বলিউডের প্রথম ‘হি ম্যান’

১৯৯২ সালের সিনেমা ‘বলবান’। দীপক আনন্দ একেবারেই আনকোরা এক মুখকে নিলেন সিনেমাটির জন্য। কিন্তু, নতুন নায়ক বলেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিতে থাকেন একের পর এক শীর্ষস্থানীয় নায়িকারা। শেষ অবধি ঝুঁকি নিতে রাজি হন প্রয়াত নায়িকা দিব্যা ভারতী। ব্যস, সিনেমা সুপারহিট।

এবার আরেকটা গল্পে আসি। সঞ্জয় দত্ত তখন মাদকের নেশায় আসক্ত। বাস্তব জীবন বেশ অগোছালো ভাবে চলছে। বাবা সুনীল দত্ত সাংসদ হওয়ায় বেশ ব্যস্ত, ঠিকভাবে সময় দিতে পারছেন না। কিন্তু ছেলের একজন ভালো সঙ্গী প্রয়োজন, যে তাঁর আর্থিক বিষয়গুলি দেখভাল করবে।

কিন্তু এই রুপালি জগতে বিশ্বাসী কে!

এমন সময় বন্ধুরুপে এগিয়ে আসলেন তৎকালীন বলিউডের এক জনপ্রিয় নায়ক। হ্যা, ঠিকই ধরেছেন, ‘বলবান’ দিয়েই তাঁর ক্যারিয়ার শুরু। সঞ্জয় দত্তে আর্থিক বিষয়টি তখন সম্পূর্ণ বিশ্বস্তার সঙ্গে দেখতেন সেই নায়কটি। বলিউডে তিনি পরিচিত হলেন একজন বিশ্বাসী ভালো মানুষ হিসেবে। তিনি নব্বই দশকের অন্যতম জনপ্রিয় নায়ক। বন্ধুমহলে যিনি ‘আন্না’ নামে পরিচিত। তিনি হলেন বলিউডের প্রথম বডি বিল্ডারদের একজন, প্রথম ‘হি ম্যান’ – সুনিল শেঠি।

সুনীল শেঠি বেড়ে উঠেছেন অস্বচ্ছল পরিবার থেকে। তাঁর বাবা ছোটবেলায় এক হোটেলে বাসন ধোঁয়ার কাজ করতেন। পরবর্তীতে সুনীল শেঠি বাবার প্রতি সম্মান দেখিয়ে সেই হোটেলটাই পুরো কিনে ফেললেন। এই উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে তিনি চিরাচরিত সাদামাটা গোছের নায়ক ছিলেন, মোটেই সুদর্শন কেউ ছিলেন না।

কিক বক্সিংয়ে ব্ল্যাক বেল্টের অধিকারীর মূল সম্পদ ছিল অভিনয় আর অ্যাকশন। প্রথম ছবিতেই সাফল্য আসার পরও আলোচনায় আসার জন্য তাঁকে অপেক্ষা করতে হয় আরো ‍দুই বছর। ১৯৯৪ সালে ‘দিলওয়ালে’ আর ‘মোহরা’র পর একক নায়ক হিসেবে ‘গোপিকিষান’ ছবি দিয়ে বাজিমাৎ করেন। দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করে মন জয় করে নিয়েছিলেন। অনেকের মতে, এটিই তাঁর ক্যারিয়ারের সেরা সিনেমা।

প্রয়াত শ্রীদেবীর সাথে

এরপর একে একে করেন ‘হাম হ্যায় বেমিসাল‘, ‘গাদ্দার’, ‘ভাই’, ‘হু তু তু’, ‘কৃষনা’, ‘টাক্কর’ অন্যতম। তবে তাঁর ক্যারিয়ারে আলাদা করে বলতে হয় তিনটি সিনেমার কথা। প্রথমটি জে পি দত্তের ‘বর্ডার’, সাড়া জাগানো এই ছবিতে ভৈরব সিং চরিত্রে অভিনয় করে প্রশংসিত হয়েছিলেন। দ্বিতীয়টি প্রিয়দর্শনের বিখ্যাত ছবি ‘হেরা ফেরি’।

