স্যার গ্যারি সোবার্স: ক্রিকেট বিবর্তনের চূড়ান্ত নমুনা

১.

একদিকে ঘরের মাঠে ইংল্যান্ডের সিরিজ বাঁচানোর লড়াই। অন্যদিকে প্রথম তিন ম্যাচের দুটিতে জয় পাওয়া ওয়েস্ট ইন্ডিজের সামনে পাঁচ ম্যাচের সিরিজটি নিজেদের করে নেওয়ার সুযোগ। হেডিংলিতে সিরিজের চতুর্থ টেস্টে টস করতে নামলেন ইংলিশ অধিনায়ক কলিন কাউড্রে এবং উইন্ডিজ অধিনায়ক স্যার গারফিল্ড সোবার্স। টানা চতুর্থবারের মত টসে জিতে স্বাগতিকদের ফিল্ডিংয়ে পাঠালেন সোবার্স। বৃষ্টি ও আলোক স্বল্পতার কারণে প্রথম দিন প্রায় সোয়া তিন ঘণ্টা খেলা বন্ধ থাকলে দিনশেষে সফরকারীদের সংগ্রহ দাঁড়ায় ৩ উইকেটে ১৩৭ রান।

১৯৬৬ সালের ৫ আগস্ট। হেডিংলি টেস্টের দ্বিতীয় দিন। দলীয় ১৫৪ রানের মাথায় ৬ নম্বর ব্যাটসম্যান হিসেবে মাঠে নামলেন সোবার্স। আর নেমেই খেলে ফেললেন ‘মহাকাব্যিক’ এক ইনিংস। ক্যারিয়ারের সপ্তম টেস্ট সেঞ্চুরিটা (১৭৪) তুলে নিলেন চা বিরতির আগেই। ডানহাতি সিমুর নার্সকে নিয়ে পঞ্চম উইকেট জুটিতে যোগ করলেন ২৬৫ রান।

সোবার্সের ২৬০ বলে ১৭৪ রানের অনবদ্য ইনিংসটিতে বাউন্ডারি ছিল ২৪টা। যার ১৬টাই মেরেছিলেন লাঞ্চের পর থেকে চা বিরতির আগপর্যন্ত এক সেশনেই।

উইজডেন সোবার্সের ১৭৪ রানের ইনিংসটির বর্ণনা দিয়েছিল ঠিক এভাবে, ‘Bowlers were slaughtered with a blade that flashed in a manner both savage and sublime. The fast men were carted all around the wicket. The spinners were driven and lofted with uncanny quickness of eye and feet.’

সোবার্সকে দারুণ সঙ্গ দেয়া সিমুর নার্স করেছিলেন ৩২৩ বলে ১৩৭ রান। শেষ পর্যন্ত ৯ উইকেটে ৫০০ রান তুলে ইনিংস ঘোষণা করেন সোবার্স।

ইংল্যান্ডের প্রথম ইনিংসের শুরুতেই ৪ উইকেট তুলে নেন দুই স্ট্রাইক বোলার ওয়েস হল এবং চার্লি গ্রিফিথ। এরপর শুরু হয় ‘সোবার্স শো’! ব্যাট হাতে নয়, বল হাতে! বাঁহাতি কব্জির জাদুতে মাত্র ৪১ রান খরচায় তুলে নেন ৫ উইকেট; শেষ ৩ উইকেট মাত্র ৭ বলের বিধ্বংসী এক স্পেলে! ফলাফল মাত্র ২৪০ রানে গুটিয়ে যায় ইংল্যান্ড।

ফলোঅনে পড়ে দ্বিতীয় ইনিংসে কিছুটা প্রতিরোধের চেষ্টা চালায় স্বাগতিকরা। কিন্তু গিবস-সোবার্সদের ঘূর্ণিতে ধূলিসাৎ হয়ে যায় ইংলিশদের ম্যাচ বাঁচানোর স্বপ্ন। মাত্র ৩৯ রানে ৬ উইকেট তুলে নেন ডানহাতি অফ স্পিনার ল্যান্স গিবস আর ‘চায়নাম্যান’ সোবার্সের ঝুলিতে জমা পড়ে ৩ উইকেট। বল হাতে সোবার্সের ম্যাচ ফিগারটা দাঁড়ায় দেখার মত, ৩৯.৪-১০-৮০-৮!

ইংলিশরা অলআউট হয় ২০৫ রানে। সফরকারী উইন্ডিজ ম্যাচটি জিতে নেয় এক ইনিংস এবং ৫৫ রানের ব্যবধানে।

উল্লেখ্য, তখন ম্যাচসেরার পুরস্কার দেয়ার কোন নিয়ম প্রচলিত ছিল না। থাকলে নিশ্চিতভাবেই ‘ব্যাটসম্যান অফ দ্য ম্যাচ’, ‘বোলার অফ দ্য ম্যাচ’, সব পুরস্কার সোবার্স একাই জিততেন।

এর আগে লর্ডসে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে সোবার্স খেলেন অপরাজিত ১৬৩ রানের একটি অনবদ্য ‘ম্যাচ সেভিং’ ইনিংস। চাচাত ভাই ডেভিড হলফোর্ডের (১০৫) সাথে ‘অবিচ্ছিন্ন’ ষষ্ঠ উইকেট জুটিতে যোগ করেন ২৭৪ রান।

১৯৬৬ সালের সেই ইংল্যান্ড ট্যুরে ৫ টেস্টে সোবার্সের সংগ্রহ ছিল ৭২২ রান। সেঞ্চুরি ৩ টি, ফিফটি ২ টি। ব্যাটিং গড় ১০৩.১৪!

