বন্ধুত্ব জানে না কাঁটাতারের বাঁধন!

১৯৪৭ সালের আগস্ট মাস। প্রায় শত বছরের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনকালের অবশেষে সমাপ্তি ঘটেছে, দেশ বিভক্ত হয়ে ভারত এবং পাকিস্তান নামক দু’টি স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় হয়। দেশবিভাগের মানদণ্ডটাও অদ্ভুত, ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’-এর উৎকৃষ্টতম উদাহরণ! সেই সময়কাল থেকে চার বন্ধুর এক অসাধারণ গল্প যেন রীতিমত সিনেমার গল্পকেও হার মানায়!

‘আমাদের দেশটা ভেঙে গেছে, ভারতবর্ষের বিশাল এবং অক্ষত হৃদয়টি হয়েছে ক্ষতবিক্ষত।’ পাকিস্তানের লাহোরে বসে ১৯৪৯ সালের এক গ্রীষ্মে লিখেছিলেন এক তরুণ, উদ্দেশ্য ছিলো তাঁরই এক বন্ধু, যাকে তিনি হারিয়ে ফেলেছিলেন দেশভঙ্গের অদ্ভুত এক মানদন্ডে। অভিজাত ভঙ্গিতে ফিরোজা নীল রঙের কালিতে টানা টানা লেখায় সেই তরুণ যেন নিজের ক্ষতবিক্ষত হৃদয়টিকেই তুলে ধরেছিলেন মর্মান্তিকভাবে। সেই তরুণটির নাম ছিলো আসাফ খাজা; যাকে উদ্দেশ্য করে লেখাটি লিখেছিলেন, তাঁর নাম অমর কাপুর।

‘লাহোরে গত পঁচিশটি বছর ধরে আমরা ছিলাম বন্ধু, ছোটবেলার খেলার সাথী, স্কুল-কলেজের সহপাঠী, আমরা ছিলাম অবিচ্ছেদ্য। আমি পরিপূর্ণ আস্থার সঙ্গে নিশ্চিত করছি তোমাদের, এই দূরত্ব তোমাদের প্রতি ভালোবাসা, প্রীতি এবং স্নেহে বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলতে পারবে না। তোমাকে আমরা সবসময় মনে রাখবো, মনে রাখবো সেই ভ্রাতৃত্বপূর্ণ বন্ধন, যা গত পঁচিশটি বছরে আমাদের বন্ধুত্বকে মাহাত্ম্যপূর্ণ করে তুলেছিলো।’ পাকিস্তান টাইমসের তৎকালীন সাংবাদিক আসাফ লিখেছিলেন। তিনি আরও লিখেছিলেন, ‘আমরা দারুণ কিছু সময় কাটিয়েছি অমর, দুর্ধর্ষ কিছু মুহূর্ত!’

আসাফ খাজা ছিলেন পাকিস্তান টাইমসের সাংবাদিক

আসাফ, অমর ছাড়াও আরও ছিলেন আগা রেজা এবং রিশাদ হায়দার; তাঁরা ঠিক বন্ধু ছিলেন না যেন, ছিলেন সহোদরের মতোই! থাকতেন তিন মাইলের ভিতরেই, প্রায়শঃই চলে যেতেন একে অন্যের বাড়িতে, স্কুল থেকে ফেরার পথে রাস্তা থেকে খাবার কিনে একসাথে খেতেন, গাছের ডাল দিয়ে স্ট্যাম্প এবং এক টুকরো কাঠকে ব্যাট বানিয়ে সফট বল ক্রিকেট খেলতে নেমে যেতেন একসঙ্গে। নিষ্পাপ শৈশব থেকে শুরু করে দুরন্ত যৌবন, ছিলেন একে অন্যের অচ্ছেদ্য অংশ।

