প্রতিপক্ষের মাঠে অনন্য সম্মান

ফুটবল শুধু একটা খেলা না। এটা একটা আবেগ, একটা অনুভূতি। ফুটবলে মাঝেমাঝে নিজের অহংকার, নিজের গর্ব বাদ দিয়ে; প্রতিপক্ষের শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিতে হয়। ফুটবল ভক্তদের কাছে , এটার চেয়েছে সুন্দর খেলা আর হয় না। আর ফুটবলাররা হচ্ছেন মাঠের শিল্পী। তারা মাঠে তাদের শিল্পিত কারুকার্যের মাধ্যমে ভক্তদের বিমোহিত করেন।

তবে, এদের মধ্যে কিছু আছে ব্যতিক্রম। যারা অবিস্মরণীয়  পারফরমেন্স দিয়ে প্রতিপক্ষ  সমর্থকদের মনও জয় করে নেন। এটা অবশ্যই কোনো চাট্টি খানি কথা নয়!ফুটবল ইতিহাসে এমনই কয়েকজন ফুটবলার আছেন যারা নিজেদের অপ্রতিরোধ্য পারফরমেন্স দিয়ে প্রতিপক্ষের মাঠেই প্রতিপক্ষ  সমর্থকদের কাছ থেকে ‘স্ট্যান্ডিং ওভ্যাশন ‘ আদায় করে নিয়েছিলেন!

রোনালদো নাজারিও: (ওল্ড ট্রাফোর্ড,  রিয়াল বনাম ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড – ২০০৩)

ফুটবল ইতিহাসের অনেক সেরা স্ট্রাইকার আছেন। যারা পায়ের জাঁদুতে  পুরো ফুটবল বিশ্বকে বিমোহিত করেছেন। তেমনই একজন হচ্ছেন রোনালদো। ‘দ্য ফেনোমেনন’, ‘দ্য কিং’, ‘দ্য নাম্বার নাইন’।

সময়টা ২০০৩। এপ্রিল মাস।ওল্ড ট্রাফোর্ডে শক্তিশালী ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড এর মুখোমুখি রিয়াল মাদ্রিদ। রোনালদো ততদিনে সেরা স্ট্রাইকারে পরিণত হয়েছেন।

ওল্ড ট্রাফোর্ডে আরো একবার নিজের সামর্থ্যের জানান দিলেন। হ্যাটট্রিক করে ম্যানইউ ফ্যানদের মনে জায়গা করে নিয়েছিলেন। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ৪-৩ গোলে ম্যাচটা জিতেছিল ঠিক।কিন্তু,  রোনালদোর শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিতে তারা একটুও দ্বিমত করে নি।এমনকি, ম্যানইউ যদি প্রতিযোগিতা থেকেও বাদ পড়তো! তাহলে সমর্থকদের মনে কোনো আফসেস থাকতো না।

হ্যাটট্রিক হিরো যখন বদলি হিসেবে মাঠ ত্যাগ করছিলেন; তখন পুরো গ্যালারি ‘রোনালদো’, ‘রোনালদো’ ধ্বনিতে মুখরিত ছিল।দাঁড়িয়ে করতালির মাধ্যমে বিশ্বসেরা স্ট্রাইকারকে অভিবাদন জানিয়েছিলেন।

রোনালদিনহো: (সান্তিয়াগো বার্নাব্যু, রিয়াল বনাম বার্সা- ২০০৫)

আরেকজন ব্রাজিলিয়ান। আরেকজন সেলেসাও মাস্টার ক্লাস। ফুটবল মাঠে করতে পারতেন না এমন কোনে কাজ ছিল না। ব্যক্তিগত, দলীয় ট্রপি; কি জিতেন নাই? সব ট্রফি জিতেছেন ব্রাজিল এবং বার্সার সাবেক এই প্রাণভোমরা।

২০০৫ সালে সান্টিয়াগো বার্নাব্যূতে তার একক নৈপুণ্যে রিয়ালকে হারিয়েছিল বার্সেলোনা। তাঁর অতিমানবীয় পারফরমেন্সের কারণে  প্রথম বারের  মতো রিয়ালের সমর্থকরা সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে কোনো খেলোয়াড়কে ‘স্ট্যান্ডিং ওভ্যাশন’ দিতে বাধ্য হলো। এল ক্লাসিকোর মতো গুরুত্বপূর্ণ লড়াইয়ে।

রিয়াল ডিফেন্ডারদের নাকানিচুবানি খাইয়ে বার্সাকে বড় জয় এনে দিয়েছিলেন। সেই সময়ের সেরা প্লেয়ার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। নিংসন্দেহে, ম্যাচটা মাদ্রিদ সমর্থকদের কাছে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

আলেসান্দ্রো ডেল পিয়েরো: (সান্তিয়াগো বার্নাব্যু, রিয়াল বনাম জুভেন্টাস – ২০০৮)

২০০৮ সালে বার্নাব্যূ আরেকবার গ্রেটেস্ট মোমেন্টের সাক্ষী হলো। সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে ইতালিয়ান ফরোয়ার্ড  যা দেখালেন; তা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের গ্রুপ স্টেজে ওয়ান অব দ্যা বেস্ট সলো পারফরমেন্স।

