মেসি সাম্রাজ্যের পতন ও ছাগল বিতর্ক

‘লুকা মড্রিচ ছিল দারুণ। ওর মত খেলোয়াড় আর্জেন্টিনায় খুব দরকার ছিল। আমাদের যারা নেতৃত্ব দেয়, তারা আসলে নেতৃত্বের কিছুই বোঝে না। মেসির ওরকম ব্যক্তিত্বই নেই। এটা লজ্জার ব্যাপার। ওকে দেখলাম একটা ছাগলের সাথে ছবি তুলছে, নিজেকে বলছে বিশ্ব সেরা (জি.ও.এ.টি=গ্রেটেস্ট অব অল টাইম)। তুমি বিশ্ব সেরা নও, তুমি কিছু জিতে দেখাও।’

– কথাটা খোদ ডিয়েগো ম্যারাডোনার। ফুটবল বিশ্বে বা বৈশ্বিক সমর্থকরা তাঁর কথাকে গুরত্বের সাথে না নিলেও আর্জেন্টিনায় তিনি এখনো বিরাট ব্যাপার। দেশটিতে ম্যারাডোনার প্রতি সাধারণের যে আকর্ষণ, যে সমর্থন তাঁর ছিটেফোটাও নেই মেসির জন্য।

কারণ ম্যারাডোনা উঠে এসেছিলেন নোংরা বস্তি থেকে। ড্রাগ ও অ্যালকোহলের প্রতি নেশাগ্রস্থ থেকে জীবনের কঠিন বাস্তবতাকেও তুলে ধরেছিলেন তিনি। আর মেসির জন্ম আর্জেন্টিনায় হলেও তাঁর বড় হওয়া আর ফুটবলার হয়ে ওঠা তো স্পেনে। তাকে আর্জেন্টাইনদের বিলবোর্ড-টিশার্টে দেখা যায়, কিন্তু মনে স্থান পাননি আজো।

ফলে, সেই ম্যারাডোনা যখন কোনো কথা বলেন, তখন সেটাকে আর্জেন্টাইনরা গুরুত্বের সাথে নিতে বাধ্য। আর লাতিন  ফুটবল সমর্থকরা তখনই একজন ফুটবলারকে কিংবদন্তি মানেন, যখন তিনি বিশ্বকাপ জিতে ফেলেন। তাই, বার্সেলোনার হয়ে সব অর্জন এখন অবধি বৃথা।

ব্যাপারটার মোক্ষম এক ব্যাখ্যা দিয়েছেন ব্রাজিলের হয়ে ২০০২ সালের বিশ্বকাপ জেতা রিভালদো, ‘দেখুন, মেসি বার্সেলোনার হয়ে এবং ফুটবলের জন্য যা যা করেছে, তাতে ইতোমধ্যে এই খেলাটার একজন কিংবদন্তি। কিন্তু এর চেয়ে বেশি কিছু তার পক্ষে আপনি বলতে পারবেন না। কারণ, আর্জেন্টিনার দেশ হিসেবে ম্যারাডোনার মতো একজন বৃহত্তম তারকা আছে, যিনি তাদের বিশ্বকাপ জিতে দিয়েছেন। ফলে আর্জেন্টাইন ও লাতিনদের কাছে সম্ভবত মেসি ওই একই পর্যায়ের কিংবদন্তি নয়। কারণ, দেশের সমর্থকদের কাছে এটা কোনো ব্যাপারই নয় যে, ক্লাবের হয়ে আপনি কী করেছেন।’

‘মেসি বার্সেলোনার হয়ে অনেক ট্রফি জিতেছে; চ্যাম্পিয়নস লিগ বেশ কয়েক বার, লা লিগা। এটা ক্লাব সমর্থকদের কাছে অনেক বড় ব্যাপার। কিন্তু আর্জেন্টিনার লোকেদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো বিশ্বকাপ জেতা। অবশ্যই এটা আমরা বুঝতে পারি। কারণ, ফুটবলের সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে বিশ্বকাপ হলো সবচেয়ে বড় ব্যাপার এবং এটা সবচেয়ে বড় পুরস্কার। আপনি যতক্ষণ এটা না জিতছেন, ততোক্ষণ লোকে বলবে, এটা আপনাকে জিততে হবে। আমার ধারণা, মেসি যতক্ষণ বিশ্বকাপ না জিতবে, আর্জেন্টিনার লোকেরা তাকে ম্যারাডোনার মাপের মনে করবে না।’, যোগ করেন তিনি।

ক্লাব ফুটবলে গণ্ডায় গণ্ডায় ট্রফি (১৪ মৌসুমে ৩২ শিরোপা) জিতেছেন, এক ব্যালন ডি’অরই জিতেছেন পাঁচবার। অথচ, জাতীয় দলের হয়ে ট্রফি জয়ের প্রশ্নেই যেন লিওনেল মেসির সব জারিজুরি শেষ। বিশ্বকাপ ও দুটি কোপা – সর্বশেষ তিনটি বৈশ্বিক টুর্নামেন্টের ফাইনালে নিজের ম্যাজিকে দলকে নিয়ে গেছেন ফাইনালে। কিন্তু সব সময়ই ফিরেছেন খালি হাতে।

