এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট: আন্ডারওয়ার্ল্ড মাফিয়ার মূর্তিমান আতঙ্ক

সিনেমার দর্শকরা কমবেশি সবাই ‘এনকাউন্টার’ শব্দটার সাথে পরিচিত। গ্যাঙস্টাররা যখন নাগালের বাইরে চলে যেতে থাকে, কিংবা পালানোর পথ খুঁজতে থাকে, তখন চূড়ান্ত অ্যাকশনে নামে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আর এই চূড়ান্ত অ্যাকশন হলে, দেখা মাত্রই গুলি করা।

যদিও, মানবাধিকার কর্মী ও গণমাধ্যমের সুবাদে পুলিশের এই ‘অ্যাকশন’ নিয়ে যথেষ্ট তর্ক-বিতর্ক আছে। সেটা যাই হোক না কেন, আন্ডারওয়ার্ল্ড মাফিয়ারা যমের মত ভয় করে এই ‘এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট’দের। আর পুলিশ বাহিনীর কাছে তাঁরা সুপার হিরোর চেয়ে কম কিছু না। আজ তেমনই কয়েকজনের গল্প শুনি চলুন।

  • প্রদীপ শর্মা

তিনি হলেন ভারতের সবচেয়ে ভীতিকর এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট। গুজব আছে কর্মজীবনে তিনি এনকাউন্টারে ৩১২ জন সন্ত্রাসী ঘায়েল করেছেন। যদিও, সরকারী হিসেবে সংখ্যাটা ১০৩। যদিও, তাঁর কিছু দুর্নামও আছে। অনেক হাইপ তোলা লাক্ষ্যা ভাইকে তিনি সরিয়ে দেন। ছোটা রাজনের চক্ষুশূলে পরিণত হন।

গোয়েন্দারা খবর পেয়েছিল, তাঁকে সরিয়ে দিতে উঠে পড়ে লেগেছে ছোটা রাজন। রাম নারায়ন গুপ্ত’র এনকাউন্টারের জন্য তাঁকে আদালতে নেওয়া হয়। চাকরিও চলে যায়। ২০১০ সালে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। যদিও, ২০১৩ সালে আদালতের রায়ে তিনি নির্দোষ বলে প্রমাণিত হন। ২০১৭ সালের আগস্টে আবার তাঁকে ডিপার্টমেন্টে ফিরিয়ে আনে পুলিশ।

এক সাক্ষাৎকারে তিনি একবার বলেছিলেন, ‘মুম্বাইয়ের গ্যাঙগুলো এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছে। এনকাউন্টার আমার নেশা। ছুটির দিনগুলোতে তাই খুব বিরক্ত লাগে।’ এমন একটা চরিত্রকে বলিউডও অবজ্ঞা করতে পারেনি। ‘ডিপার্টমেন্ট’ সিনেমায় তাঁর চরিত্রটি করেছেন স্বয়ং সঞ্জয় দত্ত। ২০১৪ সালের মারাঠি সিনেমা ‘রেগে’-তে মহেশ মাঞ্জেরেকারকে দেখা যায় তাঁর চরিত্রে।

  • দায়া নায়েক

সম্ভবত এই তালিকায় তিনিই সবচেয়ে জনপ্রিয় নাম। তাঁকে নিয়ে ‘আব তাক ছাপ্পান’-এর মত ব্যবসাসফল সিনেমা বানিয়েছেন শিমিত আমিন। এন চন্দ্র’র ‘কাগার‘ বা সঞ্জয় দত্ত অভিনীত ‘ডিপার্টমেন্ট’ও নির্মিত হয়েছে তাঁর জীবন অবলম্বেনে। কন্নড় ভাষায় তাঁকে নিয়ে নির্মিত সিনেমার নামই ছিল ‘এনকাউন্টার দায়া নায়েক’।

২০০৬ সালের আগ অবধি পুরোপুরি সফল ছিলেন দায়া। ৩০০ টিরও বেশি গ্রেফতার, ৮৩-এর বেশি গ্যাঙস্টার নিধন করেছেন। ১৯৯৭ সালে ছোটা রাজনের বিরুদ্ধে এক অভিজানে দু’বার তিনি গুলিবিদ্ধ হন, তবুও জীবিত ফিরে আসেন। তিনি মুম্বাই মাফিয়াদের বুকে কাঁপুনি ধরিয়ে দিলেও ‘এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট’ হিসেবে কখনোই নিজেকে পরিচয় দিতে পছন্দ করতেন না।

