারাদিন খাটাখাটুনি করে এসে বেচারিকে তার দুই ছেলের সাথে একই বিছানা ভাগাভাগি করে থাকতে হতো।

বাচ্চাদের ভিডিও গেইমস থাকেনা? আমার ছিল ফুটবল আর কল্পনা। আসলেই দুর্দান্ত একটা ব্যাপার। গেইমসের নকল দুনিয়া আমার ছিলোনা। ছিলো একেবারে রক্তমাংসের দুনিয়া। বড় বড় ফুটবল টুর্নামেন্ট হতো আমাদের। প্রতিটা গলি খেলতো আলাদা আলাদা করে দল দিয়ে। ট্রফি ছিলো এক ক্যান সোডা। সেই এক ক্যান সোডার জন্যে যে কি হতো! রীতিমতো জান প্রাণ দিয়ে লড়ার মতো অবস্থা। আমাদের জন্যে ওই সোডা কোপা লিবার্তাদোরেসের চাইতেও দামী।

একবার জিতে গেলে, ঐ ক্যান হাতে হাতে ঘুরতো। প্রত্যেকে এক চুমুক করে গিলে দিয়ে দিচ্ছে পাশের জনকে। ট্রফি সোডা, স্বাদই অন্যরকম। এই যে শ্যাম্পেইন খাই, ম্যান এরচে দশগুন বেশি স্বাদ ঐ সোডার।

আমার বয়স যখন ১৩ একটা ঘটনা ঘটে গেলো। সাও পাওলোর একটা বড় টুর্নামেন্টে ঢুকে গেলো পেকুইনিনোস। আমাদের দলটা চমৎকার ছিলো। উই অয়্যার গুড, ম্যান! শুরুর দিকের রাউন্ডে দেখা গেলো বড় বড় ক্লাবগুলোকে আমরা ১২, ১৩ গোলে হারাচ্ছি।

ফাইনালে গিয়ে দেখা হলো পর্তুগিজা দ্য দেস্পোর্তোস। বড় ক্লাব। পেশাদার ক্লাব যাকে বলে। এদের ঐ টুর্নামেন্টে খেলার একটাই কারন তা হচ্ছে ওরা ওখানকার ছোট ছোট দল থেকে খেলোয়াড় সংগ্রহ করে। অন্য আর কিছু না।

বিশাল এক দল, সব রীতিমতো পেশাদার খেলোয়াড়, খেলার সব গিয়ার আছে আর এদিকে আমরা এক দল, যাদের মাঠই নেই নিজেদের, খেলা হচ্ছে আমাদের জেলখানার বাইরে এক পতিত জমিতে, খেলোয়াড়েরা খেলে একবেলা খাবারের আশায়…অনেকটা সিনেমার মতো ঘটনাটা। ঐ যে সিনেমায় দেখায় না, ঐরকম আরকি। ডেভিড-গোলিয়াথের মতো বলতে পারেন। তারপরেও মনে হচ্ছিলো, হয়ে যাবে। বন্ধুরা একজন আরেকজনকে যখন বলছি, সবার একই রকম কথা, ‘নাহ! হয়ে যাবে। জিতবো!’

ম্যাচের আগের দিন বিরাট ঝড়। রাতভর বৃষ্টি হলো মুষলধারে। সকালে উঠে সবার মনে হচ্ছিলো খেলা বাতিল করা হবে।

সেরকম কিছু হলোনা। খেলা শুরু হলো। শুরু হয়েছে ঠিকই কিন্তু মাঠ ভর্তি কাদা। অদ্ভুত এক অবস্থা। দৌড়া শুরু করলেই পড়ে যাচ্ছিলাম আমরা। আমাদের একজনও নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিলো না। আর ওদের? সব ঠিকঠাক।

পায়ে সত্যি সত্যি মেটাল ক্লিটের বুট। ঐযে যেগুলোয় স্টাড স্ক্রু ঘুরিয়ে লাগানো যায়।

আমাদের তো সস্তার বুট। ছোট প্লাস্টিকের ক্লিট। সব আবার ওই শক্ত মাঠে খেলে খেলে ক্ষয়ে গেছে।

ঐ মুহুর্তটায় মনে হয়েছিলো, এইটা শালার জীবন? ধুর!