হঠাৎ এক কালবৈশাখী ঝড়ে এক পলকে এলোমেলো হয়ে গেলো সব। এতগুলো বছরের বন্ধুত্ব, এতদিনের ভালোবাসা, সব মিথ্যে হয়ে হয়ে গেলো ধর্মীয় প্রতিহিংসাময় এক দেশবিভক্তিতে। চারজনের মধ্যে অমরই ছিলেন একমাত্র হিন্দু, ফলে তাঁকে লাহোর ছাড়তেই হলো। অতি প্রিয় ‘পন্ডিতজী’ অমরের বিদায়টা ছিলো হৃদয়বিদারক, মনে হচ্ছিলো যেন পাঁজরটা ছিড়ে যাচ্ছে।

তিন সপ্তাহ বাদে গোটা পরিবারসহ অমর তল্পিতল্পা গুটিয়ে চললেন ভারতের উদ্দেশ্যে, সাথে চললো ৫৭ বছর ধরে চলমান বংশীয় ব্যবসাও। এতদিনের কলিজার টুকরা বন্ধুটি লাখ লাখ রিফিউজির মধ্যে মিশে যাচ্ছেন নিজের অস্তিত্বকে বিসর্জন দিয়ে, হৃদয়ের সে রক্তক্ষরণটা কীভাবে লুকাতেন আসাফরা?

স্ত্রীকে নিয়ে অমর কাপুরের দিল্লী ঘুরে গেছেন আগা রেজা

এই ঘটনাটি রাতারাতিই বদলে দিয়েছিলো সব। আসাফ হয়ে গেলেন পাকিস্তান টাইমসের সাংবাদিক, আগা এবং রিশাদও ঢুকে পড়লেন ব্যবসাতে। ‘তুমি যদি আগাকে দেখতে! ইয়া মোটা হয়েছে, মাথায় এত্ত বড় একটা টাক – আমি নিশ্চিত, এখন ওকে দেখলে তুমি চিনতেই পারবে না! উন্নতির লক্ষণ, কি বলো?’ লিখেছিলেন আসাফ।

আসাফের লেখাতেই পরিষ্কার, দুই বছরের এই বন্ধুবিরহ বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলতে পারেনি তাঁদের সম্পর্কে। সেই আগের মতোই অনুভূতি তাঁকে অমরের মনের খুব কাছাকাছিই রেখেছিলো। যেটা হয়ে গিয়েছে, সেটা ঠিক করা আর তাঁদের পক্ষে সম্ভব ছিলো না। আসাফ লিখলেন, ‘যেটা হয়ে গেছে, সেটা তো গেছেই। এখন আমরা যেটা করতে পারি, সেটা হলো মনপ্রাণ দিয়ে দ্বিধাবিভক্ত জনগণের মধ্যে আবার শান্তি আনয়নের জন্য চেষ্টা করা।’

তবে অমরের মনে শান্তি ছিলো না ঠিক। তাঁর বাবা কিছুতেই পৈতৃক ব্যবসা এবং বসতভিটা ছেড়ে বেরোতে রাজি ছিলেন না, বাসায় স্ত্রী-সন্তানকে কড়া নির্দেশ দিয়েছিলেন, কোনোক্রমেই যেন বাড়ির বাইরে পা না রাখে। পরে যখন সত্যিই বসতভিটা ছাড়তে হলো, সাথে করে নিয়েছিলেন .৩৮ ক্যালিবারের একটি রিভলভার। অমরের ভাষায়, সেটা ছিলো ‘পাগলামি, বদ্ধ পাগলামি’!

অমর কাপুরের দেয়ালে বন্ধুদের স্মৃতি

দেশ ছেড়ে দিল্লীতে আসার পর থেকে টানা তিন বছর বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় মালিকানাবিহীন এক বাসায় মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়েছিলেন তাঁরা। সেখানে বসেই লেখা এক ডায়েরিতে তিনি পরে লেখেন, ‘১৯৪৭ সালের ৩ জুন, যেদিন ভারত-পাকিস্তান ভাগ হয়ে গেলো, ভারতবর্ষ শেষ হয়ে গেছে ওইদিনই।’ তিনি আরও লেখেন, জিঘাংসার পরিমাণ ওই ঘোষণার পর তো কমেইনি, উল্টো বেড়ে গিয়েছিলো কয়েকগুণ, ‘ধর্ম হওয়া উচিত ছিলো মানুষের ব্যক্তিগত আচার-ব্যবহার এবং একান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার। অথচ সেটাকেই ব্যবহার করা হলো খুন-দাঙ্গা-রাহাজানিময় এক মৃত্যুৎসবে।’

