রিয়েলিটি শো’র বাতিল সেই ছেলেটা

‘বড়ো ইচ্ছে করছে ডাকতে, তোর গন্ধে মেখে থাকতে, কেন সন্ধ্যে সন্ধ্যে নামলে সে পালায় – ২০১২ সালের একেবারে শেষের দিকে রাজ চক্রবর্তীর ‘বোঝে না সে বোঝে না’ সিনেমার এই গান বাঙালি শ্রোতাদের হৃদয়ে ভীষন ছাপ ফেলেছিল।

সিনেমার গানে সাদা পোশাক পরা নায়ক-নায়িকার পাশাপাশি গিটার কাঁধে নিয়ে কালো পোষাক পরা একজন অপরিচিত নবীন গায়ক গানটি গেয়ে যাচ্ছেন। শ্রোতারা মুগ্ধ হচ্ছেন। গানের জগতে এই নবীন গায়কের সফল জয়যাত্রা হলো এই গানের মাধ্যমে।

এর কিছুদিন পরেই সাড়া ফেললো বলিউডের ‘আশিকি ২’ সিনেমার গান। এই সিনেমার ‘তুমি হি হো’ গানটির তুমুল জনপ্রিয়তার কথা একবাক্যে সবাই মেনে নিবেন। সেই সুবাদে বাংলা ও হিন্দি গানের জগতে রাজকীয় ভাবে প্রবেশ করেছিলেন সেই নবীন গায়কটি।

আজ তিনি প্রতিষ্টিত। তিনি গত অর্ধ যুগ ধরে তিনি বলিউডের সবচেয়ে জনপ্রিয় গায়ক। ভারতীয় বাংলা গানেও রয়েছে বেশ জনপ্রিয়তা। তিনি হলেন অরিজিৎ সিং।

অথচ, একটা সময় তিনি তাকে বাতিলের খাতাতেই ফেলে দিয়েছিল সনি টেলিভিশনে প্রচারিত রিয়েলিটি শো ‘ফেম গুরুকুল’। সেটা ২০০৫ সালের কথা। ইন্ডিয়ান আইডলের ব্যাপক জনপ্রিয়তার রেশ ধরে সনি এন্টারটেইনমেন্ট নতুন আরেকটি রিয়েলিটি শো নিয়ে আসে। তারা নতুন একটি গানের জুটির সন্ধানে ছিলেন।

সেখানে ছিলেন ১৮ বছর বয়সী অরিজিৎ সিং। গানের গলাটা দারুণ হলেও তাঁর মধ্যে কোনো এক্স ফ্যাক্টরের বালাই তখন ছিল না। ফলে, দর্শকরা গ্রহণ করেনি তাঁকে। সেরা ছয়ে পৌঁছানোর পর দর্শকদের ভোটে বাদ পড়েন তিনি। অথচ, সেবার যারা বিজয়ী হয়েছিলেক গায়কীতে তাঁদের চেয়ে ঢেঁর এগিয়ে ছিলেন অরিজিৎ।

সেটা তো হওয়ারই কথা। কারণ গায়ক হওয়ার জন্য অরিজিতের প্রস্তুতিপর্বটাও ছিল মনে রাখার মত। তিনি ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তালিম নিয়েছেন গুরু রাজেন্দ্র প্রসাদ হাজারির কাছ থেকে। তবলা শিখেছেন ধীরেন্দ্র প্রসাদ হাজারির কাছে। আধুনিক সঙ্গীত, বাংলা গান ও লোকগীতিতে তাঁর শিক্ষক ছিলেন বীরেন্দ্র প্রসাদ হাজারি। অরিজিতের তালিম নেওয়ার শুরু হয় সেই তিন বছর বয়স থেকে। নয় বছর বয়সে তিনি সঙ্গীতের জন্য ভারতীয় সরকারের বৃত্তিও পান। বোঝাই যাচ্ছে, একজন সঙ্গীতজ্ঞ হতে যা যা দরকার তার সবটাই করেছেন অরিজিৎ।

