এক্সট্র্যাকশন ও ‘এ কেমন আজব বাংলাদেশ!’

যেকোনো ছবি বা সিরিজ দেখতে বসে প্রথম আমি যেটা খুঁজি সেটা হচ্ছে ‘ডিটেইলিং’। আমার মনে হয় ডিটেইলং বা ছোট ছোট জিনিস ঠিকঠাকমত করলে ছবিটার সৌন্দর্য দ্বিগুণ হয়ে যায়। ‘এক্সট্র্যাকশন’ ছবিটা আমার কাছে এই জায়গাতেই মার খেয়েছে।

আমার কোনো সমস্যা নেই এখানে ‘এ কোন বাংলাদেশ দেখালো?’ বা এই ছবিতে ‘বাংলাদেশের ভাবমূর্তি কোথায় গেল?’ তা নিয়ে। বাংলাদেশের ভাবমূর্তি এর চেয়ে খুব ভাল অবস্থানে যে নেই তা স্যোশাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের স্ট্যাটাস দেখলেই স্পষ্ট হয়ে যায়। তো ছবিতে সেই ব্যাপারগুলো দেখানোতে খুব সমস্যা হওয়ার কথা নয়।

দেশের অসাধু ব্যবসায়ী বা মাফিয়ারাই সব কন্ট্রোল করে না – এটা যদি আপনার ধারণা হয়ে থাকে তাইলে আমি বলবো আপনি অন্ধ। ক্ষমতার হাত কত লম্বা হতে পারে, সেটা আপনার জানা নেই। আর দুনিয়ার সব ছবিতেই দেখা হয় ব্যবসায়ীরা পুলিশ বা সরকারকে নিয়ন্ত্রন করে।  বাংলা সিনেমাতেই মিশা সওদাগর যখন হাঁক ছেড়ে বলে, ‘অ্যাই ইন্সপেক্টর! ২৪ ঘন্টা সময় দিলাম মাইয়াডারে তুইল্লা নিয়া আয়’ তখন আপনাদের এসব সেন্স কই থাকে?

তাই, বাংলাদেশের রিপ্রেজেন্টেশনে আমার কোনো সমস্যা নাই। কিন্তু, কিভাবে দেখালো তা নিয়ে আলাপ করা যেতে পারে। এখানে ডিটেইলিংয়ের অভাব তীব্র। একই সাথে আমাদের নিজস্ব কিছু ব্যর্থতাও ফুটে ওঠে

প্রথমত, কেন একজন বাংলাদেশি মাস্তান কলকাতার ‘পয়সা দিয়ে ফুটে যা বাড়া’ টাইপ একসেন্টে কথা বলবে! কেন একজন বাংলাদেশি ড্রাগ লর্ড এমন বাংলায় কথা বলবে যেন মনে হয় যে সে আফগানিস্তান থেকে দু’দিন হল বাংলাদেশে আসছে! বিশ্বাস করেন, স্বয়ং ক্রিস হেমসওর্থই একমাত্র মানুষ যার বাংলা শুনে মেজাজ খারাপ হয়নি। প্রায় শুদ্ধ উচ্চারণে ‘প্রমাণ দাও’ আর ‘সুলতানা কামাল ব্রিজ’ বলেছে যে মনটা ভরে গেছে।

আচ্ছা সংলাপ বাদ দেই। পুলিশের গাড়ি, র‍্যাবের ইউনিফর্মের উপর লেখাগুলা দেখেছেন? জাস্ট অভ্র কি বোর্ড দিয়ে কয়টা বাংলা শব্দ লিখে সেগুলো এনলারজ করে সেটে দিয়েছে! এমনকি অনুবাদের সময় বানানটাও তারা খেয়াল করেনাই! ড্রাগ লর্ডকে সাহায্য করা র‍্যাবের বড় অফিসার যে ছিল, তার নাম সম্ভবত ‘বজলুর রশিদ’ রাখতে চেয়েছিল, সেটা নেম প্লেটে লেখা ‘বাজলুর রশীদ’। সিএনজির উপর লেখা ‘আল্লাহ্‌ সারভ শাকতিমান’, প্রতিটা বাসায় বাসায় হিন্দি গান বাজানো – একদম যাচ্ছেতাই অবস্থা।