দুর্নীতির জের ধরে ২০০৬ সালে তিনি সাময়িক বরখাস্ত হন। যদিও, গোয়েন্দারা তাঁর বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ জোগার করতে না পারায় পুনরায় তাঁকে চাকরিতে বহাল করা হয়। ২০১৪ সালে তাঁর পোস্টিং হয় নাগপুরে। কিন্তু, পরিবারের নিরাপত্তার খাতিরে তিনি জয়েন করতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে, আবার বরখাস্ত হন। ২০১৫ সালে সেই ট্রান্সফার অর্ডার বাতিল করে আবারো তাঁকে চাকরিতে ফিরিয়ে আনা হয়।

  • বিজয় সালাস্কার

অরুণ গাওলির গ্যাঙয়ের জন্য বিজয় সালাস্কার ছিলেন এক মূর্তিমান আতঙ্কের নাম। ২৫ বছরের সার্ভিসে তিনি ‘খতম’ করেছেন ৯০ জন গ্যাঙস্টারকে। এর মধ্যে ৭৫ থেকে ৮০ জনই ছিলেন অরুণ গাওলি গ্যাঙয়ের। ২০০৮ সালের ২৬ নভেম্বর আজমল কাসাবের মুম্বাই তাজ হোটেলে হামলার সময় ৫০ বছর বয়সে তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। ‍মৃত্যুর পর তিনি ২০০৯ সালে ‘অশোক চক্র’ খেতাবে ভূষিত হন।

মৃত্যুর আগে তিনি ছিলেন মুম্বাই পুলিশের অ্যান্টি এক্সটোরশন সেলের প্রধান। তাঁকে ঘিরে বিতর্কও আছে। গুজব আছে তিনি তামাক ইন্ডাস্ট্রি ও শীর্ষ ব্যবসায়ীদের সাথে মিলে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছিলেন। এজন্য, তাকে ইস্যু করা রাইফেলও কেড়ে নিয়েছিল মুম্বাই পুলিশ। গণমাধ্যমের দাবী, সাথে রাইফেল থাকলে হয়তো, ২০০৮ সালের মুম্বাই অ্যাটাক চলাকালে তাঁকে প্রাণ দিতে হত না।

  • শচীন ওয়াজে

মহারাষ্ট্র পুলিশে ১৯৯০ সালে জয়েন করেন শচীন ওয়াজে। শুরুর দিকে তিনি খুব বিনয়ী ছিলেন। মুম্বাইয়ের মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় শান্তি ধরে রাখতে তার অনেক অবদান আছে। কর্মজীবনে তিনি ৬৩ টি সফল এনকাউন্টার করেছে। এর মধ্যে মুন্না নেপালি, কৃষ্ণা শেঠি ও লস্কর-ই-তাইবার সন্ত্রাসীরাও আছে।

শচিন ছিলেন প্রদীপ শর্মার রাইট হ্যান্ট। প্রদীপই মুম্বাই অ্যান্টি এক্সটরশন সেলের হয়ে প্রথম এনকাউন্টারের নেতৃত্ব দেন। নিজের ‘গুরু’র সাথে মিলি দাউদ ইব্রাহিম ও ছোটা রাজনের অনেক শীষ্যকে ঘায়েল করেন তিনি। ২০০৭ সালে তিনি পুলিশের চাকরি ছেড়ে দিয়ে শিব সেনায় যোগ দেন।

চাকরিতে থাকাকালে সাইবার ক্রাইম নিধনেও তাঁর সুনাম ছিল। তিনি ১৯৯৭ সলে সফল ভাবে ক্রেডিট কার্ড কেলেঙ্কারির মূল হোতাদের গ্রেফতার করেন। তিনি একালের গ্যাজেটের চালনা ও নিয়ন্ত্রনের ব্যাপারেও বিশেষজ্ঞ ছিলেন। ২০০২ সালে পুলিশি রিমান্ডে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার খাজা ইউনুসের মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়। রিপোর্ট বলে তিনি ঠাণ্ডা পানি বোঝাই পাত্র দিয়ে ইউনুসের পেটে আঘাত করেন বলেই তাঁর মৃত্যু হয়।

