লাতিন শ্রেষ্ঠত্বের ব্যাটন এখন ইউরোপের হাতে?

১.

টানা চতুর্থবারের মতো কোন ইউরোপিয়ান দল বিশ্বকাপ জিততে যাচ্ছে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো। গত বিশ্বকাপে ছিল টানা তৃতীয় বার জেতার রেকর্ড। এর আগে সর্বোচ্চ টানা দুইবার ইউরোপে বিশ্বকাপ গেছে। তাও ১৯৩৪, ৩৮ সালে – দু’বারই ইতালি জেতে। লাতিন আমেরিকায় সর্বোচ্চ টানা দুইবার বিশ্বকাপ এসেছে ১৯৫৮, ৬২ সালে। দু’বারই ব্রাজিল জিতে। ওই শেষ – এরপর লাতিনে আর টানা বিশ্বকাপ আসেনি। বলা যায় বিংশ শতাব্দিতে লাতিন সমান তালে ইউরোপের সাথে লড়ে গেলেও একবিংশ শতাব্দিতে এসে পাঁচ বিশ্বকাপের মধ্যে মাত্র একবার জিততে সমর্থ হচ্ছে লাতিন দেশ।

লাতিন বনাম ইউরোপ চিন্তা করলে স্পষ্টত লাতিন আমেরিকান দলগুলা সামষ্টিকভাবে ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছে। কিন্তু দলগুলোকে আলাদা চিন্তা করলে তাদের এই পিছিয়ে পড়াটা একেবারে অস্বাভাবিক না।  ব্রাজিলের বিদায়ের সাথে তাদের বিশ্বকাপ জয়ের অপেক্ষা ১৬ থেকে ২০ বছর হয়ে গেল। ব্যাপারটা হাস্যকর লাগতে পারে। কিন্তু একটা ভাল দল কয়েক বছরের ব্যাবধানে একাধিক বিশ্বকাপ জিততে না পারলে সব দলের জন্যই সেই অপেক্ষাটা বাড়তেই থাকে। জার্মানি গত বিশ্বকাপ জিতে ২৪ বছরের অপেক্ষার পর। ২০১০ এ তো স্পেন প্রথমবার জিতে বিশ্বকাপ।

ইতালির ২০০৬ সালেরটাও ২৪ বছর অপেক্ষার পর। ব্রাজিল ৯৪ তে জিতে ২৪ বছর অপেক্ষা করার পর। ২৪ বছরটা এখানে অনেকটা ম্যাজিক নম্বরের মতই মনে হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে আরেকটা জিনিসও পরিস্কার যে, বিশ্বকাপ জয় খুব সহজ কোন কাজ না। এখানে আপনার সামান্য দুর্বলতা যথেষ্ঠ কাপ থেকে ছিটকে যেতে। আর যেহেতু লাতিন আমেরিকার চেয়ে ইউরোপের ভাল দল অনেক বেশি, তাই টানা চারবার ইউরোপের কোন দল বিশ্বকাপ জেতাটা অস্বাভাবিক কোন ঘটনা না। অবকাঠামো, প্রযুক্তি, অর্থনীতি গত দিক থেকে ইউরোপের দেশ গুলো এগিয়ে থাকাতে এখন গতানুগতিক ফেবারিটের বাইরে ভাল স্কোয়াড পাওয়া দলগুলোও ঠিকই বিশ্বমঞ্চ থেকে ফলাফল নিয়ে ফিরতেসে।

সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বাঁধা টপকাতে পারলে বেলজিয়াম প্রথম বারের মতো বিশ্বকাপের একেবারে দ্বারপ্রান্তে চলে যাবে। আর জিততে পারলে এই শতাব্দিতে আরেকটা নতুন চ্যাম্পিয়ন পাবে। ইংল্যান্ড যদি জিততে পারে তাহলে তাদেরও নতুন চ্যাম্পিয়ন ধরা যেতে পারে, কারণ তাদের শেষ বিশ্বকাপে সেই ১৯৬৬ সালে। সাধারণত ফুটবল বিশ্বকাপে জার্মানি, ইতালি, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা – এই কয়েকটা দল বিশ্বকাপের চিরন্তন ফেভারিট হিসেবে যেকোন বিশ্বকাপ শুরু করে।