এখন আমাদের ব্যর্থতাটা বলি। এই ছবিতে শুনেছি ওয়াহিদ ইবনে রেজা, আরিক আনাম খান-সহ পুরো একটা বাংলাদেশি টিম ছিল। তারা প্রোডাকশন ভ্যালু চেইনের কোন লেয়ার পর্যন্ত ছিল আমি জানিনা। তাদের কাজ যদি খালি ‘সংলাপ লিখে দেওয়া’ পর্যন্ত থাকে তাইলে ঠিক আছে।

কিন্তু, যদ্দুর শুনেছি তাদের অনেকে সেট ডিজাইন, কস্টিউম ডিজাইন থেকে শুরু করে চরিত্রদের রীতিমত বাংলা ভাষাতে দক্ষ করার দায়িত্বেও ছিলেন! তাহলে, আমাকে বলতেই হয় এটা খুব ছেলেমানুষি কাজ হয়েছে। বাংলাদেশি হিসেবে ছোট ছোট কিন্তু চোখে লাগার মত ব্যাপারগুলো তাদের ধরিয়ে দেওয়ার দরকার ছিল। এই হাস্যকর সব ভুলের দায়টা তাই আমার-আপনার স্বদেশিদেরই।

দ্বিতীয় যেটা খারাপ লেগেছে, সেটা হচ্ছে ছবির ৯০ ভাগ জুড়েই যখন বাংলাদেশকে ‘দেখানো’ হয়েছে, তখন তাতে অন্তত একজন বাংলাদেশি অভিনেতার দরকার ছিল। এটা ওয়াহিদ ভাইদের ব্যর্থতা। আদতে, এটা আমাদের মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রিরই ব্যর্থতা। আমাদের কনটেন্টের যে মান, তাতে একজন অভিনেতা বা অভিনেত্রীকে স্বীকৃতি দেওয়ার মত কাজই তো খুজে পাওয়া যায় না। ‘এক্সট্র্যাকশন’-এ তাই ভারতীয় আর কলকাতার অভিনয়শিল্পী দিয়ে বোঝাই। তাদেরই নেওয়া হয়েছে যারা অভিনয় যাই জানুক না কেন, তাদের সর্বজনস্বীকৃত কাজ আছে। আমাদের তাই কেউ নেই।

‘আমির আসিফ’-এর ভূমিকায় যে অভিনয় কনেছে, লোকটার নাম প্রিয়ানশু পানিউলী। ভারতের খুবই আন্ডাররেটেড, তবে সু-অভিনেতাদের একজন। কিন্তু, এখানে এসে পচে গেলেন।  একবার ভাবেন, এই লোকের সংলাপগুলো যদি আফরান নিশো, মোশাররফ করিম বা শহীদুজ্জামান সেলিম দিতো, কতটা পারফেকশনের কাছাকাছি পৌঁছাত পারতেন তারা! আমাদের মত দর্শকদেরও ভাল লাগতো। কিন্তু, বৈশ্বিক এজেন্সি এদের কাউকে চেনে না, আমাদের এখানে চেনানোর মত কোনো কাজ হয় না। হবে কিভাবে, এখানকার ভাল-খারাপের মাপকাঠি তো ইউটিউব ভিউ।

আমি যদি ইতালিয়ান হতাম, তাহলে লকডাউনে বসে হয়তো এই ছবি দেখতে আমার খারাপ লাগতো না। কিন্ত, বাংলাদেশে বলে হজম করতে পারছি না।

‘এত খুঁত ধরতে বসেছি কেন?’, ‘নেটফ্লিক্স কেন আমার সব চাওয়া-পাওয়া মানবে?’ – এমন ফালতু প্রশ্ন উঠতেই পারে। কিন্তু, জবাবে আমি বলবো, নেটফ্লিক্স আমার চাওয়া-পাওয়া মানতে বাধ্য। কারণ, তারা অনেক গবেষনা করেই বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে গল্প সাজিয়েছে। উদ্দেশ্যটাও পরিস্কার – বাংলাদেশের বাজার ধরা। তাই, আমার মত দর্শকের সমালোচনা করার অধিকার অবশ্যই আছে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।