সেই ম্যাচে রিয়ালকে ২-০ গোলে হারিয়েছিল জুভেন্টাস। তা শুধু ডেল পিয়েরোর মাস্টার ক্লাস পারফরমেন্সের কারণে! জোড়া গোল করেছিলেন। দু’টাই ছিল লং-রেঞ্জ মিসাইল।

ইতালিয়ান সুপারস্টার যখন মাঠ ত্যাগ করছিলেন। তখন পুরো সান্তিয়াগোর গ্যালারি ডেল পিয়েরোর নামে জয়োধ্বনি দিয়েছিল। এমন ভাবে করতালি দিচ্ছিল; ডেল পিয়েরো যেন তাদেরই একজন। এটা ছিল ফুটবল প্রেমীদের জন্য স্মরণীয় এক  মুহুর্ত। রিয়াল ভক্তদের কাছে স্মরণীয় তো বটেই।

ডেনিস বার্গক্যাম্প: (মেইন রোড, ম্যানসিটি বনাম আর্সেনাল – ২০০৩)

ডেনিস বার্গক্যাম্প এমন একজন খেলোয়াড় যাকে সব সময় মনে রাখতে হয়। তাকে তুমি কোনোদিন ঘৃণা করতে পারো না। বরং ঈর্ষা করতে পারো।

বার্কক্যাম্প একজন ডাশ কিংবদন্তি। আর্সেনালের হয়ে ৪০০ উপরে ম্যাচ খেলেছেন।  গোল করেছেন ১২০ টি। আর্সেন ওয়েঙ্গারের অধীনে  গানারদের সাতটা মেজর ট্রফিও জেতাতেও সাহায্য করেছেন।

২০০৩ সালে ম্যানসিটির বিপক্ষে পারফরমেন্সটা ছিল তার  অন্যতম সেরা পারফরমেন্স। এই ডাশ মায়েস্ত্রা হ্যাটট্রিক করে একাই সিটিজেনদের হারিয়ে দেন। ম্যানসিটি সমর্থকরা তাঁর বিধ্বংসি পারফরমেন্সের কারণে তাকে ‘স্ট্যান্ডিং ওভ্যাশন’ দিতে বাধ্য হয়েছিল, তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে নিয়েছিল।

লিওনেল মেসি: ( সান্তিয়াগো বার্নাব্যু, রিয়াল বনাম বার্সা- ২০০৯)

২০০৯ সাল। তখনও তিনি আজকের মেসি হয়ে গড়ে উঠে না।দিন যত যায়;আস্তে আস্তে তিনিও আরো পরিণত হয়েছেন। এখন তিনি বিশ্বসেরা। মহাতারকা।

কে ভেবেছিল? একজন উঠতি তারকার কাছে রিয়াল এমনভাবে ধরাশায়ী হবে! মেসি পুরো সান্তিয়াগো বার্নাব্যূ স্তব্ধ করে দিয়েছিলেন। মাদ্রিদ ডিফেন্ডারদের জন্য দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। জোড়া গোল করেছিলেন। দুইটা গোল করিয়েছেন। রিয়াল হেরেছিল ৬-২ গোলে!

প্রথম বারের মতো মাদ্রিদ সমর্থকরা মেসির নামে গর্জন করেছিলেন। মেসির শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিয়ে ছিলেন।

এটা অবশ্য প্রথমবার নয়। এরপরে আরো অনেক বার মেসি সান্তিয়াগো বার্নাব্যূতে অসাধারণ পারফরমেন্স উপহার দিয়েছেন। লাস্ট দুই এল ক্লাসিকোর রেজাল্ট তো এখনো টাটকা।

আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা: (সান্তিয়াগো বার্নাব্যু, রিয়াল বনাম বার্সা – ২০১৫)

টেকনিক্যালি ইনিয়েস্তা  বিশ্বের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার। ফুটবল  বিশ্ব আর ইনিয়েস্তার মতো মিডফিল্ডার দেখবে কিনা তা সময়ই বলে দেবে।

একজন ইনিয়েস্তা একাই ম্যাচ ঘুরিয়ে দেয়ার ক্ষমতা রাখে। ২০১৫ সালে ইনিয়েস্তা বার্নাব্যূতে যে পারফরমেন্স উপহার দিলেন। তা কোনোদিন ভূলার নয়। সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে  ফুটবলীয় অভিজ্ঞাতার সবটাই যেন শো করলেন মাঝমাঠের এই কারিগর।

২০১০ সালের স্পেনের বিশ্বকাপ জয়ী নায়ক যেন ম্যাচে স্বৈরাচারী ভুমিকায় ছিলেন। পুরো মাঝমাঠ শাসন করেছেন।  নেইমারের পাস থেকে চোখধাঁধানো এক গোল করে; স্কোরলাইনটা ৪-০  বানিয়ে ছিলেন।

ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো: (অ্যানফিল্ড, লিভারপুল বনাম রিয়াল – ২০১৪)

