কেরালা ক্যাফে: দশটি জীবনঘনিষ্ঠ গল্পের মলাটবদ্ধ ছবি

একটা সিনেমায় কী থাকে? একটা গল্প; যার খানিক কল্পনা, খানিক সামান্য বাস্তব। আরেকটু পরিধি বাড়িয়ে বলা যায়, আমাদের প্রতিনিধি হয়ে কয়েকটি চরিত্রের এগিয়ে যাওয়া। কিংবা একেবারে আবেগ বিবর্জিত মতামতদাতার কাছে সিনেমা কেবল বিনোদন।

দেখা শেষে ডিলিট দিয়ে মেমোরি কার্ডের স্পেস ঠিকঠাক রাখতে হয়। কারো কাছে সিনেমা কিছুই নয়। বিকেলের আড্ডায় বন্ধুকে বলল, তোর কাছে থাকলে কিছু দে। সময় কাটে না। নিল, দেখল, রেখে দিল বা মুছে ফেলল। এই তো?

যদি বলি সিনেমা মানে নিজের ভেতরটাকে টেনে বের করা? যদি বলি সিনেমা মানে নিজেকে নাড়িয়ে তাড়িয়ে বদলে দেয়া? যদি এটা বলি সিনেমা মানে মানসিক চিন্তাধারায় বড়সড় একটা ধাক্কা দেয়া? যদি বলি আমি ঠিক, রেফারেন্স চাইবেন? জ্বি, আছে! রেফারেন্স আছে!

ছবির নাম ‘কেরালা ক্যাফে’। ২০০৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত মালায়লাম মুভি। ‘কেরালা ক্যাফে’ ২০০৯ সালে দশজন গল্পকারের লেখা দশটি জীবনঘনিষ্ঠ গল্পের মলাটবদ্ধ গ্রন্থের শিরোনাম। ‘কেরালা ক্যাফে’ যেখানে বসে ম্যামুট্টি, সুরেশ গোপি, পৃথ্বিরাজ, ফাহাদ ফাসিল, দিলীপ, জয়াসুরিয়া, নিথিয়া মেননরা মিলে আমার আপনার ভিতরটাকে বের করে এনেছেন।

ঘুণে ধরা সভ্যতায় ঘুণপোকারা ঘুণের মাঝেই ঘুরঘুর করে। ঘুণের ভাগটাও তাদের একার নেই। উইপোকা, ছারপোকারা চারপাশে ঘিরে আসে ভাগের আশায়। ছন্নছাড়া জীবনে ব্যস্ততা ঘিরে ধরে আমাদের প্রায়শই। আঠা হয়ে লেপ্টে থাকে, শিকল হয়ে বেঁধে রাখে।

চাইলে ছুটা যায়, শরীরকে কষ্ট দিয়ে! কষ্ট দেবার সময়টাই বা কোথায় পাওয়া যায়? শেষ বয়সে নিজেকে কষ্ট দেবার কষ্টটুকু করার শক্তিটুকুই বা কই? তাই বৃদ্ধাশ্রম হয় শেষ ঠিকানা, কারো ভাগ্যে তাও জুটেনা! পুঁচকে বিড়ালছানার মতন তাদেরও ফেলে আসা হয় অজানায়!

দশ গল্পের প্রত্যেকটি নিয়েই উপন্যাস বাঁধা যাবে। জীবন উপন্যাসই বটে! তাই, থাকুক। দারিদ্র্যের কাছে হার মেনে মেয়েকে দত্তক দেবার বেলায় শেষবার কিনে দেয়া চকলেটে জীবন বেঁচে থাকুক।

বেঁচে থাকুক ভাইয়ের প্রিয় পাখির পালক বোনকে দিয়ে প্রাণপণ দৌঁড়াবার দৃশ্যে। বেঁচে থাকুক, প্রত্যেক স্টপেজে দাঁড়ানো বাসের পাঁচমিনিটের ব্রেকে, আরেক বাসে দশমিনিটের ব্রেকে ভেতরের ভিলেনটাকে মেরে ফেলার আত্নতৃপ্তিতে।

দশটি গল্প। তাই ভিন্ন ভিন্ন জেনারের স্বাদ আস্বাদনের সুযোগ থাকছে। কোনটায় দম ফাটানো হাসি, ফাঁসি দিতে গিয়েও শেষ পর্যন্ত পরিবারের ভালবাসায় ফিরে আসার মূহুর্তে চোখ টলমল করবে, একটু ভৌতিক স্বাদও পাবেন, আবার কোনটায় থমকে যাবেন! পর্দায় নিজেকেই দেখতে পাচ্ছেন বলে!

‘অ্যান্থোলজিক্যাল ড্রামা’ এ মুভির জনরা। এন্থোলজির বাংলা করলে অর্থ দাঁড়ায় ‘সাহিত্য সংকলন’। মুভির সার্থকতা এখানে দিনের আলোর ন্যায় পরিষ্কার। বকবকানি অনেক হলো। দেখে নিন। একটু হেসে নিন, তারপর কেঁদে নিন, তারপর ভালবেসে নিন। আপন করে নিন প্রিয়জনকে।
‘কেরালা ক্যাফে’ আপনার জন্য, যেখানে জীবনকে চেনানো হয়, উপলব্ধি করানো হয়।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।