টিউশনির টাকা জমিয়ে উদ্যোক্তা

গল্পটা চার তরুণের।

‘নিজের কিছু একটা করতে হবে’ – বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই সবসময় মন মগজে এই স্বপ্ন নিয়ে ‍ঘুরতেন তারা। উদ্যোক্তা হওয়ার প্রবল ইচ্ছা ছিল তাদের। নিজেদের লাভের চেয়েও মানুষের উপকারে আসাটাকেই প্রাধান্য দিতেন।

কিন্তু, কিভাবে কি করবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না। সময়টা সহজ ছিল না। তখনই ‘বাজেটঅর্ডার’-এর আইডিয়া মাথায় আসে মূল উদ্যোক্তা সৈয়দ নাজমুস সাদাতের।

স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘হঠাৎ একদিন খেয়াল করে দেখলাম যে বাংলাদেশে বর্তমানে ই-কমার্স ব্যবসার দারুণ প্রসার ঘটলেও এমন অনেক ব্যবসায়ী আছেন যারা প্রোডাক্ট নিয়ে বসে আছেন কিন্তু কাস্টমার পাচ্ছেন না। আবার ক্রেতাও ঘুরে ফিরে নির্দিষ্ট কিছু ই-কমার্স সাইটের দিকেই ঝুঁকছেন কারণ নতুন ব্যাবসায়ীরা মার্কেটিং এর অভাবে ক্রেতার কাছে নিজেদের পণ্য পৌঁছাতে পারছেন না। ফলে একই পণ্য যে অন্যান্য বিক্রেতা আরও অনেক কম দামে বিক্রি করছেন তা ক্রেতা জানতেও পারছেন না। তার উপর মধ্যস্বত্বভোগীরা তো আছেই। যে পেয়ারা বরিশালে ২-৩ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয় তা ঢাকায় এসে ৭০-৮০ টাকায় বিক্রি হয় শুধুমাত্র মধ্যস্বত্বভোগীদের জন্যই! আবার ধরুন আপনি ঢাকায় থাকেন আর আপনার হঠাৎ কুমিল্লার রসমালাই, টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়ির চমচম, সিলেটের ১ নং চা-পাতা, সুন্দরবনের খাঁটি মধু কিংবা রাজশাহীর খাঁটি আম দরকার। কিন্তু আপনি কাকে দিয়ে এগুলা আনাবেন বুঝতে পারছেন না। অথচ প্রতিদিন এসকল এলাকা থেকে অনেক অনেক মানুষ ঢাকায় আসেন। তাদের মধ্যে কারো সাথে যোগাযোগ করে যদি আপনি এগুলো আনাতে পারতেন তাহলে কেমন হতো?’

সৈয়দ নাজমুস সাদাত

যে ভাবনা সেই কাজ! এমন একটা মার্কেটপ্লেসের চিন্তা তখন তিনি করতে পেরেছিলেন, যেখানে অনলাইনে বসেই ক্রেতারা নানারকম পন্য যাচাই করে সঠিক দামে সঠিক পন্য বেচাকেনা করতে পারবেন। সাদাত বলেন, ‘এসব দেখেই হঠাৎ মাথায় চিন্তা আসে যে ক্রেতা এবং বিক্রেতার একটি মার্কেটপ্লেস দরকার যেখানে বিক্রেতা এবং ক্রেতা সরাসরি একে অন্যকে খুঁজে নিতে পারবে,ক্রেতার বাজেটের মধ্যেই কেনাবেচা হবে এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌড়াত্ব যেনো কমে আসে।’

প্রথমে সাদাত একাই ছিলেন। পরবর্তীতে এই উদ্যোগের সাথে যুক্ত হন তারই তিন বন্ধু সুলতান মাহমুদ, আসিফ জামিল ও জোহায়ের আবতাহি। সবাই শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। এর মধ্যে সাদাত পড়াশোনা করছেন ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রোমেন্টাল সায়েন্সে। সুলতানও একই বিভাগের ছাত্র। আর আসিফ গনিত বিভাগ ও জোহায়ের জিওগ্রাফি এন্ড  এনভায়রোমেন্টাল সায়েন্স বিভাগের শিক্ষার্থী।

