ফেসবুকের টেন ইয়ারস চ্যালেঞ্জে কি আদৌ উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু আছে?

ফেসবুকের টেন ইয়ারস চ্যালেঞ্জ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে বেশ কিছু লেখা চোখে পড়লো। তাদের অভিমত, ফেসবুক এর ফলে লাভবান হবে, আমরা ক্ষতিগ্রস্থ হবো। লেখাগুলি মূলত কেট ও’নিল নামক একজন টেক বিশেষজ্ঞের মতামতের বর্ধিত রূপ। কেট ও’নিল জানাচ্ছেন, আমরা এই টেন ইয়ার চ্যালেঞ্জ দিয়ে ফেসবুকের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সকে আরো সমৃদ্ধ করছি, তাদের ফেস রিকগনিশন প্রযুক্তিকে উন্নত হতে সাহায্য করছি। আমার প্রশ্ন হলো, এতে সমস্যা কোথায়? কেট ও নিল একটি সমস্যার কথা উল্লেখ করেছেন।

সেটা হলো, বীমা কোম্পানিগুলি মানুষের চেহারার দশ বছরে বদলে যাওয়ার প্যাটার্ন দেখে সে অনুযায়ী মৃত্যুর দিন হিসেব করে প্রিমিয়ামের রেট ধার্য করবে। ওহো, খুব আশঙ্কার কথা! মানুষের মৃত্যু যেন একটা গাণিতিক ব্যাপার, এটা যেন ঐকিক নিয়মে হয়! হাহা! আর কী কী অসুবিধা? ব্ল্যাক মিরর নামক নেটফ্লিক্স সিরিজে নাকি দেখিয়েছে এক শহরে সবাইকে হাসি হাসি মুখ করে রাখতে হয়, নাহলে সোশাল স্ট্যাটাস কমে যায়, সুবিধা কম পাওয়া যায়।

এটা হলো ফেস রিকগনিশ প্রযুক্তির একটি কাল্পনিক অসুবিধা, নেটফ্লিক্স সিরিজের ওপর ভিত্তি করে। তবে সত্যিকারের কাজ হচ্ছে চিনে। সেখানে কোটি কোটি ক্যামেরা বসেছে, এবং সবার ফেস আইডি আছে। রাস্তাঘাটে কেউ কোন পাবলিক নুইসেন্স করলে তৎক্ষনাৎ লাইভ টিভিতে তাকে দেখিয়ে লজ্জা দেয়া হবে।

তো এসব হচ্ছে ফেস আইডির অসুবিধা। হ্যাঁ, অসুবিধাগুলো অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু আমি সুবিধাই বেশি দেখছি। তিনটার বিপরীতে ১০০টা উল্লেখ করা যাক? এই যেমন ধরেন আপনার শিশুর ছবি ব্যবহার করে কেউ মিম বানালো (এর থেকে অনেক খারাপ কিছু হতে পারে, আমি আপনাকে শঙ্কিত করতে চাইছি না), আপনার কাছে নোটিফিকেশন চলে এলো! কোন সন্ত্রাসী খেতে গেলো রেস্টুরেন্টে, ধরা খেয়ে গেলো, আপনার ছবি ব্যবহার করে কেউ ফেইক একাউন্ট খুললো, আপনি জেনে গেলেন। এরকম অজস্র, অজস্র সুবিধা দেখানো যাবে ফেস রিকগনিশনের।

ফেসবুক যদি বাড়তি কিছু সুবিধা নিতে চায়, নিক না! আপনি লেটেস্ট মডেলের ফোনে ফেস লক না থাকলে মাইন্ড করেন, নিজের চেহারা সুন্দর করে সেট করে রাখেন প্যাটার্ন হিসেবে, আর এখন ফেসবুক ১০ বছরের ডাটা নিয়ে অ্যানালাইজ করে কাকে কী সুবিধা দিবে এতে এত চিন্তিত!

টেন ইয়ার চ্যালেঞ্জ দিয়ে ডাটার ইনসাইট পাওয়া যেতে পারে, যা দিয়ে ম্যানিপুলেটিভ মার্কেটিং কনটেন্ট তৈরি করা যাবে, এবং কোম্পানিগুলো লাভবান হবে। আপনার ফেইস হ্যাক করার জন্যে আপনি ফেসবুকে অসংখ্যবার ছবি দিয়েই থাকেন। এখানে টেন ইয়ার চ্যালেঞ্জকে দোষ দিয়ে লাভ কী!

