খোকনের ছবি মানেই ছিল হিট!

নায়ক-নায়িকা নয়, পোস্টারে একজন পরিচালকের নাম দেখে প্রেক্ষাগৃহে হুমড়ি খেতেন দর্শক। চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে তারকাখ্যাতি পাওয়া যায় – তিনি রেখে গেছেন সেই প্রমাণও। আমাদের দেশে গুনী ক্ষণজন্মা যে কয়েকজন মানুষের কথা বলতে হবে, বিশেষ করে আমাদের চলচিত্র অঙ্গনে। তাদের মধ্যে একজন হলেন প্রয়াত পরিচালক শহীদুল ইসলাম খোকন।

আমাদের দেশের বর্তমান চলচিত্র অবস্থা ও তৎকালীন শহীদুল ইসলাম খোকন এর সম্পর্কে কিছু কথা না বললেই নয়। আমাদের অন্তত আরেকজন শহীদুল ইসলাম খোকন দরকার, চলচিত্রের এই দুর্গম সময়ে। বর্তমান সময়ে যে বিষয়টা সব থেকে বেশি ভাবায় তা হলো আমাদের দেশে মৌলিক গল্পের খুব অভাব।

হাতে গোনা যে কয়েকটি চলচিত্র মৌলিক গল্পের তা যথেষ্ট নয়। অবশ্য যথেষ্ট না হওয়ার কারণও আছে। যেসব মৌলিক গল্পের সিনেমা হচ্ছে সেগুলো দর্শক সেভাবে টানতে পারছে সিনেমা হলে।

এটিএম শামসুজ্জামানের একটি মন্তব্য এই প্রসঙ্গে না বললেই নয়। তিনি বলেছিলেন, ‘খোকনের কাছ থেকে অনেক কিছুই শেখার আছে। স্বল্প বাজেটে কীভাবে দুঃসাহসিক ছবি করা যায় এবং সেটা জনপ্রিয় করা যায়- খোকন সেটা খুব ভালোভাবে করতে পারতেন।’

শুধু প্রেম-ভালোবাসা নয়। রম্য গল্প নিয়েও প্রশংসিত ছবি করেছেন খোকন। দেশপ্রেমসহ চলমান সামাজিক প্রেক্ষাপটও খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরতেন তিনি। দর্শকরা সিনেমা হলে গিয়ে কখনও বঞ্চিত হতেন না বিনোদন থেকে। পরিপূর্ণ বিনোদন নিয়েই ফিরতেন দর্শকশ্রেণী। তাই শহীদুল ইসলাম খোকনের ছবি মানেই ছিল হিট।

নিজের সহকারী পরিচালক নজরুলকে ( আলেকজান্ডার বো) নায়ক বানিয়েছিলেন। সুন্দরী নায়িকা তামান্না, প্রথম সিনেমায় জাতীয় চলচিত্র পুরস্কার পাইয়ে দেয়া নায়িকা সিমলা আর সবচেয়ে বড় দুই আবিষ্কার রুবেল ও হুমায়ূন ফরিদী। হুমায়ূন ফরিদীকে মনে হয় তিনিই একটু ব্যবহার করতে পেরেছিলেন তিনি। আর কেউ সেভাবে পারেননি।

নেতিবাচক চরিত্রে হুমায়ূন ফরীদির আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার পেছনে সবচেয়ে বেশি অবদান ছিলো খোকনের। তার পরিচালনায় ‘সন্ত্রাস’ সুপারহিট হওয়ার পর দেশীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ব্যস্ততম খলনায়কের আসনে বসে ফরীদি। গুণী এই অভিনেতা খোকনকে বুঝতে পারতেন। যে কারণে তার জন্য প্রযোজকও বনেছিলেন ফরীদি। কিন্তু মন্দ কপাল ছিলো দু’জনেরই। ‘পালাবি কোথায়’ ব্যবসাসফল হয়নি।