আর বল হাতে ২৭.২৫ গড়ে ২০ উইকেট। পাশাপাশি ফিল্ডার হিসেবে নেন ১০টি দুর্দান্ত ক্যাচ। যা একটি অনন্য কীর্তি। কেননা টেস্ট ক্রিকেটে আজ অব্দি কোন খেলোয়াড় এক সিরিজে একই সাথে ৫০০ রান, ১০ উইকেট, ১০টি ক্যাচের মালিক হতে পারে নি!

উইজডেনের ভাষায়, ‘It was all Sobers triumph, One after another.’

বলা হয় যে, ত্রিশের দশকে ব্র্যাডম্যানের পর সিক্সটিজে এসে সোবার্সই প্রথম ক্রিকেটার যিনি ইংরেজদের হৃদয় জয় করতে সমর্থ হয়েছিলেন। এতটাই যে এক সিরিজেই তাঁর নাম হয়ে যায় ‘কিং ক্রিকেট!’ এই নামে পরবর্তীতে সোবার্সের একটি বইও বেরিয়েছে।

২.

ক্রিকেটবোদ্ধাদের বেশিরভাগের চোখেই তিনি টেস্ট ইতিহাসের সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডার। অনেকের কাছে তিনি শুধু সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডারই নন, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ক্রিকেটারও বটে।

স্বনামধন্য ক্রীড়ালেখক রে রবিনসন সোবার্সকে বিশেষায়িত করেছেন এভাবে, ‘Evolution’s ultimate specimen of cricketers.’

প্রখ্যাত ক্রিকেট সাহিত্যিক এবং ইতিহাসবিদ সি এল আর জেমসের ভাষায়, ‘The living embodiment of centuries of tortured history… a West Indian cricketer, not merely a cricketer from the West Indies.’

কেবল ব্যাটসম্যান হিসেবেই সোবার্স সর্বকালের সেরাদের একজন। স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের চোখে ক্রিকেট ইতিহাসের ‘সেরা’ দুই বাঁহাতি ব্যাটসম্যানের একজন হলেন গ্রায়েম পোলক আর অন্যজন স্যার গ্যারি সোবার্স।

সোবার্সের ব্যাটিং পরিসংখ্যানটা একবার দেখুন। ৯৩ টেস্টে ৮০৩২ রান, ব্যাটিং গড় ৫৭.৭৮। ২৬টি সেঞ্চুরির পাশাপাশি আছে ৩০টি হাফ সেঞ্চুরি। এর সাথে যোগ করুন ৩৪.০৩ গড়ে ২৩৫ উইকেট এবং ফিল্ডার হিসেবে ১০৯টি ক্যাচ।

টেস্টে সোবার্সের ব্যাটিং এবং বোলিং গড়ের পার্থক্য ২০ এর বেশি। ক্রিকেট ইতিহাসে এই কৃতিত্ব আছে শুধুমাত্র জ্যাক ক্যালিস এবং ওয়ালি হ্যামন্ডের।

সোবার্স ছিলেন একজন সহজাত স্ট্রোকমেকার। যার ব্যাটিংয়ের মূল দর্শন ছিল আক্রমণ। কথিত আছে, প্রতিটা বলের জন্য অন্তত তিন রকমের শট খেলার অপশন খোলা রাখতেন তিনি।

প্রোটিয়া কিংবদন্তি ব্যারি রিচার্ডসের মতে, ‘Sobers was the only 360-degree player in the game. From his backlift to follow-through, the bat traversed a perfect and complete circle.’

অফসাইডে নান্দনিক কাভার ড্রাইভ এবং নিখুঁত টাইমিং ছিল সোবার্সের ট্রেডমার্ক। তবে স্টাইলিশ দৃষ্টিনন্দন ব্যাটিংয়ের চাইতে পাওয়ারফুল হিটিংয়ের জন্যই বেশি জনপ্রিয় ছিলেন তিনি। সলিড ব্যাকফুট প্লেয়ার হওয়ায় কাট এবং পুল শটে ছিলেন বিশেষভাবে পারদর্শী।

সাবেক অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক ও চ্যানেল নাইনের প্রখ্যাত ধারাভাষ্যকার রিচি বেনোর মতে, ‘When he drove through the off-side he looked at once classy and fierce. In his cuts and pulls it was brilliance in brutality.’

সোবার্সের দৃষ্টিশক্তি ছিল অত্যন্ত প্রখর। স্পিনারদের বিপক্ষে তাঁর পায়ের কাজ ছিল ‘লাইটনিং কুইক’।

সোবার্স সবসময়ই বলতেন, ‘ব্যাটিংয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল পায়ের পজিশন। যদি তোমার পা ঠিক সময়ে ঠিক জায়গায় থাকে তাহলে তুমি অবশ্যই ভাল খেলবে।’

সোবার্সের ব্যাটসম্যানশিপ প্রসঙ্গে সি এল আর জেমস একটা কথা বলেছেন, ‘Sobers had the ability to judge the ball early in its flight and so quickly decide which stroke to play. He was only comparable with Don Bradman in having this capability of “seeing” the ball.’