এর বাইরে অন্য দলগুলো কন্সিসটেন্টলি ভাল দল নিয়ে আসতে পারেনা। এদের মধ্যেই কোননা কোন দল ফাইনালে থাকেই। ২০১০ এ সেই ঐতিহ্যের দেয়াল ভেঙ্গে যায়। ২০১৮ তেও তাই হতে যাচ্ছে। এবারের বেলজিয়াম কিংবা ২০১০ এর স্পেন ইউরোপের দলগুলোর জন্য উদাহারণ হতে যাচ্ছে যারা কিনা প্রথম ব্রাজিল জার্মানিদের মতো বড় দলগুলোর বাঁধা পেরিয়ে বিশ্বকাপ জয়ের দিকে এগিয়ে গেছে। এর আগে নিজেদের সোনালী প্রজন্ম নিয়ে আসা দলগুলা ঠিকই আঁটকে যেত অলটাইম ফেভারিটদের কাছে। পক্ষান্তরে লাতিন থেকে ভাল দল নিয়ে আসা উরুগুয়ে কিংবা কলম্বিয়া সে ধরণের কোন চমক শেষ পর্যন্ত দেখাতে পারেনি।

২.

লাতিন আমেরিকার দলগুলো মানসিকভাবেও দুর্বল। ২০০২ এর পর থেকে যতবারই ব্রাজিলকে বিদায় নিতে দেখেছি – প্রতিবারই মানসিক চাপটা এবজোর্ব করতে ব্যার্থ হয়েছে তারা। ব্রাজিল একটা গোল হজম করার পর প্রতিবারই মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ে। প্রত্যাশার চাপে পড়ে খেলোয়াড়রা নিযেদের স্বাভাবিক খেলাটা আর চালিয়ে যেতে পারে নাই।  কৌতিনহো তার একটা বড় উদাহারণ। ২০০২ এর ফাইনালের পর ব্রাজিল বিশ্বকাপে কোন শক্তিশালী দলকে ৯০ মিনিটের খেলায় হারাতে পারেনি। অথচ বেলজিয়াম চাপে পড়েছে বলে একবারও মনে হয়নি। ওদের ডিফেন্সে ব্রাজিল প্রচুর আক্রমণ করেছে, কিন্তু সেটাতে ওরা ভয় পেয়ে যায়নাই। অন্যদিকে বেলজিয়ামের প্রতিটা আক্রমনই ব্রাজিলকে পুরা নাড়ায় দেয়। প্রথম গোলটা আত্মঘাতী হলেও সেটাও ওই নির্দিষ্ট খেলোয়াড়ের ওপর তৈরি চাপের ফলেই হয়েছে বলা যায়।

এটা কেন হচ্ছে?

হতে পারে ব্রাজিলকে যতটা শক্তিশালী দল হিসেবে দেখানো হয় কাগজে কলমে, তারা আসলে অতটা শক্তিশালী না। যেজন্য বড় ম্যাচ খেলতে গিয়ে ব্রাজিল যখন জয়ের কাগজে কলমে আন্ডারডগ দলের বিপক্ষে ঝাপিয়ে পড়ে তখন প্রতিপক্ষ ব্রাজিলের দুর্বল জায়গাটা ভালভাবেই ধরে ফেলে এবং তারা সুযোগের অপেক্ষায় থেকে ঠান্ডা মাথায় ডিফেন্ড করে যায়।

অথচ সেই ডিফেন্ড কাজটা কখনো ব্রাজিল করে নাই, সেটা প্রতিপক্ষ বেলজিয়াম হোক কিংবা জার্মানি। কাল কাসেমিরোর মতো খেলোয়াড় না থাকার পরও বেলজিয়ামের দুই নাম্বার টেন, বিশেষ করে দি ব্রুইনের আক্রমনকে কুড়িতে বিনষ্ট করে দেয়ার কোন ডিফেন্সিভ কৌশল ছিলনা। এবং কাসেমিরোর বদলে খেলতে আসা ফার্নান্দিনহো পুরোপুরি ব্যর্থ।

তাহলে কি দাড়ালো?