তারপরেও আমরা জেতার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলাম। পারলাম না। খেলা শেষে স্কোরলাইন ৪-২। পর্তুগিজান দের ট্রফি নিয়ে উদযাপনটা আমি কখনোই ভুলবোনা। ফুটবল আসলে জীবনের মতো। খুব একটা ফেয়ার না। নীতিটীতি মেনে চলেনা। জীবনে যেমন তাও বেঁচে থাকতে হয়, ফুটবলেও তাই।

আমার এই শিক্ষাটা খুব দরকার ছিলো। শিক্ষার একেবারে আদর্শ সময় বলতে পারেন, কারন আমার জীবনের পরবর্তী সময়টা ছিলো কঠিন, অসম্ভব কঠিন। ব্রাজিলে আপনি যদি সত্যি সত্যি একজন পেশাদার ফুটবলার হতে চান তাহলে বারো তেরো বছর বয়সেই বড় কোন ক্লাবের ইয়ুথ অ্যাকাডেমিতে থাকতে হবে। কিছু কারনে আমার ক্ষেত্রে সেরকম হয়নি। সাও পাওলো আমাকে একবার ট্রায়াল দিয়েছিলো, পছন্দও করেছিলো শেষে বলে দিলো আমাকে ওরা অ্যাকাডেমিতে রাখতে পারবেনা। চাইলে আমি ক্লাবে গিয়ে ট্রেনিং নিতে পারি। সাও পাওলো ক্লাব আমার বাড়ি থেকে অনেকটা দূরের পথ। প্রতিদিন বাসে যাওয়া আসা করতে হলে স্কুলটায় সমস্যা হয়ে যায়। আর আমার মা…হা হা হা হা…

মা তো কোনভাবেই এই প্রস্তাব মেনে নেবেন না। আমার মায়ের কাছে পড়াশোনাই সব।

আমি আমার সবকিছুর জন্যে মায়ের কাছে কৃতজ্ঞ। এই সময়টায়, আমার এই বিশ্রী সময়টায় মা যা করেছেন তার জন্যে আমি আজীবন কৃতজ্ঞ থাকবো। আমার মতো দরিদ্র পরিবারের ছেলেদের ওই বয়সে পরিবারকে সাহাজ্য করার জন্যে কাজ করতে হয় বাইরে। ফুটবল, স্কুল, কাজ সব একসাথে চালিয়ে যেতে পারেনা। এখানেই স্বপ্নেরা মারা যায়।

কিন্তু আমার মা, মা আমার উপর বিশ্বাস রেখেছিলেন। ঠিক কি কারন, তা জানিনা। বললেন যত যাই হোক খেলাটা চালিয়ে যেতে।

তো ১৩ বছর বয়সে আমি খেলা শুরু করলাম ভারজেয়ায়। একেবারে বড়দের সাথে।

সাও পাওলোকে যারা চেনেন, তারা জানেন আমি কি বলছি (তারা সম্ভবত হাসাহাসিও করছেন ভারজেয়ার কথা শুনে।) বিষয়টার ব্যাখ্যা আমি পরে দেবো।

ভারজেয়া অনেকটা আমেরিকার স্ট্রিট বাস্কেটবলের মতো অথবা ইওরোপের সেমি প্রফেশনাল লীগগুলোর মতো। মাঠে ময়লা, খেলতে হয় শরীর দিয়ে। মাঠে আরও অনেক খারাপ খারাপ ব্যাপার হয়।

