ইতিহাসের প্রথম অবৈধ বোলিং অ্যাকশন

ঘোষণা: আমরা, নিম্ন স্বাক্ষরকারীগণ এই মর্মে ঘোষণা করেছি যে অল ইংল্যান্ড এবং সাসেক্স এর মধ্যকার তৃতীয় ম্যাচে আমরা অংশ নেবো না যা ব্রাইটন শহরে জুলাই বা আগস্টে অনুষ্ঠিত হবার কথা ছিল, যতক্ষণ পর্যন্ত না সাসেক্স এর বোলারগণ বৈধভাবে বল করছে অর্থাৎ ছুঁড়ে বল করা বন্ধ করছে!

স্বাক্ষরকারী: টম মারসডেন, উইলিয়াম অ্যাশবি, উইলিয়াম ম্যাথিউস, উইলিয়াম সিয়ারলি, জেমস সন্ডার্স, টমাস হাওয়ার্ড, উইল কলডকোর্ট, ফুলার পিলচ এবং টমাস বিগলি।

প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের ইতিহাসে জুলাই ১৫, ১৮২২ একটি স্মরণীয় দিন। প্রথম বোলার হিসেবে জন উইলসের বোলিং অ্যাকশনকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়। তিনি সাইড আর্ম বোলিং করেছিলেন (অনেকটা লঙ্কান মালিঙ্গার মত, তবে হাত কাঁধের নিচেই ছিল)। আন্ডার আর্ম বোলিং এর জগতে ওটা ছিল একেবারেই নতুন ও অবৈধ বোলিং অ্যাকশন।

অবৈধ অ্যাকশনের কারণে আম্পায়ার নো বল ডাকার সাথে সাথে উইলস রাগে, ক্ষোভে এবং অপমানে লর্ডস এর মাঠ থেকে বের হয়ে যান। কারও সাথে কোন কথা না বলে ঘোড়ায় চড়ে (মাঠের বাইরে সবার ঘোড়া বাঁধা থাকত) স্থান ত্যাগ করেন এবং আর কোনদিন ক্রিকেট খেলেন নি!!

রাউন্ড আর্ম বোলিংয়ের শুরুটা হয়েছিল উইলিয়াম লিলি-হোয়াইট এবং জেমস ব্রডব্রিজের হাত ধরে। এরপর দ্রুতই সেটা পুরো সাসেক্স এলাকায় জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। যা কর্তৃপক্ষের নজরে আসে এবং তারা একটি প্রদর্শনী সিরিজের সিদ্ধান্ত নেন। ঠিক হয় যে তিন ম্যাচের সিরিজটি হবে যথাক্রমে শেফিল্ড, লর্ডস এবং ব্রাইটন শহরে। এক পক্ষে সাসেক্স, বিপক্ষ দলটির নাম দেয়া হয় ইংল্যান্ড (বা অল ইংল্যান্ড)।

প্রথম ম্যাচে ইংল্যান্ড প্রথমে ব্যাট করে মাত্র ৮১ রানেই অল আউট হয়। জবাবে সাসেক্স ব্যাট করতে নেমে দ্রুত ৯ উইকেট হারালেও দশম উইকেট জুটির দৃঢ়তায় শেষ পর্যন্ত ৯১ রান করতে সমর্থ হয়। দ্বিতীয় ইনিংসে ইংল্যান্ড ১১২ রান করে। সাসেক্স দল মাত্র ৩ উইকেট হারিয়ে ম্যাচটি জিতে নেয়। লিলি-হোয়াইট উভয় ইনিংসে ৫টি করে উইকেট নেন এবং ব্রডব্রিজ নেন উভয় ইনিংসে দুটি করে উইকেট।

সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচটিও সাসেক্স তিন উইকেটে জিতে সিরিজ নিশ্চিত করে। এই ম্যাচে লিলি-হোয়াইট দখল করেন মাত্র তিন উইকেট এবং ব্রডব্রিজ নেন চার উইকেট। তবে, একটি জিনিস লক্ষণীয়- সেই আমলে কোন ব্যাটসম্যান ক্যাচ আউট হলে স্কোরবোর্ডে শুধু ফিল্ডারের নাম লেখা হত, বোলারের নাম নয়। ফলে, এই আমলে এসে শুধু স্কোরবোর্ড দেখে বোলারের প্রকৃত উইকেটের সংখ্যা জানার কোন উপায় নেই।

পুরো সিরিজেই রাউন্ড আর্ম বোলিং এর বিরুদ্ধে অল ইংল্যান্ড দলের দুর্বলতা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়। অপরিচিত এই বোলিং একশনকে তারা একেবারেই মেনে নিতে পারেন নি। যারই ফলশ্রুতিতে শুরুতে উল্লেখ করা ঘোষণার সূত্রপাত। যে নয়জন স্বাক্ষর করেছিলেন তাঁদের মধ্যে ফুলার পিলচকে মনে করা হয় ডব্লিউ জি গ্রেস খেলা শুরু করার আগ পর্যন্ত সেরা ব্যাটসম্যান হিসেবে।

