স্টেশনে রাত কাটানো ছেলেটি আজ সালমানকে নিয়ে ছবি বানায়

সেই সময়টা অন্যরকম। আজকের মত সোশ্যাল মিডিয়া, ইউটিউব, ওয়াটস্যাপ নেই। মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে তারকা বনে যাওয়া দুস্কর। এমন একটা সময়ে, দিন ক্ষণ বললে আশির দশকের শেষভাগে মুম্বাইয়ের ব্যান্দ্রা স্টেশনে এসে পৌঁছালো সদ্য কৈশোর পেরোনো এক যুবক।

ছেলেটির নাম রেমে ডি’সৌজা। এসেছে গুজরাটের জামনগর থেকে। মাত্রই এইচএসসি পরীক্ষা শেষ করেছে। বুঝে ফেলেছে, ওর দ্বারা আর পড়াশোনা হবে না। এখন সময় নিজের স্বপ্নের পেছনে ছোটার। যে কথা সেই কাজ, কোনো সাত-পাঁচ না ভেবেই চলে এসেছে মুম্বাই।

যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। ঠিকানা তাই ব্যান্দ্রা স্টেশন। সেখানেই কোনোক্রমে রাত কাটাতে হবে। যদিও ক’দিন বাদেই একটা ঠিকানা মিললো। উঠে পড়লো মিরা রোডে বন্ধুর এক ভাইযের বাড়িতে।

নাচকে যে পেশা হিসেবে নেওয়া যায়, ওই আমলে সেটা কেউ স্বপ্নেও ভাবতে পারতো না। কিন্তু, ভেবেছিল সেই ছেলেটি। নিজেরে একট নাচের ক্লাস খুলে ফেললেন। চারনি রোডে সেই ক্লাসের নাম রাখলেন ‘সুপার ব্র্যাটস’। দিন কয়েক বাদে একটু পসার হতে শুরু করলে বরিভালি ও আন্ধেরিতে আরো দু’টো শাখা খুললেন।

শাহরুখের সাথে ব্যাকগ্রাউন্ড ড্যান্সার রেমো

বেশ নাচের একটা দল দাঁড়িয়ে গেল। কি একটা প্রতিযোগীতায় যেন জিতে ফেললেন সবাই মিলে। তখনই রেমোর ওপর নজর পড়ে কোরিওগ্রাফার আহমেদ খান ও পরিচালক রাম গোপাল ভার্মার। সেটাই রেমোর জন্য বলিউড ইন্ডাস্ট্রির দরজা খুলে দেয়।

‘রঙ্গিলা’ সিনেমায় ব্যাকগ্রাউন্ড ড্যান্সার হিসেবে ছিলেন রেমো। অ্যাসিস্ট করেন আহমেদ খানকে। এভাবে এক বছরের মত চলে। এরপর নিজে আলাদা, একক ভাবে কিছু করতে চান রেমো। সুযোগ পান একটা মিউজিক ভিডিওতে। অনুবব সিনহার পরিচালনায় সনু নিগমের গাওয়া ‘দিওয়ানা’ গানের কোরিওগ্রাফার ছিলেন রেমো।

শিল্পা শেঠি ও রেমো ডি’সৌজা

বলিউডে তাঁর কোরিওগ্রাফ করা প্রথম গান হল কাঁটে সিনেমার ‘ইশক সামুন্দার’ গানটি। গানটা আকাশছোয়া জনপ্রিয়তা পায়। এরপর কাজ করেন ‘তুম বিন’ সিনেমায়। সেখানেও রেমোর কাজ প্রশংসা কুড়ায়।

এই দু’টো কাজের সাফল্যের পর রেমোকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। এরপর একে একে ধুম, লাকি, সাথিয়া, আকসার, লাভস্টোরি ২০৫০, কিডন্যাপ, ভুতনাথ, রক অন, বাজিরাও মাস্তানি, ইয়েহ জাওয়ানি হ্যায় দিওয়ানি, স্টুডেন্ট অব দ্য ইয়ার, অ্যানি বডি ক্যান ড্যান্স, অ্যানি বডি ক্যান ড্যান্স ২, ফালতু, বাজরাঙ্গি ভাইজান, টু স্টেটস, রোবট – ইত্যাদি সিনেমায় কাজ করেন রেমো। এমনকি বাজিরাও মাস্তানি ছবির ‘দিওয়ানি মাস্তানি’ গানের কোরিওগ্রাফি তাকে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পর্যন্ত এনে দেয়, যেকোন শিল্পীর যা থাকে আজন্ম স্বপ্ন।

মুম্বাইয়ে এসে স্টেশনে রাত কাটানো ছেলেটার জন্য এ যেন আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়া। যদিও, রেমো ডি ’সৌজা এখানে থেমে যাওয়ার পাত্র নন। তিনি এখন নেমেছেন পরিচালনায়। তিনি বিশ্বাস করেন, বলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে সাফল্য পেতে হল পরিশ্রম আর সততা থাকাটা জরুরী।

তার পরিচালিত প্রথম সিনেমা ফালতু বক্স অফিসে পায় আশাতীত সাফল্য। এরপর এবিসিডি ও এবিসিডি ২ ছাড়িয়ে যায় প্রত্যাশাকেও। এরপর রেমো করেন ‘আ ফ্লাইং জ্যাট’। টাইগার শ্রফ অভিনিত এই সিনেমাটির থেকে অবশ্য বক্স অফিস মুখ ফিরিয়ে নেয়।

এমন ব্যর্থতার পরও রেমো পেয়ে গেছেন তাঁর ক্যারিয়ারের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় অ্যাসাইনমেন্ট। যার নাম ‘রেস থ্রি’, কেন্দ্রীয় চরিত্রে আছেন স্বয়ং সালমান খান।  একটা সময় যার এই মুম্বাই শহরে মাথা গোজার ঠাঁই পর্যন্ত ছিল না, আজ তারই পরিচালনায় কাজ করছেন মুম্বাই সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম বড় নামগুলোর একটি। এটা তো রূপকথার গল্পকে হার মানিয়ে দেওয়া কোনো ফাটাফাটি বলিউড সিনেমার চিত্রনাট্য।

বক্স অফিস এই ‘রেস থ্রি’ কে আদৌ কতটা হাত ভরে দেবে, সেসব আগাম বলা যাচ্ছে না, তবে একটা ব্যাপার সত্যি যে নিয়তি রেমো ডি’সৌজার জীবনে সত্যি মিরাকল লিখে রেখেছে। কোনো গডফাদার কিংবা কারো ছায়ায় না থেকে এতটা পথ পারি দেওয়া কিন্তু, চাট্টি খানি কথা নয়!

– কইমই.কম অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।