উত্তমের বিপরীতে কাজ করা একমাত্র বাংলাদেশি নায়িকা

১৯৭৬ সালের সিনেমা ‘বহ্নিশিখা’। নীহাররঞ্জন গুপ্তের গল্প অবলম্বনে নির্মিত সেই সিনেমায় উত্তম কুমারের সাথে আরো ছিলেন সুপ্রিয়া দেবী ও রঞ্জিত মল্লিক। সিনেমায় উত্তমের নায়িকা ছিলেন অলিভিয়া, বাংলাদেশের মেয়ে। সেবারই প্রথম ও শেষ বারের মত কোনো বাংলাদেশি নায়িকার বিপরীতে কাজ করেন মহানায়ক উত্তম কুমার।

অলিভিয়ার জন্ম ১৯৫৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি, বর্তমান পাকিস্তানের করাচিতে। পুরো নাম অলিভিয়া গোমেজ। ছোটবেলায় ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে লেখাপড়া করেন। সেই আমলে এটা ছিল বিরাট ব্যাপার। মাত্র ১৩ কি ১৪ বছর বয়সে মডেলিং শুরু করেন। হোটেল পূর্বাণীতে রিসিপশনিস্ট পদে চাকরি করেন কিছুদিন। চাকরিরত অবস্থায় কয়েকটি বিজ্ঞাপনে কাজ জুটে যায়।

১৯৭২ সালে চিত্রনির্মাতা এস এম শফি তার ‘ছন্দ হারিয়ে গেলো’ ছবিতে প্রথম কাজ করার সুযোগ করে দেন অলিভিয়াকে। যদিও এর আগে প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানের ‘লেট দেয়ার বি লাইট’ এবং বেবি ইসলামের ‘সংগীতা’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করার কথা ছিল তাঁর।

লেট দেয়ার বি লাইট-এ নায়িকা হিসেবে প্রথমে অলিভিয়াকেই পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু, কোনো এক অজানা কারণে অলিভিয়াকে বাদ দিয়ে ববিতাকে নেয়া হয়। যদিও, অলিভিয়া কালক্রমে ববিতার পথেই হেঁটেছেন। ববিতার পর দ্বিতীয় বাংলাদেশি অভিনেত্রী হিসেবে কাজ করেছেন কলকাতার চলচ্চিত্রে।

সিনেমায় অলিভিয়ার শুরুটাই ছিল নাটকীয়। জহির রায়হান তখন ‘লেট দেয়ার বি লাইট’ নির্মাণের কথা ভাবছেন। চিত্রামোদী মহলের ধারণা জহিরের এ ছবিতে তার শ্যালিকা ববিতাই নায়িকা হবেন। একদিন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে জহির তার পরের ছবির নায়িকা অলিভিয়ার সাথে গণমাধ্যমের পরিচয় করিয়ে দিলেন। এটা সত্তর সালের কথা।

একে তো জহির রায়হানের মত পরিচালক, তার আন্তর্জাতিক বাজারের উদ্দেশ্যে বহু ভাষায় নির্মিতব্য ছবির নায়িকা নির্বাচিত হওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। ফলে অলিভিয়া সম্পর্কে কৌতূহলী হয়ে ওঠেন বিনোদন সাংবাদিকরা।

ক’দিন বাদেই আবার ‘লেট দেয়ার বি লাইট’ থেকে বাদ পড়লেন অলিভিয়া। এলেন যথারীতি ববিতা। প্রথম ছবি থেকে এই ইন আর আউটের ব্যাপারটা ছিল সত্যই আলোচনা হবার মত বিষয়। এ সুবাদে তার পরিচিতির পরিধিটা বাড়লো। দর্শক তার বিষয়ে আগ্রহী হল। প্রথম ছবি নিয়ে এই কাণ্ড অলিভিয়ার জন্য শাপে বরই হয়েছিল।