জোহায়ের আবতাহি

চারজন এক হওয়ার পর উদ্যোগটিতে নতুন করে প্রাণের সঞ্চার হয়। পুরোদমে লেগে পড়েন তারা। সাদাত বলেন,  ‘ভয় ছিল যে এই আইডিয়া মানুষের পছন্দ হবে তো? এটা কি কাজ করবে বাংলাদেশে? পরে মনে সাহস জোগাড় করে একদিন আমার তিন বন্ধুর সাথে বিষয়টা শেয়ার করলাম। ওরা সমর্থন করলো। সেদিন সত্যি মনে অনেক আত্মবিশ্বাস খুঁজে পাই। সেদিন থেকে আমরা চার জনই কাজ করছি বাজেটঅর্ডার নিয়ে।’

কি ভাবছেন? বাকি পথটা আরামসে কাটিয়ে ফেলেছেন তারা? নাহ মোটেই না।  অনেক চ্যালেঞ্জ ছিল। বিশেষ করে পড়াশোনা চালিয়ে রীতিমত মহাযজ্ঞ একটা উদ্যোগের জন্য কাজ করাটা অনেক কঠিন ছিল। এছাড়া আর্থিক দিক তো আছেই। টিউশনি আর টুকটাক ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজ করে আস্তে আস্তে অর্থ জমাতে থাকেন চারজন।

সুলতান মাহমুদ

সাদাত  বলেন, ‘সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জিং ছিলো টাকা এবং সময় ম্যানেজ করা। আমরা সবাই এখন থার্ড ইয়ারে পরি। তাই পড়ালেখা, ভার্সিটি, পার্সোনাল লাইফের সময় ম্যানেজ করে এর পেছনে সময় দেওয়া সত্যি খুব চ্যালেঞ্জিং একটা কাজ। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত আমরা ক্লাস করি। ক্লাস শেষে টিউশনি আর অন্যান্য কাজ শেষ করতে করতে রাত ১০টার মতো বেজে যায়। রাত ১০-১১টা থেকে শুরু হয় আমাদের বাজেট অর্ডার নিয়ে কাজ করা। আর তা চলে রাত ২-৩ টা কখনওবা ভোর হয়ে যায়। সকালে আবার ক্লাসের জন্য দৌড়। আর আমরা স্টুডেন্ট হওয়ায় আমাদের ফান্ডিংয়ের অনেক অভাব। আমরা যার যার টিউশনি কিংবা ফ্রিল্যান্সিং এর টাকা জমিয়ে তা বাজেটঅর্ডারের পেছনে খরচ করি। মাঝে মাঝে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছি। কিন্তু তবু হাল ছাড়িনি আমরা। যেভাবেই হোক ম্যানেজ করে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। আশা রাখি ভালো কিছু করতে পারবো ভবিষ্যতে ইনশাআল্লাহ।’

সাদাতরা স্বপ্ন দেখেন আরো অনেক দূরে যাওয়ার। এই প্ল্যাটফরমটি নিয়ে তাদের স্বপ্ন আকাশ ছোঁয়ার। সাদাত বলেন, ‘আমাদের এই প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশে যে দিন দিন পণ্যের দাম দিন দিন যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে তা কমিয়ে আনতে দারুণভাবে সহায়তা করবে। কারণ আমরা যদি প্রোডাকশন লেভেলে একটু খোঁজ নেই তাহলে দেখবো যে পণ্যের দাম কিন্তু খুব একটা বাড়েনি। এখনও একটি পোলো টিশার্ট ৮০-১০০ টাকায় পাওয়া যায়। কিন্তু গ্রাহক পর্যায়ে পৌঁছাতে পৌঁছাতে তা ৩-১০ গুণ দামে বিক্রি হয়। এর কারণ শুধুমাত্র ক্রেতার সাথে বিক্রেতার সরাসরি কোন যোগাযোগের ব্যাবস্থা নেই বলে। মধ্যস্বত্বভোগীরা ঠিকই কম দামে কিনে বেশি দামে ক্রেতার কাছে বিক্রি করছে। ফলে ক্রেতা এক অর্থে ঠকছেন, বিক্রেতা নিজের ন্যায্য পাওনা পাচ্ছে না কিন্তু মাঝখান দিয়ে মধ্যস্বত্বভোগী ঠিকই নিজের লাভ পকেটে ভরে নিচ্ছে। আমাদের এই প্ল্যাটফর্মে ক্রেতা সরাসরি বিক্রেতাকে খুঁজে নিতে পারবে। যোগাযোগ করতে পারবে। বিক্রেতা যেই দামে বিক্রি করতে চাচ্ছে তাতে ক্রেতার না পোষালে সে অন্য কোন বিক্রেতাকে সিলেক্ট করতে পারবে নিজের বাজেট অনুযায়ী। ফলে বিক্রেতারা নিজেদের পণ্যের দাম যতোটুকু সম্ভব কম রাখার চেষ্টা করবেন ক্রেতা হারানোর ভয়ে। পাশাপাশি ক্রেতাকেও নিজের বাজেটের বাইরে যেয়ে পণ্য কিনতে হবে না।

