গা ছমছম কি হয় কি হয়!

| শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা থেকে |

‘ফ্ল্যাট নম্বর ৬০৯’ – নেমপ্লেটে লেখা দরজায়। দরজা খুলে ঢুকলেই গা ছমছমে শিরশিরানি ভাব। শুধু তাই নয় হঠাৎ আটকে যায় লিফট, ঝলসে ওঠে লালাভ আলো, কে যেন টান দেয় বন্ধ লিফটের ভিতর, ফ্ল্যাটের আসবাবের ড্রয়ার আপনাআপনি খুলে যায়, উড়তে থাকে কাগজ, হঠাৎ এমনিতেই পড়ে যায় জলের বোতল,কখনওবা অনুভূত হয় একই বিছানায় কোন অশরীরী কেউ শুয়ে আছে – একের পর এক ভয়ের আবহ, যা দেখে আঁতকে উঠবেন দর্শক এই ফ্ল্যাটে ঢুকলেই।

পরিচালক অরিন্দম ভট্টাচার্যের দ্বিতীয় ছবি ‘ফ্ল্যাট নং ৬০৯’। প্রথম ছবি ‘অন্তর্লীন’ করেই সাড়া ফেলে দেন পরিচালক। অভিষিক্ত নির্মাতা হিসেবে যিনি অনেক পুরস্কারের সঙ্গে পান পূর্বের ফিল্মফেয়ারও। দ্বিতীয় সিনেমাতেও তাকে ১০০-তে ২০০ দেওয়া যায়।

আর বাঙালি মাত্রেই তো ভূতের সিনেমার জন্য মুখিয়ে থাকে। ‘ফ্ল্যাট নং ৬০৯’ কে বলা যায় অন্য রকম ভূতের ছবি। এতদিন আমরা যা ভূত প্রেতের গল্প দেখে এসছি তার থেকে একদম অন্য জাতের এ গল্প। কোথাও গিয়ে আজকালকার সমাজের অরাজকতার রূপ ফুটে ওঠে।

অর্ক (আবীর) আর সায়ন্তনী’র (তনুশ্রী) সদ্য বিয়ে হয়েছে। বিয়ের পর নতুন ফ্ল্যাটের খোঁজ করছে তারা।এক দালাল (রুদ্রনীল ঘোষ) কে ধরে নতুন দম্পতি পছন্দমতো বাড়ি পেয়েও যায়। ‘ফ্ল্যাট নং ৬০৯’। যার জানলা খুললেই সবুজ ঘেরা প্রান্তর,ঝা চকচকে ফ্ল্যাট – সুন্দর করে সাজিয়ে ফেলে তারা নতুন ফ্ল্যাট।

কিন্তু তারপরই সে ফ্ল্যাট হয়ে ওঠে যেন মরণকূপ। কিন্তু ফ্ল্যাট, ভূত, রোমাঞ্চ এখানেই গল্প শেষ নয় … গল্প যত এগোয় রয়েছে তত চমক আর এখানেই একজন অনন্য পরিচালক অরিন্দম ভট্টাচার্য। এই অন্য রকম ভূতের গল্প থ্রিলার গল্প আগে হয়নি সেভাবে। তাই অবশ্যই ‘ফ্ল্যাট নং ৬০৯’-এর রহস্যের কিনারা করতে হলে গিয়ে দেখে ফেলুন এই ছবি।

থ্রিলার গল্পে এর থেকে বেশী কিছু বলা যাবেনা।  এবার আসি অভিনয়ে এ ছবিতে দুটো গুরত্বপূর্ণ চরিত্রে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও মমতা শংকর। আবির-তনুশ্রী’র প্রতিবেশী দুই বৃদ্ধ বৃদ্ধা স্বামী স্ত্রী , যাদের ব্যবহার রহস্যজনক। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়-মমতা শংকর জুটি দম্পতির ভূমিকায় ‘বালিগঞ্জ কোর্ট’ ছবির অনেকদিন পর এ ছবিতে আবার।

দুজন ওনাদের মত কিংবদন্তি অভিনেতা-অভিনেত্রী ভালো অভিনয় করবেন এতো জানা কথাই কিন্তু নতুন ভাবে ওঁদের এক্সপ্লোর করেছেন অরিন্দম। বিশেষ করে মমতা শংকরের চরিত্র। যে লুক পরিচালক দিয়েছেন মমতা শংকরকে এর আগে কোন ছবিতে এভাবে আমরা মমতা শংকরকে পাইনি।

একটা মোটা কাঁচের চশমায় যেন চরিত্রটায় মিশে গেছেন মমতা শংকর। এতো দুরন্ত অভিনয় করেছেন যার জন্য ছবিটা অবশ্যই দেখা উচিৎ। ঋতুপর্ণ ঘোষের পর মমতা শংকর কে নতুন ভাবে আবিস্কার করছেন অরিন্দম ভট্টাচার্য তাঁর দুটো ছবিতেই। তাঁর প্রথম ছবি ‘অন্তর্লীন’ এও মমতা শংকর ওইধরনের চরিত্র আগে করেননি। আর ‘ফ্ল্যাট নং ৬০৯’ এও দুরন্ত মমতা শংকর। তাঁকে যোগ্য সঙ্গত দিয়েছেন বৃদ্ধ স্বামীর ভূমিকায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। ওনার অভিনয় আর কি বলব সব সময় অপ্রতীম।