ততদিনে চলচ্চিত্রাঙ্গনের কারো কারো সাথে আলাপ-পরিচয় হল। আর নিজের ছবি থেকে বাদ দেয়া নবাগত অলিভিয়ার জন্য ছিল জহিরের শুভেচ্ছা-‘আই উইশ হার এ ব্রাইট ফিউচার’। ‘লেট দেয়ার বি লাইট’ প্রসঙ্গে অলিভিয়ার স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, ‘ছবিটি সর্বাঙ্গ সুন্দর করার জন্য জহির সাহেব সংশ্লিষ্ট সবাইকে তার বাড়িতে ডেকে নিয়ে আলাপ করতেন। নানা নির্দেশ দিতেন এবং আমাদের রিহার্সালও তার বাড়িতেই চলতে থাকে।’ তার মতে, তার আবিষ্কারক জহির রায়হান একজন ‘খাঁটি শিল্পী’ এবং ‘লেট দেয়ার বি লাইট’ তাঁর মনে শিল্পীর অনুভূতি সঞ্চারে সহায়তা করেছে।

৭০ দশকে তিনি বেশ আলোচিত ও বিতর্কিত ছিলেন। রোম্যান্টিক, সামাজিক, ফ্যান্টাসি সব ধরণের সিনেমায় তাঁকে দেখা যেত। ওই আমলে তিনি বেশ সাহসীকতার পরিচয় দিয়েছিলেন। এর ফলে নামের সাথে আবেদনময়ী কিংবা গ্ল্যামারাস শব্দগুলো যোগ হত প্রায়ই।  নায়ক ওয়াসিমের সাথে তাঁর পর্দার জুটি বেশ জমে গিয়েছিল।

ওয়াসিম-অলিভিয়া

১৯৭৬ সালে মুক্তি পাওয়া এই জুটির ‘দ্য রেইন’ ছবিটি দেশে বিদেশে ব্যাপক সাড়া জাগায়। ‘আয়রে মেঘ আয়রে’ গানটি অলিভিয়াকে খ্যাতির শীর্ষে তুলে দেয়। ছবিটির সংগীত পরিচালনা করেছিলেন প্রয়াত নায়ক জাফর ইকবালের ভাই আনোয়ার পারভেজ। ছবিটিতে আরো অভিনয় করেছিলেন রোজি সামাদ ও মেহফুজ। এই সময়েই লাক্স-এর মডেল হওয়ার মত প্রেস্টিজিয়াস কাজও করেন অলিভিয়া।

এর আগেই ১৯৭৩ সালে তিনি কাজ করেন ‘মাসুদ রানা’ সিনেমায় মুম্বাই ও পাশ্চাত্যের ধাঁচে নির্মিত এই সিনেমায় নেতিবাচক চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। ‘ও রানা ও সোনা’ – এখনো বাংলা সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম আবেদনময় গানগুলোর একটি।

১৯৭৬ সালে ‘সেয়ানা’ চলচ্চিত্রে খোলা পিঠে ‘সেয়ানা অলিভিয়া’ লিখে হাজির হন তিনি। সৃষ্টি হয় নতুন বিতর্ক। যদিও, বিতর্কের সাথে বেশ সখ্যতা ছিল অলিভিয়ার। চরিত্রের প্রয়োজনে যেকোনো পোশাকে হাজির হতে কখনোই তিনি আপত্তি জানাননি। অসংখ্য সিনেমা আছে, যেখানে সেন্সর বোর্ডের কাচি চলেছে অলিভিয়া অভিনিত অনেক দৃশ্যে। এমন একটি সিনেমা হল ‘রাস্তার রাজা’। মাহমুদ কলির সাথে অলিভিয়ার অসংখ্য দৃশ্য সেন্সর বোর্ড কেটে ফেলতে ‘বাধ্য হয়েছে’।

মাসুদ রানা চলচ্চিত্রের পোস্টার

গণমাধ্যমও তাঁকে সাহসিকতা নয়, বরং যৌনতার প্রতীক হিসেবে দেখাতেই বেশি পছন্দ করতো। তবে, অলিভিয়া নিজেও ক্যারিয়ার নিয়ে খামখেয়ালী ছিলেন। একটু মনোযোগী হলেই হয়তো তাঁকে বাংলাদেশ কিংবদন্তিদের কাতারে রাখতো। তিনি অভিনয়ে কতটা দক্ষ সেটা স্বয়ং নায়ক রাজ রাজ্জাকের সাথে তাঁর ‘যাদুর বাঁশি’ দেখলেই বোঝা যায়।