এখানে একদিনের ঘটনা আমি কখনোই ভুলবোনা।

বেশ বড় একটা দলের বিপক্ষে আমাদের খেলা। ভারজেয়ার সবসময়ের খুব ভালো দলের একটা। কিন্তু দলটা বেশ কয়েকবছর কিছু বিশ্রী কারণে লিগে আসতে পারেনি। কারনগুলো এখন বলতে চাচ্ছিনা।

তো ওরা নির্বাসন ভেঙে এসেছে। বড় একটা টুর্নামেন্টে কোয়ালিফাই করার জন্যে আমাদের সাথে খেলছে। মনে আছে ওই দলের সমস্ত খেলোয়াড় আমার দিকে খুব বিশ্রী ভাবে তাকিয়েছিলো খেলার আগেই। সবার মনে মনে ভাব, ‘এই লিটল-অ্যাস বাচ্চাটা কে? ও খেলবে, আসলেই? সিরিয়াসলি?’

সিরিয়াসই ছিলো খেলাটা।

খেলা শুরুর চার মিনিটের মাথায় আমি ওদের সেরা ডিফেন্ডারকে ড্রিবল করে গোল করে ফেললাম। সব কয়টা খেলোয়াড় এমন ভাবে তাকালো যেন বিড়বিড় করে বলছে, ‘ঠিক আছে বাচ্চা। তোকে এবার দেখাচ্ছি।’

এরপর আমার পায়ে বল আসামাত্রই মার। মোটামুটি পাগল হয়ে গেলো সব—মনে হচ্ছিল ওরা খেলছিলোই আমাকে মারার জণ্যে। ওদের ছোটখাটো একটা মিড ফিল্ডার ছিলো, বুলি হিসেবে খুব বিখ্যাত। সে বারবার বলছিলো, ‘আবার ড্রিবল করবি তো মাইরা পা গুড়া করে ফেলবো।’

থ্রেটে কি হলো? আবার ওর সামনে বল পাওয়া মাত্র ড্রিবল… এনবিএ র মতো। ব্যাটা ড্রিবলের নাঁচুনিতে একেবারে বেঁকে গিয়ে ধপাস। গোড়ালি নিজেই ভাঙলো।

এইবার…এইবার ওদের চোখের দৃষ্টি বদলে গেলো। মনে হচ্ছিলো একেবারে কাঁচা খেয়ে ফেলবে।

কি আর করা! পায়ে বল এলে আমি আসলে অন্য এক পৃথিবীতে চলে যাই। এই পৃথিবীতে খাবারের চিন্তা নেই, দিনের পর দিন শক্ত জমিতে হাসফাঁস করা থুবড়ে পড়া নেই, মাথার উপর নেই গনগনে সোনালি সূর্য। অন্য এক স্বপ্নের পৃথিবী। এর পর আবার যখন বল পেলাম, আমাদেরই একজনকে দিলাম নো-লুক ডামি পাস। গোল।

লোকজন একেবারে পাগলা হয়ে গেলো।

খেলা শেষে স্কোরলাইন ২-২। পেনাল্টি শ্যুট আউটে আমরা জিতলাম। ও দলের সবার মাথা হয়ে গেলো ‘আউলা’। সেই বুলি আমার কাছে এসে হিসহিস করে বললো, ‘কইছিলাম ঠ্যাঙ ভাঙ্গুম। আয় পার্কিং লটে। দেখতাছি তোরে।’

খুব সিরিয়াস সে। অবস্থা দেখলা বেশ নাজুক। খালি মনে হচ্ছিলো, এখান থেকে বেঁচে ফিরবো কিভাবে! কপাল ভালো আমার, দলের সবাই মিলে বাঁচিয়েছিলো সেদিন। সবাই আমাকে মাঝখানে রেখে ,সত্যি সত্যি চারপাশে গোল হয়ে আমাকে নিয়ে বের হয়েছিলো পার্কিং লট থেকে।

ঘটনা এখানেই শেষ না। গত ক্রিসমাসে বাড়ি গিয়েছিলাম সবার সাথে দেখা করার জন্যে। ব্যাংকে যেতে হলো কিছু কাগজপত্র ঠিক করার জন্যে।পার্কিং লটে গাড়ি রাখতে গেছি, একটা লোক ছোট্ট একটা বুথে টিকিট নিচ্ছে…

