ফিল্ডিং ত্রুটি: অতিমানবীয় এক সাইকোলজিক্যাল ব্যারিয়ার

চলতি বিশ্বকাপ ক্রিকেট আসরে আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল গেল দুই জুন দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে। ঠিক এক মাস পর আগামী দুই জুলাই বার্মিংহামের এজবাস্টনে আমরা ভারতের সাথে আমাদের অষ্টম ম্যাচ খেলতে নামবো এবং ম্যাচটি হবে আমাদের জন্য টুর্নামেন্টে টিকে থাকার লড়াই। দেশের বেশিরভাগ ক্রিকেটপ্রেমীর মতে, এবার আমরা আমাদের ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ দল নিয়ে বিশ্বকাপে গিয়েছি।

কেউ কেউ আবার  ২০০৭ এর দলটাকে এগিয়ে রাখেন, এমনকি তামিম ইকবালও ২০০৭ এর দলকে সর্বশ্রেষ্ঠ বলেছেন তাঁর এক সাক্ষাৎকারে। যেহেতু আমাদের বিশ্বকাপ ইতিহাস খুব লম্বা নয় সেহেতু অনূর্ধ্ব ৩০ বছর বয়সী সব বাংলাদেশি বিশ্বকাপে আমাদের দলগুলোর  অর্জন কিংবা ব্যর্থতা নিজ চোখে দেখছেন।

তাই তাঁদের প্রায় সবারই একটা নিজস্ব পছন্দ  থাকবে এটাই স্বাভাবিক। আমি মনে করি একজন লেখকের উচিত যে কোনো উপসংহারে আসার আগে প্রয়োজনীয় তথ্য এবং বিশ্লেষণ পাঠকের জন্য উপস্থাপন করা, নতুবা যে পাঠক সময় নিয়ে কোনো লেখা পড়লেন তাদের প্রতি অন্যায় করা হয়।

তাই কোন দল ছিল সেরা? এই নিয়ে তথ্যবহুল একটা লেখা পরবর্তীতে উপস্থাপনের চেষ্টা অবশ্যই করবো।

আজকের প্রসঙ্গ অন্য।

যা বলছিলাম, শুরু হতে যাচ্ছে আমাদের বিশ্বকাপ মিশনের ‘ডু অর ডাই’ পর্ব। বিশ্বকাপের মতো আসরে সব দলের জন্য এই পর্ব আসে, কারো জন্য জন্য একটু আগে , কারো জন্য একটু পরে। সত্যি বলতে আমাদের ভাগ্যে এই পর্বটা কদিন পরে আসতে পারতো। কোনোরূপ আবেগপ্রসূত হয়ে বলছি না আসলেই!

ভারতের সাথে আমাদের এই ম্যাচটা  বাঁচা মরার লড়াই হতো না, শুধুমাত্র যদি এই বিশ্বকাপে আমাদের দলের ফিল্ডিং আশানুরূপ হতো।

আধুনিক ক্রিকেটে  সব দলের প্রস্তূতি পর্বে  একটা বড় অংশ জুড়ে থাকে ফিল্ডিং সেশন। এরপরও  প্রতিটি দলে একজন বা দুইজন খারাপ  ফিল্ডার থাকেই। যদিও অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডকে এই ক্যাটাগরিতে রাখা যাবে না কোনো ভাবেই। আমাদের দলে মুস্তাফিজ  তেমনই একজন  ফিল্ডার। অনেকদিন যাবৎ মাশরাফি ভালো করে দৌড়াতে পারে না, যদিও খারাপ ফিল্ডারের তালিকায় তার নাম আসবে না কোনোকালেই। মাঠে তাঁর নিবেদন আজো বাকিদের জন্য অনুকরণীয়।

মাশরাফি নিজের এই অনাকাঙ্খিত দুর্বলতা জানে বলেই নিজেকে সব সময় ইনার সার্কেলে রাখে এবং মুস্তাফিজকে  লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করে।  লুকিয়ে রাখা বলতে আমি বুঝাচ্ছি , মাশরাফি চেষ্টা করে মুস্তাফিজকে এমন জায়গায় রাখতে যেখানে বল কম যায়।

বাংলাদেশ দলের বাকি সব খেলোয়াড় ভালো ফিল্ডিং করে বলেই আমরা জানি। সাকিব বরাবরই  অসাধারণ ফিল্ডার ছিল।  তামিম এবং মাহমুদউল্লাহ একযুগ ধরে বাংলাদেশের বাউন্ডারি লাইনের অতন্দ্র প্রহরী। মোসাদ্দেক, সাব্বির, মিরাজ, সৌম্য, লিটন, মিঠুন কিংবা সাইফউদ্দিন এই নামগুলো ব্যাটে কিংবা বলে যেমন-ই হোক না কেন , কখনোই ‘ও খারাপ ফিল্ডার’ – এই দুশ্চিন্তায় ফেলেনি আমাদেরকে।