ক্যারিয়ারে মোট ৫৩ টি সিনেমা করেন অলিভিয়া। এর মধ্যে ছন্দ হারিয়ে গেল, পাগলা রাজা, বাহাদুর, শাহজাদী, গুলবাহার, বেদ্বীন, শ্রীমতি ৪২০, চন্দ্রলেখা, টক্কর, হিম্মতওয়ালী, ডার্লিং, রাস্তার রাজা, বন্ধু, লাল মেমসাহেব, তকদিরের খেলা, সতীনাথ কন্যা, ভাইবোন, নাগ নাগিনী, জংলি রাণী, জামানা, জীবন সঙ্গীত, শপথ নিলাম, টাকার খেলা, দূর থেকে বলছি, সেয়ানা, তীর ভাঙা ঢেউ, শাপমুক্তি, একালের নায়ক, কুয়াশা, আগুনের আলো, কালা খুন, আগুন পানি ইত্যাদি অন্যতম। মুক্তি না পাওয়া দু’টি সিনেমা হল ‘মেলট্রেন’ ও ‘প্রেম তুই সর্বনাশী’।

৭০-এর একেবারে শেষে এবং ৮০’র দশকের শুরুতে যথাক্রমে রোজিনা ও অঞ্জু ঘোষের আগমণ অলিভিয়ার সাম্রাজ্যে ধস নামায়। এফ কবির চৌধুরীর রাজমহল (১৯৭৯) দিয়ে রোজিনা এবং সওদাগর (১৯৮২) দিয়ে অঞ্জু খুব অল্প সময়ে ফোক-ফ্যান্টাসি ছবির বাজারটা দখল করে নেন। একটা সময় চিত্র জগতে অলিভিয়ার অবস্থান নিভু নিভু করে জ্বলে থাকা তারার মতন হল।

অলিভিয়া ও সুপ্রিয়া দেবী

ইদানিং আর অলিভিয়ার কথা শোনা যায় না। এই প্রজন্মের অনেকেই তাঁকে চেনে না। দীর্ঘদিন ধরে তিনি লোকচক্ষুর অন্তরালে আছেন। ১৯৯৫ সালে মুক্তি পায় তার সর্বশেষ অভিনীত চলচ্চিত্র ‘দুশমনি’। এরপর আর কখনোই পর্দা তো দূরের কথা, গণমাধ্যমেরও তিনি মুখোমুখি হয়েছেন বলে শোনা যায়নি। নিভৃতে কাটছে তাঁর জীবন।

অলিভিয়ার পূর্বপুরুষের আদি নিবাস ভারতের গোয়াতে। খ্রিস্টান ধর্ম অনুসারী ছিলেন অলিভিয়ার বাবা-মা। তার পিতা দেশ বিভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। থাকতেন মগবাজারের ইসলামী কলোনিতে। বাবা চাকরি করতেন দ্য ডেইলি অবজারভার পত্রিকায়।

চলচ্চিত্রকার এস এম শফিকে ১৯৭২ সালে বিয়ে করেন অলিভিয়া। তখনই তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। ১৯৯৫ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান শফি। চলচ্চিত্র জগৎ ছেড়ে দেন অলিভিয়া। এরপর বিয়ে করেন নারায়নগঞ্জের ফতুল্লার মুনলাইট টেক্সটাইল মিলসের কর্ণধার হাসানকে।

রঞ্জিত মল্লিকের সাথে অলিভিয়া

অলিভিয়ার ছোট ভাই থাকেন আবুধাবিতে। বড় ভাই অভি ও আরেক ভাই ফুটবলার জর্জি থাকেন ঢাকাতেই। অলিভিয়ার চার বোনের মধ্যে বড় বোন থাকতেন কলকাতায়। ২০১১ সালে তিনি মারা যান। মেঝো বোন অডিট ছিলেন বিমানবালা। বর্তমানে আমেরিকায় থাকেন। ছোটবোন অলকা থাকেন ঢাকাতেই।

শোনা যায়, এখন অলিভিয়া বসবাস করছেন বনানীর ডিওএসএইচ-এর বাড়িতে। কোনো কিছুরই অভাব নেই। হয়তো আক্ষেপ আছে, চলচ্চিত্রাঙ্গনের কেউই যে তাঁর খবর নেয় না!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।