প্রবল বিরোধিতার পর জর্জ টি নাইট নামক এক ক্রিকেটার বাকি সবাইকে শান্ত করেন। তিনি ইংল্যান্ড দলেরই ছিলেন এবং ঘটনাক্রমে তিনিও রাউন্ড আর্ম বোলিং করতেন। তাঁর মধ্যস্থতায় শেষ পর্যন্ত সবাই মিলে সিরিজের শেষ ও তৃতীয় ম্যাচ খেলার সিদ্ধান্ত নেন।

শেষ ম্যাচের প্রথম ইনিংসে লিলি-হোয়াইট ও ব্রডব্রিজের বিধ্বংসী আক্রমণে ইংল্যান্ড মাত্র ২৭ রানে গুঁড়িয়ে যায়। সাসেক্স ৭৭ রান করে ৫০ রানের লিড পায়। দ্বিতীয় ইনিংসে ইংল্যান্ড দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ায় এবং ১৬৯ রান সংগ্রহ করে। শেষ পর্যন্ত তারা ম্যাচটি ২৪ রানে জিতে নেয়। ইংল্যান্ড দলের রাউন্ড আর্ম বোলার নাইট দখল করেন (কমপক্ষে) তিন উইকেট।

এভাবেই রাউন্ড আর্ম বোলিংয়ের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু। দ্বিধা, সংশয় ও ক্ষোভের মাঝেই রাউন্ড আর্ম বোলিংয়ের পথচলা অব্যাহত থাকে। মাঝে মাঝে আম্পায়ারগণ নিজের মত করে সিদ্ধান্ত নিতেন, কেননা তখন পর্যন্ত ক্রিকেট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোন আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়া হয় নি।

শেষ পর্যন্ত ১৮২৮ সালে এমসিসি ক্রিকেটের ১০ নম্বর আইনটি সংশোধন করে। উল্লেখ করা হয় যে- বোলারগণ আন্ডার আর্ম বোলিংয়ের পাশাপাশি রাউন্ড আর্ম বোলিং ও করতে পারবেন। তবে, বোলারগণ বাহুকে কনুই এর (উপরের অংশ) উপরে তুলতে পারবে না।

জর্জ নাইটের হস্তক্ষেপে ১৮৩৫ সালে আরও সংশোধন করে কনুই এর বদলে কাঁধ লেখা হয়। অর্থাৎ, বল করার সময় কারও হাত কাঁধের উপরে উঠলে তা অবৈধ হবে – The ball must be bowled, and if it is thrown or jerked, or if the hand be above the shoulder in the delivery, the umpire must call ‘no ball’।

অবশ্য, নতুন স্বাধীনতা পেয়ে বোলারগণ প্রায়শই এই নিয়ম ভঙ্গ করছিলেন। বিশেষ করে যারা একটু জোরে বল করতে চাইতেন তারা হাতকে কোনমতেই কাঁধের নিচে রাখতে পারছিলেন না। ওদিকে দর্শকও বলের গতি দেখতে পছন্দ করা শুরু করেছে। সবমিলিয়ে ওভার আর্ম একশন সময়ের দাবী হয়ে উঠল।

১৮৬২ সালের আগস্ট মাসে সারে ও অল ইংল্যান্ড দলের মধ্যকার খেলায় এডগার উইলশার নামক বোলারকে ছয়বার ‘নো বল’ ডাকা হয়। কারণ তার হাত বল করার সময় কাঁধের উপরে উঠে যাচ্ছিল। পরিহাসের বিষয় হচ্ছে আম্পায়ার ছিলেন জন লিলি-হোয়াইট (উইলিয়াম লিলি হোয়াইটের ছেলে)। ঘটনার প্রতিবাদে নয়জন অল ইংল্যান্ড দলের খেলোয়াড় মাঠ ত্যাগ করেন। পরেরদিন খেলা আবার শুরু হয়, তবে আম্পায়ারকে বদলে দেবার পর। ম্যাচ শেষে উইলশারের বোলিং ফিগার দাঁড়ায় ৬/৪৯ এবং ১/৪৩।

এর দুই বছর পর অর্থাৎ ১৮৬৪ সালে এমসিসি আনুষ্ঠানিকভাবে ওভার আর্ম বোলিংয়ের বৈধতা দান করে। এই ঘটনাকে ক্রিকেটের ঐতিহাসিকগণ আধুনিক ক্রিকেটের সূচনা হিসেবে অভিহিত করেন। তবে, এর শুরুটা হয়েছিল প্রায় ৬ দশক আগের নয়জন ক্রিকেটারের সেই ‘ঘোষণা দিয়ে খেলা বন্ধ করার’ মধ্য দিয়ে।

_______________

ভারতের প্রখ্যাত ক্রীড়া সাংবাদিক অভিষেক মুখার্জী ক্রিকেটসকার.কমে Cricket history in quotes নামক দারুণ একটি সিরিজ লিখেছেন। এই সিরিজে তিনি ইতিহাস খুঁড়ে তুলে এনেছেন সাধারণ মানুষের উক্তিতে বা লেখায় উল্লেখ করা ক্রিকেটের সব দারুণ রেফারেন্স। মজার ব্যাপার হচ্ছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মূল ফোকাস ক্রিকেট ছিল না, অন্য কোন কিছুর সাথে উড়ে এসে জুড়ে বসেছে! আমি অসাধারণ সেই সিরিজটির ভাবানুবাদ করার চেষ্টা করছি।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।