যাকে ভিক্ষুক ভেবেছিল পথচারীরা, তাঁকেই এখন বিশ্ব চেনে!

ইরান বিশ্বকাপের প্রথম পর্বের বাঁধাও অতিক্রম করতে পারেনি। তারপরও দলটির ২৫ বছর বয়সী গোলরক্ষক আলীরেজা বেইরানবন্দকে মনে রাখবে রাশিয়া বিশ্বকাপ।

আরো নির্দিষ্ট করে বললে, এই গোলরক্ষককে কোনোদিনও সম্ভবত ভুলবেন না সময়ের অন্যতম সেরা ফুটবলার ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। এই আলীরেজাই তো পেনাল্টি আটকে দিয়ে গোলবঞ্চিত করেছেন স্বয়ং সি আর সেভেনকে।

আর এই ঘটনাই যেন এক মুহূর্তে পাল্টে দিল আলীরেজার পরিচয়। রোনালদোর শট ঠেকানোর সময় তাঁর মনেও কি নিজের পূর্ব জীবনের কথা একবারও মনে পড়েনি? হয়তো পড়েছে।

আলীরেজার জন্ম এক যাযাবর পরিবারে। শৈশব তাঁর কাটে ভেড়া চড়িয়ে। যদিও, ওই সময় থেকেই ফুটবলের প্রতি ভালবাসারও জন্ম হয়।  অবসরে তিনি ফুটবল খেলা শুরু করেন বন্ধুদের সাথে।

আলীরেজার বয়স যখন ১২ বছর তখন পরিবার সারবিয়াসে চলে আসে। তখন একটা স্থানীয় দলের হয়ে অনুশীলন শুরু করেন তিনি। তাঁর দারুণ সব সেভ দেখে দর্শক ও দলের সবাই মুগ্ধ হয়। তবে, বাঁধা ছিল একটাই – বাবা। বাবা মুর্তজা আলীরেজাও অন্যান্য ইরানী বাবার মত ভাবতেন ফুটবল খেলে কোনো ভবিষ্যৎ নেই।

আলীরেজা বলেন, ‘আমার বাবা ফুটবল পছন্দ করতেন না একদম। তিনি আমাকে সাধারণ কোনো কাজ খুঁজতে বলেন। এমনকি তিনি আমার খেলার জামা ও গ্লাভসও ছিড়ে ফেলতেন। অনেক সময় তাই খালি হাতেও খেলতে হত।’

বাবার এই মাত্রাতিরিক্ত শাসন বেশিদিন হজম করতে পারেননি আলীরেজা। তাই তো ঘর তো পালিয়ে নিজের স্বপ্নের পেছনে ছুটতে গিয়ে চলে আসেন তেহরানে। দাল পারানে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন তিনি। এটা হল পাথর ছোড়ার একটা খেলা। এই দক্ষতাটা ফুটবল জীবনেও বেশ কাজে আসে আলীরেজার।

সময়টা শক্ত ছিল। একবার একটা ফুটবল ক্লবের অফিস রুমের বাইরে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। পথচারীরা তাকে ভিক্ষুক ভেবে ভুল করেছিলেন। আলীরেজা স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি, আমার চারপাশে কিছু কয়েন পড়ে আছে। বুঝলাম পথচারীরা যাওয়ার সময় রেখে গেছে। তাঁরা ভেবেছিল আমি বুঝি ভিক্ষুক। যাই হোক, এর সুবাদেই আমি অনেকদিন বাদে ভাল একটা নাস্তা করতে পারি।’

খেলোয়াড়ী জীবন শুরু করাটাও সহজ ছিল না আলীরেজার জন্য। অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে তাকে। কখনো তিনি পেটের দায়ে পোশাক নির্মান কারখানায় কাজ করেছেন। কখনো গাড়ী ধোয়ার কাজ করেছেন, কখনো বা পিজ্জা বয়ের কাজও করেছেন।

তবে, কখনোই ফুটবলার হওয়া স্বপ্নকে ত্যাগ করেননি আলীরেজা। তিনি বিশ্বমানের একজন গোলরক্ষক হতে চাইতেন, তিনি আদর্শ মানতেন রাশিয়ান কিংবদন্তি লেভ ইয়াশিনকে। তারই ফল পাচ্ছেন এখন।

রোনালদোর পেনাল্টি আটকে দেওয়ার ঘটন রোজ রোজ ঘটেনা। আলীরেজা তাই এখন বিশ্বকাপেরই বড় বিস্ময়। রোনালদোর বিপক্ষে সাফল্যের রহস্যটা কি? আলীরেজা রহস্য ভাঙলেন, বরং তাঁর কাছেও পুরো ব্যাপারটা স্বপ্নের মত মনে হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘আমি যখন পেনাল্টিটা সেভ করলাম, আমি কিছুই যেন বুঝতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল, আমি বুঝি স্বপ্ন দেখছি, এখনো এসে কেউ আমার ঘুম ভাঙাবে। এমন একটা সময় শিঘ্রই আসবে, যখন আমাকে ও আমার দলের ভাল পারফরম্যান্সকে কেউ আর বিস্ময় হিসেবে দেখবে না। মানুষই জানে আমরা আরো ভাল কিছুর প্রত্যাশা করি।’

এবার সেই প্রত্যাশা পূরণের পালা! ইরানের বিখ্যাত ক্লাব পারসেপোলিসে খেলেন আলীরেজা। কে জানে, আসছে মৌসুমেই হয়তো বড় কোনো ইউরোপিয়ান ক্লাব ছিনিয়ে নেবে তাঁকে।

– টাইমস অব ইন্ডিয়া ও দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।