পৃথিবীর প্রথম ক্রিকেট লিখিয়ে একজন নারী

প্রথম পর্বে আমরা সেই ঘটনার কথা জেনেছি যেটাকে ক্রিকেটের সবচেয়ে পুরনো রেফারেন্স হিসেবে সারা বিশ্বের ক্রিকেট পণ্ডিতগণ সর্বসম্মতিক্রমে মেনে নিয়েছেন। আমরা এটাও দেখেছিলাম ক্রিকেট তখনও ছিল ছোট ছোট ছেলে এবং কিশোরদের খেলা। স্পোর্টস ইভেন্ট হিসেবে তখনও কোন আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়নি।

যাই হোক, সময়ের সাথে সাথে কোন এক অজ্ঞাত কারণে খেলাটি চার্চের লোকজনের কাছে খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠল। শুধু তাই নয়, অনেকে এই খেলায় এতটাই মজে গেলেন যে কিছু সমস্যা দেখা দিতে শুরু করল! এরকম একটি ঘটনা ঘটে ১৬১১ সালে। এক চার্চের দুইজন পাদ্রিকে প্রার্থনা ফাঁকি দিয়ে ক্রিকেট খেলার দায়ে জরিমানা করা হয়!

এর এগারো বছর পর অর্থাৎ ১৬২২ সালে আরেকটি চার্চের দুই শীর্ষ কর্মকর্তাকে সতর্ক করা হয় কেননা তারা চার্চের উঠোনে ক্রিকেট খেলছিলেন, সেটাও আবার রোববারে! খ্রিস্টানদের কাছে যা অত্যন্ত গর্হিত কাজ। উল্লেখ্য, এই ঘটনার প্রায় ৩০০ বছর পর ক্রিকেটের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান এবং ধর্মপ্রাণ জ্যাক হবস রোববারে একটি ম্যাচ খেলার অস্বীকৃতি জানিয়ে পত্রপত্রিকার শিরোনাম হয়েছিলেন। সেই গল্প আরেকদিনের জন্য তোলা রইলো।

১৬৪০ সালের দিকে ক্রিকেটের সাথে বাজি ধরা যুক্ত হয়ে যায়। এ সময়কার একটি চমকপ্রদ ঘটনার কথা ইতিহাসে লিপিবদ্ধ রয়েছে। কোন এক কারণে দুই জন ‘অভিজাত’ মানুষ একই এলাকার চার জন ‘নিচু শ্রেণির’ মানুষের সাথে বাজিতে ক্রিকেট খেলেন। শর্ত ছিল- দুই জনের দলটি হেরে গেলে টাকা দেবে এবং চার জনের দল হেরে গেলে ১২ টি মোমবাতি দেবে! অনেকটা ভারতীয় ‘লাগান’ সিনেমার মত! তবে, শেষটি তেমন হয়নি।

কেননা, ‘নিচু’ শ্রেণির চারজনের দলটি হেরে যায়। কিন্তু, ম্যাচ শেষে তারা মোমবাতি প্রদানে অস্বীকৃতি জানায় এবং শেষ পর্যন্ত ঘটনাটি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। অবশ্য, আদালত পর্যন্ত যাওয়ায় আমাদের সুবিধে হয়েছে- তা না হলে আমরা হয়ত ঘটনার কথা জানতেও পারতাম না!

এসব ঘটনা যখন ঘটছিল সেই ইংল্যান্ডেরই আরেক প্রান্তে প্রখ্যাত কবি ও গদ্যকার জন মিল্টন ইংরেজি সাহিত্যে নিজের অবস্থান অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। প্যারাডাইস লস্ট প্রকাশিত হয়েছিল আর কিছুদিন পর, ১৬৬৭ সালে। তবে, ১৬৪৬ সালেই এক গুচ্ছ কাব্য সংকলন প্রকাশ করে তিনি বিখ্যাত হয়ে গিয়েছিলেন।

জন মিল্টন তাঁর একমাত্র বোনের দুই ছেলে-এডওয়ার্ড জুনিয়র এবং জন এর শিক্ষা-দীক্ষার দায়িত্ব নিজেই নিয়েছিলেন। এদের মধ্যে এডওয়ার্ড জুনিয়র পরবর্তীতে জন মিল্টনের আত্মজীবনী রচনা করেন।

তবে, এডওয়ার্ড জুনিয়র শুধু এই একটি বই নয় আরও বেশ কিছু সাহিত্য রচনা করেছিলেন। এরমধ্যে একটি আমাদের আজকের বিষয়বস্তু। বইটির নাম ছিল- ‘The Mysteries of Love & Eloquence, or, The Arts of Wooing and Complementing as They Are Manag’d in the Spring Garden, Hide Park, the New Exchange, and Other Eminent Places : a Work in Which is Drawn to the Life the Deportments of the Most Accomplisht Persons, the Mode of their Courtly Entertainments, Treatments of Their Ladies at Balls, Their Accustom’d Sports, Drolls and Fancies, the Witchcrafts of Their Perswasive Language in their Approaches, or Other More Secret Dispatches…’