৩.

৯৩ টেস্টে ২৩৫ উইকেট। ম্যাচে কখনও ১০ উইকেট পাননি। ইনিংসে ৫ উইকেট পেয়েছেন মাত্র ৬ বার। পরিসংখ্যান বিবেচনায় সোবার্সকে তাই ‘গ্রেট বোলার’ বলা যাবে না কোনভাবেই। তবে ‘বোলার’ সোবার্সের বিশেষত্ব ছিল অন্য জায়গায়।

বাঁহাতি অর্থোডক্স (অফ স্পিন) এবং চায়নাম্যান (রিস্ট স্পিন) দুই ধরনের বোলিংই করতে পারতেন দক্ষ হাতে। বেশ ভাল টার্নও পেতেন। এমনকি ‘ব্যাক অফ দ্য হ্যান্ড’ অ্যাকশনে গুগলি পর্যন্ত দিতে পারতেন। আবার দলের প্রয়োজনে বাঁহাতি সিমারের ভূমিকাতেও দেখা গেছে তাঁকে।

উইজডেনের বর্ণনা অনুযায়ী, ‘His versatility enabled him to bowl all varieties of left-arm bowling from spin to fast-medium. He could take the new ball, run in quick and make it dart about. When the ball was older, he could spin it sharply and in both ways.’

সোবার্সের বলে খুব বেশি পেস না থাকলেও নতুন বলে বেশ কার্যকরী ছিলেন। সুইং, কন্ট্রোল আর বুদ্ধিমত্তা দিয়ে ব্যাটসম্যানদের ভালই ভোগাতে পারতেন। তাঁর ন্যাচারাল ডেলিভারি ছিল লেট ইনসুইঙ্গার। এমনকি খুব ভাল বাউন্সারও নাকি দিতে পারতেন। মাঝেমধ্যে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশ জোরে বল করতেন এমনটাও মনে করেন অনেকে।

সাবেক ইংলিশ ওপেনার জিওফ্রে বয়কটের দৃষ্টিতে, ‘With the new ball, he could make the delivery curve late in flight at high speed; his action being a loose, springy run followed by a “whiplash” delivery.’

সাবেক অস্ট্রেলীয় ব্যাটসম্যান নেইল হার্ভের মতে, ‘As a fast-medium bowler, he was quite nippy. On occasions Sobers could be faster than Hall.’

সোবার্সের চেয়ে ভাল বোলার ইতিহাসে অনেক আছে, কিন্তু তাঁর মত ভার্সেটাইল বোলার আর ক’জন এসেছে? যে কিনা পিচ এবং কন্ডিশন অনুযায়ী বোলিং স্টাইল সুইচ করতে জানত!

ব্যাটিং এবং বোলিংয়ের পাশাপাশি সোবার্স ছিলেন একজন বিশ্বমানের ফিল্ডার। সোবার্সকে তাঁর সময়ের অবিসংবাদিত সেরা ফিল্ডার বলেও রায় দিয়েছেন অনেকেই। স্লিপ, লেগ স্লিপ, কাভার, পয়েন্ট – মাঠের সব জায়গাতেই ছিলেন দুর্দান্ত। সোবার্সের ছিল স্পিড, ব্যালান্স আর রিফ্লেক্সের নিখুঁত কম্বিনেশন আর পাওয়ারফুল থ্রোয়িং আর্ম।

রিচি বেনোর ভাষায়, ‘Sobers is the greatest all-round cricketer the world has seen. A brilliant batsman, splendid fielder, particularly close to the wicket, and a bowler of extraordinary skill.’

টেস্ট ক্রিকেটে ৩০০ উইকেট পাওয়া প্রথম বোলার ফ্রেড ট্রুম্যানের সঙ্গে সোবার্সের দ্বৈরথটা ছিল দেখার মত। ট্রুম্যানের চোখে সোবার্স ছিলেন, ‘A sublime left-hand batsman who was one of the greatest cricketers ever to have graced the game, certainly the greatest all-rounder.’

ট্রুম্যান আরও বলতেন, ‘Sobers had a great cricketing brain and his thought processes were lightning quick.’

৪.

১৯৩৬ সালের ২৮ জুলাই, বার্বাডোজের ব্রিজটাউনে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। পুরো নাম গারফিল্ড সেন্ট অব্রান সোবার্স।

পরিবারের ছয় সন্তানের মধ্যে সোবার্স ছিলেন পঞ্চম। বাবাকে হারান মাত্র পাঁচ বছর বয়সে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাহাজডুবিতে মারা যান তাঁর বাবা।

প্রথম জীবনে ক্রিকেটের পাশাপাশি ফুটবল এবং বাস্কেটবলেও ছিলেন সমান পারদর্শী। ভাই জেরাল্ড সোবার্সের সঙ্গে টানা ৩ বার নিজের স্কুল বে স্ট্রিট বয়েজকে ইন্টার স্কুল টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন করেন তিনি।

মাত্র ১৫ বছর বয়সে স্থানীয় বার্বাডোজ লিগে খেলা শুরু করেন। ১৬ বছর বয়সে ফার্স্ট ক্লাস অভিষেক, বার্বাডোজ একাদশের হয়ে ভারতের বিরুদ্ধে। বাঁহাতি স্পিন বোলিংয়ে অভিষেকেই ৭ উইকেট (৪/৫০ ও ৩/৬২) নিয়ে চমকে দেন সবাইকে।