খেলার আগে মনে হচ্ছিল কাসেমিরোর বিকল্প যে সেও বিশ্বসেরাদের একজন, কিন্ত বাস্তবে দেখা গেল ওর চেয়ে বেলজিয়ামের একই দায়িত্ব পালন করা ফেলাইনি ছিল একদম স্পট অন। মনে হচ্ছিল সে একাই ব্রাজিল লেফট উইং এর সব পথ বন্ধ করে দিচ্ছে আগেই। এবং ডিফেন্সিভ মিডে ওরা যতটা জমাট ছিল, ব্রাজিল ততটা ছিলনা। উল্টো ফার্নান্দিনহোকে দেখা গেছে প্লেমেকিং এর দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রতিপক্ষকে বল বিলিয়ে দিচ্ছে এবং কাউন্টারে গোল খাওয়ার সব যোগান বেলজিয়ামকে দিয়ে দিচ্ছে। একটা বিশ্বমানের খেলোয়াড়ের অবস্থা এমন হবে কেন? কেন কৌতিনহো চাপে পড়ে ভুল পাস দিবে? কেন নেইমার এর মতো বিশ্বসেরা খেলোয়াড়দের একজন মাত্র একটা শট নিবে?

এই বিশ্বকাপে ব্রাজিলের দুই সেন্টার ব্যাক থিয়াগো সিলভা আর মিরান্ডার জন্য এই বিদায়টা অনেক বেশি আক্ষেপের হবে। এতো ভাল ডিফেন্স বোধয় ব্রাজিল সহসা পাবেনা। ওদেরকে স্যালুট দিতেই হয়। নেইমার হতাশ করে নাই, কিন্তু একেবারে ইম্প্রেসও করে নাই। জাতীয় দলের জন্য বিশ্বকাপই শেষ কথা। বিশ্বকাপ জিতে নাই বলে জিকো সক্রেটিসদের মতো খেলোয়াড়দের অনেক ব্রাজিল ভক্তকেই পরিচয় করাই দেয়া লাগে।

ব্রাজিলের ইতিহাসের অমর কোন ফিগার হতে হলে ব্রাজিলকে বিশ্বকাপে জেতাতে হবে। নেইমার অবশ্য সেটা আরেকভাবে করতে পারে। ব্রাজিলের হয়ে সর্বোচ্চ গোলের মালিক হতে পারলেও হয়ত সে অমরত্ব পাবে। কিন্তু বিশ্বকাপে না জিতলে সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে পেলে এবং দ্বিতীয় সর্বোচ্চ হিসেবে রোনালদোকেই ভাল মানায়। আজ থেকে হয়তো নেইমার প্রচন্ড হতাশায় ভুগবে। উত্তরসূরীদের মতো কিছু করতে না পারায় ভুগতে পারে হীনমন্যতায়। তবে সুযোগ হয়তো আরেকবার আসবে। কিন্তু সময়টা চার বছর। চার বছরে অনেক কিছুরই পরিবর্তন হয়। চার বছর আগে তার পাশে ছিল অস্কার, এবার পেয়েছে কৌতিনহোকে। কে জানে হয়তো চার বছর পর কৌতিনহোর পাশে আরেকজনও থাকতে পারে। সময়টা চার বছর বলেই এতটা ভয়।

৩.

মিশন হেক্সা নিয়ে হাসি তামাশা যারা করে তারা আসলে এই দুইটা শব্দের মর্ম বুঝবেনা। বুঝতে হলে আগে তাদের দলকে পাঁচটা বিশ্বকাপ জিততে হবে। এই ব্যাপারটা রিয়াল মাদ্রিদের লা ডেসিমা নিয়েও দেখসি। যাদের তিনটা চার টা উচল ছিল তারাও রিয়ালের উচল খরা নিয়ে হাসি তামাশা করসে। অর্থাৎ ব্যাপারটা স্বাভাবিক। কালকে যখন বেলজিয়ামের কাছে হেরে ব্রাজিলের বিদায় প্রায় নিশ্চিত হয়ে যাচ্ছিল তখন ভাষ্যকাররা ব্রাজিলকে – ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে সফল দল হিসেবেই সংজ্ঞায়িত করছিল।

ব্রাজিলের উপর বিশ্বকাপ যেতার তাগিদের কথাও উঠে আসছিল বার বার। ফুটবল ইতিহাসে ব্রাজিল যেমন দুর্দান্ত দল উপহার দিয়ে এসেছে তেমনি দুর্দান্ত খেলোয়াড়ও উপহার দিয়েছে একই সাথে। এখানে সাথে ব্রাজিলের সাথে কারো তুলনা চলেনা। কিন্তু সেই ব্রাজিলকেও বিশ্বকাপ থেকে খালি হাতেই ফেরা লাগে। ২১ বারের মধ্যে এ নিয়ে ১৬ তম বার। এবার ভাল একটা সুযোগ ছিল, আগামীবার সেটা নাও আসতে পারে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।