ক্রোয়াট রূপকথা শেষে ফরাসি বিপ্লবের জয়

প্রথমার্ধে পিছিয়ে থাকার পর ফুটবলের ইতিহাসে এর আগে কেবল একটি দলই জিততে পেরেছিল বিশ্বকাপের শিরোপা। ১৯৩০ সালে বিশ্বকাপের প্রথম আসরেই ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে শিরোপা জিতেছিল উরুগুয়ে। এবার সেই ইতিহাস গড়ার হাতছানি ছিল ক্রোয়েশিয়ার সামনে।

২-১ গোলে এগিয়ে থেকে দ্বিতীয়ার্ধ শুরু করা ফ্রান্স মিনিট সাতেকের জন্য যেন অতিমানবীয় হয়ে ওঠে। প্রথমে পোগবার গোল, এরপর বিশ্বকাপ ফাইনালের একমাত্র টিনেজার হিসেবে কিলিয়ান এমবাপের গোল, ব্যস ৪-১ গোলে এগিয়ে যায় দিদিয়ের দেশ্যমর দল।

 

সেখান থেকে ম্যাচে ফিরে জয় ছিনিয়ে আনতে অস্বাভাবিক কিছু করতে হত ক্রোয়েশিয়ার। সেটা আর হয়নি। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে একটা গোল পরিশোধ করেন মারিও মানজুকিচ। সেখানেই শেষ। এরপর আক্রমণের পর পাল্টা আক্রমণ চলতে থাকলেও তাতে কোনো লাভ হল না।

গোটা বিশ্বকাপের সবগুলো ম্যাচ জয়ী ক্রোয়াট বীররা হারলো স্রেফ একটা ম্যাচ। কপাল খারাপ যে, এই ম্যাচটাই ফাইনাল। সম্পূর্ণ ধারার বিপরীতে গিয়ে গোল পেয়ে নিজেদের ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের বিশ্বকাপ জিতে গেল ফ্রান্স। ফুটবল ইতিহাসের মাত্র তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে খেলোয়াড় ও কোচ – দুই ভূমিকাতেই বিশ্বকাপ জিতে ফেললেন দিদিয়ের দেশ্যম। ১৯৯৮ সালে তিনি ছিলেন অধিনায়ক, এবার কোচ। বাকি দু’জন হলেন ব্রাজিলের মারিও জাগালো ও জার্মানির ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার।

প্রথমার্ধ শেষে স্কোরলাইন দেখে বোঝার কোনো উপায় নেই যে, কোন দলটা বেশি ভাল খেলছে। ফ্রান্সের ২-১ গোলে এগিয়ে থাকলেও পুরোটা সময় আধিপত্ত ছিল আসলে তথাকথিত ‘আন্ডারডগ’ তকমা নিয়ে খেলতে নামা ক্রোয়েশিয়ার।

অন টার্গেটে সাতবার শট নিতে পেরেছে ক্রোয়াটরা। আক্রমণের পর আক্রমণ করে তাঁরা তটস্থ রেখেছিল ফ্রান্সের রক্ষণভাগকে। ফ্রান্সের জন্য সৌভাগ্য বয়ে এনেছিল জোড়া সেট পিস। দুটো গোলেরই কাণ্ডারি অ্যান্টনিও গ্রিজম্যান।

ম্যাচের ১৮ মিনিটে তার ফ্রি-কিকে ফরাসি কেউ মাথা ছোঁয়াতে না পারলেও, তাতে মারিও মানজুকিচের মাথা আলতো ছোয়া লাগে। আর সেটাই কাল হয় ক্রোয়াটদের জন্য। গোল পোস্টের অতন্দ্র প্রহরী ড্যানিজেল সুবাসিচ শত চেষ্টা করেও গোল ঠ্যাকাতে পারেনি। বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে এবারই প্রথমবারের মত আত্মঘাতী গোলের দেখা মিললো।

তবে, অ্যান্টনিও গ্রিজম্যান আদৌ ফাউলের শিকার ছিলেন কি না সে নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। সাবেক ইংলিশ কিংবদন্তি ফুটবলার অ্যালান শিয়ারার তো বলেই দিয়েছিলেন, ‘এমন বাজে সিদ্ধান্ত ফাইনালের ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে। এমন দু’টো গোল তাঁরা হজম করেছে যার কোনোটাই ফ্রি-কিক কিংবা পেনাল্টি হয় না।’

গোল হজমের পরও ক্রোয়েশিয়ার আক্রমণের ধার কমেনি। প্রথমবারের মত  ফাইনাল খেলতে নামা দলটিকে ম্যাচে ফেরান ইভান পেরিসিচ। এনগোলো কান্তে বলটা ক্লিয়ার করে দিতে ব্যর্থ হন। তারই সুযোগ নিয়ে প্রথম সুযোগেই দলকে সমতায় ফেরান পেরিসিচ। ফ্রান্সের পেনাল্টি থেকে গোল করার পেছনেও জড়িয়ে আছে পেরিসিচের নাম। ব্লেইজ মাতুইদিকে যে তিনিই ফাউল করেছিলেন। পেনাল্টি থেকে গোল করেন গ্রিজম্যান। প্রথমার্ধে প্রতিপক্ষের গোলপোস্ট বরাবর ফ্রান্সের এটাই একমাত্র শট।

২-১ গোলে এগিয়ে থেকে প্রথমার্ধ শেষ করে ফ্রান্স। বিশ্বকাপের ফাইনালের ইতিহাসে এর আগে মাত্র একবারই প্রথমার্ধেই তিন গোলের দেখা মিলেছে। সেটা ১৯৭৪ সালের ঘটনা। সেবার ২-১ গোলে এগিয়ে ছিল পশ্চিম জার্মানি। জার্মানরাই সেবার জিতেছিল। এবার যেমন জিতে গেল ফ্রান্স। ক্রোয়াট রূপকথার শেষে সেই ফরাসি বিপ্লবেরই জয় হল।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।