১৯৫৪ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে টেস্ট ডেব্যু, কিংস্টনের স্যাবাইনা পার্কে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। সুযোগ পেয়েছিলেন পেটের পীড়ায় আক্রান্ত অভিজ্ঞ বাঁহাতি স্পিনার আলফ ভ্যালেন্টাইনের বিকল্প হিসেবে।

অভিষেক টেস্টের দুই ইনিংসে তিনি ব্যাট করেছিলেন ৯ নম্বরে! করেছিলেন যথাক্রমে ১৪* ও ২৬ রান। তবে বল হাতে নিজের জাতটা চেনাতে একদমই ভুল করেন নি। লেফট আর্ম অর্থোডক্স বোলিংয়ে ৪ উইকেট নিয়েছিলেন ৭৫ রান খরচায়।

এক সাথে দুই কিংবদন্তি: মোহাম্মদ আলী ও গ্যারি সোবার্স

১৯৫৫ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে হোম সিরিজ চলাকালীন একটি ঘটনা। চতুর্থ টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে ১৯ বছরের তরুণ সোবার্সকে হুট করে ওপেনিংয়ে নামিয়ে দেন অধিনায়ক ডেনিস অ্যাটকিনসন। উদ্দেশ্য ছিল নতুন বলে মিলার-লিন্ডওয়ালের বিধ্বংসী স্পেলের হাত থেকে টপ অর্ডারকে আগলে রাখা।

রে লিন্ডওয়ালের করা ইনিংসের প্রথম তিন বলে তিন বাউন্ডারি হাঁকান সোবার্স! অজি ফাস্ট বোলারদের গতি-সুইংয়ের বিরুদ্ধে পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে শেষ পর্যন্ত আউট হন ৪৩ রানে।

৫.

ক্যারিয়ারের প্রথম ৪ বছর ব্যাটসম্যান হিসেবে সোবার্স ছিলেন আন্ডারপারফর্মড। ১৬ টেস্টের ২৩ ইনিংসে ফিফটি ছিল মাত্র ৩টা, সর্বোচ্চ ছিল ৬৬!

যখন ‘ব্যাটসম্যান’ সোবার্সকে নিয়ে সবাই মোটামুটি হতাশ, ঠিক তখনই মাত্র ২১ বছর বয়সে ‘ট্রিপল সেঞ্চুরি’ হাঁকিয়ে তিনি ভেঙে দিলেন স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের ২৮ বছরের পুরনো রেকর্ড। ১৯৩০ সালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ৩৩৪ রানের ইনিংস খেলার সময় ব্র্যাডম্যানের বয়স ছিল ২১ বছর ৩১৮ দিন। আর ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে সোবার্সের ৩৬৫* করার সময় সোবার্সের বয়স ছিল ২১ বছর ২১৩ দিন।

শুধু তাই নয়, সোবার্সের ৩৬৫* রানের ইনিংসটি ছিল টেস্ট ক্রিকেটের তৎকালীন ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ ইনিংস। যেটি খেলার পথে তিনি অতিক্রম করেছিলেন ইংরেজ কিংবদন্তি স্যার লেন হাটনের ২০ বছর ধরে টিকে থাকা বিশ্বরেকর্ড। ১৯৩৮ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে হাটন করেছিলেন ৩৬৪ রান।

সোবার্সের ইনিংসটির স্থায়িত্বকাল ছিল ৬১৪ মিনিট অর্থাৎ ১০ ঘন্টারও বেশি সময় ধরে ব্যাট করেছিলেন তিনি। তাঁর ইনিংসে কোন ছক্কা ছিল না; ছিল ৩৮টি চারের মার। বাঁহাতি সোবার্স নেমেছিলেন ওয়ান ডাউনে। তৃতীয় উইকেট জুটিতে ডানহাতি ওপেনার স্যার কনরাড হান্টের সাথে গড়েছিলেন ৪৪৬ রানের ‘ম্যারাথন’ পার্টনারশিপ। হান্ট নিজেও খেলেছিলেন ২৬০ রানের লম্বা ইনিংস।

সোবার্সের ৩৬৫ রানের ‘মহাকাব্যিক’ ইনিংস সম্পর্কে উইজডেন লিখেছিল, ‘His willow entered a phase of supreme brilliance that remained undimmed till the end.’

পাকিস্তানের বিপক্ষে ৫ টেস্টের ওই সিরিজে ৩ টি সেঞ্চুরিসহ সোবার্সের ব্যাট থেকে এসেছিল ৮২৪ রান!

পাকিস্তানের বিপক্ষে হোম সিরিজের পরপরই ভারত সফরে গিয়ে পেয়ে যান আরও ৩টি সেঞ্চুরি! মুম্বাইতে ১৪২, কানপুরে ১৯৮, কলকাতায় ১০৬। সিরিজ সর্বোচ্চ ৫৫৭ রান এসেছিল সোবার্সের ব্যাট থেকেই!