চলতি বিশ্বকাপের শুরুটাও একদম যাচ্ছেতাই হল লিওনেল মেসির। কোনো গোল পাননি, একটা পেনাল্টি মিস করেছেন, একটাতে দল ড্র করেছে আইসল্যান্ডের মত পুঁচকে দলের বিপক্ষে। আরেকটায় হেরে গেছে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে। আর গুঞ্জন এই বিশ্বকাপ থেকে আগেভাগেই বিদায় নিয়ে ফেললে মেসিসহ শীর্ষ আর্জেন্টাইনরা অবসর নিয়ে ফেলবেন। এমন দাবী করছে কিছু আর্জেন্টাইন ও ব্রিটিশ গণমাধ্যম। এর আগে ২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনালে হেরে যাওয়ার পর মেসি জাতীয় দল থেকে অবসর নেন। কিছুদিনের মধ্যেই অবশ্য অবসর ভেঙে ফিরে আসেন। এবার বলা হচ্ছে, অন্তত মেসি ও আগুয়েরো স্থায়ীভাবেই অবসর নিতে যাচ্ছেন।

বিশ্ব ফুটবলের কিংবদন্তিদের দু’টি ভাগে ভাগ করা যায়। জিদান, ক্রুইফ, প্লাতিনি, মুলার, ডি স্টেফানো, ইউসেবিও, বুফন, বেকেনবাওয়ার, পেলে, ম্যারাডোনা, বেস্ট, পুসকাস, গারিঞ্চা, জাভি, ইনিয়েস্তা, রোনালদো ডি লিমা, ববি চার্লটন – এদের মধ্যে যারা বিশ্বকাপ জিতেছেন, তাঁরা থাকেন প্রথম শ্রেণিতে। দ্বিতীয় কাতারে থাকেন বাকিরা।

অথচ, মেসি হলেন আধুনিক ফুটবলের নতুন এক ধারার বাহক। সাম্বার জন্য পেলে যেমন, টোটাল ফুটবলের জন্য ক্রুইফ যেমন, ব্যাড বয়েজ যুগের জন্য ম্যারাডোনা যেমন, মেসিকেও একালের ফুটবল সেই জায়গাটা দেয়। কারণ মেসির মত করে ফুটবলটা একালের আর ক’জনই বা খেলতে পারেন। সাফল্যের চূড়ায় তিনি তখনই উঠবেন, যখন তিনি বিশ্বকাপ জিতে ফেলবেন। তখনই তো চক্রপূরণ হবে বিশ্বকাপের।

দ্য পিপল ম্যাগাজিনের কভারে ক’দিন আগেই একটা ছাগলের সাথে হাজির হয়েছিলেন মেসি। তাতে লেখা ছিল জি.ও.এ.টি। এর অর্থ হল ‘গ্রেটেস্ট অব অল টাইম’। মানে মেসি হলেন, স্বঘোষিত সর্বকালের সেরা।

কিন্তু, এই ঘোষণাটা আসতে হবে ফুটবল বিশ্ব থেকে। এর আগে প্রত্যাশার চাপটা মেটাতে হবে মেসিকে। মেসি নিষ্প্রভ থাকার অর্থই যে ছন্নছাড়া আর্জেন্টিনা সেটা তো ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষেই বোঝা গেল। আর্জেন্টিনার ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম কাণ্ডারী অজি আর্দিলেজ তো বলেই দিলেন, ‘এই দলটা বাছাইপর্বেই বাদ পড়ে যাচ্ছিল। কিন্তু মেসি হ্যাটট্রিক করে বের করে এনেছেন সেখান থেকে দলকে। তার ফলে প্রতি ম্যাচে আর্জেন্টিনার প্রত্যাশা থাকে, মেসি অমন কোনো জাদু করে বের করে আনবেন আর্জেন্টিনাকে। সেই প্রত্যাশাই সম্ভবত লিওনেল মেসিকে স্থবির করে দিয়েছিল এই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে।’

আর্জেন্টিনা দলে মেসি কখনোই ক্লাবের মতো সমর্থন পাননি। বার্সেলোনায় মেসিকে বল জোগান দেওয়ার জন্য আগে ছিলেন জাভি-ইনিয়েস্তা, এখন আছেন রাকিটিচ-বুস্কেটস-কোটিনহোরা। এখানে যে সমর্থন তিনি সতীর্থদের কাছ থেকে পান, তা কখনোই জাতীয় দলে পাননি। তারপরও গত আসরে, ২০১৪ বিশ্বকাপে দলকে টেনে নিয়ে গিয়েছিলেন ফাইনালে। কারণ, কিছুটা হলেও হ্যাভিয়ের মাশ্চেরানো, ডি মারিয়াদের সমর্থন পেয়েছিলেন। এবারের বিশ্বকাপে দলটায় সে সমর্থনও পাচ্ছেন না।

বিশ্বকাপ জিততে দলের সমর্থন পাওয়াটা জরুরী মেসির জন্য। তখনই তো তিনি জি.ও.এ.টি হবেন। তারপরও তিনি গ্রেট হয়ে ইতিহাসে বেঁচে থাকবেন আজীবন, কিন্ত নামটা থাকবে দ্বিতীয় কাতারে।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।