এবার আবীরের প্রসঙ্গে আসি। আবীর মানেই এখন আমাদের সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ বক্সী কিংবা ফেলু মিত্তির। কিন্তু ‘ফ্ল্যাট নং ৬০৯’ এ এক অন্য আবীর। এধরনের চরিত্র তিনি আগে করেননি। দুরন্ত অভিনয় করেছেন আবির। আমি তো বলব ইমেজ নিয়ে ‘কবির’ ছবিতে দেব যে চ্যালেঞ্জ নেননি আবীর সে চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন ‘ফ্ল্যাট নং ৬০৯’ এ। আবীরের লুক অভিনয় ছবির শুরু থেকেই সপ্রতিভ আর সেটা আরো প্রকাশিত হয় ছবির শেষ ভাগে। হাফ টাইমের পর থেকে আবীর দারুণ।

আবীর-তনুশ্রী জুটির প্রথম রিলিজ ছবি এটি। তনুশ্রী’র অভিনয়ের ফ্যান আমি ‘মহানায়ক’-এ সুপ্রিয়া দেবীর রোলে ওকে দেখেই। আর তনুশ্রীকে নতুন ভাবে দর্শকের সামনে আনলেন পরিচালক অরিন্দম তাঁর ‘ফ্ল্যাট নং ৬০৯’ এ। তনুশ্রী নায়িকা হিসেবে যে কতটা দক্ষ এ ছবি তার প্রমাণ।

সারা ছবি জুড়ে যে ভয়ের আবহ,দর্শকের ভয় পাওয়া তার সুতোটা কাটতে দেয়নি তনুশ্রীর অভিনয়। কপালে ঘাম, হাড়হিম এটিচিউড,ভয় পেয়ে চিৎকার তবু নিজের মধ্যেই ভয় চেপে রেখে ভয় কে জয় করার ক্ষমতা এই সবকিছু কি দারুণ অভিনয়ে ব্যক্ত করেছেন তনুশ্রী। এই নায়িকার চরিত্রটি আগে এক অভিনেত্রী ছেড়ে দিয়ে ভুলই করেছেন। যার সম্মান রেখেছেন তনুশ্রী। রুদ্রনীল ঘোষ জমিয়ে অভিনয় করেছেন।

নতুন মুখ পূজারিণী। কি তেজস্বিনী স্মার্ট অভিনয় তাকে দিয়ে করিয়েছেন পরিচালক অরিন্দম। পূজারিণী ঘোষের অভিনয় প্রেজেন্স খুব ভালো লেগেছে। তনুশ্রীর বাবার চরিত্রে ড. বি ডি মুখোপাধ্যায়কে অনেকদিন পর দেখে খুব ভালো লাগল। সুন্দর অভিনয়। মায়ের চরিত্রে মধুমিতা চক্রবর্তী যথাযথ।

ছোট্ট বাচ্চা ছেলের ভূমিকায় যে তার অভিনয় অসাধারণ বলতেই হয়। ভীষন রোমাঞ্চকর। পুলিশ অফিসারের চরিত্রে খরাজ মুখোপাধ্যায় সবসময়ের মতো দারুণ। এছাড়াও অনেক নতুন মুখ কেউ বিহারি দুধওয়ালা কেউ পুলিশ কেউ ডাক্তারের ভূমিকায় এনারা খুব ভালো অভিনয় করেছেন। এই ছবির মূল হিরো এডিটিং সাউন্ড ক্যামেরা সিনেমাটোগ্রাফি এগুলো এত দুরন্ত যা ছবির মান অনেক উন্নত করেছে। এক লহমার জন্য স্ক্রীন থেকে চোখ সরাতে দেবেনা।

ভুতের ছবির বিশাল দিক সাউন্ড মিউজিক যেটা অসাধারন করেছেন মমতা শংকর পুত্র রাতুল শংকর ঘোষ। ছবির গান সুন্দর অনুপম উজ্জয়িনী, ইমনের। তবু গান গুলো আরেকটু ভালো হলে ভালো হত।যদিও থ্রিলার ছবিতে গান খুব একটা ফ্যাক্টর নয়। কিন্তু ছবির দৃশ্যের সঙ্গে যথাযথ। শেষ দৃশ্যে ইমন চক্রবর্তীর গলায় ‘কিছু কিছু কথা’ মন কেমন করায়।

উপসংহারে একটাই কথা, ছবির ট্রেলার দেখে অনেকেই ভাবছেন এটা সেই রামগোপাল ভার্মার ‘ভূত’ কিংবা অন্য যে কোন ভূতের ছবির মতো তা কিন্তু একেবারেই নয়। একটা ছবির ট্রেলার দেখে ছবিটাকে যাচাই করবেননা। হলে গিয়ে ছবিটা দেখুন।না দেখলে ঠকবেন। কোনো বলিউডি ভূতের ছবির রিমেক এ ছবি নয়।প্যারানরমাল অ্যাক্টিভিটিজ খুলে দিচ্ছে অজানা রহস্যের দরজা। একদম অন্যরকমের ভূতের গল্প বানিয়েছেন ফিল্মফেয়ার বিজয়ী পরিচালক। মিস করবেন না কেউ।

শিক্ষিত মার্জিত আন্তরিক পরিচালক খুব কম এই ইন্ডাস্ট্রিতে যাদের মধ্যে একজন অরিন্দম ভট্টাচার্য। তাই ভালো ছবি দর্শকদের আরো উপহার দেবার জন্য পরিচালক সহ পরিচালক কলাকুশলীদের ও অবশ্যই প্রযোজক দের অনেক শুভকামনা।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।