লোকটাকে খুব চেনা চেনা লাগছে।

ওদিকের চোখ দেখেও মনে হচ্ছে উনি আমাকে চেনেন।

হাতে টিকিট পেলাম।

হাতে টিকিট দেয়ার পরেও মানুষটা তাকিয়ে আছে।

হঠাৎ করে বলে উঠলো, ‘হেই…লিটল কিড! লিটল কিড!’

‘আমাকে মনে আছে? ঐ যে ভারজেয়া, ব্রো! তোমার পা ভাঙতে চেয়েছিলাম!’

মনে মনে বললাম, খাইছে! এখন আবার কি করবে!

এরপর মানুষটা বললো, ‘ম্যান, সত্যি সত্যি তোমার পা ঐদিন আমি ভাঙতে চেয়েছিলাম। বিশ্বাস হয়?’

আমি এমন এক ভাব করলাম যে, ‘আরে নাহ! তাই কি হয় নাকি!’

‘সত্যিরে ভাই। পাইলে একেবারে ভেঙ্গে গুড়ো করে দিতাম। আর তুমি মিয়া এখন আমার প্রিয় দলে খেলতেছো, ম্যান! লাভ ইউ ব্রো! আমার বিশ্বাস হইতেছেনা। ভাবতে পারো, যদি সত্যি তোমার পা ভাইঙ্গা দিতাম?’

মানুষটার সাথে এরপর সেলফিও তুললাম।

আমার জীবনে যা হয়েছে সেই ঘটনাটা ব্যাখ্যার জন্যে আমাদের ব্রাজিলে চমৎকার একটা কথা আছে। আমার জীবন জল থেকে হয়েছে ওয়াইন। পাঁচ বছর আগে খেলতাম ভারজেয়ায়, বেঁচে থাকার জন্যে লড়ছি। মনে প্রাণে চাইছি বড় একটা ক্লাবে যেতে। অনেক বড় বড় খেলোয়াড়দের সাথে খেলেছি, ওদের কেউ এখন বাস চালায়, কাজ করে সুপারমার্কেটে কিংবা কনস্ট্রাকশনের কাজ করছে। এমন না যে ওরা প্রতিভাবান খেলোয়াড় ছিলেন না কিংবা খুব পরিশ্রম করেনি। সাফল্যের পেছনে কপাল লাগে, সুযোগটাও চাই। কাউকে কাউকে বেঁচে থাকার জন্যে লড়তে হয়। স্বপ্নটাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে লড়াই তারা করতে পারেনা।

মা না থাকলে আমারও হতোনা। মা যদি আমাকে আপাদমস্তক পুরোটা না দিয়ে সাহায্য না করতো, আমিও ওদের দলেই থাকতো।

১৫ বছর বয়সে পালমেইরাসে খেলার সুযোগ পেলাম। ওখান থেকেই সব শুরু হলো। ব্যাখ্যা করতে পারবো না আসলে। অনেকটা ভবিতব্যের মতো। ঈশ্বর সবকিছু একেবারে মনে হয় লিখে রেখেছিলেন। পালমেইরাসের ইয়ুথ টিমের সাথে টিকে গিয়েছিলাম, প্রথম কন্ট্যাক্ট সাইন করলাম। সাইন করার পর সব হল রকেট শীপের মতো। ফার্স্ট টিমে ঢুকে গেলাম। ওখানে সত্যিই ভালো খেলেছিলাম। এরপর ডাক পেলাম রিওর অলিম্পিক টীমে। সালটা ২০১৬।

