কবিতার পাঠক আছে নাকি কেউ?

বই পড়া লোকেদের একটা কমন বৈশিষ্ট্য দেখা যায়, তাদের বেশিরভাগই ফিকশনের পাঠক। সময়ের আলোচিত বইগুলার বেশিরভাগই হয় ফিকশন, নয় প্রবন্ধ। অথচ সাহিত্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর্টগুলা নিয়া খুব বেশি লোকের আগ্রহ নাই।

কিছুদিন আগে রকমারি বেস্টসেলারের তালিকা দেখতেছিলাম। দশটা বইয়ের তিনটা ফিকশন, তাও শুধুমাত্র উপন্যাস। আর বাকী সাতটা আরো হাস্যকর। কম্পিউটার শিক্ষা, নামাজ শিক্ষা আর রান্নার বই, যেগুলা সাহিত্য নয়। গেল বছর বইমেলায় আমার লেখা বইও বেস্টসেলার ছিল, দুঃখের বিষয়, সেইটাও সাহিত্যের বই ছিল না। কিছুদিন আগে আমি ফেসবুক বন্ধুদের কাছে একটা প্রশ্ন রাখছিলাম, আপনার কেনা সবচেয়ে দামী বই কোনটা? দেখি বেশিরভাগ লোকই বিভিন্ন অ্যাকাডেমিক বইয়ের নাম বলতেছে। সাহিত্যের বই পয়সা খরচ কইরা কিনতে লোকেরা রাজি না!

একবার কথাসাহিত্যিক মঈনুল আহসান সাবের এক ডাক্তারের কাছে যান। ডাক্তার তার পরিচয় জানতে পাইয়া বলেন, আপনি লেখক? ভালো কথা। বই কিন্তু আমিও লেখি। কিন্তু আপনাদের মতো বানায়া বানায়া লেখি না। অনেক গবেষনা কইরা তারপর লেখি।

ফলে, বই পড়া আর সাহিত্য পড়া এক জিনিস না। বাজারে প্রচুর বই পাওয়া যায়, তার মধ্যে সাহিত্যের বই খুব অল্পই। আর সেগুলা খুঁইজা পাবেন শুধু সাহিত্যের পাঠকেরাই।

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সেইদিন একটা আড্ডায় বলতেছিলেন, সাহিত্যের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল আর্ট হচ্ছে উপন্যাস। তারচেয়ে একটু শক্তিশালি শিল্প নির্মিত হয় গল্পে। তারপর প্রবন্ধ। আরো গভীর শিল্প কবিতায়। তারপর নাটক। মাঝখানে একটু বইলা রাখি, নাটক কিন্তু দেখার জিনিস না, পড়ার জিনিস। দেখার জিনিস হইলো থিয়েটার, যা পারফর্মিং আর্ট, ইন্টেলেকচুয়াল আর্ট নয়। আর সাহিত্যে সবচেয়ে শক্তিশালি শিল্প হচ্ছে মহাকাব্য, যা এখন আর দুনিয়ার কোথাও রচিত হয় না।

বিশ্বসাহিত্যের কাতারে বাংলা সাহিত্যের কিন্তু তেমন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নাই। বাংলা সাহিত্যকে ধরা হয় দ্বিতীয় শ্রেনীর সাহিত্য হিসেবে। সমগ্র বাংলা সাহিত্যে একটা মাত্র সাহিত্যকর্মকে প্রথম শ্রেনীর সাহিত্যের মর্যাদা দেয়া যায়, মাইকেল মধুসুদন দত্তের মেঘনাদবধ কাব্য।

লেখকের লেখা কবিতার বই। প্রকাশিত হয়েছে ২০১৯ সালের অমর একুশে বইমেলায়।

তো, কবিতা নিয়া বলতে গিয়া অনেক কথা বইলা ফেলছি, আর না বললেও হবে। এখন কবিতায় ফিরত আসি। বাংলা কবিতার গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে যারা খোঁজখবর রাখেন, তারা জানেন, বাংলা কবিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়টা ছিল তিরিশের দশক। কবি জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু, সুধীন্দ্রনাথ দত্তের মতো একঝাঁক বড় কবির একসাথে বাংলা সাহিত্য শাসন করেন তিরিশের দশকে।