আসিফ জামিল

এবার প্রশ্ন হল কিভাবে কাজ করে এই প্ল্যাটফরম? বাজেটঅর্ডার কাজ করে বিডিং পদ্ধতিতে। ধরা যাক, কেউ একটি টিশার্ট কিনবেন। বাজেট ৫০০ টাকা। বাজেটঅর্ডারে বাজেট কতো, আপনি কোথায় থাকেন, কতো দিনের মধ্যে লাগবে আর যদি আগে থেকে টিশার্টের কোন ডিজাইন থেকে থাকে সেই ডিজাইনসহ পোস্ট করা যাবে। তারপর বিক্রেতারা পোস্টে বিড করবে যে কে কত টাকায় সেই টিশার্ট দিতে পারবে। কেউ ৩৫০, কেউ ৪৫০, কেউ ৪০০ টাকায় বিড করলো। ক্রেতা তাদের সাথে যোগাযোগ করে যাকে পছন্দ হয় তাকে নির্বাচন করবেন। এরপর টিশার্ট হাতে বুঝে পাওয়ার পরে তাকে টাকা পরিশোধ করে দিবেন।

আর হ্যাঁ, এখানে ক্রেতা এবং বিক্রেতা দু’জনেরই রেটিং দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।ফলে পণ্যের মান ভালোভাবেই নিয়ন্ত্রন করবে বিক্রেতারা। আর পেমেন্ট ‘ক্যাশ অন ডেলিভারি’তে হওয়ায় ক্রেতার প্রতারিত হওয়ার সুযোগ নেই। এখানো উদ্যোক্তাদের লক্ষ্য হচ্ছে ক্রেতা এবং বিক্রেতাকে একই প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা। কোন বিক্রেতা যেন কোন পণ্য নিয়ে সিন্ডিকেট করতে না পারে এবং ক্রেতারা যেন মধ্যস্বত্ব ভোগীদের শিকার না হয়ে সরাসরি যিনি পণ্য তৈরি করছেন তার কাছ থেকে কম দামে পণ্য কিনতে পারে তা নিশ্চিত করা।’

ওয়েবসাইটটি করা হয়েছে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি।মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে প্রায় প্রায় দুই শতাধিক রেজিস্ট্রেশন হয়েছে। অর্ডার পোস্ট করা হয়েছে ২০-এর অধিক। আর এর পুরোটাই হয়েছে কোনোরকম বিপণন ছাড়া। ব্যবহারকারীরাও এখন পর্যন্ত সার্ভিসে মুগ্ধ। সাদাত বলেন, ‘প্রতিনিয়ত সারা বাংলাদেশ থেকেই আমাদের ওয়েবসাইটে অ্যকাউন্ট খোলা হচ্ছে। অর্ডার পোস্ট হচ্ছে। এখন মনে হচ্ছে আমরা বোধহয় ঠিক রাস্তায় হেঁটেছিলাম এবং মানুষের চাহিদা কোথায় তা ধরতে পেরেছিলাম সঠিকভাবে। মানুষের কাছ থেকে এত এত প্রশংসা পেয়ে আমরা সত্যি খুব আনন্দিত।’

ওয়েবসাইট লিংকঃ https://budgetorder.com

ফেসবুক পেজঃ https://www.facebook.com/budgetorder

ক্রেতা হিসেবে একাউন্ট খোলার লিংকঃ https://goo.gl/GtMWBM

বিক্রেতা হিসেবে একাউন্ট খোলার লিংকঃ https://goo.gl/n67Avp

সেলার/বিক্রেতা হিসেবে একাউন্ট খুলবেন যেভাবেঃ

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।