পাঠক, বিশ্বাস করুন ছাপা বা লেখার কোন ভুল হয় নি, এটি আসলেই একটি, শুধু একটি বই এর শিরোনাম। আসলে, সেই আমলে এটাই রেওয়াজ ছিল। এজন্য দীর্ঘ ও খটমটে শিরোনাম দেখে অবাক হবার কিছু নেই! বইটির বিষয়বস্তু ছিল মেয়েদের পটাবার বিভিন্ন কৌশল নিয়ে! একেকটি চ্যাপ্টারে তিনি একেকটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। উদাহরণসহ দেখিয়েছেন কিভাবে ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে মেয়েদের সাথে সুন্দরভাবে কথা বলতে হয়।

একটি চ্যাপ্টারের নাম ছিল ‘Mock Complements’ বা নকল প্রশংসা। কোন এক পানশালায় (বর্তমান রেস্টুরেন্ট হিসেবে কল্পনা করুন) রিচার্ড নামের এক ছেলে কেট নামের এক মেয়েকে পটাবার চেষ্টা করছে। কিন্তু মেয়ে বাড়ি যাবার জন্য ব্যাকুল। কেননা, দেরী হলে বাবা-মা মেরে হাড্ডি গুঁড়ো করে দেবে! শেষ চেষ্টা হিসেবে রিচার্ড বলছে, ‘Nay ’tis true Kate, and I’le lay our pie-bald Mare against any Horse in the Town, that thou hast as pretty a smelling brow as any Lass in the Countrey.’

কিন্তু দুর্ভাগ্য! কেট এত সহজেই পটে যাওয়ার মত মেয়ে নয়! বরং সে যথেষ্ট বাস্তববাদী! তাই সে রিচার্ডকে উত্তর দিয়েছে, ‘Ay, but Richard will you think so hereafter? Will you not when you have me throw stools at my head; and cry, Would my eyes had been beaten out of my head with a cricket ball, the day before I saw thee.’

কেট এর এই উত্তরটিকে ধরা হয় মূলধারার যে কোন সাহিত্যে সর্বপ্রথম ক্রিকেট এর, কিংবা আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে প্রথমবারের মত ক্রিকেট বলের ব্যবহার!

এডওয়ার্ড ফিলিপস জুনিয়র ক্রিকেট পছন্দ করতেন কী না তা নিশ্চিত হবার কোন উপায় নেই। তবে, তিনি সত্যিই যদি ক্রিকেট খেলাটিকে ভালবাসতেন তাহলে নিশ্চয়ই একটি ক্রিকেট বলকে আঘাত করার বস্তু হিসেবে ব্যবহার না করে অন্য কোন সুন্দর উপমা দিয়েই লিখতেন!

এর প্রায় দুইশ বছর পরের ঘটনা। রাসেল মিটফোর্ড নামক ভদ্রমহিলা ‘The Lady’s Magazine’ এ নিয়মিত আর্টিকেল লিখতেন। পরবর্তীকালে তিনি আর্টিকেলগুলোর একটি সংকলন বের করেন। যার শিরোনাম ছিল ‘Our Village: Sketches of Rural Character and Scenery’। এই সংকলনটিকে ক্রিকেট সংক্রান্ত প্রথম প্রবন্ধ হিসেবে ধরা হয়।

ভদ্রমহিলার লেখার হাত দারুণ ছিল। একটি উদাহরণ দিলে আপনারাও সেটি অনুধাবন করতে পারবেন। গ্রামের দুই ধরণের (ছোটদের এবং বড়দের) ক্রিকেটকে তিনি এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন- ‘ One of young men, surrounded by spectators, some standing, some sitting, some stretched on the grass, all taking a delighted interest in the game; the other, a merry group of little boys, at a humble distance, for whom even cricket is scarcely lively enough, shouting, leaping, and enjoying themselves to their hearts’ content.’

আহ!  অন্য সব বাদ দিয়ে তিনি যদি শুধুই ক্রিকেট নিয়ে লিখতেন!

_______________

ভারতের প্রখ্যাত ক্রীড়া সাংবাদিক অভিষেক মুখার্জী ক্রিকেটসকার.কমে Cricket history in quotes নামক দারুণ একটি সিরিজ লিখেছেন। এই সিরিজে তিনি ইতিহাস খুঁড়ে তুলে এনেছেন সাধারণ মানুষের উক্তিতে বা লেখায় উল্লেখ করা ক্রিকেটের সব দারুণ রেফারেন্স। মজার ব্যাপার হচ্ছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মূল ফোকাস ক্রিকেট ছিল না, অন্য কোন কিছুর সাথে উড়ে এসে জুড়ে বসেছে! আমি অসাধারণ সেই সিরিজটির ভাবানুবাদ করার চেষ্টা করছি।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।