প্রতিটা মানুষের মনের মানচিত্র আলাদা

যদিও আমি মনোবিজ্ঞানী নই, তবু কিছু কেইস স্টাডি টাইপ বইপত্র এবং কিছু জার্নাল পেপার পড়ে আমার যেটা মনে হলো সেটা হচ্ছে, ডিপ্রেশন বা বিষণ্ণতা এমন একটি মানসিক অবস্থা, যেটাকে আসলে জেনারালাইজ করা যায় না। একেক মানুষের ক্ষেত্রে ডিপ্রেশনের প্রভাব একেকরকম, এমনকি ডিপ্রেশন তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় উদ্দীপকগুলোও একেকজনের ক্ষেত্রে ভিন্নভাবে কাজ করে।

হিউম্যান মাইন্ড একটা অতি জটিল বস্তু, এবং সেই সাথে ইউনিকও বটে। একজনের সাথে সম্পূর্ণ মেলে না কখনো অন্যজনের। আবার সকলের মানসিক শক্তিও সমান হয় না। কেউ কেউ হয়তো সামান্য ব্যাপারেই ভেঙে পড়ে, আবার কেউ কেউ হয়তো বড়ো বড়ো বিপদেও স্থির থাকে। তাই একজন কতো বড়ো বিপদে আছে এটাকে দেখিয়ে অন্যজনের ডিপ্রেশনকে ছোটো করে দেখা সবসময়ই একটা হাস্যকর এবং অর্থহীন বস্তু বলে মনে হয়েছে আমার। কিভাবে? একটু ব্যাখ্যা করছি।

গত বছর আমার বাবা মারা যান। সেসময় আমি খুব ভেঙে পড়েছিলাম। ভয়াবহ ডিপ্রেশনের কারণে দুই মাস কোনো কাজ করতে পারিনি। আমার একটা অপরাধবোধও কাজ করছিল এই বলে যে আমি এরকম বিপদের সময় দেশে গিয়ে আমার মা বোনের পাশে দাঁড়াতে পারিনি।

এখন ধরুন, সেসময় কেউ যদি আমাকে বলতো, ‘আচ্ছা, আপনি যে এরকম করছেন, আপনি কি জানেন যে দুনিয়াতে কতো মানুষের বাপ মা অল্প বয়সে মারা যায়? আপনি তো তাও বুড়া হইছেন’, অথবা, ‘আপনি কি জানেন বাবা মারা যাওয়ার কারণে কতো মানুষের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়? কতো মানুষ না খেতে পেয়ে মারা যায়? আপনি তো তবু খেতে পরতে পারছেন’, তাহলে কি আমার ইচ্ছা হতো না ওই মানুষের নাক বরাবর ঘুষি বসিয়ে নাকের হাড্ডি ভেঙে দিতে, যাতে সারাজীবন নাকিসুরে কথা বলতে হয়? আরে বাপ, আমার বাবা মারা যাওয়ার দু:খ আমার নিজের। ওটা আমিই বুঝি। অন্যের বাবা মারা গিয়ে কী কী দু:খে পড়েছে ওটা জেনে আমার কী মোক্ষলাভ হবে? আমার তাতে সান্ত্বনা কী?

যে মেয়েটা বিয়ের পর ম্যারিটাল রেপের শিকার হয়েছে, বরের হাতে প্রতিদিন মার খায়, তাকে যদি আপনি বলেন যে ‘তুমি তো তবু একজনের হাতে ধর্ষণের শিকার হয়েছ। পতিতাপল্লীতে পাচার হয়ে যাওয়া মেয়েরা কতোজনের দ্বারা ধর্ষণের, মারধোরের শিকার হয় জানো?’ তবে বিলিভ মি, মেয়েটা এখানে কোনো সান্ত্বনা পাবে না। বরং তার মনে একটা অপরাধবোধ চলে আসতে পারে যে ওই মেয়ের তুলনায় আমার অত্যাচারটা কিছুই না। তাহলে আমার এত মন খারাপ হয় কেন? নিজেকে নিজে সে অপরাধী মনে করবে, গালি দিবে। আর ক্রমাগত অপরাধবোধে ভুগতে ভুগতে একসময় ক্ষয়ে যাবে ভেতরে ভেতরে।

যে মেয়েটার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে বিয়ের পরে স্বামী শ্বশুরবাড়ির সেবার দায়ে, সেও বিষণ্ণতায় ভোগে। শাড়ি, গয়না, ভালো পোশাক, প্রেম ভালোবাসা, সবকিছুর মধ্যেও নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে না পারার বিষণ্ণতায় সে ভুগতে পারে। তার কাছে গিয়ে অন্য মেয়েকে কিভাবে শ্বশুরবাড়ির লোকজন যৌতুকের জন্য পুড়িয়ে মেরে ফেলে তার কাহিনি বলে সে তুলনায় সে কতো ‘সুখে’ আছে বলে তার ডিপ্রেশনকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা কি একজন বিবেকবান মানুষের উচিত কর্ম ?

শিশুর জন্ম দেওয়ার পর অসুস্থ শরীরে রাতের পর রাত না খেয়ে না ঘুমিয়ে একাই শিশুর যত্ন নিতে গিয়ে যে মা বেবি ব্লুজ (এটাও সিভিয়ার ডিপ্রেশনের একটা প্রকার) এ আক্রান্ত হয়ে আত্মহত্যার কথা ভাবে, তাকে যদি আপনারা বলেন, ‘বাচ্চা পেয়েও এমন করছ, জানো, দুনিয়াতে কতো মানুষের বাচ্চা হয় না?’ অথবা যদি বলেন, ‘একটা বাচ্চাতেই এই অবস্থা, আমার নানী দাদী আম্মা তো চৌদ্দটা বাচ্চা পালতো, এত ঢং তো দেখিনি’, তখন কি জানেন যে ওই মায়ের আপনাকে খুন করে ফেলতে ইচ্ছে করে? ওই মায়ের ঘেন্নায় লজ্জায় নিজেকে খুন করে ফেলতে ইচ্ছা করে? আমি জানি, কারণ এই পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে আমি নিজে গিয়েছি।

পরীক্ষায় ফেল করে যে কিশোর আত্মহত্যা করে, শুধু সেই জানে, আপনজনের প্রতিটা কথা কিভাবে শক্তিশেলের মতো হৃদপিণ্ডে প্রবেশ করে হৃদয় পুড়িয়ে দেয়। দশ বছরের প্রেমের সম্পর্কের পর নিজের ঘনিষ্ঠ বন্ধুর হাত ধরে যার প্রেমিকা চলে যায়, সেই মানুষটির হয়তো ‘চলে গেলে চলে যা, সিটিএন’ বলার মতো এটিটিউডটাই নাই, যেটা হয়তো আমার আছে। সেজন্য আমার কী অধিকার জন্মায় যে তাকে গিয়ে বলি, ‘তোর বিষণ্ণতা আসলে দু:খবিলাস, দুনিয়াতে মানুষের আরো অনেক কষ্ট আছে?’

মানুষকে কখনো আমি এই জন্যে আরেক জনের মাত্রায় মাপি না। একজনের মানসিক শক্তি দিয়ে আরেক জনের মনকে যাচাই করি না। নিজের জীবনের হাজার উত্থান পতন, ডিপ্রেশন কাটিয়ে উঠে একটা পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরেও অন্যের ডিপ্রেশনের কারণকে তুচ্ছ করি না।

কারণ প্রতিটা মানুষের মনের মানচিত্র আলাদা।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।