পরের বছর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ঘরের মাটিতে আবারও ৩ সেঞ্চুরি! ব্রিজটাউন টেস্টে স্যার ফ্রাঙ্ক ওরেলকে সাথে নিয়ে ৫ম উইকেট জুটিতে গড়েন ৩৯৯ রানের রেকর্ড পার্টনারশিপ। এরই সাথে পেয়ে যান ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ডাবল সেঞ্চুরিটাও (২২৬)। সাত শতাধিক (৭১৯) রান নিয়ে সিরিজের হাইয়েস্ট স্কোরার হন আরও একবার।

১৯৬১ সালে ব্রিসবেনে ইতিহাসের প্রথম ‘টাই’ টেস্টে ১৩২ রানের ‘চোখধাঁধানো’ এক ইনিংস খেলেন সোবার্স। স্যার ডন ব্র‍্যাডম্যানের মতে, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এটাই তাঁর দেখা সেরা ইনিংস। এক ম্যাচ পরই সিডনিতে খেলেন ১৬৮ রানের আরেকটি মাস্টারক্লাস!

সোবার্সের ব্যাটিং দেখে ব্র্যাডম্যান এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে তাঁকে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার হয়ে খেলার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সেই আমন্ত্রণ পরে রক্ষাও করেছিলেন সোবার্স।

তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সিরিজটি শেষ পর্যন্ত ২-১ ব্যবধানে হেরে যায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ২টি সেঞ্চুরিসহ সোবার্সের ব্যাট থেকে আসে ৪৩০ রান। পাশাপাশি বল হাতে ১৫টি উইকেটও নিয়েছিলেন তিনি।

১৯৬২ সালে দেশের মাটিতে ভারতকে ৫-০ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াশ করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। সোবার্স করেছিলেন ৭০.৬৭ গড়ে ৪২৪ রান এবং বল হাতে ২০.৫৭ গড়ে নিয়েছিলেন ২৩ উইকেট।

পরের বছর ইংল্যান্ড সফরে গিয়ে দ্বিতীয়বারের মত অর্জন করেন এক সিরিজে তিন শতাধিক রান ও ২০ উইকেটের ডাবল। সোবার্সের অলরাউন্ড নৈপুণ্যেই (৩৩২ রান ও ২১ উইকেট) সেবার ৩-১ ব্যবধানে সিরিজ জিতেছিল ক্যারিবীয়রা।

সোবার্সের ৩৬৫ পরবর্তী সময়টাকে উইজডেন বর্ণনা করেছিল এভাবে, ‘This was the period of absolute supremacy. Sobers had no parallel in the world with the bat.’

৬.

১৯৬৫ সালে সোবার্সকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের অধিনায়ক নির্বাচিত করা হয়। প্রথমবারের মত দায়িত্ব পেয়েই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ঘরের মাটিতে ফ্রাঙ্ক ওরেল ট্রফির শিরোপা (২-১) এনে দেন সোবার্স।

এরপর ১৯৬৬-৬৭ সালে ইংল্যান্ডকে ৩-১ এবং ভারতকে ২-০ ব্যবধানে পরাজিত করে সোবার্সের নেতৃত্বাধীন উইন্ডিজ।

অধিনায়ক হিসেবে সোবার্স ছিলেন সাহসী এবং আত্মবিশ্বাসী এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। ক্যাপ্টেন্সির সূচনাটাও ছিল দুর্দান্ত, তবে শুরুর সাফল্যটা শেষদিকে আর ধরে রাখতে পারেন নি।

১৯৬৭-৬৮ মৌসুমে ত্রিনিদাদ টেস্টে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে রেজাল্টের আশায় দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ৯২ রান তুলেই ইনিংস ঘোষণা করেন সোবার্স। ফলে শেষ দিনে জয়ের জন্য ইংল্যান্ডের লক্ষ্য দাঁড়ায় ২১৫ রান। দুর্ভাগ্যক্রমে চ্যালেঞ্জটা হেরে যান তিনি। ৭ উইকেট হাতে রেখেই লক্ষ্যে পৌঁছে যায় ইংলিশরা। এই হারের জন্য সোবার্সকে গণমাধ্যমের কঠোর সমালোচনার শিকার হতে হয়েছিল। রীতিমতো ‘জাতীয় শত্রু’তে পরিণত হয়েছিলেন তিনি!

আসলে সে মুহূর্তে ভাগ্যও তাঁর সহায় ছিল না। না হলে কি আর পরের টেস্টটা নিশ্চিত পরাজয়ের মুখ থেকে অবিশ্বাস্যভাবে বাঁচিয়ে ফেলতে পারত ইংল্যান্ড? ব্যাট হাতে ১৫২ ও ৯৫ রান এবং বল হাতে ৬ উইকেট নিয়েও তাই ক্যারিবীয় সমর্থকদের মন গলাতে ব্যর্থ হন সোবার্স।

এদিকে ওয়েস হল এবং চার্লি গ্রিফিথের বিদায়ের পর উইন্ডিজের পেস আক্রমণ অনেকখানিই দুর্বল হয়ে পড়ে। যার ফলশ্রুতিতে ১৯৬৮-৬৯ মৌসুমে অস্ট্রেলিয়ার কাছে ৩-১ ব্যবধানে টেস্ট সিরিজ হারে ওয়েস্ট ইন্ডিজ।

সিরিজের একমাত্র জয়টা এসেছিল ব্রিসবেনে। ব্যাটিংয়ে ১৩০ রান (৯৪ ও ৩৬) এবং বল হাতে ৭ উইকেট (১/৩০ ও ৬/৭৩) নিয়ে দলের জয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন ‘বাঁহাতি সিমার’রূপী গ্যারি সোবার্স।

