রোজী আফসারী: চোখের পাতায় ভাসে সেই হাসি

১৯৯০ সালের কথা।  তখনও তিনি জীবিত। এক সন্ধ্যায় তাঁর ঢাকার পল্টনের বাসায় বসে তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনি তো এখনও ষাটের দশকের মতো তেমনটি সুন্দরী-হাসিখুশি রয়ে গেলেন।’

আমার কথাটি শুনে উঁনি হাসলেন। সেই হাসি এখনও ক্ষণে ক্ষণে ভাসে চোখের পাতায়। হেসে বললেন, ‘সবটাই সম্ভব হয়েছে আপনাদের আশীর্বাদে।’

তিনি হলেন রোজী আফসারী। রোজী নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন। তাঁর আসল নাম শামীমা আক্তার রোজী। হারানো দিনের কিংবদন্তিতুল্য নায়িকা। তাঁর জন্ম বৃহত্তর নোয়াখালীর লক্ষ্মীপুরে ১৯৪৫ সালের ২৩ এপ্রিল । তাঁর পিতা ওয়ালিউল্লাহ এক সময় কবি ছিলেন।

ছয় ভাইবোনের মধ্যে রোজী ছিলেন সবার বড়। তাঁর লেখাপড়া করা শুরু হয়েছিল উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল থেকে। জুনিয়র ক্যামব্রিজ করেছিলেন ঢাকার  ভিকারুননিসা স্কুল হতে।

১৯৬৩ সাল। বয়স তখন তার মাত্র ১৭ কি ১৮। ওই বছরে তিনি ‘এইতো জীবন’ ছবিতে প্রথম অভিনয় করার সুযোগ পেলেন। ওই ছবিতে রোজীর নায়ক ছিলেন শওকত আকবর। সুমিতা দেবীও ওই ছবিতে নায়িকা ছিলেন, তাঁর নায়ক ছিলেন রহমান।

রোজী নিজেই আমাকে বলেছিলেন, ‘এইতো জীবন ছবিতে অভিনয় করে পারিশ্রমিক পেয়েছিলাম আট হাজার টাকা।’

‘বন্ধন’ ছিল তাঁর দ্বিতীয় ছবি। এই ছবিতে রোজী ১৪ বছরের মেয়ের ভূমিকা ছাড়াও ৪০ বছরের মহিলার ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন।

লাঠিয়াল ছবির জন্য ১৯৭৫ সালে পার্শ্ব-অভিনেত্রীর ক্যাটাগরিতে তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। রোজী মারা যান ২০০৭ সালের ৯ মার্চ, ঢাকায়।  তাঁর সন্তানদের নাম – কবিতা সামাদ ও মোহাব্বত জুবায়ের।

‘নিজেরে হারায়ে খুঁজি’ ছবিতে গোলাম মুস্তাফ‘র সাথে

রোজীর অভিনয় কাল ছিল ১৯৬৩ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত। প্রায় ৪ দশক ধরে তিনি প্রায় ৩৫০টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন।

বিবাহিত জীবনে তিনি সুখী হতে পারেননি বলেই জানা যায়। প্রথম বিয়ে হয়েছিল চিত্রগ্রাহক  আবদুস সামাদের সঙ্গে। পরে তিনি চিত্র পরিচালক মালেক আফসারীর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। তখনই তাঁর নামের সাথে যোগ হয় ‘আফসারী’।

স্বামী ও পরিচালক মালেক আফসারীর সাথে

রোজী অভিনীত উল্লেখযোগ্য ছবি হলো:

  • এই তো জীবন। মুক্তির তারিখ – ১৯৬৪ সালের ১৩ মার্চ। ছবিতে তাঁর নায়ক ছিলেন – শওকত আকবর।
  • সংগম। মুক্তির তারিখ – ১৯৬৪ সালের ২৩ এপ্রিল। ছবিতে তাঁর নায়ক ছিলেন – হারুন।
  • বন্ধন। মুক্তির তারিখ – ১৯৬৪ সালের ৬ নভেম্বর।
  • একালের রূপকথা। মুক্তির তারিখ – ১৯৬৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি। ছবিতে তাঁর নায়ক ছিলেন – আনোয়ার হোসেন।
  • ১৯৬৫ সালে – রাহী। এ ছবিতে তাঁর নায়ক ছিলেন – আনোয়ার হোসেন।
  • ইয়ে ভি এক কাহানী। এ ছবিতে তাঁর নায়ক ছিলেন – হারুন। আওর গম নেহি। এ ছবিতে তাঁর নায়ক ছিলেন – শওকত আকবর।
  • পুনম কি রাত। মুক্তির তারিখ – ১৯৬৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর। ছবিতে তাঁর নায়ক ছিলেন – শওকত আকবর।
  • ইস ধরতি পর। মুক্তির তারিখ – ১৯৬৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর। ছবিতে তাঁর নায়ক ছিলেন – হারুন।
  • উলঝন। মুক্তির তারিখ – ১৯৬৭ সালের ২৬ মে। ছবিতে তাঁর নায়ক ছিলেন – খলিল।
  • ১৯৬৮ সালে – বেদের মেয়ে। এ ছবিতে তাঁর নায়ক ছিলেন – আজিম। অভিশাপ। এ ছবিতে তাঁর নায়ক ছিলেন – শওকত আকবর।
  • ১৯৬৯ সালে – জোয়ার ভাটা। এ ছবিতে তাঁর বিপরীতে ছিলেন – খান আতা।
  • ১৯৭০ সালে – জীবন থেকে নেয়া। এ ছবিতে তাঁর বিপরীতে ছিলেন – শওকত আকবর।
  • ১৯৭৪ সালে – ঈশা খাঁ। এ ছবিতে তাঁর বিপরীতে ছিলেন – আনোয়ার হোসেন।
  • নিজেরে হারায়ে খুঁজি। এ ছবিতে তাঁর বিপরীতে ছিলেন – আনোয়ার হোসেন।
  • ১৯৬৭ সালে – চাওয়া পাওয়া।
  • ১৯৬৮ সালে – সোয়ে নদীয়া জাগে পানি। এতটুকু আশা। রাখাল বন্ধু।
  • ১৯৬৯ সালে – নীল আকাশের নীচে। কসম উস ওয়াক্ত কি।
  • ১৯৭০ সালে – কাঁচ কাটা হীরে। দ্বীপ নেভে নাই। সাধারণ মেয়ে। বড় বৌ।
  • ১৯৭১ সালে – স্মৃতিটুকু থাক। সুখ দুঃখ।
  • ১৯৭২ সালে – সমাধান। মানুষের মন। বাহরাম বাদশা।  জীবন সঙ্গীত। স্বীকৃতি।
  • ১৯৭৩ সালে – রংবাজ। তিতাস একটি নদীর নাম।
  • ১৯৭৪ সালে – পরিচয়। আলোর মিছিল।
  • ১৯৭৫ সালে – লাঠিয়াল।
  • ১৯৭৬ সালে – প্রতিনিধি। সূর্যগ্রহণ। দ্য রেইন।
  • ১৯৭৮ সালে – অশিক্ষিত। নাগরদোলা। দাবী। মহেশখালীর বাঁকে। গোলাপি এখনো ট্রেনে।
  • ১৯৭৯ সালে – সূর্য সংগ্রাম। বেলা শেষের গান।
  • ১৯৮২ সালে – সওদাগর।
  • ১৯৮৩ সালে – মেঘ বিজলী বাদল।
  • ১৯৮৬ সালে – মায়ের দাবী।
  • ১৯৮৯ সালে – ক্ষতিপূরণ।
  • ১৯৯২ সালে – ক্ষমা।
  • ১৯৯৫ সালে – এই ঘর এই সংসার।
  • ২০০০ সালে – হীরা চুন্নি পান্না।

রোজী ছবিতে অভিনয় করা ছাড়াও ছবি প্রযোজনার সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। সেখানে তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজগুলো হল:

  • ১৯৮৭ সালে – ধনী গরীব।
  • ১৯৮৯ সালে -ক্ষতিপূরণ।
  • ১৯৯২ সালে – ক্ষমা।
  • ১৯৯৫ সালে – এই ঘর এই সংসার।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।