কিন্তু হতাশাজনকভাবে এই  বিশ্বকাপের শুধুমাত্র উইন্ডিজ ম্যাচ ব্যাতিত কোনো ম্যাচে আমরা ভালো ফিল্ডিং করতে পারিনি। শুধু যদি বলি,  ভালো ফিল্ডিং করতে পারিনি তাহলে আমাদের করা মাত্রাতিরিক্ত বাজে ফিল্ডিংকে আড়ালে প্রশ্রয় দেয়ার মতো হবে।  সত্যি বলতে অধিকাংশ ম্যাচে আমরা যাচ্ছেতাই ফিল্ডিং করেছি।

ইংল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে আমরা কম করে হলেও ৩০/৪০ রান অতিরিক্ত দিয়েছি ফিল্ডিং মিস করে। ইংল্যান্ডের ম্যাচে আমাদের হাত ফস্কে চার হয়েছে , যখন রান আউট হতে পারতো তখন থ্রো হয়েছে ভুল প্রান্তে  , বিপদজনক সব  এক রান বা দুই রান ইংলিশ ব্যাটসম্যানরা নিয়েছে অনায়াসে। একই ঘটনা ঘটেছে অস্ট্রেলিয়ার সাথে, বোনাস হিসাবে ওয়ার্নারের রান আউট এবং ক্যাচ দুটোই মিস হয়েছে।

ওয়ার্নার তারপর আমাদের বোলিংকে যেভাবে কচুকাটা করলো তা ভুলতে সবার অনেক দিন লাগার কথা। অস্ট্রেলিয়ার সাথে আমাদের সাহসী রান তাড়া শেষ পর্যন্ত আফসোস বাড়িয়েছে, শুধুমাত্র ফিল্ডিং ভালো হলেই আমরা ওই ম্যাচে জিততে পারতাম।

নিউজিলান্ডের সাথে কেন  উইলিয়ামসনের ওই দুৰ্ভাগ্যজনক রান আউট ছাড়াও এমন অনেক অনেক মুহূর্ত ছিল যখন ভালো ফিল্ডিং করে রান বাঁচানোর দরকার ছিল কিন্তু বাংলাদেশের ফিল্ডাররা উল্টো রান ছেড়ে দিয়েছে।

আর দক্ষিণ আফ্রিকার সাথে আমরা যে ম্যাচ জিতলাম তা অন্য যে কোনো দলের সাথে খেললে হারতাম বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস । ওই ম্যাচে আমরা ডেভিড মিলার এবং ডুমিনির  ক্যাচ ছেড়েছি সাথে মার্করামের রান আউট মিস করেছিলাম। আমাদের ভাগ্য ভালো থাকার কারণে আমরা এতগুলো ভুল করেও ম্যাচ জিততে পড়েছিলাম। এই তিন জনের যেকোনো একজনও যদি তাদের এই চান্স গুলো কাজে লাগতো তবেই আমরা ম্যাচ হারতাম।

আবার অন্যদিকে উইন্ডিজের সাথে নিশ্চিত আমরা ৩৫০+ তাড়া করতে নামতাম কিন্তু ফিল্ডিং খুবই ভালো করার কারণে আমরা ৩২২ রান তাড়া  করতে নামি। আবার আফগানিস্তানের সাথেও আমাদের ফিল্ডিং মোটামোটি আশাব্যাঞ্জক ছিল।

এক ম্যাচে অসাধারণ ফিল্ডিং এবং অন্য ম্যাচে ফুড়ুৎ- এর কারণ  বিশ্লেষণের ভাষা খুঁজে পেতে বেগ পেতে হচ্ছে । ক্রিকেটে একটা কথা সব সময় বলা হয়,  ব্যাটিং বা বোলিং স্কিল বা ট্যালেন্ট কম-বেশি হতে পারে কিন্তু ফিল্ডিং খারাপ হবার কোন কারণই নেই, যে কোনো দল তার ফিল্ডিং বিশ্বমানের করতে পারে পরিশ্রমের মাধ্যমে।