নায়ক-নায়িকার জুটি হতে দেখেছি, তাই বলে নায়ক পরিচালকের জুটিও হয়! এখন এটা কল্পনা করা দুঃসাধ্য। জুটি বলতে এক দুইটি সিনেমা দিয়ে না। ২৯ টি সিনেমা একসাথে করেন খোকন-রুবেল জুটি। তাদের দুই জনের কারণে এই দেশে মার্শাল আর্ট জনপ্রিয়তা পায়। নিজের প্রথম দুটি সিনেমা ফ্লপ হওয়ার পরেও তিনি থেমে যাননি। তিন নম্বর সিনেমার পর থেকে তাঁকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি।

এই সিনেমা নির্মানের ক্ষেত্রে তিনি কতটা সাহসী ছিলেন তার একটা উদাহরণ দেই। ‘ঘাতক’ সিনেমাতে সরাসরি গোলাম আজমকে তুলে ধরেছেন রাখডাকহীনভাবে। হুমায়ূন ফরীদি গোলামের চরিত্রটিও সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। ছবিটিতে গোলাম আজমের মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তী সময়ের অপকীর্তি তুলে ধরেছেন খোকন।

এটা একই সঙ্গে চ্যালেঞ্জিং ও সাহসী কাজ বলেই স্বীকৃত। কথিত আছে, সিনেমাটি হলে চলার সময় পুলিশ নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত থাকতো। ‘ঘাতক’-এর পাশাপাশি ‘সন্ত্রাস’, ‘কমান্ডার’ ছবিগুলোও দেশদ্রোহীদের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া মসলাদার ছবির বাজার মাত করা এ নির্মাতা তৈরি করেছেন ‘পালাবি কোথায়’ ও ‘বাঙলা’র মতো ভিন্ন মেজাজের ছবি। এ-ও তো কম সাহসের ব্যাপার নয়!

মাঝে যখন আমাদের দেশে অশ্লীলতা ছেয়ে গিয়েছিলো তখনো তিনি তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন। ইহা একটি সিনেমার পোস্টার’-এই একটি বাক্য দিয়ে সিনেমার অশ্লীলতার প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন শহীদুল ইসলাম খোকন। অশ্লীল সিনেমার যুগে নিজের নতুন ছবি ‘যোদ্ধা’র প্রচারে এভাবেই মাঠে নেমেছিলেন খোকন।

গুণী এই পরিচালক অনেক বিষয়ে অটুট থাকতেন নিজের বিশ্বাসে। যেমন তার সময়ে রেকর্ড পরিমাণ পারিশ্রমিক হাঁকাতেন তিনি। এমনকি নায়ক-নায়িকার চেয়েও বেশি ছিলো তার পারিশ্রমিক। খোকন প্রযোজকদের বলতেন, ‘যে শিল্পী আমার চেয়ে বেশি পারিশ্রমিক পাবেন, তিনি পরিচালক হিসেবে আমাকে মূল্য দেবেন না। আমার কথা শুনবেন না। আর এর ফল ভালো হবে না। ফিল্ম ইজ অ্যাবসল্যুটলি ডিরেক্টরস মিডিয়া।’

ছোট বেলায় গ্রামের একটা প্রবাদ শুনেছিলাম। আগের দিনে হালচাষের সময় বলা হতো ‘আগের হাল সেদিক দিয়ে যায়, পেছনের হালও সেদিক দিয়ে যায়’। আমার মনে হয় এখনকার স্বশিক্ষিত পরিচালকগণ এই প্রবাদ শুনেননি অথবা এই জেনারশনের মতো ঐসব ‘বোগাস’ কথা তারা কানে তুলতে নারাজ। আমি জানি না আমাদের দেশের বর্তমান সময়ের পরিচালকরা নিজেদের কিভাবে মূল্যায়ন করে থাকেন।

নিজেদের সিনেমা নিয়ে তারা কোথায় যেতে চান কিংবা এদেশের সিনেমা কে কতুদুর দেখতে চান, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। তবে পুর্বসুরীদের অনুসরণ করলে আমাদের দেশের সিনেমার অবস্থা এতো নাজুক থাকতো না। আর পুর্বসুরীদের মাঝে ‘শহীদুল ইসলাম খোকন’ এর নাম উপরের দিকেই থাকবে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।