পরবর্তী সফরে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষেও জিততে পারেন নি (১-১)। একই মৌসুমে ইংল্যান্ডের কাছে ২-০ ব্যবধানে সিরিজ হারে ক্যারিবীয়রা।

১৯৭০-৭১ সালে ভারতের বিপক্ষে ৫ ম্যাচ সিরিজের ৪ টিই ড্র হয়। অন্যটিতে হেরে যায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ৩ সেঞ্চুরিতে ৫৯৭ রান করেও সিরিজ হার ঠেকাতে পারেন নি সোবার্স। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে পরবর্তী সিরিজটিও ড্র হয় ১-১ ব্যবধানে।

দলীয়ভাবে ব্যর্থ হলেও অধিনায়ক থাকাকালীন সোবার্সের ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স ছিল চোখে পড়ার মতো। অধিনায়ক হিসেবে সোবার্সের ব্যাটিং গড় ৫৮.৮০। টেস্টে তিন হাজারের অধিক রান করা অধিনায়কদের মধ্যে কেবল স্যার ডন ব্রাডম্যান (১০১.৫১) আর মাহেলা জয়াবর্ধনে (৫৯.১১) আছেন সোবার্সের ওপরে।

তাছাড়া অধিনায়ক হিসেবে তাঁর অর্জন ১১৭টি উইকেট। উইকেটসংখ্যায় তাঁর উপরে আছেন কেবল ইমরান খান (১৮৭) আর রিচি বেনো (১৩৮)।

এমনকি অধিনায়ক হিসেবে সবচেয়ে বেশি বল করার রেকর্ডটিও গ্যারি সোবার্সের (১০,৮৬০ টি)! দ্বিতীয় স্থানে থাকা রিচি বেনো (১০,৭২০ টি) ব্যতীত আর কোন অধিনায়কের ১০ হাজারের বেশি বল করার রেকর্ড নেই।

৭.

১৯৭০ সালে ইংল্যান্ড সফরে ‘বিশ্ব একাদশ’ দলের অধিনায়ক মনোনীত হন গ্যারি সোবার্স। লর্ডসে অনুষ্ঠিত সিরিজের প্রথম ম্যাচেই সোবার্সের বাজিমাত! বাঁহাতি ফাস্ট বোলিংয়ের বিধ্বংসী এক স্পেলের (৬/২১) পর ব্যাট হাতে ৬ নম্বরে নেমে খেলেন ১৮৩ রানের দুর্ধর্ষ এক ইনিংস! দুঃখজনক ব্যাপার হল, ম্যাচটির টেস্ট মর্যাদা ছিল না।

বিশ্ব একাদশ সেবার সিরিজ জিতেছিল ৪-১ ব্যবধানে। সোবার্সের ব্যাট থেকে এসেছিল ৭৩.৫০ গড়ে ৫৭৩ রান আর বল হাতে ২১.৫২ গড়ে শিকার করেছিলেন ২১ উইকেট।

এরপর ১৯৭১ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে আরও একটি সিরিজে বিশ্ব একাদশকে নেতৃত্ব দেন তিনি। সেই দলে ছিলেন গ্রায়েম পোলক, ক্লাইভ লয়েড, জহির আব্বাস, সুনীল গাভাস্কার, টনি গ্রেগ, বিষেণ সিং বেদীর মত খ্যাতিমান সব ক্রিকেটার।

প্রথম ম্যাচ হারলেও সোবার্সের নেতৃত্বাধীন দলটি সিরিজ জিতেছিল ২-১ ব্যবধানে। সিরিজের তৃতীয় ম্যাচটা হয়েছিল মেলবোর্নে। যে ম্যাচে কাউন্টার অ্যাটাক স্টাইলে ব্যাট করে ২৫৪ রানের ‘অতিমানবীয়’ এক ইনিংস খেলেন সোবার্স। যার সৌজন্যে নিশ্চিত হেরে যাওয়া ম্যাচে দারুণভাবে কামব্যাক করে শেষ পর্যন্ত জিতে যায় তাঁর দল।

লারার সাথে

মেলবোর্নের বাউন্সি ট্র্যাকে সেদিন ডেনিস লিলি, গ্রাহাম ম্যাকেঞ্জি, বব ম্যাসির মত ফাস্ট বোলারদের সামনে সোবার্সের ভয়ডরহীন স্ট্রোকপ্লে দেখে অভিভূত হয়েছিলেন স্বয়ং ব্র্যাডম্যান!

সোবার্সের ‘এক্সট্রাঅর্ডিনারি’ সেই ইনিংসের বর্ণনা দিতে গিয়ে উইজডেন লিখেছিল, ‘When the ball was up, he drove — with timing and power beyond the capability of lesser men. When it was short and wide, he cut or drove off the backfoot with a ferocity that was primal in beauty and brutality. And when deliveries came rearing into his body, he rocked back to pull and hook, furious and fearless.’

৮.