দূরত্ব, অভিজ্ঞতা এবং সময়, তিনের মারপ্যাঁচে পড়ে একটা সময় চার বন্ধু আলাদা হয়ে যেতে হলো ঠিকই। তিন দশকের মধ্যেই তাঁদের কারও সাথে কারও আর তেমন যোগাযোগ রইলো না, এমনকি কারও কাছে কারও ঠিকানাও ছিলো না! একটা ছোট্ট ‘টুইস্ট’ তাঁদেরকে আবারও নিয়ে এসেছিলো কাছাকাছি, বেঁধেছিলো এক সূত্রে।

১৯৮০ সালে আগা রেজার এক চাচা দিল্লীতে গিয়েছিলেন একটি কনফারেন্সে, যাওয়ার আগে আগা তাঁকে বলেন অমরকে খুঁজে বের করার একটা চেষ্টা চালাতে। আগা বলে দিয়েছিলেন, অমরদের দিল্লীতে একটি প্রিন্টিং প্রেসের ব্যবসা রয়েছে যা তাঁদের কাপুর বংশের নামেই চলমান। দিল্লীতে পৌঁছেই তাঁর চাচা টেলিফোন ডিরেক্টরি খুঁজে খুঁজে অমর কাপুরদেরকে ফোন করতে শুরু করলেন।

দেশবিভাগের সময় নিয়মিত ডায়রি লিখতেন অমর কাপুর

সৌভাগ্যের বিষয়, চতুর্থ কলটি করতেই খোঁজ পেয়ে গেলেন অমরের। এরপর দেশে ফিরলেন অমরের ঠিকানাসহ, আবার একই সাথে মিললো চার বন্ধু। শুরু হলো তাঁদের পরিবার-পরিজন এবং নিজের কাজ সম্পর্কে জানা-অজানা অনেক কথার ফুলঝুড়ি, ফোনে কিংবা চিঠিতে তাঁদের যোগাযোগ হয়ে উঠলো নিয়মিত। ততদিনে রিশাদ হয়ে উঠেছিলেন পাকিস্তানের সফলতম ব্যাংকিং প্রোফেশনালদের একজন, আগা নিজের ব্যবসা দেখাশোনা করছিলেন, আসাফ পাকিস্তান টাইমসে চাকরিটার পাশাপাশি জাতীয় প্রেস ট্রাস্টের চেয়ারপারসন হয়ে গিয়েছিলেন। অন্যদিকে অমর ততদিনে মন দিয়েছেন নতুন প্রিন্টিং প্রেসের ব্যবসায়, ব্যবসাটা তো বড় করতে হবে!

ইতিমধ্যে আগা রেজার ছেলের বিয়ে ঠিক হলো, অমর তাই দাওয়াত গ্রহণ করে পাড়ি জমালেন লাহোরে। যেহেতু অমরের পারমিশন ছিলো কেবল লাহোর ভ্রমণের, অগত্যা অন্যদেরকেই করাচি থেকে আসতে হলো ইসলামাবাদে। এরপর এক দশকে অমর পাকিস্তানে গিয়েছেন আরও তিনদফা, রক্তের সম্পর্ক না থাকা সেই বন্ধুগুলোর পরিবারটাই আবারও হয়ে উঠলো অত্যন্ত আপনজন।

নিয়মিত দেখা না হলেও বন্ধুদের ভেতর চলতো চিঠি চালাচালি

ভালোবাসার তীব্রতাটা বোঝা যায় রিশাদের মেয়ে সাইমা হায়দারের কথাতেই, ‘তাঁরা যেন ছিলো একই মায়ের পেটের চার ভাই। দারুণ একটা ব্যাপার ছিলো, প্রত্যেকেই ব্যক্তিগতভাবে ছিলেন দারুণ ব্যক্তিত্ববান এবং সফল। কিন্তু নিজেদের মধ্যে যখন আড্ডায় বসতেন, একদম শিশুদের মতো আমুদে ব্যবহার করতেন। তাঁদের মধ্যকার বন্ধুত্বের তীব্রতাটা ছিলো স্বর্গীয়!”