এখন কথা হচ্ছে, কোম্পানিগুলোর লাভবান হওয়া নিয়ে আপনার আপত্তি। এই প্রসঙ্গে সেদিন আরেকটা কনটেন্ট দেখলাম, নেটফ্লিক্সের সাম্প্রতিক ইন্টারএ্যাকটিভ একটা এপিসোড নিয়ে। সেখানে আপনাকে বারবার বেছে নিতে হচ্ছে চরিত্র, বস্তু, খাবার, গাড়ির মডেল ইত্যাদি। তো এই প্যাটার্নগুলি দিয়েও আপনি মহাভুল করে ফেলেছেন। কী ভুল? এখন নেটফ্লিক্স এই ডাটা বড় বড় কোম্পানিগুলিকে দিবে, তারা আপনার পছন্দ অনুযায়ী প্রোডাক্ট বানাবে, সেই অনুযায়ী আপনি এ্যাড দেখবেন, এই হচ্ছে অসুবিধা।

আমি এখানে কোন অসুবিধা দেখি না। আপনি একজন সুখী সক্ষম পুরুষ সারাদিন যৌনশক্তিবর্ধক ঔষধের অ্যাড দেখার চেয়ে নিজের পছন্দের অ্যাডটাই দেখেন, সমস্যা কী!

এখন কথা হচ্ছে, এত বিজ্ঞাপন কেন! হ্যাঁ, এটা একটা কথা বটে। আগে টিভিতে এ্যাড ছিলো, ভালো লাগতো না বলে আপনি ইউটিউবে চলে এসেছেন। ইউটিউবে এখন বিজ্ঞাপনের পরিমাণ বাড়ছে। এখন আপনি শান্তিমত ইউটিউব দেখতে পারেন না। কিছুদিন পর বিজ্ঞাপন আরো বাড়বে। তখন হয়তো ইউটিউব ছাড়বেন, কিন্তু নতুন কিছু চলে আসবে। সেখানে কিছুদিন ট্রাফিক কম থাকবে, তারপর যখন কাস্টমারের আনাগোনা বৃদ্ধি পাবে, তখন কোম্পানিগুলিও টাকার বস্তা নিয়ে হাজির হয়ে যাবে।

তারা কি এমনি এমনি টাকা ঢালছে? জ্বী না। আপনি প্রোডাক্ট কিনবেন বলেই টাকা ঢালছে। আপনি যদি মনে করেন, আপনি কোন বিজ্ঞাপনে মোহিত হয়ে টাকা ঢালবেন না, আপনি কিছু কিনবেন না, খুবই ভালো।

কিন্তু আপনার কি কোনকিছু কেনার দরকার নাই? অবশ্যই আছে। আপনি বনে-বাঁদাড়ে থাকেন না। আপনাকে লোকালয়ে থাকতে হয়। সুপারস্টোরে যেতে হয়, অনলাইন শপেও ঢু মারেন। জিনিসপত্র তো আপনার কেনা লাগবেই! আপনি নিজে এ্যাড পছন্দ করেন না, আবার আপনি নিজেই পছন্দের প্রোডাক্টের পেইজে গিয়ে রিভিউ দিয়ে শেয়ার করেন, তারা আপনাকে পেয়েছে কীভাবে? তারা লক্ষ লক্ষ কাস্টমার পেয়েছে কীভাবে? এ্যাডের মাধ্যমে।

আপনি ব্যবসা অপছন্দ করেন। আপনি সাদাসিধে চাকুরি করে জীবনযাপন করেন। কিন্তু আপনাকে যে বেতন দেয়, তার টাকাটা আসে কোথা থেকে? সে অন্য কোথাও বড় বেতনে চাকুরি করে আপনার জন্যে টাকা এনে দিচ্ছে? জ্বী না, একদম ওপরে যে বসে থাকে, তাকে ব্যবসার মাধ্যমেই টাকা কামাতে হয়। আর সেই ব্যবসার জন্যে লাগে প্রোডাক্ট, অথবা সার্ভিস। সেগুলোর এ্যাড আপনাকে দেখতে হয় আর কী, আপনি নিজেও এই অ্যাড তৈরির রকটি অংশ হয়ে আছে।

এই ব্যবসার টাকা দিয়েই চলে যাবতীয় ওয়েলফেয়ার, কল্যাণ সমিতি, সিএসআর ইত্যাদি। এই হাইটেক যুগে আপনাকে ভালো কন্টেন্ট পেতে হলে হয় প্রচুর অ্যাড দেখতে হবে, অথবা পেইড সার্ভিসে চলে যেতে হবে। এর বিকল্প দেখি না।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।