১৯৭২ সালে কলিন কাউড্রের টেস্ট ক্রিকেটে সর্বোচ্চ রানের (৭৪৫৯) রেকর্ড টপকে যান সোবার্স। কাউড্রের রেকর্ডটি টিকেছিল ৯ বছরেরও বেশি। পরবর্তীতে সোবার্সের রেকর্ডটি ভেঙেছিলেন ইংলিশ ওপেনার জিওফ্রে বয়কট।

১৯৭২-৭৩ মৌসুমে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে হোম সিরিজে অধিনায়ক হিসেবে অভিষেক হয় রোহান কানহাইয়ের। হাঁটুর ইনজুরির কারণে ওই সিরিজে খেলেননি সোবার্স। পরের বছর কানহাইয়ের নেতৃত্বে ইংল্যান্ড সফর করেন তিনি, শেষবারের মত।

ক্যারিয়ারের শেষ অ্যাওয়ে সিরিজেও ব্যাটে বলে যথারীতি উজ্জ্বল ছিলেন সোবার্স। ৭৬.৫০ গড়ে করেছিলেন ৩০৬ রান আর উইকেট পেয়েছিলেন ১০টা। লর্ডস টেস্টে অপরাজিত ১৫০ রানের ইনিংসটি তাঁর ক্যারিয়ারের শেষ সেঞ্চুরি।

১৯৭৪ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে হোম সিরিজে তিনি টেস্ট ইতিহাসের প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে ৮০০০ রানের মাইলফলক স্পর্শ করেন, ১৫৭ ইনিংসে। টেস্টে দ্রুততম আট হাজার রানের রেকর্ড হিসেবে যা টিকে ছিল দীর্ঘ ২৮ বছর। ২০০২ সালে রেকর্ডটি ভেঙে দেন শচীন টেন্ডুলকার (১৫৪ ইনিংস); বর্তমানে যেটি কুমার সাঙ্গাকারার (১৫২ ইনিংস) দখলে।

তবে একটা জায়গায় সোবার্সকে পেছনে ফেলতে পারেননি কেউই। টেস্টে আট হাজার রান করা ব্যাটসম্যানদের মধ্যে সোবার্সের ৫৭.৭৮ গড়ই সবার শীর্ষে!

সিরিজের শেষ ম্যাচটা অনুষ্ঠিত হয়েছিল পোর্ট অব স্পেনের কুইন্স পার্ক ওভালে। ওটাই ছিল স্যার গারফিল্ড সোবার্সের ক্যারিয়ারের শেষ টেস্ট। ডেরেক আন্ডারউডের বলে বোল্ড হবার আগে ক্যারিয়ারের শেষ ইনিংসে করেছিলেন ২০ রান। এছাড়া বল হাতে উইকেট নিয়েছিলেন ৩টি।

ক্যারিয়ারের শেষ সিরিজে ব্যাট হাতে সোবার্সের সংগ্রহ ছিল ১০০ রান। তবে উইকেট পেয়েছিলেন ১৪ টা।

সোবার্স যখন অবসর নিলেন তখন তিনি টেস্ট ইতিহাসের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক (৮০৩২), দ্বিতীয় সর্বোচ্চ টেস্ট সেঞ্চুরির (২৬) মালিক, দেশের পক্ষে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি (২৩৫) এবং ফিল্ডার হিসেবে তৃতীয় সর্বোচ্চ ক্যাচের (১০৯) মালিক।

দুই ইংলিশ কিংবদন্তি ওয়ালি হ্যামন্ড এবং কলিন কাউড্রের পর সোবার্স হলেন ৩য় ব্যক্তি যিনি টেস্টে ১০০ ক্যাচের মাইলফলক অর্জন করেন।

আরেকটি অবাক করা তথ্য হল, টেস্ট ইতিহাসের একমাত্র খেলোয়াড় হলেন স্যার গ্যারি সোবার্স যিনি সর্বোচ্চ ৩ বার এক সিরিজে তিন শতাধিক রান এবং ২০ উইকেটের ‘ডাবল’ অর্জনের কৃতিত্ব দেখিয়েছেন!

★ ১৯৬২ সালে ভারতের বিপক্ষে ৪৭৪ রান এবং ২৩ উইকেট

★ ১৯৬৩ সালের ইংল্যান্ড সফরে ৩৩২ রান এবং ২১ উইকেট।

★ ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ড সফরে ৭২২ রান এবং ২০ উইকেট।

রিচি বেনো’র পর ইতিহাসের দ্বিতীয় খেলোয়াড় হলেন স্যার গ্যারি সোবার্স যিনি টেস্ট ক্যারিয়ারে ২ হাজার রান এবং ২০০ উইকেটের ডাবল অর্জনের কৃতিত্ব দেখিয়েছেন।

টেস্ট ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ৩০০০ রান, ২০০ উইকেট এবং ১০০ ক্যাচের ‘ট্রিপল’ কীর্তিটাও স্যার গ্যারি সোবার্সের। যে রেকর্ডের অধিকারী আর মাত্র ৩ জন ক্রিকেটার- ইয়ান বোথাম, শেন ওয়ার্ন এবং জ্যাক ক্যালিস।

৯.