ডাক পাবার পরের অনুভূতিটা আসলে বোঝাতে পারবো না।

ঐ মুহুর্তটা বোঝার জন্যে…দু বছর আগে ফেরত যেতে হবে। মাত্র দু বছর আগে আমি পেরির ফুটপাথে। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপের সময় ফুটপাথ হলুদ সবুজ রঙ করছি। আমাদের যারা ভালো আঁকতে পারে তারা দেয়ালে বড় বড় ম্যুরাল আঁকতেন- ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড়দের মুখ-ডেভিড লুইজ, নেইমার…

এর দুই বছর পর অলিম্পিকে আমি সেই নেইমারের সাথে মাঠে। জাতীয় দলের হলুদ জার্সিটা যখন গায়ে চাপিয়েছি-মনে হয়েছে আমি আমার স্বপ্ন ছুঁয়েছি। জিতেছি আমার স্বপ্নটাকে।

২০১৬ সালের ঐ টুর্নামেন্ট ব্রাজিলিয়ানদের জন্যে আলাদা, বিশেষ বলতে পারেন। অলিম্পিকের স্বর্ণটাই আমাদের ছোঁয়া বাকী ছিলো এছাড়া আর সব আছে আমাদের। টুর্নামেন্টটাকে খুব ভারী লাগছিলো—রিওতে হচ্ছে টুর্নামেন্ট…কারন শুধু এটাই না, বিশ্বকাপের ঘটনাটাও আমাদের তাড়া করে ফিরছিলো। প্রথম দুটো ম্যাচ খারাপ খেলার পর সমালোচনা একেবারে জেঁকে ধরলো। পরিবেশ আক্ষরিক অর্থেই ভারী তখন। গোটা চাপটা তখন নেইমারের উপর। ঐ চাপ সামলে নেইমার আমাদের দলটা যেভাবে সামলে চালিয়ে নিলো, তাঁর জন্যে আমার অসীম শ্রদ্ধা।

টুর্নামেন্টের আগে আমি ছিলাম নেইমারের ফ্যান, স্রেফ ফ্যান আর সবার মতো। অসাধারন একজন ফুটবলার নেইমার, এই সত্যটা সবাই জানে। কিন্তু ওই সময়ে নেইমারকে জানা…চেনা…সত্যিকার অর্থেই বিশেষ কিছু। চেনা গেলো নেইমার মানুষ হিসেবে কেমন। সবার সাথে ওর যে ব্যাবহার খুব অবাক হয়েছি, জানেন! ফুটবলার হিসেবে আমার জীবনটা খুব ছোট হলেও অনেক মানুষকে দেখেছি, যারা হয়তো খেলোয়াড় হিসেবেও অসাধারন নন, কিছুই জেতেননি। কিন্তু ‘মাসকারাডো’। মাসকারাডো মানে হচ্ছে মুখোশ পড়া মানুষ। লোকের সামনে একরকম আর ড্রেসিং রুমে অন্যরকম। কিন্তু নেইমার…সবাইকে নিজের ভাই এর মতো দেখতো মানুষটা। এই দৃষ্টিভঙ্গীটাই সম্ভবত নেইমারকে দলের সব খেলোয়াড়কে এক ছাতার নীচে এনে সব চাপ অগ্রাহ্য করার শক্তি যুগিয়েছে। আমরা সত্যিই একটা দল হয়েছিলাম। মাঠে এগারোটা ভাই খেলছে তো বেঞ্চে বসে আছে আরো এগারো জন।

সোনার পদকটা যখন পেয়েই গেলাম, সেই মুহুর্তটা কিভাবে প্রকাশ করি! অসাধারন এক মুহুর্ত আমাদের জন্যে। টুর্নামেন্টের আগে নেইমার একটা ট্যাটু করিয়েছিলো, ওর ট্যাটু দেখে আমিও করার একটা উছিলা পেয়ে গেলাম। অবশ্য উছিলা বলাটা ঠিক হবেনা। কারন নেইমারের ওই ট্যাটুতে অনেক অনেক অব্যক্ত কথা ছিলো। ছোট্ট একটা বাচ্চা পাহাড়ের নীচে দা৬ড়ানো। চোখ উপরের ফ্যাভেলার দিকে, বগলের নীচে একটা বল। স্বপ্ন দেখছে। স্বপ্ন।

