রিয়াল মাদ্রিদ ফ্লপ থেকে বিশ্বকাপের রুশ বীর

ডেনিশ চেরিশভকে খুব ধৈর্য ধরে নিজের সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে। বিশ্বকাপের আগেও এই উইঙ্গার রুশ দলের নিয়মিত কোনো মুখ ছিলেন না। বিশ্বকাপের মূল পরিকল্পনাতেও তিনি ছিলেন না।

কিন্তু দৃশ্যপট পাল্টে গেল বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার মিনিট বিশেকের মধ্যেই। অ্যালান ডিজাগোয়েভের ইনজুরিতে সৌদি আরবের বিপক্ষেই মাঠে নেমে গেলেন, আর নেমেই জোড়া গোল। দু’টো গোল দিয়েই নিজের জাতটা বুঝিয়ে দিয়েছেন তিনি। পরের ম্যাচে মিশরের বিপক্ষেও করেছেন গোল। দুই ম্যাচেরই তিনি সেরা খেলোয়াড়। তিনিই এখন রুশদের জাতীয় বীর।

জাতীয় দলের হয়ে চেরিশভের অভিষেক ২০১২ সালে। যদিও, ২০১৫ ও ২০১৬ এই দু’বছর জাতীয় দলের হয়ে খেলা হয়নি তাঁর। ২০১৪ সালে ফ্যাবিও ক্যাপেলো তাঁকে বিশ্বকাপের দলেই রাখেননি। ইনজুরির কারণে খেলতে পারেননি ২০১৬ সালের ইউরোও। গেল মার্চে ফ্রান্সের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচের দলে ডাক পাওয়ার আগে তাঁর অভিজ্ঞতা বলতে ছিল মোটে নয়টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ।

২৭ বছর বয়সী চেরিশভের তাই এখন স্বপ্নের মত দিন কাটছে। মস্কোতে বসে তিনি বলেন, ‘এমন কিছু কখনো হবে, স্বপ্নেও ভাবিনি। জাতীয় দলের হয়ে এখানে আসতে পেরেই আমি খুশি ছিলাম।’

চেরিশভের যে গতি আর দক্ষতা আছে, তাতে কেন এতদিন রাশিয়া তাঁকে ব্যবহার করেনি সেটা নিয়ে রীতিমত গবেষণা হওয়া দরকার। হ্যা, এটার বড় একটা কারণ হল চেরিশভের ইনজুরি। আরেকটা ব্যাপার হল গেল বেশ কয়েকটা মৌসুম ধরে তিনি শুধু এক ক্লাব থেকে আরেক ক্লাবে যাওয়া-আসার মধ্যে আছেন, কোথাও থিঁতু হতে পারছেন না।

চেরিশভের জন্ম রাশিয়াতেই। কিন্ত, তাঁর বেড়ে ওঠা স্পেনে। বাবা দিমিত্রি চেরিশভ পাঁচ বছর খেলেছেন স্পেনের দল স্পোর্টিং গিজনে, রাশিয়ার হয়েও খেলেছেন ১০ টি ম্যাচ। আর সেই স্পেনেই প্রথম নবাগত তারকা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন চেরিশভ।

কিশোর বয়সে ডেনিশ খেলেছেন ক্যাসল ও লিও আঞ্চলিক দলগুলোর হয়ে। বাবার সাথে তিনি তখন বারগসে চলে এসেছিলেন। বয়স যখন নয় বছর তখনই স্প্যানিশ স্কাউটরা তাঁর দক্ষতার ব্যাপারে বুঝে ফেলেছিল। ফলে, মাত্র ১১ বছর বয়সে তিনি পাড়ি জমান রিয়াল মাদ্রিদে!