টেস্টের মত সোবার্সের ফার্স্ট ক্লাস পরিসংখ্যানও বেশ সমৃদ্ধ। ৩৩৮টি প্রথম শ্রেণীর ম্যাচে ৫৪.৮৭ গড়ে তাঁর সংগ্রহ ২৮৩১৪ রান। সেঞ্চুরি ৮৬টি এবং হাফ সেঞ্চুরি ১২১টি।

উল্লেখ্য, স্বদেশিদের মধ্যে তাঁর চেয়ে বেশি প্রথম শ্রেণির সেঞ্চুরি আছে শুধুমাত্র গর্ডন গ্রিনিজ (৯২টি) এবং আলভিন কালিচরণের (৮৭টি)। এছাড়া বল হাতে ২৭.৭৪ গড়ে তিনি নিয়েছেন ১০৪৩টি উইকেট।

ক্যারিয়ারে একটি মাত্র ওয়ানডে খেলেছেন সোবার্স, প্রতিপক্ষ ছিল ইংল্যান্ড। কোনো রান করতে না পারলেও একটি উইকেট নিয়েছিলেন সে ম্যাচে।

ঘরোয়া পর্যায়েও সীমিত ওভারের ম্যাচ খুব একটা খেলা হয় নি। ৯৫টি লিস্ট ‘এ’ ম্যাচ খেলে করেছেন ২৭২১ রান, নিয়েছেন ১০৯টি উইকেট।

১৯৬৮ সালে কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপের ম্যাচে নটিংহামশায়ারের হয়ে গ্ল্যামারগনের বিপক্ষে এক ওভারে টানা ৬টি ছক্কা হাঁকান সোবার্স। ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে এক ওভারে ৬ ছক্কার কীর্তি এটাই প্রথম। যার ভিক্টিম ছিলেন ২৩ বছর বয়সী বাঁহাতি পেসার ম্যালকম ন্যাশ! অথচ ৪ উইকেট নিয়ে সেদিন বিপক্ষ দলের সফলতম বোলার ছিলেন এই ন্যাশই!

বিখ্যাত সেই ওভার প্রসঙ্গে হতভাগ্য বোলার ম্যালকম ন্যাশের বক্তব্যটা ছিল এরকম, ‘I was just part of the history and there was nothing I could do. I could have bowled wide to try to stop him from scoring but that wasn’t what I was all about. It was just one over in my life. Would I take it back? Never. I just wish I got paid for it. It would have made me rich.’

সোবার্সের আগ্রাসী ব্যাটিংয়ের প্রশংসা করে গ্ল্যামারগন অধিনায়ক টনি লুইস বলেছিলেন, ‘It was not sheer slogging through strength, but scientific hitting with every movement working in harmony.’

১০.

দীর্ঘ কুড়ি বছরের বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন সোবার্স।

★ ১৯৫৯ সালে বর্ষসেরা ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান ক্রিকেটারের পুরস্কার লাভ করেন।

★ ১৯৬৪ সালে উইজডেন ‘ক্রিকেটার অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন।

★ ১৯৭০ সালে ইংরেজ প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে বর্ষসেরা অলরাউন্ডারের পুরস্কার লাভ করেন।

★ ১৯৭৪ সালে ইংলিশ কাউন্টি কর্তৃক ‘ওয়াল্টার লরেন্স ট্রফি’ প্রাপ্ত হন।

★ ক্রিকেটে বিশেষ অবদানের জন্য ১৯৭৫ সালে ব্রিটেনের রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ কর্তৃক ‘নাইট’ উপাধি প্রাপ্ত হন।

★ ১৯৯৮ সালে সরকারি উদ্যোগে ন্যাশনাল হিরো অব বারবাডোজের মর্যাদা অর্জন করেন।

★ ২০০০ সালে উইজডেন কর্তৃক শতাব্দীর সেরা পাঁচ ক্রিকেটারের একজন হিসেবে মনোনীত হন সোবার্স। ১০০ জন ক্রিকেট বিশেষজ্ঞের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৯০টি ভোট পান তিনি। তাঁর সঙ্গে বাকি চারজন হলেন স্যার ডন ব্রাডম্যান (১০০), স্যার জ্যাক হবস (৩০), শেন ওয়ার্ন (২৭) ও স্যার ভিভ রিচার্ডস (২৫)।

★ ২০০৪ সালে আইসিসি প্রবর্তিত ‘বর্ষসেরা ক্রিকেটার’ পুরস্কারটির নাম রাখা হয় ‘স্যার গারফিল্ড সোবার্স ট্রফি’।

★ ১৯৫৮-১৯৭০ সালের মধ্যে মোট ৮ বার উইজডেন ‘লিডিং ক্রিকেটার ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’ পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন সোবার্স। সর্বোচ্চ ১০ বার এই সম্মান অর্জন করেন স্যার ডন ব্র্যাডম্যান।

স্যার গ্যারি সোবার্স ক্রিকেট বিষয়ক বেশ কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। ১৯৬৭ সালে ‘বোনাভেঞ্চার এন্ড দ্য ফ্ল্যাশিং ব্লেড’ শীর্ষক উপন্যাস এবং একই বছর জে.এস. বার্কারের সাথে যৌথভাবে ‘ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেট ইতিহাস’ নামের বই প্রকাশ করেন।

শেষ করব একটি অন্যরকম তথ্য দিয়ে। স্যার গারফিল্ড সোবার্স জন্মেছিলেন দুই হাতে ছয় ছয় বারোটি আঙুল নিয়ে। ছেলেবেলায় এক দুর্ঘটনায় তার এক হাতের অতিরিক্ত আঙুলটি পড়ে যায়। পরবর্তীতে অন্য হাতের আঙুলটিও কেটে ফেলা হয়।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।