ফেম গুরুকুলের পর একটা সময় পর ভাগ্য অন্বেষণে মুম্বাইয়েই থেকে গেলেন। যাত্রাটা সহজ ছিল না। সব ছেড়েছুড়ে বাড়ি চলে যাওয়ার কথাও ভেবেছিলেন তিনি। একবার সেসব দিনের স্মৃতিচারণা করে বলেছিলেন, ‘যেকোনো লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য কষ্ট সহ্য করতে হয়। যেসব দিন আমি কোনো কাজ পাচ্ছিলাম না, তখন ভেঙে পড়েছিলাম। এমনকি বাড়ি ফিরে যাওয়ার কথাও ভেবেছিলাম। পরে আমি নিজের মনকে বুঝিয়েছিলাম, যাই হোক না কেন, সব ভুলে আমাকে কাজে মন দিতে হবে।’

ফেম গুরুকুুলের সেই ক্ষুদে অরিজিৎ

বলিউডের প্লে-ব্যাকের সুযোগ আসে, আবার হারিয়েও যায়। বানশালীর ‘সাওয়ারিয়া’ সিনেমা অরিজিতের গাওয়া গানটি আদৌ প্রকাশই করা হয় নি। অবশেষে সুযোগ আসে মার্ডার ২ সিনেমার ‘ফির মোহাব্বত’ গান দিয়ে, এজেন্ট বিনোদের ‘রাবতা’ গান গুলো করার।

বারফির গানের পর মাহেন্দ্রক্ষণ আসে মহেশ ভাটের ‘আশিকি ২’ সিনেমার অ্যালব্যাম দিয়ে। তুমুল জনপ্রিয়তা পায় এই অ্যালব্যামের গান গুলো। বলা বাহুল্য বলিউডে এই দশকের সবচেয়ে জনপ্রিয় সিনেমার অ্যলব্যাম এটাই হবে। এরপর হিন্দি গানে শুরু হল অরিজিতের শুভযাত্রা।

আর পিছনে ফিরে তাকানোর কিছু নেই। একের পর এক সিনেমায় প্লে-ব্যাক করতে লাগলেন। খোদ সেই একই বছরেই কাবিরা, কাশ্মির তু – ম্যায় কন্যাকুমারী, ম্যা রাঙ শারবাতো ক্যা, হার কিসি কো, কাভি যো বাদল বারসে’র মত জনপ্রিয় গান উপহার দিয়েছিলেন।

অরিজিৎ সিং তাঁর হিন্দি গানের ক্যারিয়ারে অনেক জনপ্রিয় গান গেয়েছেন। ‘দিলওয়ালে’ সিনেমায় শাহরুখ খানের কণ্ঠে যেমন ‘গেরুয়া’ গেয়ে দারুণ সাড়া জাগিয়েছিলেন। তেমনি পদ্মাবতের জিম শার্বের কণ্ঠে ‘বিনতে দিল’ গেয়ে সবার প্রশংসা পেয়েছিলেন। সিটি লাইটস সিনেমার ‘মুসকুরানে’ গানটার কথা বিশেষ ভাবে বলতে হয়।

করণ জোহরের ‘অ্যায় দিল হ্যায় মুশকিল’ সিনেমাটি দর্শকনন্দিত হয়নি, তবে এই সিনেমার অরিজিত সিং এর কণ্ঠে চান্না মেরেয়া, ব্রেকআপ সং থেকে টাইটেল সং-এর জন্য শ্রোতাদের কাছে অনেকদিন মনে থাকবে। ‘রয়’ সিনেমা নিয়েও দর্শকদের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়, তবুও এই সিনেমায় তাঁর গাওয়া ‘সুরুজ ডুবা হ্যায়’ গানটি শ্রোতাপ্রেমীদের কাছে বিশেষ কিছু হয়ে থাকবে।

‘টু স্টেইটস’ সিনেমার ‘মাস্ত মাগান’, জাগ্গা জাসুসের ‘গালতি সে মিস্টেক’, ‘রাজি’-তে ওয়াতান থেকে সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া ‘কলঙ্ক’ সিনেমার ‘ফার্স্ট ক্লাস’, টাইটেল সং সহ বহু গানে বিশেষ দ্যুতি ছড়িয়েছিলেন। তামাশা সিনেমায় ‘তুম সাথ হো’ গানে অলকা ইয়াগনিকের সঙ্গে দ্বৈত গান গেয়েছেন। শ্রেয়া ঘোষালের সঙ্গে জুটি বেশ জনপ্রিয়। বলিউডে যেসব সঙ্গীতজ্ঞ উচ্চশিখরে আছেন তাদের সাথে কাজ করার তেমন সুযোগ পাননি। বেশি কাজ করেছেন প্রীতম-জিৎ গাঙ্গুলিদের সাথে। কাজ করেছেন তাঁদের সহকারী হিসেবেও।