ট্যাটুটা শুধু আমার কথা না, নেইমারের কথা না, হাজার হাজার ব্রাজিলিয়ানদের কথা বলে। আমরা যে সোনা জিতলাম, ঐ কথাটাও কি সুন্দর করেই না ট্যাটুটাতে লুকিয়ে ছিলো।

২০১৮ বিশ্বকাপের এই দলটায় থাকার জন্যে আমি আমার পক্ষে সম্ভব সবকিছু করতে চাই। কিন্তু ব্রাজিল তো ব্রাজিলই। কঠিন প্রতিযোগীতা…কোনকিছুই নিশ্চিত না এখানে। এজন্যেই আমি ম্যানচেষ্টার সিটিতে খেলতে এসেছি। খেলোয়াড় হিসেবে আমাকে আরো বড় হতে হবে। দিন দিন বড় হতে হবে।

ব্রাজিল আর ইংল্যান্ড অনেক অনেক আলাদা দুটি দেশ। এখানে সূর্যের দেখা খুব একটা পাওয়া যায়না। আরো বেশ কয়েকটা ক্লাবে যাবার, আরেকটু উষ্ণ দেশে যাবার সুযোগ আমার ছিলো। কিন্তু এসেছি এই সিটিতেই, পেপ গার্দিওলার কোচিং এ খেলা যাবে যে।

এই প্রথম আমি এমন একটা দেশে এসেছি যেখানকার ভাষা আমি জানিনা আর ঠান্ডাটাও মারাত্মক। নিজেকে বোঝানো, নিজের কথা বোঝানো একটা চ্যালেঞ্জ, একাকীত্বটাও কম না। পেপ যখন কল করে বললেন, সিটির ভবিষ্যতের জন্যে আমি খুব গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রাখতে পারি…তখন আর এসব আধ্যাত্মিক কথা ভাবিনি। টুক করে সাইন করে ফেলেছি।

কলটা আমার জন্যে খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। কল পেয়ে বুঝলাম ভদ্রলোক আমার ভবিষ্যত নিয়ে ভাবেন। অনেক কথা হয়েছিলো আমাদের মাঝে। অনেক কথা হলে আসলে বোঝা যায় মানুষের কোন কথাটা নকল আর কোনটা আসল। গার্দিওলার চাওয়াটা নিখাঁদ, কোন ফাঁকা বুলি ওতে ছিলোনা…আর ফুটবলে এর কত দাম তাতো বোঝেনই।

সিটিতে যাওয়ার আগে অবশ্য একটা কাজ করেছি। কাজটা অবশ্যই করতে হতো। জীবনের একটা অধ্যায় বন্ধ করাটা জরুরী ছিলো।

আমার সেই অধ্যায়টা হচ্ছে পেকুইনিনোস । সিটিতে যাওয়ার আগে ওখানে আমাকে যেতেই হতো। প্রথমবার গিয়েছিলাম দুই বন্ধু। বনের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত নয় বছরের দুই বাচ্চা ছেলে। বগলের নীচে একজোড়া করে বুট। এবারে গিয়েছিলাম আড়াইশো জোড়া বুট নিয়ে। আনন্দ ভাগ করে নিতে। বাচ্চাদের জন্যে।

এখন পেকুইনিনোসের সাথে যদি বড় কোন ক্লাব খেলতে আসে…সাবধান…খুব সাবধান। একেবারে ছিবড়ে বানিয়ে ছেড়ে দেবে ওখানকার বাচ্চারা।

ম্যানচেষ্টার সিটিতে যখন খেলতে এলাম, মনে হচ্ছিলো জীবন থেকে কি সব খোয়ালাম নাকি! মা ব্রাজিল ইংল্যান্ড মাকুর মতো আসা যাওয়া করছেন। মায়ের কাছ থেকে আলাদা থাকা আমার জণ্যে খুবই কঠিন। আমার জীবনের সবকিছু ঐ মানুষটা। মা শুধু আমার মা নন, আমার বাবাও।