অনেকে তাকে বেয়াদব, অহংকারী বলেন। কিন্তু, ফুটবলার রোনালদোকে আপনি ঘৃণা করতে পারেন না। দিনশেষে, পারফরমেন্স দিয়ে সে আপনার মুখ বন্ধ করে দিবেই। ২০১৪ সালে ব্রেন্ডন রজার্স এর লিভারপুলকে কার্লো আনচেলত্তির রিয়াল মাদ্রিদ যেন রীতিমত ফুটবল শিখালো। রিয়াল তাদেরকে ঘরের মাঠে লজ্জাজনক পরাজয় উপহার দিয়েছিল।

বিশেষ করে , রোনালদো ছিলেন দুর্দান্ত। পুরো ম্যাচে অসাধারণ খেলেছেন। চমৎকার হেডে গোল করে রিয়ালকে ৩-০ গোলের বড় জয় এনে দিয়েছিলেন। পর্তুগিজ সুপারস্টার লিভারপুল ডিফেন্সকে নাচিয়ে ছেড়েছেন। তার খুনে পারফরমেন্স লিভারপুল ফ্যানদের মন জয় করেছিল।তারা তাকে উচ্চকন্ঠে অভিনন্দন জানালো।

এছাড়া সাম্প্রতিক দৃশ্যটা তো এখনো ফুটবলপ্রেমীদের চোখে লেগে আছে। জুভেন্টাসের বিপক্ষে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে বাইসাইকেল কিকে যে গোলটা করলেন; তা নিঃসন্দেহে এই বছরের সেরা গোল হওয়ার দাবি রাখে। ম্যাচ শেষে পুরো জুভেন্টাস গ্যালারি যেন রোনালদোময়। মূলত তার বিধ্বংসী পারফরমেন্সেই তাকে জুভ সমর্থকদের মনে জায়গা করে দেয়।

স্টিভেন জেরার্ড: (স্টামফোর্ড ব্রিজ, চেলসি বনাম লিভারপুল – ২০১৪)

জেরার্ড এবং চেলসির মধ্যে অনেক ইতিহাস রয়েছে। ইংল্যান্ড ও লিভারপুল এর সাবেক এই অধিনায়ক ২০০৫ সালে চেলসিতে পাড়ি জমাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু, পরে নিজের সিন্ধান্ত পাল্টে শৈশবের ক্লাবেই স্থায়ী ভাবে থাকার সিন্ধান্ত নেন।

জেরার্ডের প্রিমিয়ার লিগ সাফল্য যেন ভাগ্যেই নেই। ২০১৪ সালে অ্যানফিল্ডে শিরোপার খুব কাছে গিয়েও সামান্য ভূলের কারণে চেলসির কাছে শিরোপা হারাতে হয়েছিল। ফলে, প্রথমবারের মতো লিগ জয়ের স্বপ্নও বিসর্জন হয়ে হয়েছিল!

ম্যাচটা ছিল চেলসির বিপক্ষে জেরার্ডের শেষ ম্যাচ। লিভারপুলের হয়েও বিদায়ী মৌসুম। লিভারপুল এর হয়ে যখন স্টিভেন জেরার্ড সমতা সূচক গোল করলো। চেলসি লিভারপুল কিংবদন্তিকে দাঁড়িয়ে জানাতে ভুলেনি। যদিও তাদের মধ্যে পারষ্পরিক শত্রুতা ছিল।

থিয়েরি হেনরি অঁরি: (স্টেডিয়াম অব লাইট, স্যান্ডারল্যান্ড বনাম আর্সেনাল- ২০০৩)

একজন জাত স্ট্রাইকার। সাবেক ফ্রান্স ও আর্সেনাল কিংবদন্তি। একসময় বার্সার আক্রমণের অন্যতম সদস্য ছিলেন। প্রতিপক্ষের জন্য ত্রাস ছিলেন বললেই চলে। ২০০৩ সালে সান্দারল্যান্ডের ঘরের মাঠে এক অসাধারণ ‘স্ট্যান্ডিং ওভ্যাশন’ পেয়েছিলেন থিয়েরি হেনরি। উজ্জ্বলতায় সুইডিশ ফরোয়ার্ড ফ্রেডি ইয়েনবার্ককেও ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন তিনি। যদিও ফ্রেডি সেই ম্যাচে হ্যাটট্রিক করেছিলেন।

হ্যাটট্রিক হিরো ফ্রেডি ম্যাচ বল ঘরে তুলে ছিলেন বটে। কিন্তু, সব আলো নিজের করে নিয়ে ছিলেন থিয়েরি হেনরি। বিধ্বংসী পারফরমেন্স দিয়ে স্যান্ডারল্যান্ড ফ্যানদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন। তর্কসাপেক্ষে অঁরিকে তারা সেরা রায় দিলো।

থিয়েরী হেনরি নিজে গোল করেছিলেন। গোল করিয়েছিলেন। স্যান্ডারল্যান্ড সমর্থকদের মনে ঠাঁই করে নিয়েছিলেন। সান্দারল্যান্ড ভক্তরা প্রতিপক্ষের শ্রেষ্ঠত্ব ঠাউর করতে পেরেছিল।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।