শুধু খেলা কিংবা নিছক বিনোদন নয় ফুটবল

১৯৮৬ সালের ২২শে জুন। চার বছর আগে ইংরেজদের কাছে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ হারিয়েছে আর্জেন্টাইনরা। শোচনীয় অবস্থায় আর্জেন্টিনার অর্থনীতি। এমন দিনে বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হল আর্জেন্টাইনরা। ডিয়েগো ম্যারাডোনার নেতৃত্বে মাঠে নামল আর্জেন্টাইনরা।

প্রথম অর্ধ শেষ হল গোলশূন্যভাবে। দ্বিতীয়ার্ধে ৫ ফুট ৫ ইঞ্চির ম্যারাডোনার দু গোলে জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে আর্জেন্টাইনরা। প্রথম গোলটি ‘হ্যান্ড অব গড’ নামে পরিচিত এবং গোলটি নিয়ে রয়েছে যথেষ্ট বিতর্ক। কিন্তু,পরের গোলটি দেখে স্টেডিয়াম ও টিভির সামনে থাকা কোটি দর্শক বিমোহিত হয়েছিল।

গোলটিকে আখ্যা দেওয়া হয় ‘শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ গোল’ হিসেবে। কোটি কোটি আর্জেন্টাইন ভুলে গিয়েছিল তারা ফকল্যান্ড যুদ্ধে পরাজিত। তারা মনে করেছিল আজ তারা বিজয়ী। ফাইনালে জার্মানিকে হারিয়ে শিরোপা জয়ের পর আনন্দে ফেটে পড়েছিল গোটা আর্জেন্টিনা। বুয়েন্স আয়ার্সের পানশালার প্রিয়ার সাথে বিচ্ছেদে শোকাতুর তরুণও সেদিন রাস্তায় নেমে এসেছিল। অংশ নিয়েছিল বিজয় মিছিলে।

বাংলাদেশের সাধারণ কোন মানুষের কাছে যদি জানতে চাওয়া হয় ব্রাজিলের প্রেসিডেন্টের নাম কি?অধিকাংশ লোকই জবাব দিতে পারবে না। যদি জিজ্ঞেস করা হয় নেইমার কোন দেশের খেলোয়াড়, সবাই একবাক্যে জবাব দিবে ‘ব্রাজিল’।

পর্তুগালের প্রধানমন্ত্রী অ্যন্তনিও কস্তা রাষ্ট্রীয় সফরে ভারতে এসেছিলেন এই বছরের জানুয়ারিতে। তিনি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে উপহার দিয়েছিলেন পর্তুগিজ সুপারস্টার ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর জার্সি। অ্যান্তনিও কস্তার থেকে যে রোনালদোকে উপমহাদেশের মানুষদের কাছে অধিক পরিচিত, সেটা আমাদের অজানা নয়।

সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডের ফুটবলার শাকিরি-জাকা বিশ্বকাপে সার্বিয়ার বিপক্ষে গোলের পর ‘আলবেনীয় ঈগল’ উদযাপনের জন্য শাস্তির সম্মুখীন হয়েছেন। তাদের উদযাপনে হয়ত একটি বার্তা ছিল,কিন্তু সেই বার্তাটি লঙ্ঘন করেছিল আইন। ফুটবল শুধুই একটা খেলা নয়,এটায় মিশে আছে লাখো মানুষের আবেগ।

এবার আসি ২০১৬ সালের পর্তুগালের ইউরো জয়ের ঘটনায়। ভঙ্গুর অর্থনীতির পর্তুগাল ইউরো জয়ের পর নেমে এসেছিল রাস্তায়।লিসবনের ঋণে জর্জরিত বৃদ্ধ লোকটিও নিজেকে মনে করেছিল পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ। পর্তুগিজ জাতি সব ভুলে ‘ইউরোপ সেরা’ হবার আনন্দ উদযাপন করতে নেমে এসেছিল রাস্তায়।

এই শতাব্দীতে আফ্রিকার দেশ আইভরি কোস্টে গৃহযুদ্ধ থেমে গিয়েছিল একজনের আহবানে। তিনি জাতিসংঘ প্রেরিত কোন দূত ছিলেন না। ২০০৭ সালে বিশ্ববিখ্যাত ফুটবলার দিদিয়ের দ্রগবার আহবানে গৃহযুদ্ধ থামিয়েছিল আইভরি কোস্টের নাগরিকেরা।

এই ফুটবলই সহস্র মাইল দূরের দেশে অনেক দেশকে পরিচিত করে। মেসির আর্জেন্টিনা, রোনালদোর পর্তুগালের নাম সহস্র মাইল দূরের বাংলাদেশে পত্রিকার শিরোনাম হয় তাদের জন্য। মোটা হরফে লেখা হয় তাদের দেশের নাম। ফুটবলারদের পরিচিতির কাছে ম্লান হয় রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধানদের পরিচিতি।

বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনারের নামের থেকে আমাদের দেশে পত্রিকায় বেশিবার এখন লেখা হচ্ছে হ্যারি কেইনের নাম। কেউ আবার ফুটবলের মাধ্যমে বার্তা জানায় শোষকদের কাছে। এই ফুটবলকে আপনি ‘শুধুই একটি খেলা’, ‘বিনোদনের মাধ্যম’ বলে অবহেলা করতে পারেন না।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।