কমেডি এই ছবিতে ঘনশ্যাম চরিত্রে অভিনয় করে নিজের চিরাচরিত ধারা ভাঙার চেষ্টা করেছিলেন। এবং সর্বশেষ ধর্মেশ দর্শনের মিউজিক্যাল হিট সিনেমা ‘ধাড়কান’। এই ছবিতে একজন আন্টি হিরো ‘দেব’ চরিত্রে অভিনয় করে নিজের প্রতিভার আরেকবার পরিচয় দিয়েছিলেন। ক্যারিয়ারে একটি মাত্র ফিল্মফেয়ার,এই ছবির মাধ্যমেই পেয়েছিলেন।

আরেকটি সিনেমার কথা না বললেই না। সেটা হল ২০০৪ সালে ফারাহ খান নির্মিত সিনেমা ‘ম্যায় হু না’। ভিলেন হয়ে শাহরুখ খানের সাথে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করেছেন সুনিল শেঠি।

মূলত নব্বই দশকের পর তিনি ধীরে ধীরে চলচ্চিত্র থেকে অনিয়মিত হয়ে পড়েন। জনপ্রিয়তাও কমতে থাকে। গত দশকে তাঁর উল্লেখযোগ্য ছবির মধ্যে ‘ইয়ে তেরা ঘার, ইয়ে মেরা ঘার’, ‘আওয়ারা পাগল দিওয়ানা’, ‘কাঁটে’, ‘জানি দুশমন’, ‘ওয়ান টু থ্রি’, ‘হালচাল’, ‘চুপ চুপ কে’ ও ‘ফির হেরা ফেরি’ অন্যতম।

গত বছর দ্য জেন্টলম্যান ছবিতে অভিনয় করেছেন। সামনে মুক্তি পাবে ভারত, হেরা ফেরি ৩। এছাড়া তিনি তামিল, মালায়লাম, ইংলিশ ছবিতেও অভিনয় করেছেন। প্রযোজক হিসেবেও নিজের নাম লিখিয়েছেন।

ব্যক্তিজীবনে বিয়ে করেছেন মানা শেঠি, বেশ সুখের সংসার তাঁদের। রয়েছে দুই সন্তান। এর মধ্যে মেয়ে আথিয়ার ইতিমধ্যেই বলিউডে অভিষেক ঘটেছে। ছেলে আহানও বলিউডে পা রাখতে যাচ্ছেন শিগগিরিই। একসঙ্গে অভিনয়ের সুবাদে সোনালী বেন্দ্রে তাকে পছন্দ করতেন,তবে পরিবারের কথাভেবে সোনালীর সাথে দূরত্ব সৃষ্টি করেন। বলিউডে তাঁর সবচেয়ে কাছের বন্ধু সঞ্জয় দত্ত, অজয় দেবগণ ও অক্ষয় কুমার। অক্ষয়ের সাথে রীতিমতো জুটি বেঁধে অনেকগুলো ছবিতে অভিনয় করেছেন।

চলচ্চিত্রে অভিনয়ের বাইরে সুনিল শেঠি পুরোদস্তর হোটেল ব্যবসায়ী। না, টাকা আছে বলে ঢেলেছেন, ব্যাপারটা তা নয়, রীতিমত হোটেল ম্যানেজমেন্টের ওপর উচ্চতর ডিগ্রি আছে তাঁর। আর সুনিল শরীর নিয়ে বেশ সচেতন হলেও বেশ ভোজনরসিকও বটে। তার প্রিয় খাবার হল তিলওয়ালি কুলফি, মাঝের ঝোল ও থাই ফুড, বিশেষ করে চিংড়ি।

হোটেলের পাশাপাশি তাঁর একটা বুটিক হাউজ আছে। নাম ‘মিসচিফ’। সিনেমায় আসার আগেও, তিনি সিনেমায় কস্টিউম সরবরাহের ব্যবসা করতেন। এছাড়া পপকর্ন এন্টারটেইনমেন্ট নামে তাঁর আরেকটি প্রতিষ্ঠান আছে। এর হয়ে দেশের বাইরে বলিউড তারকাদের নিয়ে বিভিন্ন ইভেন্ট আয়োজন করে থাকেন সুনিল।

খুব কম লোকই জানেন যে, তাঁর পুরো নাম সুনিল ভিরাপ্পা শেঠি! এখন টেলিভিশনেও বেশ জনপ্রিয় তিনি। ফিটনেস বিষয়ক রিয়েলিটি শো ‘বিগেস্ট লুজার জিতেগা’ ও ‘ইন্ডিয়া’স আসলি চ্যাম্পিয়ন হ্যায় দাম?’-এ সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করছেন।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।