  • রবীন্দ্রনাথ আঙগ্রে

এই ব্যক্তি দেখতে যতটা ভদ্র, ভেতর থেকে তিনি ততটাই নির্মম। তিনি মাফিয়াদের জন্য কতটা ভয়ঙ্কর ছিলেন সেটা বোঝাতে একটা তথ্যই যথেষ্ট। তিনি যখন ৫০ টি এনকাউন্টার সম্পন্ন করেন, তখন হাফ সেঞ্চুরি উপলক্ষ্যে বিশেষ এক পার্টির আয়োজন করেছিলেন।

তাঁকে আন্ডারওয়ার্ল্ড এতটাই ভয় পেতে যে গ্যাঙস্টার সুরেশ মাঞ্চেকর গ্যাঙ ভেঙে দিয়েছিলেন। কিন্তু, আঙগ্রে হাল ছাড়েননি। খুজে বের করে মেরেছেন সুরেশকে। অফিশিয়াল রেকর্ড বলে ক্যারিয়ারে মোট ৫৪ জন সন্ত্রাসীকে মেরেছেন আঙগ্রে। তাঁর আরেক বিখ্যাত এনকাউন্টার ছিল অমর নায়েকের বিরুদ্ধে।

২০০৮ সালে রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী গনেশ ওয়াহ তাঁর বিরুদ্ধে হুমকি, চাদাবাজী ও ডাকাতির অভিযোগ এনে মামলা করেন। এর জের ধরে আঙগ্রেকে গ্রেফতার করে বরখাস্ত করা হয়। কয়েক মাস জেল খাটার পর ২০০৯ সালের মে-তে তিনি মুক্তি পান। ২০১০ সালে আবারো তাকে ওয়াহ’র ভাই মহেশের খুনের মামলায় গ্রেফতার করা হয়। এই দফায় তিনি ৪৯ দিন জেল খাটেন। যদিও, কোনে তথ্য প্রমাণ ও উপযুক্ত সাক্ষীর অভাবে ২০১১ সালে তাকে খালাস করে দেয় আদালত। সব ছেড়ে ২০১৫ সালে তিন ভারতীয় জনতা পার্টিতে (বিজেপি) যোগ দেন।

  • রাজবীর সিং

তিনিই হলেন দিল্লী পুলিশের একমাত্র অফিসার, যিনি কর্মজীবনে মাত্র ১৩ বছরের মধ্যে অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার অব পুলিশ (এসিবি) বনে যান। তিনি ৫১ টি এনকাউন্টারের সাথে জড়িত। তিনি দিল্লী থেকে ভূমি দস্যুদের নিধন করেন।

ডিউটিতে থাকা অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়নি। যদিও, মৃত্যুটা স্বাভাবিকও ছিল না। দিল্লীর গুরুগাওয়ে তাঁকে গুলি করেন তাঁরই ২০ বছর পুরনো বন্ধু ও বিল্ডার বিজয় ভারদুয়াজ। কারণ হল, জমিজমা ও আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত দ্বন্দ। যে বন্দুক দিয়ে গুলি করা হয় সেটা রাজবীরের নিজের।

  • প্রফুল বনসালে

তদন্তের ক্ষেত্রে তাঁর ছিল অতিমানবীয় দক্ষতা। মুম্বাই পুলিশের কুখ্যাত-আলোচিত ‘ডেথ স্কোয়াড’-এর বিখ্যাত সদস্য তিনি। অফিশিয়াল হিসাব বলে তিনি ৯০ জনেরও বেশি সন্ত্রাসীকে ‘ওপরে পাঠিয়েছেন’। কিন্তু, আন-অফিশিয়াল হিসাবে এই সংখ্যাটা আরো অনেক বেশি।

তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত শিকার হলেন আরিফ কালিয়া। তিনি ছিলেন ছোটা শাকিলের শ্যুটার।

১৯৯৮ সালে সিরকা শহরে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সাথে জড়িত ১০১ জনকে এনকাউন্টারে মারা হয়। এরপরের তিন বছরে (১৯৯৯-২০০১) পুলিশের গুলিতে মারা যায় আরো ২৫০ জন গ্যাঙস্টার। এই মিশনগুলোর নেতৃত্ব দেন প্রদীপ শর্মা, বিজয় সালাস্কার, প্রফুল বনসালে ও রবীন্দ্রনাথ আঙগ্রেরা। ফলে, বর্তমান মাফিয়া মুক্ত মুম্বাই গড়ার পেছনে তাঁদের কৃতিত্ব দেওয়াই যায়!

– হিন্দুস্তান টাইমস, টাইমস অব ইন্ডিয়া, দ্য হিন্দু ও মেনএক্সপি অবলম্বনে

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।