এরপরের গুরুত্বপূর্ণ দশককে ধরা যায় ষাইটের দশক। শহীদ কাদরী, নির্মলেন্দু গুণ, সৈয়দ হক এইরকম আরো একঝাঁক প্রতিভাবান কবি একই সাথে আসেন ষাইটের দশকে কবিতা লেখতে।

এর আগে পরেও অনেক কবি লিখছেন, আল মাহমুদের মতো বড় কবি পঞ্চাশের দশকে ছিলেন, কিন্তু একসাথে একঝাঁক কবি আইসা সাহিত্যজগত শাসন করতেছেন এমনটা শুধুমাত্র তিরিশ আর ষাইটের দশকেই দেখা যায়। সত্তরের দশকে এক রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ছাড়া আমরা বাংলাদেশে আর কোন কবি পাই না। আশির দশক আসে প্রবল সম্ভাবনা নিয়া, লিটলম্যাগ আন্দোলনের সুবর্ণযুগ ছিল সেইটা। অনেক কবিদের প্রস্তুতি তৈরি কইরা দেয় এই আশির দশক। এর পরে আসে নব্বই দশক।

বাংলা সাহিত্যে নব্বই দশক তেমনই আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ সময়, যখন একঝাঁক কবি একসাথে আবার সাহিত্যজগত তোলপাড় করেন। বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত প্রায় প্রতিটা লিটলম্যাগ নব্বই দশকের কবিদের নিয়া স্পেশাল ইস্যু পাবলিশ করে। সাহিত্যে নব্বই দশকের অবদান এইখানে যে, এই কবিদের হাত ধইরা বাংলা সাহিত্য প্রথমবারের মতো কলকাতা ত্যাগ কইরা বাংলাদেশের সাহিত্যিকদের শ্রেষ্ঠত্ব রচনা করে। ঢাকা হইয়া ওঠে বাংলা সাহিত্যের রাজধানি। কলকাতার সাহিত্যিকদের বড়ভাইসুলভ হাত আমাদের পিঠ থেকে সইরা আইসা বন্ধুত্বসুলভ করমর্দনের প্রস্তাবনা তৈরি করে। এই দশকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কবি আছেন। আজকে আমি নব্বই দশকের তিনজন কবির কবিতা নিয়া লেখব।

নব্বই দশকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কবি চঞ্চল আশরাফ। আধুনিক কবিতার ব্যাপারে তার দুর্বলতা লক্ষ্যনীয়। বাংলা কবিতার গতানুগতিক ধারাকে পাশ কাটায়ে (ত্যাগ কইরা না) তিনি নিজস্ব কবিতার জগত তৈরি করেন। চঞ্চল আশরাফের একটা কবিতা পড়া যাক।

– শবযাত্রা –

দ্যাখো যায়, অন্ধকার ঝুঁকে ঝুঁকে যায়

হাতে বাঁশ কাঁধে লাশ

তুমি যার সে তো আর

ছায়া নিয়ে যাবে না জলের পাশে

চিতার পোশাক প’রে করবে না কখনো শিকার

দ্যাখো যায়, শাদা শাদা অন্ধকার যায়

হাতে বাঁশ কাঁধে লাশ

কোদালে উঠবে মাটি, লুপ্ত হবে সমূহ সমাধি

পিঁপড়ার কোলাহল নেবে মৃত্যুর ভাগ, নেবে ঘুম

মৃত্যু যার, সে কি তার

নিঃশ্বাসে উড়িয়ে দেবে প্রাণভস্ম, অলীক খোলস?

দ্যাখো যায়, অন্ধকার ঝুঁকে ঝুঁকে যায়

হাতে বাঁশ কাঁধে লাশ

স্তম্ভ ডুববে জলে, প্রাসাদ যাবে ছিঁড়ে খয়েরি বাতাসে

রোদের প্রহারে পণ্ড হবে স্মৃতিসভা, অশ্রুভোজ

অশ্রু যার, সে কি তার

রুমালে শুকাতে পারে ভেজা থাম, আমস্তক জল?