আজকাল ক্রিকেট ড্রিলিং বা অনুশীলন যে পর্যায়ে পৌঁছেছে সেখানে  ফিল্ডিং খারাপ হবার কোনো যৌক্তিকতা খুঁজে পাওয়া মুশকিল। ৯০ এর দশকে অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার ছাড়া পুরো জিম্বাবুয়ে দলে বাকি সব প্লেয়ার ছিল মাঝারি মানের। তবুও তারা তাদের ফিল্ডিংয়ের জোরে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে শুরু করে সব বড় বড় দলকে খাবি খাওয়াতো।

ফিল্ডিংয়ের আমাদের এমন অধারাবাহিকতার প্রধান কারণ হচ্ছে  জাতি হিসাবে আমাদের মানসিক দুর্বলতা । সাকিব ইংল্যান্ডের ম্যাচ পরে বললেন, ‘যদি দেখেন আমরা ফিল্ডিং ভালো করছি তাহলে বুঝতে হবে ম্যাচে আমরা টপে আছি, আর যদি খারাপ করি তবে বুঝতে হবে আমরা ম্যাচে স্ট্রাগল করছি।’

সাকিবের এই বক্তব্য  খুবই পীড়াদায়ক। কারণ তার এই কথা দিয়ে সে নিজেদের মানসিক শক্তিমত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ঘন্টার পর ঘন্টা প্র্যাক্টিস ড্রিলিং করার পরেও ম্যাচে টপ না থাকলে যখন ভালো ফিল্ডিং করা হয় না তখন বুঝে নিতে হবে মানসিক ভাবে আমাদের দুর্বলতা আছে, বিপদে পড়লে আমাদের খেলোয়াড়রা ঘাবড়ে যায় , তড়িঘড়ি করতে গিয়ে ভুল করে, একাগ্রতায় সমস্যা আছে তাদের।

মানসিক শক্তিমত্তার বিষয়টা আসে ফিল্ডিংয়ে একটা রান আউট করার সময়, রান বাঁচানোর সময় কিংবা বাউন্ডারি লাইনে ক্যাচ ধরার সময়। দিনের পর দিন প্র্যাক্টিসে ঘাম ঝরালেও মানসিক ভাবে শক্ত থাকা এবং মাথা ঠান্ডা রাখা খুবই জরুরি ফিল্ডিংয়ের সময়।  একটা ম্যাচে রান আউট করার সুযোগ আসে একবার বড়জোর দুইবার , এর চেয়ে বেশি আসলে খুব ভাগ্যবান ভাবতে হবে নিজেকে।

যা বলছিলাম, ওই এক বা দুইবার  সুযোগ যে আসে তার স্থায়িত্বকাল খুব কম , বড় জোর ২/৩ সেকেন্ড। এই ২/৩ সেকেন্ডের ভিতরে কাজের কাজটা করে ফেলতে হয়। তখন আসে মাথা ঠান্ডা রাখার ব্যাপারটা। নিউজিলান্ডের বিপক্ষে ঠিক এমন একটা চান্স ছিল কেন উইলিয়ামসন কে রান আউট করার ,কিন্তু মাথা ঠান্ডা না থাকার কারণে তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে গড়বড় হয়ে গেছে মারাত্মক।

ধারাভাষ্যকার ইয়ান স্মিথ তখন বলছিলেন, ‘হয়তো এটা শুধু ম্যাচেরই সবচেয়ে বড় মুহূর্ত নয়, গোটা টুর্নামেন্টেরই সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হয়ে থাকবে।’ – খুবই সত্যি কথা। হয়তো ওই একটি কারণেই নিউজিলান্ড এই বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়নও হতে পারে আর বাংলাদেশ একই কারণে  বিশ্বকাপ নেয়া থেকে বঞ্চিত হতে পারে।

আমার জানা মতে, কদিন পর পর একজন বিশেষজ্ঞ সাইকিয়াট্রিস্ট ক্রিকেটারদের নিয়ে সেশন করেন।  কিন্তু বিশ্বকাপের মতো গুরুত্বপূর্ণ আসরের আগে তার শরণাপন্ন কেন হলো না বিসিবি তা বোধগম্য নয়। বিসিবি হয়তো তাঁর কাছ থেকে আশানুরূপ উপকার পায় নি।

তবে, সাকিবের কথা যদি ভালো করে খেয়াল করা হয়  তবে বোঝা যাবে খেলোয়াড়রা নিজেরাই জানে তাদের সমস্যা কোথায়। তারা বুঝতে পারে, ম্যাচে যদি ভালো অবস্থানে না থাকে  তবে তারা ভালো ফিল্ডিং করতে পারে না, সুতরাং বিসিবির অবশ্যই উচিত এই স্পেসিফিক সাইকোলজিকাল ব্যারিয়ার থেকে খেলোয়াড়দের বের করে নিয়ে আসা।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।