রিয়াল মাদ্রিদে অবশ্য মনে রাখার মত কোনো পারফরম্যান্স নেই চেরিশভের। ২০১৫ সালে রিয়ালের প্রথম দলে তাঁর অভিষেক। ১৯ সেপ্টেম্বরের সেই ম্যাচে বদলী হিসেবে নেমে ১৩ মিনিট খেলেন চেরিশভ। রিয়াল মাদ্রিদ গ্রেনাডার বিপক্ষে স্যান্টিয়াগো বার্নাব্যু স্টেডিয়ামে হারে ০-১ গোলে।

তবে, চেরিশভ রিয়ালে বিখ্যাত কোপা দেল রে’র এক ম্যাচের কারণে। সে বছর দুই ডিসেম্বর কাদিজকে ৩-১ গোলে হারিয়েছিল রিয়াল। ম্যাচে ৪৫ মিনিট খেলা চেরিশভ গোলও করেন।  কিন্তু, গোল বাঁধে অন্য জায়গায়। আগের মৌসুমেই তিনটা হলুদ কার্ড পাওয়ায় তিনি নিষিদ্ধ হয়েছিলেন। নিষিদ্ধ খেলোয়াড়কে খেলানোয় অংশগ্রহণই বাতিল হয়ে যায় রিয়ালের। ডেনিশের দোষ ছিল না, তবুও তিনি গণমাধ্যম আর সমর্থকদের চক্ষুশূলে পরিণত হন।

সেই মৌসুমে রিয়ালের হয়ে সব মিলিয়ে ছয়টি ম্যাচ খেলেন ডেনিশ। ওটাই শেষ। রিয়াল মাদ্রিদ তাঁকে ছেড়ে দেয়। রিয়ালে থাকতেই লোনে তিনি সেভিয়া, ভ্যালেন্সিয়া ও ভিলারিয়ালে খেলেছেন। এবার ২০১৬ সালে পাকাপাকি ভাবে ভিলারিয়ালের সাথে ২০২১ সাল অবধি চুক্তি করে ফেললেন। সাত মিলিয়ন ইউরোতে এস্তাদিও দে লা ক্যারামিকাতে এসে ভাল খেললেও তিনি ছিলেন ইনজুরি জর্জর।

গেল দুই মৌসুমে ক্লাবের হয়ে মোটে দু’টো গোল করা লোকটাই এখন আছেন বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে। বাবা দিমিত্রি চেরিশভ বলেন, ‘আমার ছেলেটা এখন খুবই খুশি। ও এখন ফুটবলের আনন্দদায়ক দিকটা দেখছে। ও তো জীবনে কম উত্থান পতন দেখেনি। এখনকার সময়টা ওর জন্য উপভোগের, পরিশ্রম করার আর নিজের যোগ্যতার ওপর ভরস রাখার।

স্বাগতিক রাশিয়া নক আউট পর্বে নাম লিখিয়ে ফেলেছে। সর্বশেষ গ্রুপ ম্যাচে উরুগুয়ের বিপক্ষে ৩-০ গোলে হার, সাথে খোদ ডেনিশ চেরিশভের আত্মঘাতি গোল – একটু আত্মবিশ্বাসে ঘাটতি আসবে এই বিশ্বকাপের মঞ্চে তিন গোল করে ফেলা এই তারকার? – জীবনে যে হতাশার মধ্য দিয়ে গেছেন সেসবের তুলনায় এ তো কিছুই না। শেষ ১৬ তো পর্তুগালের বিপক্ষে ম্যাচ – তাতে কি আর এমন ভয়!

ডেনিশের টুইটার অ্যাকাউন্টে একটা ছবি পিন করে রাখা। সেখানে রাশিয়াতে শৈশবের একটা ছবিতে হাতে টেডি নিয়ে আছেন ডেনিশ। ক্যাপশন দেওয়া, ‘যদি স্বপ্ন দেখো, তাহলে তুমি পারবে।’ যে কোনো সাফল্যের সূচনা হয় একটা স্বপ্ন থেকে। সেজন্যই তো বিতর্কিত ও ইনজুরি জর্জর রিয়াল মাদ্রিদের এক ফ্লপ তারকাই এখন বিশ্বকাপের অন্যতম বড় আবিস্কার। স্বপ্ন দেখা আর স্বপ্ন পূরণের এই ধারা অব্যাহত থাকুক!

– গোল.কম ও ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল অবলম্বনে

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।