দ্যাখো যায়, অন্ধকার ঝুঁকে ঝুঁকে যায়

শাদা শাদা অন্ধকার যায়

হাতে বাঁশ কাঁধে লাশ

নব্বই দশকের সবচেয়ে প্রভাবশালী কবি ব্রাত্য রাইসু। নব্বই পরবর্তি তো আছেই, এমনকি আশির দশকের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিকও সরাসরি তার সাহিত্যে রাইসুর প্রভাব স্বীকার করেন। আর নব্বই পরবর্তি সাহিত্যিকদেরকে রাইসুর প্রভাব আজ পর্যন্ত প্রবলভাবে আয়ত্ত কইরা রাখছে। ব্রাত্য রাইসুর কবিতার মূল বৈশিষ্ট তার স্যাটায়ার, বাঁকা চোখের পর্যবেক্ষন। বাংলা সাহিত্যকে কলকাতার ভাষা থেকে মুক্ত কইরা বাংলাদেশের ভাষায় প্রতিস্থাপন করা ব্রাত্য রাইসুর সবচেয়ে বড় অবদান। এই পর্যায়ে ব্রাত্য রাইসুর একটা কবিতা পড়তে হবে।

– স্তন –

স্তন । এই নারীবাক্য অধিক বিশেষ্য। মহাপ্রাণ ধ্বনিতে নির্মিত মাত্রা -জ্ঞান -শূন্য গোলক। অদৃশ্য বলয়যুক্ত যাদুঘর। ক্রমস্ফীতি। মেটাফিজিক্স। গোলক–যা বর্তুল, প্রাণময় । এই স্তন ধর্মসংক্রান্ত।

প্রিয় স্তন, খুলে বক্ষবন্ধনী আজ আব্রু রক্ষা করো ।

ঐ স্তন দ্যাখো লাফিয়ে উঠেছে শূন্যে — মহাশূন্য: বিপরীতে সামান্য শূন্যের। ওই ভীত শিশুদের জন্ম হচ্ছে যত্রতত্র –তারা গান গাইছে জ্যামিতির–করুণামিতির। হেসে উঠছে বর্তুলজাতক। কী যেন বাঁশির ডাকে জগতের প্রেমে, বাহিরিয়া আসিতেছে সলাজ হৃদয়।

কেন এই স্তন বার বার! বাৎসল্যবিহীন যারা, লক্ষ করো, কীভাবে ব্যক্ত হয়ে উঠছে বাহুল্য; ওই ব্যক্তি হয়ে ওঠে স্তন–নারীবাদিনীর, ছুঁড়ে ফেলা ছিন্ন স্তন ফুঁসে উঠছে স্বীকৃতিসংক্রান্ত। তাকে দাও অধিকার– বিন্যস্ত হবার; তাকে শিশুদের হাত থেকে রক্ষা করা হোক!

ঐ স্তন ঘিরে ঘুরে আসছে মারাত্মক ভাবুক প্রজাতি। ভয়ে ও বিনয়ে, নুয়ে পড়ছেন অধ্যাপক–বিশুদ্ধ জ্যামিতি। ঐ স্তন ঘিরে উঠেছে সংক্রামক নগরসভ্যতা; ফেটে পড়ছে ত্রিকোণ-গোলক–

ঐ স্তন জেগে উঠেছে চূড়ান্ত —

ডাকো স্তন, হীনম্মন্যদের!

