ফাগুন হাওয়ায়: আবেগের দোলাচলে চোখে জল

‘ফাগুন হাওয়ায়’ দেখেছি ২১ শে ফেব্রুয়ারিতে। এই দিনটাকে উদযাপন করার এর চেয়ে ভালো উপায় আর কী ছিলো! ফাগুন হাওয়া একুশের গল্প, ভালোবাসার গল্প, বঞ্চনার গল্প, রুখে দাঁড়াবার গল্প। পুরো ছবিতে একটা চমৎকার ভিন্টেজ আমেজ আছে।

সেই সময়ের আবহ ফুটিয়ে তুলতে তৌকির কোনো ছাড় দেন নি।  চায়ের দোকানের কাপ, রেডিও, পোষাক, সবকিছুই সেই সময়ের প্রতিনিধিত্ব করেছে। তিশা আর সিয়ামের সম্পর্কটা সেই পুরোনো আমলের রাজ্জাক-ববিতার কথা মনে করিয়ে দেয়। সেই সময়ের পরিমিতি আর রুচি একটা প্রশান্তির অনুভূতি দিয়েছে। মফস্বলের তরুণ-তরুণীদের নাটকের নীল দর্পন নাটকের রিহার্সেল দেখতে দেখতে আক্ষেপ জেগেছে, এখন পাড়ায় পাড়ায় এমন হয় না কেন?

সিনেমার মূল শক্তির জায়গা হলো এর মেটাফর, অজস্র ডাবল মিনিং। পশ্চিম পাকিস্তানী পুলিশ অফিসার যশপাল শর্মা যখন বউ কথা কও পাখিকে উর্দুতে ‘বিবি বাত করো’ ডাকার নির্দেশ দেয়, তখন এটা সাদা চোখে একটি উন্মাদ চরিত্রের বিকলন মনে হতে পারে, কিন্তু আসলে এর অর্থ আরো গভীর।

মানুষের মুখের ভাষা কেড়ে নেয়া মানে তার চারপাশে একটা বিশাল বদল আসা। তখন সবকিছু অচেনা মনে হয়। এই নদী, পাখি, গ্রাম, ভাষা সব মিলেই তো আমাদের দেশটা, মাতৃভাষা ছাড়া কি আর কোনকিছু আগের মত লাগবে কারো কখনও? ওরা আমাদের মুখের ভাষা কেড়ে নিচ্ছিলো, ওরা কেড়ে নিচ্ছিলো আমাদের জীবনের সমস্ত রঙ এবং সুর।

নীল দর্পন নাটকের রিহার্সেলের মাধ্যমেও অনেক বক্তব্য উঠে এসেছে। ওটা শুধু একটা নাটকের রিহার্সেল ছিলো না। সেখানে মুসলীম লীগের দালাল ছেলেটাকে অত্যাচারী সাহেবের ভূমিকায় দেখানোটা বেশ অর্থবহ ছিলো। নাটকের রিহার্সেলের সাথে সাথে সবুজ এই দেশে ঘনিয়ে আসা সংকট চিত্রিত হয়েছে চমৎকারভাবে।

যশপাল শর্মার স্বপ্নে বউ কথা কও পাখিদের দ্বারা আক্রান্ত হওয়া- একটা মনে রাখার মত দৃশ্য। সেই সময় আন্দোলনও কিন্তু জমাট বাঁধছে!

ফারুক আহমেদ (সিনেমায় তাঁর চরিত্র হুজুরের, যে যশপাল শর্মার আদেশে সবাইকে উর্দু শেখাতো), জ্বীনের ভয়ে কাবু হবার পর খাস বাংলায় কথা বলাটা জানিয়ে দেয়- যতই উর্দু নামক কুৎসিত ভাষায় পারঙ্গম হও না কেন, আদিম অনুভূতি প্রকাশে মায়ের ভাষা ছাড়া অবলম্বন নেই!

তবে এই ভূতের ভয় দেখানো নিয়ে দুটি কথা আছে। ফারুক আহমেদকে ভূতের ভয় দেখানোর দৃশ্যের চিত্রায়ন খুবই, খুবই দুর্বল ছিলো। মনে হচ্ছিলো আলিফ লায়লা দেখছি। তাও আবার একবার না, দু’বার এই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। আর সবচেয়ে হাস্যকর ছিলো পাকিস্তানি পুলিশ অফিসারকে থানায় গিয়ে ভুতের ভয় দেখিয়ে আসাটা। এটা ঠিক কোন যুক্তিতে করলেন তৌকির, আমি জানি না। কাঁচা কাজ হয়েছে।

সিনেমার গান ভালো ছিলো, কিন্তু সিনেমায় যে সাদাকালো যুগের আবহ ছিলো, তার সাথে যায় নি। বর্তমান যুগের মিহি গলার অতিমাত্রায় পরিশোধিত গানগুলির মত লেগেছে।

সিনেমার শেষের দিকে বহুমাত্রিক অনুভূতিতে বিহবল হয়েছি। আবেগের দোলাচলে চোখে জল এসেছে। বুকের মধ্যে জমেছে গৌরবের আর্দ্রতা।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।