আগাকে মাঝেমধ্যেই অমর বলতেন দিল্লীতে এসে একটু ঘুরে যেতে। অবশেষে ১৯৮৮ সালে আগা কথা দিলেন, তিনি ভারতে পরের বছরই আসবেন। কিন্তু সে ভাগ্য আর হয়নি আগার, ওই বছরেরই ডিসেম্বরে ৬৭ বছর বয়সে হৃৎযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেন আগা রেজা। এরপর ১৯৯৩ সালে সেই ৬৭ বছর বয়সেই রিশাদ হায়দারও মারা গেলেন।

একাকী, নিঃসঙ্গ আসাফ দুঃখবিদগ্ধ চিত্তে অমরকে লিখলেন, ‘আজন্ম যাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব ছিলো, তাঁদেরকে এভাবে হারানোটা অত্যন্ত দুঃখজনক। নিজের একটা অংশই যেন হারিয়ে ফেলেছি। আগা আর রিশাদ আমার জীবনে বিশাল এক শূণ্যতা তৈরি করে রেখে গেছে, যা পূরণ করা আর সম্ভব নয়। আমার নিজেরও শরীরের অবস্থা খুব ভালো নয়, কে জানে, হয়তো খুব দ্রুতই আমার বেহেশতবাসী বন্ধুদের সাথে হয়তো আমি নিজেও যোগ দিতে যাচ্ছি! আমার এখন শুধু একটাই ইচ্ছে, আমার মৃত্যু যেন ওদের মতো করেই হঠাৎ হয়, যন্ত্রণাহীন মৃত্যু!’

স্ত্রী মিনাকে ১৯৫৫ সালে বিয়ে করেন অমর কাপুর

আসাফ দুঃখ করে বলেন, ‘জীবনটাকেই ইদানিং অর্থহীন বলে মনে হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘যদি আমি আর তুমি আর দেখা করতে না-ই পারি, আমাদের ছেলেমেয়েদেরকে একসাথে হওয়ার সুযোগ করে দিও, যেন আমাদের মধ্যকার বন্ধুতাটা ওদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে।’

এর ঠিক এক মাস পর, ২৯ জুলাই সকালে ঘুম থেকে উঠে গোসল আর খাওয়াদাওয়া শেষে সকালের পত্রিকা হাতে নিতে না নিতেই হঠাৎ হৃৎযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন আসাফ খাজা।

দেশ বিভাগের মাসখানেক পরই লাহোর ছেড়ে দিল্লী আসেন অমর

সেই চার বন্ধুর মধ্যে এখন একমাত্র বেঁচে আছেন ৯৪ বছর বয়সী অমর কাপুর। ২০ বছরের পুরোনো ব্যবসা বিক্রি করে দিয়ে স্ত্রীকে নিয়ে ভারতের দিল্লীর অদূরেই ফরিদাবাদে দোতলা বাসায় জীবনযাপনে ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন। বয়সের ভারে কিছুটা দূর্বল হয়ে গেলেও এখনও বেশ শক্তসমর্থ তিনি, এখনও পেন্সিলে আঁকিবুকি, পেইন্টিং, ফটোগ্রাফ আর একরাশ স্মৃতি বুকে নিয়ে বেঁচে আছেন বেশ ভালোভাবেই। কিন্তু তিনি কি এখনও মনে করতে পারেন তাঁর বন্ধুদের? জিজ্ঞাসা করতেই ছলছল করে উঠলো দুই চোখ, ধরে আসা গলাতে বললেন, ‘আজও প্রতিটা দিন ওদেরকে মিস করি। আগে ওদের যতটা ভালোবাসতাম, হয়তো এখন তার চেয়েও বেশি ভালোবাসি। তাঁরা ছিলো আমার বন্ধু, আমার জীবনের একমাত্র সত্যিকারের বন্ধু!’

বিবিসি অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।