পেকুইনিনোস এ যখন খেলতাম, ম্যাচের পর দেখতাম বাচ্চাদের বাবারা এসেছেন। আমি একা। হঠাত করে মনে হতো আমার আশেপাশে কেউ নেই। খুব কঠিন একটা সময়। কষ্টে বুক ভেঙে যেতো। এখন কেউ বাবার কথা জিজ্ঞেস করলে একদম সোজাসাপ্টা বলে দিই, আমার মা ই আমার বাবা। আমি, আমার ভাইদের জন্যে মা করেননি এমন কিছু নেই। জীবনটাকে উৎসর্গ করেছেন।

মা হচ্ছেন আমার দেখা, চেনাজানা সুপারহিরো। হিরোইস সেন ক্যাপস!

এজন্যেই এখন যখনই গোল করি, মা যদি স্টেডিয়ামে নাও থাকেন, ফোন তুলে কল করি। কথা বলি মায়ের সাথে।

যখন ছোট ছিলাম, মা চিৎকার করে ডেকে ডেকে এপাড়া ওপাড়া খুঁজে বেড়াতেন। যখন ফোন এলো, করতেন কলের পর কল। আমি ফোন না তুললে কল যেতো বন্ধুদের কাছে। প্রত্যেকের কাছে।

‘অ্যালো মা!’

এখন এই যে ফোন তুলি, আমি আসলে আমার মাকে তখন মনে করি, মনে করি আমাদের সংগ্রাম কে। আমার কোচ মামেদে কে, অসংখ্য ব্রাজিলিয়ান কে, যাঁরা আজকের এই আমি হয়ে ওঠার পেছনে অবদান রেখেছেন।

আমি স্বাপ্নিক মানুষ। স্বপ্ন দেখতে পছন্দ করি। আমার দেখা খুব দুঃসাহসী স্বপ্নেও আমার বর্তমান অবস্থাটা আমি দেখিনি। আমি জানি এবারের বিশ্বকাপেও অনেক বাচ্চাকাচ্চা সেই আমার মতো করে ফুটপাথ রঙ করবে। হয়তো বড় কোন ক্লাবে ওদের কখনো খেলা হবেনা। হয়তো ওদের বলা হবে, ‘পারবি না ব্যাটা। বাড়ি যা!’

ওদেরকে আমি বলবো, যুদ্ধ করা ছেড়োনা।

ইতিহাদ টানেলের মধ্য দিয়ে আমি যখন হেঁটে এসেছি মাঠে তার ঠিক চারবছর আগে খেলতাম ভারজেয়া। লোকজন হিসিহিস করে বলেছে, পার্কিং লটে পা গুঁড়ো করে ফেলবো।

তোমাদের জীবন এখন হয়তো সেই মোর্তাদেল্লা স্যান্ডউইচ আর সোডায় আটকে আছে। শুধু স্বপ্নের পেছনে যদি দৌড়াতে পারো…বিশ্বাস করো, কি হবে কেউ বলতে পারেনা।

ওয়াটার ক্যান টার্ন টু ওয়াইন।

তো, যে বাচ্চারা আমার লেখা এখন পর্যন্ত পড়ছো, তোমাদের বলছি, ‘ঝিঙে বেচো পাঁচ সিকেতে, হাজার টাকায় সোনা, বন্ধু তোমার লাল টুকটুক স্বপ্ন বেচোনা।

আরেকটা কথা। আরেকটা কাজ করতে হবে। ওকে?

মাকে কল করবে। মা তোমাকে খুব মিস করে। খুব মিস করে।

– দ্য প্লেয়ার্স ট্রিবিউনে কলামটি লিখেছেন ব্রাজিল ও ম্যানচেস্টার সিটির স্ট্রাইকার গ্র্যাব্রিয়েল জেসাস।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।