নব্বই দশকের সবচেয়ে জনপ্রিয় কবি মারজুক রাসেল। তবে তিনি সম্ভবত তার কবিতা দিয়া তত জনপ্রিয় নন, যতটা গানে কিংবা মিডিয়া ব্যক্তিত্ব হিসেবে। জনপ্রিয় ব্যান্ড শিল্পী জেমসের সবচেয়ে জনপ্রিয় গানগুলার লিরিক লিখেন তিনি। তার কবিতায় উইট এবং হিউমারের উপস্থিতি প্রবল। জগতের সব কিছু তাচ্ছিল্য কইরা যাওয়ার টেন্ডেসি কবিতায় তাকে জনপ্রিয় কইরা তোলে। মারজুক রাসেলের একটা কবিতা পড়ি।

– অলটারনেটিভ –

তোমার দেখা পাচ্ছি না; তোমাদের দেড়-তলা বাড়িটাকে দেখতেছি। বাদামি পর্দা-ওড়া-হালকা-খোলা জানালা দিয়ে যত ভিতর দেখা যায়, ছাদে শুকাতে দেয়া কাপড়চোপর ‘ফিরোজা+পিংক’ কম্বিনেশন ড্রেসে তোমাকে একদিন মার্কেটে দেখছিলাম; ওই ড্রেসটা কি ভিজাই থাকে, শুকাইতে দাও না, ছায়াতে শুকাও? গোপনে শুকাও?

তোমাদের এলাকার হোটেলগুলায় নাশতা; দুপুর, রাতের খাবার, টং দোকানে চিনি-ছাড়া-কাঁচাপাতি-দুধ-বেশি-চা; চানাচুর, আবঝাপ, মিনারেল পানি, চুইং গাম, ক্র্যাকজ্যাক খাচ্ছি প্রশংসা করছি। তোমারে খাইতে পারতেছি না।

তোমার এলাকার রোদ বৃস্টি ধুলাবালি, প্যাক, ময়লাটয়লা লাগায় বেড়াচ্ছি; তোমারে লাগানো হয়েই উঠতেছে না, হবে…

তোমার এলাকা ছাইড়া যাচ্ছি

তোমারে ছাড়ার ফিলিংস হচ্ছে, হোক-

আমি অনেক-কিছুই-ছাইড়া-আসা-লোক!

নব্বই দশকে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ কবি আছে, কবিতার পাঠকেরা এইবার নিশ্চয়ই তাদেরকে খুঁইজা বাইর করতে আগ্রহী হবেন। কবিতা বলতে আমরা যা বুঝি, সেই ছন্দ কিংবা কাঠামোবদ্ধ কলকাতামূলক প্রমিতাচর্চা, তার থেকে বের হওয়ার প্রস্তুতিটা কিন্তু খুব সহজ ছিল না। যদিও আশির দশকের প্রতিষ্ঠানবিরোধী নব্বইয়ের সাহিত্যিকদের ক্ষেত্র প্রস্তুত কইরা দেয়।

আজকের দিনে ফেসবুকে হাজার হাজার লাইক কমেন্ট দেইখা আমরা অনেককে কবি বইলা আমাদের ভালোবাসা বরাদ্দ কইরা থাকি, তাতে সাহিত্যের কিছুই যায় আসে না। সাহিত্যের পাঠকমাত্রই জানেন, কবিতা শুধুমাত্র লাইনের পর লাইন লেইখা যাওয়া নয়, কবিতা একটা লাইফস্টাইল, একটা চর্চা। একটা আদর্শ, একটা ভাবমূর্তি। সাহিত্য লেখার বিষয় না, সাহিত্য করার বিষয়, যেইটা করতে গিয়া একজন কবির একটা জীবন শেষ হইয়া যায়। নব্বই দশকের কবিদের মধ্যে এইটা দেখা যায় যে, তারা শুধুমাত্র সাহিত্যই করেন আর কিছুই না। সাহিত্যিকদের মধ্যে এই ডেডিকেশন থাকে বইলাই সাহিত্য এত গুরুত্বপূর্ণ আর্ট।

বাংলা সাহিত্যে নব্বই দশকের সাহিত্যিকদের অর্জন সিগনিফিকেন্ট এবং প্রভাবশালি, যা এড়ানোর কোন কায়দা নাই। পাঠকেরা আগ্রহী হইলে কমেন্টে বইলেন, কথাসাহিত্য নিয়া এর পরে এইরকম কিছু একটা লেখব নে। সকলকে ভালোবাসা।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।