অরিজিৎ সিংয়ের বাবা পাঞ্জাবি ও মা বাঙালি। ছোট বেলা কাটিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গে। তাই বাংলা গানের প্রতি আলাদা একটা টান থাকবে স্বাভাবিক। আর অরিজিতের মা তবলা বাজাতেন। শেখান থেকে অরিজিৎ চলে আসেন গানের ভূবনে। নিজেকে একালে তিনি ‘স্পেশাল’ করে তুলেছেন বাংলা গানে। বাংলায় প্রথম প্লেব্যাক করেন ‘এগারো’ সিনেমায়। তবে আলোচিত হন ‘বোঝে না সে বোঝে না’র দারুণ সাফল্যের পর।

জিৎ-এর কণ্ঠে বস সিনেমার ‘মন মাঝি রে’ তো তুমুল জনপ্রিয় গান। অন্যদিকে ‘চাঁদের পাহাড়’ গানটা যেন অরিজিতের জন্যই গড়া। তবে বিশেষ করে বলতে হয়, কৌশিক গাঙ্গুলির খাদ সিনেমার ‘দেখো আলোয় আকাশ ভরা’ গানটির কথা। দারুণ সঙ্গীতায়োজন হয়েছিল গানটি, মায়া ভরা কণ্ঠে গানটি গেয়েছিল অরিজিত।

অপুর প্যাঁচালীর গানটাও মুগ্ধ হবার মতন। বালির শহর, তোমাকে ছুঁয়ে দিলাম, এগিয়ে দে, শুধু তোমার জন্য, বরবাদ-সহ বাংলায় আরো জনপ্রিয় গান গেয়েছেন। সিনেমার গানের বাইরে শুদ্ধ সঙ্গীতের ধারক কৌশিকি চক্রবর্তীর সঙ্গে ‘কিছু কিছু কথা’ গানটাও বেশ শ্রুতিমধুর। বাংলা গানে অবশ্য এখন কম সময় দেন। বাংলাদেশে ‘ঢাকা অ্যাটাক’ ছবিতে গেয়েছেন টুপটাপ গানটি। যৌথ প্রযোজনার ‘শিকারী’ ছবিতেও গান গেয়েছেন।

অরিজিৎ সিং যখন জনপ্রিয় হচ্ছিলেন, তখন অনেকেই বলেছিলেন খুব দ্রুত হারিয়ে যেতে পারেন। কিন্তু তা তিনি হতে দেননি। তাঁর নিজের সীমাবদ্ধতা অবশ্যই আছে, তবে তাঁর চেয়েও বেশি সীমাবদ্ধতা এখন বলিউডের গীতিকার ও সুরকারদের। আজকাল বলিউডেই গান খুব কম জনপ্রিয় হয়, যেখানে আগে ছিল জনপ্রিয় গানে পরিপূর্ণ। অরিজিৎ সিং বক্স অফিসের শীর্ষ নায়কের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে তাঁর সিনেমা থেকে নিষিদ্ধ হয়েছেন বলতে গেলে ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে। সেই ধাক্কাটাও তিনি সামলে উঠেছেন।

এই অল্প সময়ের বর্নাঢ্য ক্যারিয়ারে পাঁচবার ফিল্মফেয়ার পেয়েছেন। এর মধ্যে পরপর চারবার পেয়ে গেছেন। এখন তিনি কুমার শানুর রেকর্ড ভাঙার অপেক্ষায় আছেন। ছোট্ট একটা ক্যারিয়ারে তিনি ২০০ টির ওপর গান গেয়ে ফেলেছেন।

ব্যক্তিজীবনে বিয়ে করেছেন প্রেমিকা কোয়েল রায়কে। মুম্বাইয়ের আন্ধেরিতে তাঁদের সুখের সংসার। ২০১৪ সালে বিয়ে করা এই দম্পতির দুই সন্তান। দাম্পত্যজীবনেও তিনি বেশ পরিচ্ছন্ন মানুষ। জীবনটাও বেশ সাদামাটা। গাড়ি চড়ার চেয়ে এখনো পাবলিক ট্রান্সপোর্টেই ভরসা রাখেন তিনি। সীমাবদ্ধতা থাকার পর এই পরিচ্ছন্নতা আর সাদামাটা জীবনটাই এখন অবধি তার ক্যারিয়ারে সাফল্যের চাবিকাঠি।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।